পুরনো লেখা

লেখা তুমি লেখা নও, কও কথা মোরে,
কথায় কাঁদাও তুমি কি যে ব্যথা ওরে!
কাগজের ভাঁজে গিয়েছ যতনে ঘুম,
স্মরণের আদরে দিলাম তোমারে চুম।

-MGRI 



 


আরকান থেকে রোহিঙ্গারা উৎখাত হলে বাংলাদেশ বিপদে পড়বে

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

আরাকান বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলাসংলগ্ন নাফ নদীর ওপাড়ে বার্মার একটি রাজ্য যার বর্তমান নাম রাখাইন। ভৌগলীয় অবস্থান হচ্ছে--- রাখাইন (সাবেক আরাকান) বার্মার একটি প্রদেশ, পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। এর উত্তরে চীন, পূর্বে ম্যাগওয়ে অঞ্চল, ব্যাগো অঞ্চল এবং আয়েইয়ারওয়াদি অঞ্চল, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ। রাখাইন প্রদেশকে মূল বার্মা থেকে পৃথক করে রেখেছে ভিক্টোরিয়া পর্বতশৃঙ্গ। রাখাইন রাজ্যের আয়তন ৩৬,৭৬২ বর্গকিলোমিটার (১৪,১৯৪ বর্গমাইল) এবং এর রাজধানীর নাম সিত্তে। এখানে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানের বাস।

দক্ষিণ এশীয় এই অঞ্চল এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মানচিত্রটা দেখলে এমন অনেক কিছু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করা যায় যা গ্রন্থগত মন্থনে কোনভাবেই সম্ভব নয়। প্রথমে---বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভারতের পেটচিরে থাকা ক্ষুদ্র একটি দেশ যার তিন প্রতিবেশী হলো: ভারত, বার্মা এবং বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের টেকনাফ-লাগোয়া বার্মার ক্ষুদ্রাংশটি(২৫৬ কি.মি.)সহ ভারতের ৪০৯৬ কি.মি.(২৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগর দিয়ে ঘেরা এই বাংলাদেশ। প্রতিরক্ষাগত, ভৌগলিক দৃষ্টিভঙ্গী বিবেচনা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে ভারত প্রতিবেশী হিসাবে যতোটা বন্ধুদেশ বলে কথিত তার চেয়ে অনেকগুণ বৈরী ও প্রতিকূল-রাষ্ট্র। স্বাধীনতার('৭১) পূর্বাপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এই সত্যটি বারবার প্রমাণীত হয়েছে। বাকি রইল পার্শ্ববর্তী বার্মা। বার্মা মূলত বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ। আরাকান ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বার্মার বৌদ্ধরা একটি উগ্র মুসলিমবিদ্বেষী শক্তি। আর বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। আরাকান রাজ্যে সংখ্যাগত দিক থেকে বৌদ্ধেদের সমসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাস। এখন দেখা যাক এই আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অস্তিত্ব বাংলাদেশের জন্য কতোটুকু ইতিবাচক বা নেতিবাচক। আগেই বলে এসেছি, আরাকান প্রদেশটি বার্মার মূল ভূখণ্ড থেকে ভিক্টোরিয়া পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বিভক্ত। যেহেতু বার্মা বৌদ্ধ-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তাই সেটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বৈরীশক্তি। অপরপক্ষে বার্মার দিক থেকে তাকানো গেলে বাংলাদেশ বার্মার মতো উগ্ররাষ্ট্র না হলেও বার্মার দৃষ্টিকোণে একটি বৈরীরাষ্ট্র। সেদিক থেকে বার্মা তার ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় ভূ-রাজনৈতিক(Geo-Political) আচরণ নির্দ্ধারিত করার কৌশল অবলম্বন করবে--এতে সন্দেহ থাকার কথা নয়। সঙ্গত কারণে, বার্মার সীমান্ত-প্রদেশ আরাকানের ধর্মভিত্তিক সংখ্যাতত্ত্ব বার্মার শাসকদের জন্য একটি চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশ-বার্মার ভবিষ্যত কোন সংঘর্ষে বা বিবাদে এই সংখ্যাতত্ত্ব যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তা না বোঝার কারণ নেই। সেই হিসাবে বার্মার শাসকেরা সবসময়েই আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে একটি বৈরী এবং বাংলাদেশবান্ধব জনগোষ্ঠী বলে মাথায় রাখবে। বার্মা তার নিরাপত্তার স্বার্থে আরাকানের ধর্মভিত্তিক সংখ্যাতত্ত্বকে পরিবর্তন করতে চাইবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এবং বার্মার শাসকেরা আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির হারকে মাথায় রেখে অবশ্যই একটি পথচিত্র (Roadmap) তৈরি করে রেখেছে। এর প্রমাণ, রোহিঙ্গাদের বাধ্যতামূলকভাবে দু'টি সন্তানের বেশি নেয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা। এখন গণহত্যার পাশাপাশি রোহিঙ্গা-নারীদের উপর যে গণহারে ধর্ষণ চালানো হচ্ছে সেটা ঐ সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে রচিত পথচিত্রের একটা অংশ যেন মুসলিম মহিলাদের দূষিত করে দেয়া যায়। এটা নিশ্চিন্তে বলা যায়, আরাকানে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের সম্ভাবনা ততোদিন প্রকট থাকবে যতোদিন তাঁদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উপরের দিকে থাকবে বা বৃদ্ধি না পেলেও হ্রাসহীন একটি অবস্থানে থাকবে। যেহেতু সর্বশেষ আদমশুমারী অনুসারে আরাকানে মুসলিম জনসংখ্যা এখন বৌদ্ধদের প্রায় সমপরিমাণ তাই বার্মার শাসকেরা শঙ্কায় রয়েছেন--এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তারা চাইছে রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। যদি সেটা হাতের নাগালে রাখা না যায় তখন নিগ্রহ, গণহত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদিকে অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করে একটা ভীতি তৈরি করে তাদের আবাসত্যাগ করানোর পরিকল্পিত পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।

অপরপক্ষে আরাকানে রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যাবৃদ্ধি ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। যেহেতু রোহিঙ্গারা মুসলিম এবং বাংলাদেশবান্ধব তাই আরাকানে তাঁদের অস্তিত্ব বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ করুন, বার্মার মূল ভূখণ্ড আর বাংরাদেশের মাঝখানে আরাকানএখন আরাকান যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় অথবা সেখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মুসলমানেরা টিকে থাকে সেটা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক। এটা না মেনে উপায় নেই।

এখানে ভারত আরেকটি ফ্যাক্টর। ভারত সবসময়েই তার সীমান্তসংলগ্ন বাংলাদেশের অংশকে অস্থির করে রাখে। বার্মা ভারতের জন্য বাংলাদেশের প্রতিকূলে একটি ভারতবান্ধব-রাষ্ট্র। সেই হিসাবে ভারত বার্মাকে সাথে নিয়ে বার্মা-বাংলাদেশ সীমান্তকে অস্থির করবে যে কোন প্রয়োজনে। তখন আরাকানের বর্ণিত সংখ্যাতত্ত্ব ভারতের প্রতিকূলে অবস্থান নেবে যদি সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা টিকে থাকে। এবং এতে ভারতের পরিকল্পনা সমস্যায় পড়বে। তাই আরাকানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যাহ্রাস ভারতের জন্য ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরি করবে। এটা নিঃসন্দেহে ভারতের মাথায় রয়েছে।

এসব দিক বিবেচনায় মনে রাখতে হবে, আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা উৎখাত হলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশের দু'দিকেই দাঁড়িয়ে যাবে দু'টি শত্রুরাষ্ট্র বা বৈরীশক্তি। এটা বাংরাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-সামরিক উভয় দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে এদেশের শাসক এবং প্রতিরক্ষাবাহিনীকে।

৮.১২.২০১৬


ইসলামী রাজনীতি হালচর্চা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

গোড়ার কথা

'ইসলামী রাজনীতি' একটি আধুনিক পরিভাষা আধুনিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক ইসলাম (Political Islam) মৌলবাদী ইসলাম (Radical Islam) নিয়ে আলোচনা কমবেশি হচ্ছে তবে আজ আমরা বাংলাদেশ-প্রেক্ষাপটে যৎসামান্য আলোচনা করবো ইসলামী রাজনীতি নিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চার মূলনীতির অন্যতম নির্ধারিত করার পর বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির দরোজা বন্ধ করে দেয়া হয় সরকারিভাবে এর পেছনে মৌলিক দায় ছিলো ক্ষমতাশীন সেক্যুলার রক্তাক্ত বিপ্লবে দীক্ষিত বামশক্তির ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যে রাষ্ট্রীয় চিন্তা-ভাবনা থেকে ধর্মকে বহিস্কার--তার বাস্তব একটি উদাহরণ উক্ত ঘটনা এখান থেকে শুরু হয় সমাজ জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষকরণের (Secularization) প্রক্রিয়া উপমহাদেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক , এল খতীব তাঁর সমাদৃত গ্রন্থ Who killed Mujib? ( কারা মুজিবের হত্যাকারী?)- সে-সময়কার একটি চিত্র উপস্থাপন করেছেন এভাবে, "... দেশ স্বাধীন হবার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিদিন প্রচলিত 'ইনশাল্লাহ' এবং 'আসসালামু আলাইকুম' শব্দ দু'টি শুনলেও রাগে ফেটে পড়তো" (বাংলা সংস্করণ, পৃ: ৩৬) উল্লেখ্য, তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে এখানকার গুপ্ত সেক্যুলার বামশক্তি পূর্ববাংলার সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষকরণের নিমিত্ত যা-যা করার সবই করেছিলো তাদের এসব তৎপরতার মূললক্ষ্য ছিলো, ইসলাম বিশেষত, রাজনৈতিক ইসলামকে ঠেকাতে তারা তাদের কলমে আর মুখে যাচ্ছেতাই লিখেছেন, বলেছেন কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের মতো একটি মুসলিম রাষ্ট্রের অধীন হবার কারণে শক্তিদ্বয় খুব বেশি এগুতে পারেনি যেমন, বাংলাদেশের সেক্যুলার চিন্তাধারার একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, কথাসাহিত্যিক শিক্ষাবিদ মরহুম অধ্যাপক আবুল ফজলের (১৯০৩-১৯৮৩) কথা এখানে উল্লেখ করা যায় তিনি ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে যোগ দেন স্মর্তব্য, তিনি মৃত্যুর আগে শয্যাশায়ী অবস্থায় একজন মৌলভী ডেকে তাঁর সকল সেক্যুলার চিন্তাধারা থেকে তাওবা করেছিলেন বলে নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে জাতীয় দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয় (কাজির দরবার) স্বাধীনপূর্ব বাংলাদেশে তাঁর ইসলামী রাজনীতি বা ইসলামী শাসনব্যবস্থা নিয়ে কৃত সেক্যুলার চিন্তা-চেতনার একটি দৃষ্টান্ত এখানে টানা যেতে পারে তাঁর কথায়, " আমার বিশ্বাস, ধর্ম আর রাজনীতি সম্পূর্ণ আলাদা বস্তু--রাজনীতির প্রধান কাজ রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিকে পদে-পদেই আপস করে চলতে হয়, কিন্তু ধর্ম তার সম্পূর্ণ বিপরীত, কোন অবস্থাতেই ধর্ম আপস করতে রাজী না, আপস করতে গেলেই ধর্ম তার খাঁটি-রূপ বা অকৃত্রিমতা রাখতে পারবে না কিছুতেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে কোন রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান চলে, কিন্তু ধর্মীয় কোন ব্যাপারেই পদ্ধতি অচল... আমরা আমাদের দেশের জন্য গণতন্ত্রকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছি (ধর্মীয় দলগুলিও চায়), কাজেই আমাদের রাজনীতির চেহারা আর চরিত্র হবে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম খাপ খায় না, শুধু গণতান্ত্রিক কেন কোন রাজনীতির সঙ্গেই ধর্ম খাপ খেতে পারে না রাজনীতি বিশেষ করে আধুনিক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে সেক্যুলার, কিন্তু ধর্মকে আধুনিক বা অনাধুনিক নামে কিছুতেই চিহ্নিত করা যায় না ধর্ম চিরন্তন--সে চিরন্তনের সঙ্গে দিনে দিনে পরিবর্তনশীল রাজনীতির নেকাহ দিতে গেলে সুখের দাম্পত্য জীবন অকল্পনীয়, আমার আপত্তির প্রধান কারণ এখানে এবার আমার বক্তব্য নিবেদন করছি

ইদানীং 'ইসলামী শাসন' কথাটা আমাদের এক শ্রেণীর নেতা আর কর্মীর মুখে খুব একটা জনপ্রিয় তথা লোক-ভুলানো বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে এতে লোক ভুলানো অতি সহজ কারণে যে, এর পেছনে একটা অন্ধ আবেগ রয়েছে, যে-আবেগ বুদ্ধি-দীপ্ত কিংবা বাস্তব-ভিত্তিক নয় মোটেও দেখা গেছে ধর্মে মানুষ কখনও যুক্তি-বিচারের ধার ধারে না, স্রেফ একটা উত্তেজিত আবেগের স্রোতে যায় ভেসে আমাদের দেশে যে-সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ধর্ম-ভিত্তিক শাসনের দাবি করা হচ্ছে, আদতে ধর্মের খেদমত বা ধর্ম প্রচার সব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা সে ক্ষমতা দখল সহজ হবে মনে করেই সব প্রতিষ্ঠান ধর্ম বা মূলধনকে করে নিয়েছে একমাত্র মূলধন কারণ মূলধনের সাহায্যে ধর্মপ্রাণ জনগণকে সহজেই উত্তেজিত করে তোলা যায়, যায় বিভ্রান্ত করা" ( সমকালীন চিন্তা, পৃ: ৬৯-৭০, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ১৯৭০, ঢাকা)

এভাবে দেশের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত সেক্যুলার বামশক্তি তাদের চিন্তাধারাকে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পূর্ণ কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয় এবং অনুরূপ চৈন্তিক রাজনীতির গোড়াপত্তনে পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে শুধু তাই নয়, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলামী ভাবধারা মুছে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রয়োগে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশ করা হয় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নৈতিক বিষয়গু্লোকে কৌশলে লঘু করে ফেলা হয় ধীরে-ধীরে ১৯৭২ সালে 'মুসলিম বাল্যশিক্ষা' স্থলে চালু হয় ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার 'সবুজ সাথী' স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে উঠে যেতে থাকে ইসলামী শিক্ষার মূলভাব সীরাত রসূল সা., সাহাবী কাহিনী, ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস, বহুত্ববাদের বিরুদ্ধে ইসলামের একত্ববাদী ধারণা, ইসলামের সামরিক বিজয়ের কারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো যা মুসলিম-প্রজন্মে নীতি-নৈতিকতা সৃষ্টি করতে সাহায্য করতো, সে-সব বিষয় ধর্মনিরপেক্ষ মগজের আক্রমণে বিলুপ্ত হতে থাকে

সেক্যুলার জগতের আরেক বরপুত্র অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ সাংবাদিক তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের শীর্ষনেতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট সহকর্মী পরামর্শদাতা জনাব আবুল মনসুর আহমদ তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিকথা 'আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর'- স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবর্তনের ফলসরূপ কী অবস্থা হয়েছিলো, তার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, " আমাদের রেডিও-টেলিভিশন হইতে কোরআন তেলাওয়াত, আসসালামু আলায়কুম খোদা হাফেয বিতাড়িত হইয়াছিল এবং -সবের স্থান দখল করিয়াছিল  'সুপ্রভাত' 'শুভসন্ধ্যা' 'শুভরাত্রি' এই কারণেই বাংলাদেশের জনসাধারণ আমাদের স্বাধীনতার এই রূপ দেখিয়া চমকিয়া উঠিয়াছিল এমন পরিবেশেই" ( পৃ: ৬০৪, প্রকাশ: ১৯৯৫, খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা)

উপরের তথ্যগুলো তুলে ধরতে হলো আমাদের রাজনীতির গোড়ার গলতটা বুঝতে ১৯৭৫- পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র-ক্ষমতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরোত্তম আসীন হলে প্রথমবারের মতো বহুদলীয় রাজনীতির উম্মেষ ঘটে এবং দেশের আলিম-সমাজের রাজনৈতিক তৎপরতার দ্বার উম্মোচিত হয় বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রীয়ভাবে বহুদলীয় রাজনীতির উম্মেষ দেশের ইসলামী রাজনীতির জন্য এক মহাক্ষণ হিসাবে ইতিহাসে উল্লেখ থাকবে কারণ, ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত সময়টাতে আলিম-সমাজ রাষ্ট্রীয় সামাজিকভাবে কোন বৃহত্তর তৎপরতায় অংশ নিতে পারেনি সেক্যুলার বামশক্তির ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের কারণে দেশের আলিম-সমাজের অবস্থান ছিলো নিতান্ত সীমিত দুর্বিষহ অবস্থান থেকে মুক্তি পেতে বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগ ইসলামী রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে অবিস্মরণীয় বিষয়টি ইসলামী রাজনীতির নেতৃবৃন্দ বুঝতে ব্যর্থ হলে গোড়ায় গলৎ পরিদৃষ্ট হবে অহরহ আজকে ইসলামী রাজনীতির নামে আলিম-সমাজ যা কিছু করছেন, সে-সবের প্রসূতি কিন্তু সেই বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগ আজকে যারা ইতিহাসের অনিবার্য ধারা থেকে বিস্মৃত হয়ে আপোষকামিতার জঞ্জালে আবদ্ধ-জীবন যাপন করছেন তারা এক কঠিন বাস্তবতা অস্বীকারের গ্লানি বহন করে চলেছেন পরবর্তী প্রজন্মের ইতিহাসে তারা এভাবেই কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন

পরিক্রমা: 

১৯৭৪ সাল বছরের জানুয়ারী মাসে যাত্রাবাড়ি দারুল উলূম মাদানিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মাওলানা শায়খ তজম্মুল আলী জালালাবাদীকে সভাপতি মুফতী আহরুজ্জামান হবিগন্জীকে সাধারণ সম্পাদক করে জমিয়তুল উলামা বাংলাদেশ গঠন করা হয়

১৯৭৬ সাল স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ পথচলা শুরু দীর্ঘদিন থেকে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পর আলিম-সমাজের রাজনৈতিক তৎপরতা প্রবলভাবে অনুভূত হতে থাকে সে প্রেক্ষাপটে ২৪ শে আগস্ট বাংলার খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ.- নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রথম রাজনৈতিক জোট ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ বা আইডিএল জোটের ভাইস চেয়ারম্যান হন মাওলানা আব্দুর রহীম জোটের শরীক ছিলো, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জামাআতে ইসলামী, খেলাফতে রব্বানী, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি ইমারত পার্টি বিষয়টি নিয়ে আমি খতীবে আযম রহ.- জামাতা, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ . .. খালিদ হোসেন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম নেতা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জনাব আব্দুর রহমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করি জনাব চৌধুরী বলেন, ১৯৭৮ সালে আইডিএল গঠনের পর বছর খানিক সচল ছিলো জোটে জামাআত সংশ্লিষ্টতা বর্জনে অন্যান্য শরীক থেকে চাপ ছিলো খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ রহ.- উপর ছাড়া, জামাআতের রাজনীতির ধরন, কতৃত্বপরায়ন চরিত্র আইডিএলকে ব্যবহার করে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়ন করার কৌশলের কারণে আইডএল কার্যত স্থবির হয়ে ১৯৭৯ সালে ভেঙ্গে যায় এরপর হযরত খতীবে আযম রহ. নেযামে ইসলাম নিয়ে মনযোগী হয়ে পড়েন বাকি অংশের নেতৃত্বে থাকেন জামাআত নেতা মাওলানা আব্দুর রহীম . খালেদ সাহেব বিদেশ থেকে পাঠানো এক বার্তায় জানান: আইডিএল এর নেতৃত্ব জামায়াতের হাতে না থাকায় তাদের বঞ্চনাজনিত ক্ষোভ থেকে আইডিএল মূলত ভেঙ্গে যায়

১৯৭৮ সাল বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির আকাশে যুক্ত হলো এক স্মরণীয় অধ্যায় হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী রহ. সুযোগ্য আধ্যাত্মিক শিষ্য আমীরে শরীয়াত হযরত মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. সক্রিয় নেতৃত্বে গঠিত হলো বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশে আলিম-সমাজের রাজনৈতিক আন্দোলনে খেলাফত আন্দোলন প্রথম ভিত্তিস্তর যা দেশের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সংগঠিত শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে সে-সময় দেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, জামাআতে ইসলামী, সেক্যুলারমহল বামপন্থীরা বিভিন্নভাবে হাফেজ্জী হুযুর রহ. খেলাফত আন্দোলনের বিরোধীতা করে অবশ্য কওমী আলিম-সমাজের একটি অংশ খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ রহ.- নেতৃত্বে পদ্ধতিগত কারণে ভিন্নমত পোষণ করেন তৎসত্বেও খেলাফত আন্দোলনের অগ্রাভিযান ছিলো অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হাফেজ্জী হুজুররের ইসলামী আন্দোলন বা রাজনীতি ছিলো বাংলাদেশে একটি ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন দু'টো বিশেষ কারণে স্বতন্ত্রতা প্রণিধানযোগ্য এক, তাওবার রাজনীতি, দুই, নেককার প্রশাসন সৃষ্টির ডাক জাতির দুর্ভাগ্য, আলিম-সমাজ আজও হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.- -দু'টো দর্শনকে সঠিক উপলব্ধি করতে পারেননি তাই, সেটা নিয়ে উত্তরকালে যেমন গবেষণাও হয়নি, আবার পথনির্দেশনাও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি ফলে, হাফেজ্জী হুজুরের রাজনৈতিক দর্শন থেকে আলিম-সমাজ সমগ্র জাতির এক অপার অপরিশোধ্য শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধকালেও হযরত হাফেজ্জী হুজুর সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়ান ১৯৮১ সালে বিষয়টিকে বিরোধীরা হাফেজ্জী হুজুরের ক্ষমতামুখী রাজনীতি বলে সমালোচনা করেন এটা ছিলো প্রকৃতার্থে একটি অবাস্তব অপবাদ মূলত, হাফেজ্জী হুজুর রহ. নিজে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াবার কোন পূর্বপরিকল্পনা নেননি ১৯৮১ সালের ২৯ শে জুলাই ঢাকার মাদরাসা নূরিয়ায় সর্বস্তরের উলামা-মাশায়েখের একটি পরামর্শসভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে ১২ সদস্যবিশিষ্ট প্রার্থী-নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয় উদ্দেশ্যে বছরের ১৯ শে জুলাই লালবাগ শায়েস্তা খান কল্যাণ কেন্দ্রে শীর্ষস্থানীয় উলামা-মাশায়েখ সহযোগে একটি চূড়ান্ত বৈঠক হয় এবং সেখানেই হাফেজ্জী হুজুরের একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হয়রতকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের জন্য অনুরোধ করেন বৃহত্তর ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে হযরত হাফেজ্জী হুজুর সেদিন সবার আবদার রক্ষায় রাজি হন এটা কখনোই খেলাফত আন্দোলনের ক্ষমতামুখী চরিত্র ছিলো না এটা ছিলো নিখাদ ফী সাবিলিল্লাহ জাতীয় কল্যাণ সাধন নেককার প্রশাসন সৃষ্টির চেষ্টায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হযরত হাফেজ্জী হুজুর ডাক দিয়েছিলেন, ব্যতিক্রমধর্মী তাওবার রাজনীতির যারা সেদিন প্রথম দ্বিতীয় তাওবা-দিবসের ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন তারা বিলক্ষণ বুঝবেন তাওবার রাজনীতির সুগভীর আহ্বানের তাৎপর্য হযরত হাফেজ্জী হুজুরের আরেক আহ্বান ছিলো নেককার প্রশাসন সৃষ্টির ডাক মূলত, দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশে বীর হাফেজ্জীই দুর্নীতিমুক্ত, সৎ আল্লাহভীরু প্রশাসন সৃষ্টির প্রথম কার্যকর ডাক দিয়েছিলেন সেটাতে রাষ্ট্রপক্ষের অসহযোগিতার কারণে পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্য অর্জিত না হলেও প্রশাসনে প্রচুর সহানুভূতি জেগে ওঠে মানুষ বুঝতে পারে দেশের আলিম-সমাজ একটি সৎ, ন্যায়পরায়ন, সমৃদ্ধশালী মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ায় সর্বাধিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এমন বাংলাদেশ অবশ্যই বাঞ্ছনীয় এমন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য পদ্ধতি নিয়েই সেদিন আমীরে শরীয়াত হযেরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. খেলাফত আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন

এরপর ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন দেশের প্রতিনিধিত্বশীল উলামায়ে কেরাম, পীর মাশায়েখ বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে দলটি পথচলা শুরু করে ১৯৯০ সালে দলটির আমীর হন চরমোনাই দরবার শরীফের পীর মাওলানা ফজলুল করীম রহ. পরবর্তীতে দলটি ইসলাম আন্দোলন নামে নিবন্ধিত হয় কাজ শুরু করে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর ঢাকার ইন্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে শাইখুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক রহ.- নেতৃত্বে গঠিত হয় খেলাফত মজলিস বর্তমানে দলটির আমীর হিসাবে আছেন অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাক সাহেব মহাসচিব হিসাবে আছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ . আহমদ আব্দুল কাদের

পর্যবেক্ষণ:

আমরা পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির পূর্বক্ষণ পরিক্রমা সম্পর্কে কিছু ধারণা পেলাম এবার কিছু পর্যবেক্ষণে আসি আমাদের ইসলামী রাজনীতির দিকে তাকালে তিনটি মৌলিক বিষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে: দল, লক্ষ্য পদ্ধতি তিন দিক থেকে আমাদের ইসলামী রাজনীতি বৃহদাংশে অস্পষ্ট এখানে প্রথম যে প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলো, আমাদের দল রাজনীতি কতোটা ইসলামী? অর্থাৎ, দল দলের রাজনীতিকে ইসলামীকরণে কতোটুকু সফল হয়েছি? আমার মনে হয়, দলের লক্ষ্য লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নির্ণয়ের চেয়ে প্রশ্ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একটি ইসলামী দল মানেই ইসলামী আদর্শের একটি অনুসরণীয় তাবু এখান থেকে অন্যেরা আদর্শ শিখবে, ব্যবস্থাপনা শিখবে, সততা শিখবে, জবাবদিহিতা শিখবে ইত্যাদি কোন দল আলিম-উলামা কর্তৃক গঠিত-- কথার মধ্য দিয়ে দলটি ইসলামী হবার যোগ্যতা অর্জন করে না, করতে হলে দলে খোলাফায়ে রাশেদীন কর্তৃক প্রবর্তিত নিয়ম-কানুনের প্রতিফলন থাকতে হবে যেমন ধরুন, আলিম-উলামার সমন্বয়ে একটি দল হলো এখন, তাতে কি দলটি ইসলামী হয়ে গেলো? সেখানে যদি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে--প্রশাসনের দিক থেকে--মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার দিক থেকে--সচ্ছতা জবাবদিহিতার দিক থেকে--আইন প্রয়োগের দিক থেকে ইসলামের সর্বাধিক অংশগ্রহণ প্রমাণিত না হয়, তবে কি দলটি ইসলামী হবে? এরপর আসে দলের রাজনৈতিক দিক দল ইসলামী হবার সাথে-সাথে দলের রাজনৈতিক তৎপরতায় যদি খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রতিফল স্পষ্ট না হয়, তবে কি সেটা ইসলামী রাজনীতি হবার দাবি রাখে? আমাদের ইসলামী রাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করতে গেলে সর্বপ্রথম প্রশ্নগুলোর সুরাহা করতে হবে আইনের মাপকাঠিতে শুধু 'ইসলামী' নামের নামফলকে কোন দল ইসলামী হবে--আমি এমনটা মনে করি না

এরপর আসে লক্ষ্য পদ্ধতির বিষয় এখানে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-নির্ধারণ লক্ষ্য অর্জনে সুস্পষ্ট পদ্ধতি থাকার গুরুত্ব অপরিসীম গ্রহণযোগ্য সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি দল বা সংগঠনের একটি প্রাণশক্তি জাতীয় আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণে দলের নীতি অবস্থান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিবেচনায় দলীয় তৎপরতাকে বহির্বিশ্বে ওয়াকিফহালকরণ একটি রাজনৈতিক দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের জন্যও ব্যাপারটা সে-রকম লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্টতা অনিবার্য কেবল 'ইসলামী শাসন' কায়েমের সস্তা স্লোগান নয়, ইসলামী শাসন কায়েমে অনিবার্যতা, ইসলামী শাসন কায়েমের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, বিভিন্ন স্তর, প্রতিপক্ষের আপত্তির বিস্তৃত জবাব ইত্যাদি জনগণের সামনে স্পষ্ট করে তুলতে হবে আর এসব অর্জনে বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে কর্মীসম্পদ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই কেবল ইস্যুভিত্তিক কিছু সড়ক-আন্দোলন, ব্যানার নিয়ে ফটোসেশন, কিছু আলোচনা, সেমিনার--এগুলো কোন আদর্শিক দলের মৌল-আচরণ হতে পারে না ভেতরে কুসুমের অস্তিত্ব প্রমাণিত না হলে, উপরের সাদা আবরণ যতোই শ্বেত হোক, তা ডিম্ব নয়, অর্শ্বডিম্ব বর্তমান--প্রযুক্তির যুগ এখন অনলাইনে রাজনীতির রোডম্যাপ বা রেখাচিত্র অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অধিক বাস্তব বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই এটা যুগের অনস্বীকার্য দাবি যা অমান্যের সুযোগ নেই

এবার আসুন আমাদের প্রচলিত ইসলামী রাজনীতি রাজনৈতিক দল নিয়ে বিবিসি' এক হিসাবমতে গত নির্বাচনে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে মোট ৭০টি ইসলামী রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে বোঝা যায়, বাংলাদেশে ইসলামী শাসন আসুক না আসুক, ইসলামী দলের বহর কতো বিশাল প্রশ্ন জাগে, এসব দলের সম্মিলিত অর্জনকে যোগ করলে কী দাঁড়ায়? দুঃখ নেবেন না-- প্রশ্ন উপহাসের নয়; আত্মসমালোচনার মিসরের মতো একটি দরিদ্র-দেশে যেখানে একটি মাত্র দল ইখওয়ানুল মুসলিমীন বা মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরের সরকার পরিবর্তনের যোগ্যতা রাখে, জনগণকে এক কাতারে এনে সামাজিক রাষ্ট্রীয় বিপ্লব ঘটানোর ক্ষমতা রাখে সেখানে আমাদের ৭০টি দলের প্রসববস্তু কী--তা জানতে চাওয়া কি অপরাধ হবে? কিসে আমাদের আর তাদের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিলো? সে উত্তর কি এখানে খোঁজা হয়েছে? আমি নির্দিষ্ট কোন নযরিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলছি না, আমি তুলছি সফলতা লাভের পদ্ধতির কথা; কৌশলের কথা

বর্তমানে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে, লক্ষ্য-পদ্ধতি নিরূপণের নিরিখে তুলোদণ্ড কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? প্রবন্ধের শুরুতে বলেছি, দেশের ইসলামী রাজনীতির মূল প্রতিপক্ষ সেক্যুলার বামশক্তি এদের বিরুদ্ধে শানিত বক্তব্য উপস্থাপনে ব্যর্থ হওয়া মানে প্রতিপক্ষের কাছে পরাজিত হওয়া অথচ আমাদের ইসলামী দলগুলোর বিষয়ে সুস্পষ্ট বিস্তারিত বক্তব্য নেই সে-সব প্রতিপক্ষ কিন্তু ঠিক- ছক এঁকে ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে দেশের বাইরে প্রচার করছে প্রভাবশালী পাশ্চাত্য তাদের কথাকে আমলে নিয়ে সরকারের উপর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে আমাদের কি সে-খবর আছে? সেক্যুলার বামেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হলেও ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধে একাট্টা কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ইসলামী দলগুলো এক হতে পারে না কেন? উপরি আমরা দেখি, আমাদের অন্তঃবিদ্বেষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব সেদিন জমিয়তের এক নেতাকে অনলাইনে বয়ান দিতে শুনলাম, যারা জমিয়ত করে না তারা নাকি দেওবন্দের জারজ সন্তান আসস্তাগফিরুল্লাহ! এমন কথাও কি কোন ইসলামী নেতার মুখে শুনতে হবে? দেওবন্দ কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক করেছে নাকি যে তার জারজ সন্তান পয়দা হবে? এতো কদর্য যাদের শব্দ তারা কি সত্যিকার অর্থে ইসলামী রাজনীতি করছেন? এই কি খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুসৃত পথ? এগুলো কি শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া নয়?

এদেশের ইসলামী দলগুলো মূলত কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক ঐতিহাসিকভাবে কওমী মাসরাসার আলিম-সমাজ আপোষহীন হবার কথা তাঁদের পূর্বসূরি মহান ব্যক্তিবর্গের সংগ্রামের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদ আর আধিপত্যব্দের বিরুদ্ধে  অনড়-অনমনীয় সংগ্রামের ইতিহাস এখান থেকে বেরিয়ে যাবার কোন পথ নেই কিন্তু হালআমলে কওমী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামী ঐক্যজোটের একটি পরিচিত অংশ সরকারের সাথে সখ্যতা গড়ে কওমী জগতের সকল মান সম্মানকে ধুলোয় মিটিয়েছেন অথচ বিষয়টিকে কওমী জগতে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি নীতি-নৈতিকার প্র্রশ্নে এমন অবস্থান-বদল মোটেও ভালো দৃষ্টান্ত নয়

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর আরেকটি শূণ্যতা হলো, সমাজের তৃণমূল-সংশ্লিষ্ট না হওয়া যারা রাজনীতি করবে অথচ সমাজের তৃণমূলে প্রবেশ করবে না--তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বাংলাদেশ গ্রামীণ বসতির একটি দেশ কিন্তু এদেশ শাসন করে সংখ্যালঘু মুনাফাখোর এলিট শ্রেণী এদের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করার শপথ যে রাজনৈতিক দলের থাকবে না তাদের রাজনীতি করার নীতিগত অধিকার থাকার কথা নয় ইসলামী দলগুলোর জন্য বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ইসলাম তো অন্যায়, অত্যাচার, বৈষম্য আর জুলুমের বিরুদ্ধে কট্টর-প্রতিবাদ সেখানে ইসলামী দলের নেতারাই যদি এলিট শ্রেণীতে বসবাস করতে শেখেন সে-দুঃখের কি শেষ আ্রছে? আজও দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী দলগুলো বলতে গেলে একেবারেই উদাসীন

একটি দলের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা অপরিহার্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পরিষদ গঠন করে কাজ করছে-- এমন ইসলামী দল আবিস্কার করা কঠিন এদেশের এনজিওরা যেমন এখানকার সমাজ সম্পর্কে ফী-বছর বাইরের দেশগুলোতে অবহিতকরণ প্রতিবেদন পাঠায় তেমনি আমাদের ইসলামী দলগুলো যদি মুসলিম দেশসমূহে এখানকার সমাজ চাহিদা নিয়ে প্রতিবেদন পাঠাতো, তাতে কি বাংলাদেশ জনগণ উপকৃত হতো না? এতে জনগণে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তো আর তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়লে নির্বাচনেও ভালো ফলাফল হতো

উপসংহার:

মোদ্দা কথা, বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি এখন এক ভয়াবহ সঙ্কটে নিমজ্জমান বিভক্তি, অন্তর্দ্বন্দ্ব, নীতিগত আপোষহীন অবস্থানে ব্যর্থতা, সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থতা, লক্ষ্য অর্জনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অন্বেষণে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক-সম্পর্কে সম্পর্ক সৃষ্টিতে ব্যর্থতা, তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তায় ব্যর্থতা ইত্যাদিতে দেশের ইসলামী রাজনীতি জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ থেকে গেছে বলা যায় এসব বিষয়ে আমূল সংস্কারে নিয়োজিত না হলে এক সময় ইসলামী দলগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক আবর্জনায় কালিমালিপ্ত হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে সে ব্যর্থতাকে ইতিহাস কখনোই ক্ষমা করবে না

১১.১০.২০২০

 

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যালোচনা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 (২০২১ সালে এ লেখকের হেফাজত-মামলায় গ্রেফতারী বরণের অন্যতম কারণ ছিলো  অনলাইনে প্রকাশিত এ লেখা।) 

সম্প্রতি দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মুহাদ্দিস হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সংগ্রামী মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুটি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দেশে বিস্তর আলোচনা চলছে অভিযোগ দুটি হলো: এক, ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার মতিঝিলে সংঘটিত শাপলা হত্যাকাণ্ডের দায় এবং দুই, জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্টতাস্মরণে থাকা দরকার, বর্ণিত অভিযোগ নিছক সাদামাটা অভিযোগ নয়এর সাথে সম্পৃক্ত আছে, রাজনীতি, রাষ্ট্রশক্তির প্রভাব হাটহাজারী মাদরাসার অভ্যন্তরে বিকাশমান শোকরানাপন্থী আধিপত্যবাদী শক্তির কূটনীতি যা হোক, আমরা এখানে আজ কেবল বর্ণিত অভিযোগ সম্পর্কে পর্যালোচনা করবো তার আগে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, অভিযোগ করতে দলীলের প্রয়োজন পড়ে না, অভিযোগের জবাব দিতে দলীলের প্রয়োজন হয়, বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় তাহলে খতিয়ে দেখা যাক আল্লামা বাবুনগরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগদ্বয়

এক: সম্প্রতি (১৭ জুন ২০২০, বুধবার) হাটহাজারী মাদরাসার অনুষ্ঠিত শুরার অধিবেশনে মাদারসার পরিচালক হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের পক্ষ থেকে শুরার অন্যতম সদস্য মাওলানা নুরুল আমীন সাহেব হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু লিখিত অভিযোগ পড়ে শোনানযার মধ্যে একটি গুরুতর অভিযোগ ছিলো, শাপলা হত্যাকাণ্ডের জন্য বাবুনগরীর দায় সবাই স্বীকার করবেন, প্রতিটি বিষয়ের নির্ধারিত একটি স্থান থাকে যেমন, কিতাবের স্থান টেবিল, আলমিরা; কলমের স্থান কলমদানি; শোয়া-বসার স্থান বিছানা-পাটি; দরসের স্থান মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদি এখানে প্রথম প্রশ্ন হলো: মাদরাসার শুরা হলো মাদরাসাসংশ্লিষ্ট বিবিধ বিষয়ের আলোচনার শীর্ষ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ফোরাম যদিও হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক মুহতারাম মাওলানা আহমদ শফী সাহেব হেফাজতে ইসলামের আমীর এবং মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের মহাসচিব, তাই বলে মাদরাসার শুরায় হেফাজত নিয়ে কোন আলোচনা হওয়া যে কোন নিয়মের পাল্লাতেই বোধগম্য নয় ধরুন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে সেখানে কি সরকার-প্রধান তাঁর আওয়ামী লীগের সদস্যদের অভিযোগ নিয়ে শুনানী করবেন? সেটা কি গ্রহণযোগ্য হবে? তাই যদি না হবে, তবে বলুন, হাটহাজারী মাদরাসার মতো একটি বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শুরার অধিবেশনে মাদরাসাসংশ্লিষ্ট নয় এমন সংগঠনের সাংগঠনিক কথাবার্তা কীভাবে সম্ভব? এটাই বা কতোটুকু আইনসম্মত? যেখানে ইসলামী শরীয়ার ইন্তিযাম বা ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়, সেখানে এমন অব্যবস্থাপনার কী ব্যাখ্যা হতে পারে? এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, শুরার অধিবেশনে হেফাজতের মহাসচিব পরিবর্তনের প্রস্তাব আমরা জানি না, প্রস্তাবগুলো কে বা কারা রচনা করেছেন, কারাই বা সেগুলো শুরার অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন তবে সামগ্রিক দৃশ্য: যা বিভিন্নভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে বলা যায়, এর পেছনে কলকাঠিনাড়া ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ আইনের নীতিগত পদ্ধতি অনুসরণের চেয়ে যেনতেন উপায়ে অভিযোগ আনার দিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন বা তারা আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন হেফাজতের বিষয় হেফাজতের সাংগঠনিক  ধারায় উপস্থাপিত হওয়া উচিৎ--শুরার অধিকাংশ সদস্যদের এমন মতামত নিঃসন্দেহে যুক্তিপূর্ণ যেভাবেই হোক, ধরনের প্রচেষ্টাকে সামগ্রিকভাবে পদ্ধতিবিরুদ্ধ, অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়

শাপলা হত্যাকাণ্ডে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর দায় কতোটুকু, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার আমি জানি, জনাব বাবুনগরীর কাছে শাপলার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এমনসব তথ্য রয়েছে যা ফাঁস হলে অনেক বড়বড় রুই-কাতলারা জালে আটকে যাবেন তাঁকে একান্তই বাধ্য করা হলে আসল কারিগররা যে কতোটা নিজেদের বিপদ ডেকে আনবেন তা সময়েই বলে দেবে এখানে কতোগুলো বিষয় বিচার্য:

) অবরোধ থেকে আকস্মিকভাবে শাপল-চত্বরে প্রবেশের ঘটনা কীভাবে ঘটলো?

) যেখানে বাংলাদেশের কোন বৃহৎ রাজনৈতিক দলও মতিঝিল দূরে থাক, ঢাকার আশেপাশেও সমাবেশ করার অনুমতি পায়নি, সেখানে হেফাজত কেমন করে ঘণ্টাখানিকের মধ্যে শাপলা-চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি পেয়ে গেলো?

) ৫ই মে রাত্রে আমীরে হেফাজতকে শাপলায় এনে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণার চেষ্টা ভণ্ডুল করেছিলো কারা

) শাপলায় আসলে অনেক আলিম-উলামা সাধারণ সমর্থক শহীদ হয়েছিলেন কি না

) পূর্ব-সিদ্ধান্তের বাইরে শাপলায় রাত্রি যাপন করাতে গোপনে ষড়যন্ত্র করেছিলো কারা?

) ৫ই মে শাপলা-চত্বরের মঞ্চ থেকে ক্ষমতা পরিবর্তনের হুমকি দিয়ে উগ্র উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়েছিলো কারা?

) ৫ই মে হত্যাকাণ্ডের পর হাজার-হাজার হেফাজত কর্মী সমর্থককে অরক্ষিত রেখে পালিয়ে গিয়েছিলো কারা?  

উপরোক্ত সাত বিষয়ের রহস্য ভেদ করা গেলে উঠে আসবে শাপলার দায় আসলে কার বা কাদের উপর বর্তাবে আমার আশ্চর্য লাগে, এতো বড়ো একটি ঘটনা ঘটার পরও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেদিন কোন তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদেরকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেনি এখন যারা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে শাপলার জন্য দায়ী করছেন তাদের কাছে প্রশ্ন: উপরের বিচার্য বিষয়গুলোর সাথে হযরত বাবুনগরীর সম্পৃক্ততা কতো শতাংশ? তাহলেই উত্তরটা সহজে বের হয়ে আসবে ভাবতে হয়, কতো অকৃতজ্ঞ আমরা যিনি শাপলার হত্যাকাণ্ডের শিকার আহত-নিহতদের, দিকভ্রান্ত অসহায়দের ফেলে পালিয়ে আসেননি; নিজের জীবনটুকুও মরণের প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন; রিমান্ডে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন; রাষ্ট্রশক্তির শত প্রলোভনেও যাঁর মস্তক নত হয়নিসেই তাঁকেই কিনা শাপলার আহত-নিহতদের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে! ধিক্ আমাদের মানবতাবোধ

এবার আসুন, বিষয়ে আমীরে হেফাজতের সরাসরি বক্তব্য শোনা যাক পাঠকমাত্রই জানেন, ৬ই মে রাতে আল্লামা আহমদ শফী তাঁর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী খাদেমসহ সরকারের দেয়া ৭টি বিমানের টিকেটের মধ্যে চারটি ফেরৎ দিয়ে তিনটি বিমানের টিকেট নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে চলে আসেন আসার কিছুদিন পর তিনিদ্বিতীয় আলোনামে একটি চ্যানেলকে ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রদান করেন সেখানে তিনি যা বলেন তা হুবহু এমন……..তো আমাদের উপর যে আক্রমণ কইরছে রাত্রে, পৃথিবী হইছে হইতে বোধ হয় এই ধরনের আক্রমণ, ঘুমন্ত অবস্থায়; জিকির-আযকার কইত্তেছে অবস্থায়, তাদের উপর আক্রমণ হয়েছে, আপনারা জানেন। নাস্তিকবাদীরা চাইর-পাঁচ মাস পর্যন্ত, তিন-চার মাস পর্যন্ত উলঙ্গ-উলঙ্গ হইয়া মহিলা-পুরুষ, এইভাবে রাস্তার উপর, রাস্তা দখল করে যে কাজ করেছে, সবাই জানেন, তাদেরকে গুলি করা হয় নাই; কয়েক মাস পর্যন্ত--কিন্তু আমাদেরকে দুই ঘণ্টা-তিন ঘণ্টার; আমি ফজরে যাইয়া বলি দিতাম: যাও, এখন তোমরা নিজ-নিজ স্বগ্রামে চলি যাও। এ দুই-তিন ঘণ্টার সময় আমাদেরকে দেয় নাই। এই ধরনের হামলা, বর্বরতা আমাদের উপর করা হয়েছে। আল্লাহর শোকর আমরা না-কাম (ব্যর্থ) না। নবী আ.-এর সামনে সত্তর জন সাহাবাকে; বড়বড় সাহাবা; হুজুরের চাচাও ছিল--হামযা, তাঁদেরকে হত্যা করেছে কাফেরেরা। তারপর বিজয় লাভ করেছে। আমাদেরও এইটা ঐ ধরনের, ইনশা আল্লাহ ইসলাম যিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ। সেই জন্য আমি দোয়া কইত্তেছি, আপনাদের জন্য, প্রবাসীদের জন্য দোয়া কইত্তেছি। আর যাঁরা শহীদ হইয়া গেছে, তাঁদের জন্য, তাঁদের আব্বা-আম্মাদের জন্য দোয়া কইত্তেছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের শাহাদাতকে কবুল করেন; এই প্রবাসীরা: যারা নাকি আইজকে এদের জন্য জানমাল কোরবান কইত্তেছে, তাঁদের জন্য ইনশা আল্লাহ দোয়া কইত্তেছি। আশা করি আপনারা সামনে এ ধরনের ডাক যদি শোনেন, দ্বীনের ডাক যদি শোনেন, ঈমানের ডাক, তাহলে আপনারা আগের চেয়েও বেশি ঝাঁপাইয়া পড়বেন। আমার কাছে পইত্তেক দিন পাঁচ গাড়ি-সাত গাড়ি-এক গাড়ি শুধু মানুষ আইসতেছে; মানুষ আইসতেছে; মানুষ আইসতেছে: হুযুর কর্মসূচী দেন, হুযুর কর্মসূচী দেন! এক জন মানুষ: তাঁর ছেলে শহীদ হইছে, এখানে দাঁড়াইয়া বইলতেছে: হুযুর আমার কাছে যদি আরও কয়েকটা ছেলে থাইক তো, এরা যদি শহীদ হইত, আমি আল্লাহর শোকর আদায় কইত্তাম। আল্লাহ আমার ছেলেকে কবূল কইরছে, আমি এক জন শহীদের বাপ হইছি। সেই জন্য ভায়েরা, হাদীসের মধ্যে আছে: যারা শহীদ হবে তাঁরা এমন কষ্ট পাবে যেমন একটা পিঁপড়া তাদেরকে কষ্ট দেয়, কামড়াইতেছে--ঐ ধরনের কষ্ট পাবে……………………………

এবার বলুন, শাপলার দায় আমীরে হেফাজত কাদের উপর চাপিয়েছেন? এখন ওনার পক্ষ থেকে যদি আবার মাদরাসার শুরায় মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর উপর শাপলার দায় চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়, তবে কোন বিচারের মানদণ্ডে রায় দেয়া উচিৎ--সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার পাঠকদের

এরপর আসে, ২০১৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিকর্কিত ও প্রবলভাবে সমালোচিত শোকরানা মাহফিলের কথা নিন্দিত বেশ কিছু বিষয়ের সাথে উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সামরিক সচিব প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের বিতর্কিত মন্তব্য: সেদিন শাপলায় কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি; যা হয়েছে তা অপপ্রচার সেদিন তো মঞ্চে আমীরে হেফাজত মাওলানা আহমদ শফী সাহেবসহ বেশ কয়েকজন বরেণ্য কওমী আলিম উপস্থিত ছিলেন তাঁরা তো সামরিক সচিবের এমন জঘন্য মিথ্যাচারের কোন প্রতিবাদ করেননি এ নীরবতা প্রমাণ করে: মঞ্চে উপস্থিত কওমী আলিমরা স্বীকার করেন, ২০১৩ সালের ৫ই মে রাতে শাপলা-চত্বরে কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি; যা শোনা গেছেসব অপপ্রচার মাত্র অথচ শাপলা পরবর্তীকালে আমরা দেখি: আল্লামা আহমদ শফী সাহেবশাপলা গণহত্যার বিচার চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন করতে হয়, যেখানে কেউ হতাহত হয়নি সেখানে আবার শাপলার হত্যাকাণ্ডের দায় হযরত বাবুনগরীর উপর আসে কেমন করে? বিষয়গুলো কি পরস্পর বিরোধী নয়?

দুই: এবার আসুন, মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে জামায়াতসংশ্লিষ্টতা নিয়ে আহমদ শফী সাহেবের পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীর অভিযোগ নিয়েফাঁস হওয়া এক অডিও রেকর্ড থেকে মূলত অভিযোগ সামনে আসেসেখানে মাওলানা আনাস মাদানীকে স্পষ্ট বলতে শোনা যায়, বাবুনগরী জামায়াতের সাথে মিলে কাজ করছেনএরপর থেকে কওমী প্রাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মাওলানা আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠেকেউকেউ মনে করতে পারেন, অভিযোগটির পেছনে আনাস সাহেবের ব্যক্তিগত ধারণা কাজ করেছেআসলে তা নয়লক্ষ করবেন, বর্তমান রাষ্ট্রশক্তির আমলে বিরোধীদের ঘায়েল করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার হলোজামায়াতের তকমা লাগিয়ে দেয়াবিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত তকমা থেকে রেহাই পাননিআল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সে দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রশক্তি এতে জড়িত বলে আন্দাজ করা যায়কারণ, সবাই জানেন, জনাব বাবুনগরী পোষ না মানা এক মর্দে মুজাহিদ আলিমে দ্বীনসন্দেহ নেই, তাঁর আপোষহীন নীতির কারণে পোষমানা শ্রেণীটি যথেষ্ট সমস্যায় পড়েছে; পড়েছে মাখনে ভাগ না পাবার আশঙ্কায়যেহেতু এরা রাষ্ট্রশক্তির পদলেহী শ্রেণী তাই রাষ্ট্রশক্তিও তাদের স্বার্থরক্ষায় পোষ না মানা মানুষগুলোকে জব্দ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুতএখানেও ঘটেছে সেই কিস্সাস্বীকৃতি আনতে যেখানে শোকরানাপন্থীদেরকে গণভবনে ধর্ণা দিতে হয়, শোকরানার নামে সংবর্ধনা দিতে হয় এবংকওমী জননী মতো অবমাননাকর উপাধির আশ্রয় নিতে হয়, সেখানে সরকারের সচিব বাবুনগরীর কামরায় এসে পাসপোর্ট  ফেরৎ দিয়ে পোষ না মানা মানুষটির কাছে নতস্বীকার করতে জাতি দেখে, তখন কি আর গৃহপালিত শ্রেণীটির ঘুম আসে? অতএব, আপোষহীন মানুষটিকে বাগে আনতে বা জব্দ করতে জামায়াতের তকমা লাগিয়ে দেয়ার চেয়ে মোক্ষম দাওয়াই আর কী হতে পারে? মাওলানা আনাস মাদানীর অভিযোগ একান্তই তার নয়, এর পেছনে আছে রাষ্ট্রশক্তির গোপন হাওয়াআমরা আশির দশক থেকে দেখে আসছি, মাওলানা মওদূদী সাহেবের আকীদা আর রাজনীতির বিরুদ্ধে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর অদম্য সংগ্রাম: বক্তৃতায়, মুনাযারার আয়োজন করে, দরসেসবখানেই মওদূদী সাহেবের চিন্তা-চেতনা, যা সর্বস্বীকৃত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহর নীতির পরিপিন্থী, সে-সবের বিরুদ্ধে তিনি মুখে কলমে জিহাদ করেছেন, আজও করে চলেছেনআর সেই বাবুনগরী হযরতকেই দেয়া হলো জামায়াতসংশ্লিষ্টতার তকমাবাহ, কী চমৎকার! প্রতিশোধের না জানি আরও কতো যে ধরন আছেআমার মনে হয়, আইনের স্বার্থে হযরত বাবুনগরীর উচিৎ হবে, আনাস মাদানীর বরাবরে একটি উকিল নোটিস জারি করাএটা ভবিষ্যতে কাজে আসবে

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর আরেক অপরাধ হলো, তিনি শাপলার গোপন ভাগ-ভাটোয়ারায় শরীক হননি এবং শাপলা পরবর্তী কোন প্রকারকুচ ল্যাকে আও তো কুচ ল্যাকে যাওধর্মী লেনদেনে জড়িয়েও পড়েননিএখন তো আর কে কোথায় কতো টাকা গুনেছে, কতো টাকা পকেটস্থ করেছেসে খবর অজানা নয়লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক  মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী তো এক বৈঠকে বলেই দিয়েছেন: মে জোহরের পর ঢাকার দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে তিন ব্যক্তি টাকার বস্তা নিয়ে মাশগুল ছিলেনতাঁর কাছ থেকে নামগুলো জেনে নেয়া যেতে পারেস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ফটিকছড়িতেও এমন একজন আছেন, যিনি আনাস মাদানীর ঘনিষ্ট বলে খ্যাত--হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন, শাপলার ভাগ পেয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকা এক কিস্তিতেবাকি কিস্তিগুলোর কথা আল্লাহ মালুমআসলে হযরত বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উক্ত অভিযোগ এনে আনাস সাহেবরা কিন্তু জামায়াতকেই শক্তি যোগাচ্ছেনকারণ, অনেকেই ভাবতে পারেন, এমন আপোষহীন মর্দে মুজাহিদ যদি জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট হন তবে তো জামায়াতই সত্যপন্থীএখন বলুন, লাভটা হলো কার?

পরিশেষে বলবো, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বের চেয়ে রাজনৈতিক গুরুত্বটাই মূখ্যসরকার কিন্তু বিলক্ষণ জানে, হযরত বাবুনগরী জামায়াত থেকে কতো যোজন-যোজন দূরেকিন্তু তাঁকে তো দমাতে হবে, না হয় আপোষের দড়িতে বাঁধতে হবেতাই, এসব ভিত্তিহীন অভিযোগকওমী ছাত্রদেরকে সজাগ থাকতে হবে যেন পেছনের দরোজা দিয়ে এমন করে শত্রুশক্তি আমাদের আপোষহীন নেতৃবৃন্দকে কলঙ্কিত করবার দুঃসাহস দেখাতে না পারেমনে রাখতে হবে, সাপের বিষদাঁত প্রথম দিনেই ভেঙ্গে দিতে না পারলে সেই সাপ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবেআল্লাহু হা-ফিয 

০৬.০৭.২০২০                                                                                                                                                                                                             

 

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের রাজনীতি এবং বিভাজনের ষড়যন্ত্র

 মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

'সেক্যুলারিজম'(Secularism) অনুবাদে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বাংলাদেশে একটি বিতর্কিত ও আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে চারটি বিষয়কে মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে:--গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। বলাবাহুল্য, এই চারটি মৌলনীতি কোনভাবেই 'গণতান্ত্রিক' ছিলো না। এসব মৌলনীতিকে সংবিধান-সংশ্লিষ্ট বা সংবিধানে প্রবিষ্ট করার আগে জনগণের মত নেয়া হয় নি। এগুলো প্রকৃতপক্ষে এ ভূখণ্ডের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস বা অনুশীলনের বিষয়ও ছিলো না। 'গণতন্ত্র'কে ব্যাখ্যানির্ভর করে যুক্তিসঙ্গত বলে চালানোর কিঞ্চিৎ চেষ্টাচরিত্র করা যেতে পারে কিন্তু বাকি তিন মৌলনীতিকে কোনভাবেই এদেশের জনগোষ্ঠীর নির্ভেজাল আকাঙ্খার প্রতীক ভাবার কোন বাস্তবতা নেই। এর পেছনে একটা ইতিহাসও আছে। উল্লেখ্য, এ চারটি বিষয় ভারতীয় সংবিধানের মৌলনীতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষপর্যায়ে কোলকাতায় আশ্রিত অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ব থেকেই পরিচিত ভারতীয় লবির বিশ্বস্ত মানুষ আওয়ামী লীগ নেতা তাজুদ্দীন আহমদ বারবার ভারত-সরকারের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে কোন প্রকার সঙ্কেত না পাওয়ায় তাজুদ্দীন আহমদ উদ্বিগ্ন হন। পরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, ভারতীয় সংবিধানের চার মৌলনীতিকে বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করার শর্তে ভারত নবগঠিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত। বিষয়টি অস্থায়ী সরকারের ভেতর তাজুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশটি বিনাদ্বিধায় গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ড. কামাল হোসেনের মতো ভারতীয় লবির লোকজন যারা সংবিধান রচনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন তারা ওয়াদামোতাবেক সংবিধানে সংশ্লিষ্ট করে নেন। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচাপতি মরহুম আব্দুর রউফ এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছিলেন প্রায় একদশক আগে। তাই নয় কেবল, এতদসম্পর্কীয় ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য থেকে আঁচ করা যায় ভারতীয় চাপেই মূলত তাদের চার মৌলনীতি বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবেশ করে। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন সহযোদ্ধা, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন--".... কিন্তু আওয়ামী নেতারা সংবিধান রচনায় জওয়াহেরলাল-নেতৃত্বের কংগ্রেসের অনুসরণ না করিয়া চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বের মুসলিম লীগকেই অনুসরণ করিয়াছেন।.......আমাদের সংবিধান রচয়িতারাও তাই করিয়াছেন। প্রস্তাবনায় তারাও বলিয়াছেন: 'জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম-নিরপেক্ষতার মহান আদর্শই আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল।' তথ্য হিসাবে কথাটা ঠিক না। আওয়ামী লীগের ছয়-দফা ও সর্বদলীয় ছাত্র এ্যাকশন কমিটির এগার-দফার দাবিতেই আমাদের মুক্তি-সংগ্রাম শুরু হয়। এইসব দফার কোনটিতেই ঐসব আদর্শের(জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম-নিরপেক্ষতা) উল্লেখ ছিলো না। ঐ দুইটি 'দফা' ছাড়া আওয়ামী লীগের একটি মেনিফেস্টো ছিল। তাতেও ওসব আদর্শের উল্লেখ নাই। বরঞ্চ ঐ মেনিফেস্টোতে 'ব্যাংক-ইনশিওরেন্স, পাট-ব্যবসা ও ভারি শিল্পকে' জাতীয়করণের দাবি ছিল। ঐ 'দফা' মেনিফোস্টো লইয়াই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচন লড়িয়াছিল এবং জিতিয়াছিল। এরপর মুক্তি সংগ্রামের আগে বা সময়ে জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের পক্ষ হইতে আর কোনও 'দফা' বা মেনিফোস্টো বাহির করার দরকার বা অবসর ছিল না। আমাদের সংবিধান রচয়িতারা নিজেরা ঐ মহান আদর্শকে সংবিধানভুক্ত করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন। তাই জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঐ ভুল তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।"( আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ: ৬২০, পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ- ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৫, খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা) উল্লেখ্য,  আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের একজন স্বীকৃত সাংবাদিক, রাজনীতি-বিশ্লেষক এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখা একজন বিশিষ্ট নাগরিক যিনি তার জীবনটাই বলতে গেলে কাটিয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ও সমাজ বিনির্মাণের পেছনে। এখানে জনাব আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্য একেবারে পরিস্কার। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, সংবিধানে প্রবিষ্ট  সেক্যুলারিজমসহ বাকি তিনটি মৌলনীতি কখনোই মুক্তিযুদ্ধ বা জনগণের চেতনা কিংবা আদর্শ ছিলো না। এটাকে চেতনা বা আদর্শ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন আসছে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি কেন এবং কিভাবে পথ চলা শুরু করলো। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদেরকে কতোগুলো বিষয় বুঝতে হবে। প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত, ভারতীয় আধিপত্যবাদের গুপ্তসৈনিক হিসাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী  সেক্যুলারগোষ্ঠীর তৎপরতা। এসব বিষয় বুঝতে ইতিহাস-সচেতনতার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর অন্দরে লুক্কায়িত বিভিন্ন শক্তির ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘর্ষ, প্রতিযোগিতা ইত্যাদির পরিসংখ্যান ও চরিত্রকে সম্যকভাবে আয়ত্বে রাখতে হবে। 

প্রথমেই আসি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে। পাঠকমাত্রেই জানা থাকার কথা, সম্ভবত দশক আগে বিবিসি বাংলা শ্রোতাদের জরিপের রেখাচিত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বলে নির্বাচিত করে। সাথেসাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমার সোনার বাংলা...' গানটিকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ গান হিসাবে নির্বাচিত করে। বলাবাহুল্য বিবিসি মূলত একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যম। এদের দায়িত্ব প্রধানত সংবাদ-প্রচার, সংবাদ-বিশ্লেষণ এবং বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতির ছবি উপস্থাপন। কিস্তু বিবিসি বাংলা মনে হয় এসব আচরণবিধির উর্ধ্বে। তাই তারা সংবাদের চেয়ে বিনোদন বা বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠানের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত। উল্লেখ্য, বিবিসি বাংলার প্রথমযুগ থেকেই ভারতীয়দের একটা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা ছিলো। বিবিসি সাংবাদিক ও খ্যাতিমান সংবাদ-বিশ্লেষক মরহুম সিরাজুর রহমানের প্রধান হিসাবে অবসরের পর থেকে বিবিসি বাংলাতে ভারতীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় একচ্ছত্র। বিবিসি বাংলার প্রধান হয়ে আসেন সাবির মুস্তফা যিনি ভারতীয়দের চেয়েও বড়ো ভারতীয়। তার সময়েই বিবিসি বাংলা একটি নোংরা, পক্ষপাতমূলক, একচোখা এবং বিতর্কিত সংবাদ-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই সাবির মুস্তফাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি ও গান নির্বাচনের মতো একটি অহেতুক বৈশিষ্ট্যবিহীন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানটি ছিলো মূলত বিবিসি বাংলার ভারতীয় আধিপত্যবাদী চক্রের সূক্ষ্ম একটি কৌশল যার উদ্দেশ্য ছিলো বাংলাদেশের ছাত্র ও যুব-সমাজে ভারতের স্বার্থে সেক্যুলারিজম এবং কথিত বাঙ্গালি-সংস্কৃতির বীজ স্থায়ীভাবে রোপণ করা। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, শেখ মুজিবুর রহমানকে যতেদিন এদেশের মানুষের কাছে বিতর্কিত এবং ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ে হিন্দুভাবাপন্ন করে রাখা যাবে ততোই ভারতের মুনাফা অবিরত থাকবে। শেখ মুজিবুর রহমানের মুসলিম পরিচয় যতো বেশি ফুটে উঠবে ততোই ভারত এবং তার এদেশীয় পদলেহী সেক্যুলারগোষ্ঠী বিপদে পড়বে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী চক্র এই সমস্যাটি বুঝতে পেরেছে। তাই তারা বিবিসি বাংলার মাধ্যমে আগেভাগে শেখ মুজিবুর রহমানকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বানিয়ে তার মুসলিম পরিচয়কে সর্বাত্মকভাবে খাটো করতে চেয়েছে। এতে অন্তত সাবির মুস্তাফার মতো এজেন্টদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনমানসে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে নেতিবাচক ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাখা যাবে যা ভারতীয় আধিপত্যবাদের জন্য হিতকর নিয়ামক বলে বিবেচিত হবে। এর ফলসরূপ জাতি বিভক্ত হবে এবং পূর্ণমুনাফা ভারত ভোগ করবে। এই 'শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি' নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেক্যুলারচক্র শেখ মুজিবুর রহমানকে মুসলিম পরিচয়ে অভিধিত করার চেয়ে 'বাঙ্গালি' পরিচয়ে প্রচারিত করতে সচেষ্ট। এখন প্রশ্ন: শেখ মুজিবুর রহমান আসলে কতোটুকু সেক্যুলার ছিলেন? ১৯৯৪ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা তাদের ৪৫তম বর্ষপূর্তি-সংখ্যা প্রকাশ করে। সংখ্যাটিতে তোফায়েল আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সিরাজুল আলম চৌধুরী, অজয় রায়, কে এম সোবহানের মতো কট্টর বামপন্থী ও সেক্যুলার ঘরানার লেখকেরা প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উক্ত সংখ্যায় 'বঙ্গবন্ধু থেকে খালেদা' শীর্ষক একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের সেক্যুলার-চরিত্র নিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী লিখছেন: " ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক রাজনৈতিক, আদর্শিক ছিলো না। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বহুবার বলেছেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিলে এই দেশ জ্বলে উঠবে। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরদার করা উচিৎ"( পৃ: ১৫)। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই যে কখনো ধর্মনিরপেক্ষ বা বাঙ্গালি পরিচয় না দিয়ে নিজের মুসলিম সত্ত্বা এবং পরিচয়কে বড়ো করে দেখতেন তার প্রমাণ মেলে আওয়ামী ঘরানার বিশিষ্ট সাংবাদিক জাওয়াদুল করিমের 'মুজিব ও সমকালীন রাজনীতি' গ্রন্থে। বইটির ১৯৫ পৃষ্ঠায় ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের বরাতে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে জামাইকার রাজধানী কিংস্টনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের হোটেলকক্ষে লেখক তার প্রত্যক্ষ-শোনা কিছু কথা বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন। সংবাদসংস্থা এনা'র তৎকালিন সম্পাদক গোলাম রসুলকে সিক্যুরিটিপ্রশ্নে সম্বোধন করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন: " আল্লাহ তাআলা না বাঁচালে কোন সিক্যুরিটি জীবন রক্ষা করতে পারে না। কোন পুলিশ বা মিলিটারি জীবন রক্ষা করতে পারে না। আমি মুসলমান হিসাবে এটা বিশ্বাস করি।"( প্রথম সংস্করণ: ১৯৯১, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা) একই পৃষ্ঠার আরো নিচের দিকে এসে জনৈক প্রশান্ত নিয়োগীর করা একটি ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি তির্যক-মন্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। এতে তিনি বলছেন: "নিয়োগী আমার সম্পর্কে নাকি কিসব ভবিষ্যৎবাণী করেছে। কিন্তু আমি একজন মুসলমান হিসাবে ওসব বিশ্বাস করি না। আমার ধর্মেও এটা নিষিদ্ধ।" আশা করি এবার বোঝা গেলো 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি' শেখ মুজিবুর রহমান নিজের কোন পরিচয়ে বিশ্বাস করতেন এবং তা বিনাদ্বিধায় প্রকাশও করতেন। তা'ছাড়া সবাই জানেন, স্বাধীনতা-সংগ্রামের কালে শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিটি ভাষণে ইনশা আল্লাহ বলতেন। এটা নিশ্চয় কোন সেক্যুলার-চরিত্র নয়

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের এই সত্ত্বাটিকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে এদেশীয় সেক্যুলারচক্র বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে শেখ মুজিবুর রহমানকে ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙ্গালিত্বের প্রতীক ইত্যাদি প্রচার করে হিন্দুভাবাপন্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাতের ঘুম হারাম করে ফেলে। এরাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের  সময় বঙ্গভবনে-গণভবনে রবীন্দ্র-সঙ্গীতের আসর বসিয়ে দেশবাসীকে জানিয়ে দেয় এ মুজিব তোমাদের সংগ্রামী মুজিব নয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের এদেশীয় সেবাদাসেরা সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে এমন নাযুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চূড়ান্তভাবে জনবিচ্ছিন্ন একজন স্বৈরশাসকে পরিণত হন। ইনু-মেনন-মতিয়া-বাদলেরা সুকৌশলে তেরি করে হত্যার উর্বরক্ষেত্র। আর তার চরম পরিণতি হয় আগস্টের বিয়োগাত্মক ঘটনায়। 

এর দীর্ঘসময় পরে ক্ষমতায় আসে(১৯৯৬) মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় আসতেই নতুনরূপে দেখা দেয় সেই পুরনো সেক্যুলার অপশক্তি। এবার তাদের ক্ষেত্র আগের চেয়ে অনেক সহজ। শেখ হাসিনা নিজেকে বিনামূল্যে সঁপে দেন তাদের কাছে। দেশের একশ্রেণীর সংখ্যালঘু অত্যুৎসাহী হয়ে দেখাতে থাকেন এই ভূখণ্ড ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি নিয়ে এতোটাই উগ্র হয়ে ওঠেন যে, মনে হয় তাদের সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতি। এতে সরকারের স্পষ্ট মদদ ও অংশগ্রহণ দেখে আমাদের সন্দেহ জাগতো শেখ হাসিনার পরিচয়প্রশ্নে। কোলকাতায় গিয়ে শেখ হাসিনার কপালে লালটিপ আর মাথায় সিঁদুর দেয়া থেকে এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী স্বভাবতই সন্দিগ্ধ হন। প্রথম থেকেই শেখ হাসিনা শুরু করেন বিভক্তির রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ,  মৌলবাদ ইত্যাদি নিয়ে তিনি এমন এক ক্ষতের ভিত্তিস্থাপন করেন যার মাসুল আজ জাতিকে দিতে হচ্ছে। তিনি নিজেই এখন সেই ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছেন। পরিণতির ছবি সময়ের হাতেই রইল। ২০১৩ সালের ৫ম মে'তে সংঘটিত শাপলার গণহত্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে যায় এক মুসলিমবিদ্বেষী স্বৈরচারিনীর গহ্বরে। তার এই ধ্বংসাত্মক বিভক্তির রাজনীতি তাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে দূঃখজনক হলেও সত্য যে, শেখ হাসিনাকে এভাবে ব্যবহারের পেছনে কাজ করেছে সেই চিহ্নিত জাতির শত্রু সেক্যুলারগোষ্ঠী এবং ইনু-মেনন-বাদলদের সর্বনাশা বামপন্থী নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠী। 

আমি আগেই বলেছি, 'দেশ-এ'জাতি বিভক্ত হলে সুফল যাবে ভারতের হাতে। হচ্ছেও তাই। শেখ হাসিনা যতোই সেক্যুলার থাকবেন; যতোই তার বিশ্বাসের বিষয়ে, তার ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সন্দিগ্ধ থাকবেন ভারতীয় আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী ততোই মুনাফা গুনবে।এখানে যতোই বিভাজনের রাজনীতি হবে ততোই দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শক্তি ক্রমশ দুর্বল হবে। বলাবাহুল্য, এই বিভাজনের রাজনীতি আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলবে অচিরেই। তাই দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে চাই ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী, সেক্যুলার-চক্রবিরোধী আর বামপন্থী নাস্তিক্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। এর কোন বিকল্প নেই। 

১১.০৫.২০১৭

 

পুনর্গঠিত হেফাজত: প্রত্যাশা ও সংশয়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

(ফেইসবুক থেকে)

গত ১৫ই নভেম্বর ২০২০, রবিবার পুনর্গঠিত হলো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি চট্টগ্রামের দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে উক্ত পুনর্গঠন হয় মূল-কমিটিতে কারা-কারা স্থান পেয়েছেন, তা এখন অজানা নয়।  হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আমীর হিসাবে সাবেক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং মহাসচিব হিসাবে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী নতুন কমিটিতে নির্বাচিত হয়েছেন। পুনর্গঠিত কমিটি নিয়ে আপাতত যা জেনেছি: দুএকটা বিষয় বাদ দিলে বাকি সব চলনসইএমন মতামত অধিকাংশের।  মোটের উপর আল্লামা আহমদ শফী রহ.-র ইন্তিকালের পর হেফাজতের পুনর্গঠন নিয়ে সবার যে দাবি ছিলো, সেটার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

পুনর্গঠিত হেফাজত নিয়ে বলতে গেলে বাস্তবতার খাতিরে কিছু কথা বলতে হয়যা একজন পর্যবেক্ষকের নিরপেক্ষ ও ব্যক্তিগত মতামত হিসাবে গ্রহণ করলে বিতর্কের কিছু থাকে না।  বলাবাহুল্য, বর্তমান বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর সাবেক আমীর আল্লামা আহমদ শফী রহ. ইন্তিকাল করেন। সেই থেকে হেফাজতে ইসলামের আমীরের পদ শূন্য। তখন থেকে জাতি তাকিয়েছিলো হেফাজতে ইসলামের ভবিষ্যৎ আমীর নির্বাচনের দিকে। সংগতকারণে, গত ১৫ই নভেম্বর, রোববার হাটহাজারী মাদরাসায় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা.-র আহ্বানে পুরো দেশের জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের নিয়ে আমীর নির্বাচন ও কামিটি গঠন বা পুনর্গঠনের নিমিত্ত একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দৃশ্যমান আদ্যপান্ত একজন কাউন্সিলর হিসাবে সশরীরে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে।  একজন ব্যক্তি হিসাবে আমার নিজস্ব স্ভাব, মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে সম্মেলনের কিছুকিছু বিষয় যেমন ইতিবাচক মনে হয়েছে তেমনি নেতিবাচক বা অসামঞ্জস্যশীলও মনে হয়েছে।  বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে সেসব এখানে এখনই না বলা শ্রেয় বলে মনে করি।  একটি সংগঠনের সাংগঠনিক মেজাজকে নিরীক্ষণ করলে, বিশেষত, আল্লামা আব্দুস সালাম চাটগামী (লাল্লাহ মাকামাহু), . আফম খালিদ হোসাইন সাহেব, মাওলানা সাজিদুর রহমান সাহেব, ঢাকার মাখযানুল উলূম মাদরসার পরিচালক মাওলানা নুরুল ইসলাম সাহেব প্রমূখের বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।  আল্লামা চাটগামী দা.বা. তাঁর উর্দূতে দেয়া বক্তব্যে একটি শরয়ী দস্তূর এবং সেই দস্তূরের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলে আকদর প্রসঙ্গ টেনেছেন। আমার মনে হয়েছে, পুরো সম্মেলনে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা। হযরতের কথায় তিনটি বিষয় উঠে এসেছে--এক, শরীয়াহভিত্তিক দস্তূর; দুই, আকদ এবং তিন, আকদের প্রতি দায়বদ্ধতা।  কোন সংগঠনই দস্তূর বা সংবিধান ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। অথচ হেফাজতে ইসলাম তার দীর্ঘ পথচলায়ও পূর্ণাঙ্গ একটি গঠনতন্ত্র পাশ করতে পারেনি। ড. খালিদ ভাইও সে-কথা বললেন তাঁর বক্তব্যে। এরপর আসে আকদ বা সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বিষয়, যা সাংগঠনিক-মনস্তাত্বিক ইজাব-কবূলকে চিহ্নিত করে। এটি সংগঠনের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি।  হযরত চাটগামী দা.বা.-র কথা মানলে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাংগঠনিক শপথ নেয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। শপথ নেয়া কোন প্রতীকী কর্ম নয়, বরঞ্চ গঠনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের দলীল। এটাকে ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন করা হলে, লঙ্ঘনকারীকে বা-গী বা বিদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করা যায়।  সুতরাং, নির্দ্বিধায় বলা যায়, আল্লামা চাটগামীর উক্ত মৌলিক নির্দেশনায় হেফাজতে ইসলামের ভবিষ্যৎ পথচলার নিরাপত্তা অনেকখানি নির্ভর করে

যা হোক, প্রতিনিধি সম্মেলনের কথায় ফিরে আসি।  আগেই বলেছি, হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন নিয়ে জাতির প্রত্যাশা ছিলো চোখে পড়ার মতো।  যা কিছু হয়েছে, আমি বলবো পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে এমন কিছু প্রত্যাশা আমরা মনেপ্রাণে কামনা করিএখানে বলতেই হচ্ছে:

. পুনর্গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাইকরণ: কোন কাজ-ই এক লাফে হয় না; ধীরেধীরে-ধাপেধাপে করতে হয় ১৫ই নভেম্বরের পুনর্গঠিত কমিটিকে আরেকবার যাচাই-বাছাইয়ের কষ্টিপাথরে পরখ করে নিলে ভাল হয় যেমন ধরুন, যেহেতু সারা দেশ থেকে দায়িত্বশীল নেয়া হয়েছে, তাই প্রথম ধাপে কিছুকিছু ক্ষেত্রে এলোমেলো হওয়া অস্বাভাবিক নয় এমনটি হতেই পারে দেখতে হবে, কোন দায়িত্বশীল কোন দায়িত্বশীলের নিকটবর্তী থাকলে কাজ সম্পাদনে সহজতা আসে কোন-কোন দায়িত্বশীল কেন্দ্রে থাকবেন, কোন-কোন দায়িত্বশীল রাজধানীতে থাকবেনসেসব বণ্টন করতে হবেতরীকায়ে কা-’-র পথচিত্র তৈরি করে  মনে রাখতে হবে, তাকসীমে কা-র বাস্তবায়িত হবে তরীকায়ে কা-রের দক্ষতার উপর ভিত্তি করে সঙ্গতকারণে, কার্যকরী কমিটির প্রথম বৈঠকেই এ বিষয়টির সমাধান করা হলে আশা করি ভাল ফল বয়ে আনবে

. সাংগঠনিক বলয় সুসংহতকরণ: স্বীকার করতে হয়, সাংগঠনিক বিস্তৃতি বা শক্তিশালী সাংগঠনিক পথরেখা প্রস্তুতকরণ একটি আদর্শ সংগঠনের প্রাণ। সাধারণত সাংগঠনিক সম্পাদক এ কাজে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।  এ-কাজে সফল হতে সাংগঠনিক সম্পাদকের দক্ষতার বিকল্প নেই।  বলা যায়, এ-দিকটায় হেফাজতে ইসলামের অবস্থান বেশ দুর্বল বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আজও দেশের প্রত্যেক জেলা-উপজেলা-মফস্বল কমিটি গঠন, কমিটির নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠানে তদারকি, সাংগঠনিক সম্পাদকের দেশব্যাপী ত্রৈমাসিক সফর, কমিটিগুলো থেকে তরুণ-নেতৃত্ব ও কর্মী গড়ে তোলা, কর্মীদেরকে সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তোলা ইত্যাদিতে সন্তোষজনক কাজ করা হয়নি বলে মনে হয়। পাশাপাশি আমাদের দেশের ভূ-বিবেচনায় সাংগঠনিক সম্পাদকের অবস্থান রাজধানীতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেহেতু রাজধানী সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু, তাই নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক রাজধানীতে বসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে পারবেনযা দেশের অন্য কোথাও বসে মানোত্তীর্ণ করা দুষ্কর। বিষয়টি আশা করি পুনর্গঠিত হেফাজত নেতৃবৃন্দ ভেবে দেখবেন। এখানে আমার একটি প্রস্তাবনা আছে। তা হলো, একজন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদককে ঢাকায় রেখে ৮টি বিভাগে ৮ জন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মাধ্যমে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যেতে পারেএতে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের উপর থেকে কাজের চাপ কমবে এবং বৃহত্তর পরিসরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সহজ হবে।   

. জবাবদিহিতা:  জবাবদিহিতা একটি প্রতিষ্ঠানের মূল-নিয়ামক।  যেখান জবাবদিহিতা নেই, সেখানে সততা নেই; যেখানে জবাবদিহিতা আছে, স্বচ্ছতা আছেসেখানে সততা আছে, প্রগতি আছে, সফলতা আছে।  হেফাজতের আঙ্গিকে জবাবদিহিতা হবে প্রথমত, স্বয়ং রব্বুল আলামীনের কাছে এবং দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের কাছে--যেখানে প্রত্যেক দায়িত্বশীল দায়িত্বের পরিধি অনুসারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য হবেন। মনে রাখতে হবে, কেবল অর্থের হিসাবেই জবাবদিহিতা বন্দী নয়।  এর বাইরেও অন্যান্য দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে, হেফাজতে ইসলাম কোন পেশাধারী প্রতিষ্ঠান নয়; এখানে কেউ বেতনধারী চাকরিজীবি (ব্যতিক্রম বাদে) ননতাই, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবামূলক আন্তরিক প্রচেষ্টা। এখানটায় কোন প্রকার ঘাটতি দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থাই ধসে যেতে বাধ্য।  বিশেষ করে, কমিটির প্রতিটি বৈঠকে পূর্বের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তাবয়ন নিয়ে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরী। যদি এমন নিয়ম করা হয় যে, পূর্ববর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা ব্যতিরেকে চলমান বৈঠক শুরু করা যাবে না, তাহলে কাজে স্বচ্ছতা আসবে। প্রত্যেক বৈঠকের নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক খাতায় বৈঠকের বিবরণী দফতর সম্পাদক কর্তৃক লিখিত ও সংরক্ষিত থাকতে হবে এবং বিবরণীর অনুলিপি বা নকল মহাসচিব বরাবরে জমা দিতে হবে।  

. পূর্ণাঙ্গ হিসাবের অডিটসময়ে-সময়ে যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ওঠে তা হলো: হেফাজতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব। ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের অডিট রিপোর্ট আমার যদ্দূর জানা আছে এখনও চূড়ান্ত করা যায়নিবারবার কমিটি গঠন, সভাপতি পরিবর্তন, সদস্য পরিবর্তন, অযাচিত হস্তক্ষেপ ইত্যাদি কারণে অডিট চূড়ান্তের বিষয়টি আর এগোয়নি। চট্টগ্রামের একজন দায়িত্বশীল যিনি এখন মূলধারাবিরোধী, মতান্তরে ২২ লক্ষ বা ২৬ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে হিসাব না দেয়ার বিষয়ে পূর্বতন কেন্দ্রীয় কমিটি কোন ব্যবস্থা নেয়নি, যা আজও অনিস্পন্ন হয়ে রয়েছে বলে আমি জানিবিষয়টি সাবেক অর্থ সম্পাদক বা কোষাধ্যক্ষ থেকে জেনে নেয়া যেতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, হেফাজতের এসব অর্থ মুসলিম সর্বসাধারণেরকারও ব্যক্তিগত নয়। তাহাফ্ফুযে আমওয়ালুল মুসলিমীন বা মুসলিম উম্মাহর সম্পদ রক্ষার যে অনিবার্য দায়িত্ব হেফাজতের কাঁধে বর্তেছে তার জন্য জবাবদিহিতার কোন বিকল্প নেই। আমরা আশা করবো, বর্তমান পুনর্গঠিত কমিটি হেফাজতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অডিট চূড়ান্তকরণে নিরপেক্ষ ও সৎ সদস্যসহযোগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং অনাদায়ী অর্থ আদায় করবেন।  

মেয়াদভিত্তিক কমিটি: একটি নির্বাচিত কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকা জরুরী। সেটা তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদী হতে পারে। এতে প্রত্যেক কমিটির উপর কর্ম-সম্পাদনের একটি মেয়াদভিত্তিক সীমা ও চাপ থাকবে; থাকবে মেয়াদ শেষে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা। প্রতি মেয়াদ শেষে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবার সুযোগ পাবে। এতে হেফাজতের তৎপরতা শানিত হবে

. হেফাজত-প্রশাসন সম্পর্ক: হেফাজত ও প্রশাসনের মধ্যে সম্ভাব্য কোন সম্পর্ক থাকবে কি না বা থাকলে কতোটুকু থাকবেসে নিয়ে বিতর্ক বরাবরই থেকেছে। সে দিনের সম্মেলনে মাওলানা মামুনুল হক সাহেব এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেন। তিনি বলেন: হেফাজত সরকার-বিরোধীও নয় আবার সরকার-সমর্থকও নয়। আমি বলবো একদম যথাযোগ্য কথা। আমার মনে হয়েছে, মুহতারাম মামুনুল হক সাহেব কথাটি বলেছেন বর্তমান আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা.-র একটি বক্তব্যের ভাবকে ধারণ করে। সম্ভবত সম্মেলনের সপ্তাহখানিক আগে বাবুনগরী হযরত এক সম্মেলনে বলেন: আমরা সরকারবিরোধী নই, আমরা বাতিলবিরোধী। যা হোক, এখান থেকে আমরা আলোচনার সূত্রপাত করতে পারি। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে চারপাশের পরিবেশের। মনে রাখতে হবে, আমাদের চারণভূমি বাংলাদেশ। এখানে যা কিছু আমরা করবো, আমার দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতিকেই বিবেচনায় রেখে করবো। এটা পাকিস্তানও নয়, আফগানিস্তানও নয়; এটা য়ুরোপও নয়, আমেরিকাও নয়নয় ভারতও। এটা আমাদের প্রাণের প্রিয় জন্মভূমি-পিতৃভূমি: বাংলাদেশ।  এখানকার মাটি-এখানকার মানুষ আমাদের মূল উপজীব্য।  যারা এখন সরকারে বসে দেশ চালাচ্ছেন, তাঁরাও এ মাটির সন্তান। সঙ্গতকারণে, প্রশাসন বলুন, সরকার বলুনতাঁদের সাথে হেফাজতে ইসলামের একটি আদর্শিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকতে পারেযার ভিত্তি হবে দা’ওয়াত ইলাদ্দীন।  যারা আবেগবশে হেফাজতকে সবসময় সরকাবিরোধী একটি অবস্থানে দেখতে বা দেখাতে চান তাদের সাথে আমরা দ্বিমত পোষণ করি সবিনয়ে।  এতে ইসলামপন্থীদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।  আমার স্পষ্ট মনে আছে, আশির দশকে যখন খেলাফত আন্দোলনের প্রধান আমীরে শরীয়াত হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ. প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও প্রেসিডেন্ট এরশাদকে দাওয়াত দিতে বঙ্গভবনে যান, বলেছিলেন: আমি ক্ষমতা চাই না; আপনাদের ক্ষমতা আপনাদের হাতেই থাকবে। আপনারা কেবল আল্লাহর জমীনে আল্লাহর শাসন কায়েমের ঘোষণা দিন।  এই হচ্ছেদা’ওয়াত ইলাল্লাহ বা ইলাদ্দীন।  এ কাজ কি হেফাজত করতে পারে না?  আমার মনে হয়, প্রশাসনের সাথে সম্পর্কে হেফাজতে ইসলামের দু’টো ধারা থাকতে পারে: এক, দা’ওয়াতী  এবং দুই, ইহতিজাযী দু’টো ধারার দু’টো দল থাকবে।  যাঁরা দাওয়াতী ধারার সাথে যুক্ত থাকবেন তাঁরা সরকার বা প্রশাসনের সাথে সংলাপে থাকবেন।  সংলাপ ব্যর্থ হলে ইহতিজাযী ধারা সর্বসাধারণ নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে মাঠে থাকবেন।  স্মর্তব্য, ইহতিজাযী ধারা দাওয়াতী ধারার  অনুকূলে একটি প্রেসার গ্রুপ হিসাবেও কাজ করবে।  এতে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন বহিরাঙ্গনে বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এখানে আরও একটি কথা বলতে হয়: দা’ওয়াতী ধারার দলটি কেবল প্রশাসন বা সরকারের সাথে নয়, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথেও নিজেদের অবস্থান নিয়ে কথা বলবেন।  বিষয়টি সদয় বিবেচনার জন্য হেফাজতে ইসলামের পুনর্গঠিত কমিটির কাছে উত্থাপিত হলো।  

. শাপলা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার দাবি: বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্বরতম হত্যাকাণ্ড ২০১৩ সালের ৫ই মেরাতে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশে চালানো হত্যাকাণ্ড।  কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, ঘটনা-পরবর্তী কিছুদিন শাপলা-হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে হেফাজতে ইসলাম দাবি জানালেও ধীরেধীরে সে দাবির উচ্চারণ করতে ভুলে যায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।  হেফাজতের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট সরকারের দালালগোষ্ঠীর প্রভাবে এমন হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।  তাই হেফাজতের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছিলো দিনের পর দিন।  নবগঠিত কমিটি থেকে দালালগোষ্ঠী বাদ পড়ার পর এখন শাপলা-হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি আবার জেগে উঠছে।  সঙ্গতকারণে, জাতির প্রত্যাশা: হেফাজতে ইসলাম আবার শাপলা-হত্যাকাণ্ডের বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি ও  দায়ীদের আইনের কাঠগড়ায় তোলার জোড়ালো দাবি তুলবে, সাথেসাথে নিজেরাও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ৫ই মে’র ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য তুলে ধরবেন।

. আন্তর্জাতিক সম্পর্কহেফাজতে ইসলামের মতো  বৃহৎ সামাজিক শক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।  মনে রাখতে হবে, এখন বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের যুগ। এ যুগে কোন প্রতিষ্ঠান বা দলের দর্শন ও অবস্থান বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিস্কার করতে না পারলে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া যায় না।  তাই, হেফাজতে ইসলামের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী ও দক্ষ দলের কোন বিকল্প নেই।  এ বিভাগের নেতৃত্ব দেবেন হেফাজতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।  দলটি একদিকে যেমন দেশের বিদেশী রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারদের কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন তেমনি মাঝেমাঝে বিদেশ সফর করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বা বিদেশী রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করে নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দেবেনস্মরণ রাখা দরকার, শাপলার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আন্তর্জাতিক চাপের যথেষ্ট গুরুত্ব থাকে।  তাই, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দলটি তাঁদের দাবির স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক  সমর্থন অর্জনে সমর্থ হলে শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার ত্বরান্বিত হতে পারে।  এ বিষয়টিও হেফাজতের নতুন পরিষদের সামনে বিবেচনার জন্য থাকলো।

. একটি হেফাজত আর্কাইভ গঠন:  পৃথিবীর যেসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান মনে করে, তাদের ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের পরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাদের তৎপরতা ও অবদান পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আছেতারা গঠন করে যায় যাবতীয় দলীল ও স্মৃতির আর্কাইভ বা সংরক্ষণাগার।  যেহেতু সকল হেফাজত কর্মী মনে করেন,  হেফাজতে ইসলাম নিছক কোন ক্লাব-সমিতি নয়; এর রয়েছে একটি ইতিহাস এবং শাপলার মতো রক্ত ঝরানো অধ্যায়, সুতরাং হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের কুরবানীর স্মৃতি ও দলীল-দস্তাবেজ রক্ষার জন্য একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  এখানে থাকবে  হেফাজতের আন্দোলনের বিভিন্ন প্রকাশিত নথিপত্র, হেফাজত গঠনের ইতিহাস, শাপলার হত্যাকাণ্ডের ছবি ও পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট ইত্যাদি। এ ধরনের একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা গেলে কওমী ছাত্রদের মানস থেকে কখনও শাপলার স্মৃতি মুছে যাবে না এবং তা থেকে পুরো জাতি নাস্তিক-মুরতাদদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার অনুপ্রেরণা লাভ করবে

১০. সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ:  সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ জনকল্যাণমুখী যে কোন সংস্থার জন্য অপরিহার্য। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতির পাশাপশি যেসব সামাজিক কর্মকাণ্ডে হিসসা নেয়, সেসবের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মানুষ সে-কথা বোঝে। তবে অরাজনৈতিক কোন সংস্থা যখন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, সেখানে মানুষ সেটাকে রাজনীতি মনে করে না।  আমাদের দেশে রাজনীতির প্রবল অপব্যবহারের কারণে মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর উপর আস্থাহীন হয়ে পড়েছে।  সেদিক থেকে হেফাজতে ইসলামের উত্থানকে এদেশের মানুষ একটি কল্যাণমূলক ব্যতিক্রম বলে গ্রহণ করেছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই তাই হেফাজতের কাতারে শরীক হয়েছে, হচ্ছে।  এ সুযোগটাকে হেফাজতে ইসলাম কাজে লাগাতে পারে।  তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে হেফাজত প্রমাণ করতে পারেতারা নিছক ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী নয়; তাঁরা মানবকল্যাণ এবং দেশ গঠনেও অগ্রসর। এটা হেফাজত করবে কেবল মানুষকে কাছে টানার অভিপ্রায়ে নয়, আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের নিমিত্ত। এতে জাতীয়ভাবে তাঁরা সম্মানীত হবেন। সংগঠনের সমাজকল্যাণ সম্পাদক এ কাজে নেতৃত্ব দেবেন। বিষয়টি আশা করি হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেবে দেখবেন।

সবশেষে পুনর্গঠিত হেফাজত নিয়ে  সংশয়ের কথা বলি।  পুনর্গঠিত কমিটি নিয়ে ইদানীং কিছু কথা হচ্ছে।  বিশেষ করে রাজনৈতিক কোন ব্যক্তি হেফাজতের উর্ধতন দায়িত্বশীল হতে পারেন কি না বা এমন হওয়া উচিৎ কি নাএসব নিয়ে কথা হচ্ছে।  যেহেতু এখনও হেফাজতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ কোন গঠনতন্ত্র প্রকাশ করা হয়নি, তাই এ বিষয়ে নিজস্ব কোন নিয়ম নিয়ে কথা বলা দুষ্কর।  যেহেতু হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক চরিত্র অরাজনৈতিক, তাই একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের উর্ধতন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কোন ব্যক্তি হতে পারেন কি নাসে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।  এর নিস্পত্তি হতে পারতো গঠনতন্ত্রে। সেটা যখন নেই, দেখতে হবে দু’টো বিষয়: এক, অন্যসব অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধারা অথবা দুই, অভিজ্ঞতা।  নেতৃবৃন্দ যদি চান অন্য প্রতিষ্ঠানের উদাহরণকে কাজে লাগাতে পারেন বা অরাজনৈতিক সংস্থায় রাজনৈতিক ব্যক্তির দায়িত্ব প্রদানের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।  এখন প্রশ্ন আসে, হেফাজতে ইসলামের আল্লামা আহমদ শফী সাহেব রহ.-র সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ফল কেমন ছিলো?  আমার মনে হয়, প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা কঠিন কিছু নয়।  কথায় বলেনা: ফলেই বৃক্ষের পরিচয়!  ২০১৩ থেকে এ অব্দি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্বের কারণে হেফাজতের যোগ-বিয়োগ কী হয়েছে তা কি কারও কাছে অস্পষ্ট? এখানে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হোক। কোন আম মিষ্টি কি টক--সে সিদ্ধান্ত বইয়ের লেখায় নয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নিতে হয়।  হেফাজতের অতীত থেকে আমরা বারবার দেখেছি, সবাই নন, এক শ্রেণীর নীতিহীন ব্যক্তির অংশ্গ্রহণের কারণে হেফাজত বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমাদের চট্টগ্রামে একটি আঞ্চলিক প্রবাদ আছ: যার বাবাকে কুমিরে খেয়েছে, সে ঢেঁকি দেখলেও ডরায়।  এখন দেখতে পাচ্ছি, হেফাজত কর্মীদের অনেকেই সেই রাজনীতি-ভাইরাসে শঙ্কিত। মূল সংশয়টা কাজ করছে এখানে।  তার ওপর একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের ৩৪ জন নেতার হেফাজতের মূল কমিটিতে স্থান পাওয়া নিয়ে দেখলাম বেশ কথা হচ্ছে।  বিষয়টি এখনও সংশোধনের সুযোগ আছে বলে মনে হচ্ছে। মনে হয়, আগামীতে কার্যকরী কমিটির বৈঠক বসলে গঠনমূলক আলোচনার ভিত্তিতে ভারসাম্য বজায় রেখে সংশোধন করা সম্ভব। তার পরেও আমাদের সম্মিলিত একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর তা হলো: হেফাজতে ইসলামের উর্ধতন দায়িত্বে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণ নীতিগত কারণে সম্ভব কি না।  হেফাজত-কর্মীদের আরেকটি সংশয় হলো, বর্তমানে যে কমিটি বাছাই করা হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক কারণে হেফাজতের উপর কোন প্রভাব পড়ে কি না। উপরন্তু রাজনতিসংশ্লিষ্ট যাঁরা এখন কমিটিতে আছেন, তারা ভবিষ্যতে হেফাজতে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন কি না। যদি তাই হয়, ভবিষ্যতে হেফাজত আবারও বিতর্কিত হবে কি না। এগুলোই মোটামুটি সংশয়ের চিত্র।

পরিশেষে বলতে হয়: পুনর্গঠিত কমিটি নতুন পথ তৈরি করুক, এ জাতিকে আলোর পথ দেখাক; কওমী তরুণেরা বুক বাঁধুক নবচেতনায়সেটা আমরা মনেপ্রাণে চাই।  সকল বাধাবিঘ্ন পেরুতে নেতৃবৃন্দের সতর্ক-দৃষ্টি যে অনিবার্যসেটাই হোক আমাদের বাস্তব উপলব্ধি। সকল পদ আর অর্থের লোভ পায়ে মাড়িয়ে বাংলাদেশের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ফাঁদ পেতে থাকা অপশক্তির দূর্গ ধ্বংস করে তাওহীদের বাণীতে ভরপুর করে দিক হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশএ মুনাজাতই করি সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে। আল্লাহ হা-ফিয।

১৮.১১.২০ 

 


 

আমাদের কওমী তরুণ আলিম-সমাজ ও কিছু কথা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী 

আমাদের কওমী তরুণ আলিম-সমাজ নিয়ে কিছু কথা লিখবো বলে ভাবছিলাম দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু কলম ধরিনি ডরে-ভয়ে, কচিৎ যদি বাহাদুরি করে ফেলি। এর উপর নিজের সীমাহীন অযোগ্যতা, প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব, অভিজ্ঞতার নিদারুণ দুর্ভিক্ষ ইত্যকার কারণে লেখা আর হয়ে ওঠেনি। তবুও আজ লিখছি অন্তত বড়দের কিছু বকাঝকা খেয়ে যৎসামান্য অর্জন করতে পেরেছিলাম বলে। কেউ মনে করবেন না যেন আমি আবার সকলকে মুরীদ-ছাত্র ভেবে নাসীহাহ পেশ করতে বসেছি। বরঞ্চ বড়দের মজলিস আর জুতোর স্পর্শ থেকে যা কিছু শিখেছি সে-সবকে সম্বল করে তাঁদের তারজুমান হিসাবে কিছু লিখে যাচ্ছি। তাওফীক মহান জাতে বারী তাআলার।

বড়দের দেখা আমি পেয়েছি দুভাবে। এক,কিতাব থেকে  দুই, সরাসরি। বলতে পারেন অনেকটা কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহর আঙ্গিকে। কিতাব থেকে পেয়েছি আমাদের বেহেশতবাসী আকাবির হযরতবৃন্দকে আর সরাসরি যাঁদেরকে তাঁদের জীবদ্দশায় পেয়েছিলাম। বড়দের কাছ থেকে কিছু পাবার ও নেবার নেশাটা আমাকে ধরিয়ে দিযেছিলেন মূলত আমার উস্তাযে মুহতারাম জামিয়া বাবুনগরের ফিকাহ বিভাগের প্রধান মুফতী মাহমূদ হাসান সাহেব দা.বা.। তখন সালটা ১৯৮৮ হবে। আমি তখন চব্বিশ বছরের এক যুবক। জামিয়া বাবুনগরের পূর্বপাশের পুরনো হলুদ-ইমারতটার (যা বর্তমানে নেই) উত্তরের এক কামরায় থাকতেন উস্তাযুল আসাতিযা, শাইখুল হাদীস আল্লামা ইছহাক আল-গাযী সাহেব রহ.। একদিন হযরত মুফতী সাহেব হুযুর আমাকে হযরত রহ.-র রুমে পাঠালেন এক কাজে। তখনও বুঝতে পারিনি কতো বড়ো মহীরুহের মুখোমুখি হয়েছিলাম। সেই থেকে দীর্ঘদিন হযরতের খিদমাতে থাকার সুযোগ হয় অধীনের। এরপর ১৯৯১ সালে দেওবন্দ যাবার প্রাক্কালে হযরত রহ.-র কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে অশ্রুসজল কণ্ঠে হযরতের কাছে আরয করলাম: হুযুর, ওখানে তো বড়বড় আলিমদের সাথে দেখা হবে, তাঁদের সাথে আমার সম্পর্ক কেমন হবে? এর জবাবে হযরত রহ. যা বলেছিলেন তা আমার জীবনে এক স্বর্ণালী লেখা হয়ে থাকবে। আজও সে-কথা বারবার মনে পড়ে। বড়দের এসব ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়। হযরত রহ. বলেছিলেন: আমার সাথে সম্পর্ক বহাল থাকবে, নাসীহাহ যেখানেই পাবে সফর করে হলেও গিয়ে নিয়ে আসবে। কী হৃদয়ভেদী কথা! এ কথাটাই আজকের কওমী তরুণ অলিম-সমাজের উদ্দেশে তুলে ধরতে এ লেখার অবতারণা। বড়দের সংস্পর্শ বিনে এ-সব কথা কি আদৌ পাওয়া যাবে ভাই? আজ কেন জানি আমাদের তরুণ আলিমশ্রেণী বড়দের নাসীহাহ গ্রহণে খুব আগ্রহী বলে মনে হয় না। তাদের ধারণা, দারসী জ্ঞানার্জনেই তো যথেষ্ট। অথচ তারা ভুলে যান দ্বীনের এক মৌলিক অঙ্গ রিজালুল্লাহর কথা। বড়দের নৈকট্য ও তাঁদের কাছে আত্মসমর্পণের ফল যে কতো সুদূরপ্রসারী আর সুমিষ্ট হয় তার এ এক নীরব সাক্ষী আমি। সে কথাই বলছি। আমি কল্পনাও করিনি, হযরতের সেদিনের দোয়া ও নাসীহার কারণে ভারতের এমনসব বুজুর্গব্যক্তির সাথে অধীনের মুলাকাত হবে। নিঃসন্দেহে হুযুরের দোয়ার বরকতে মুলাকাত হয়েছিলো ফকীহুন্নাফস রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.-র সাহেবজাদা মাওলানা হাকীম মাসঊদ গাঙ্গুহী রহ.-র সাথে। তাযকিরাতুর রশীদ’-এ পড়েছিলাম, হযরত গাঙ্গুহী রহ. শেষ-বয়সে দুর্বল হয়ে পড়লে সাহেবজাদা হাকীম মাসঊদ গাঙ্গুহীর ইমামতিতে নামায আদায় করতেন। এখনও মনে আছে, হযরত গাঙ্গুহী রহ.-র বাড়িটা এক দিহাতী এলাকায়। কাঠের তৈরী বিশাল বাড়িতেই মুলাকাত হলো হাকীম সাহেব রহ.-র সাথে। আমরা হাযিরীনের আর্জিতে হযরত আমাদেরকে কিছুক্ষণ নাসীহাহ প্রদান করলেন। যারা পেরেছিলাম হযরতের দুহাত ধরে অত্যন্ত মূল্যবান উপদেশ শুনছিলাম। ধবধবে সাদা শরীর তাঁর। কী মোহনীয় কথার তারীকা! হযরতের ডান হাতের কব্জি ধরেছিলাম আমি। সে এক অন্যরকম অনুভূতি!

এরপর মুলাকাত হলো, হাকীমুল উম্মাহ হযরত থানভী রহ.-র মাশহূর খলিফা মাওলানা মসীহুল্লাহ খান সাহেব রহ.-র সাথে। সে এক অন্য সাম্রাজ্য। বোঝার কোন উপায় ছিলো না, এ বিশাল রাজপ্রাসাদে আল্লাহর এক দরবেশ বসে আছেন। জামিয়া বাবুনগরে পড়ার সময় একদিন হযরত গাযী সাহেব হুযুর রহ. আমাকে একান্তে সতর্ক করে বলেছিলেন: মনে রাখবে, তাকওয়া পোষাকের উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে অন্তরের উপর। মনে রেখো, রাজার পোষাক পরেও একজন বিনয়ী হতে পারে আবার ফকীরের পোষাক পরেও কেউ মুতাকাব্বির বা অহংকারী হতে পারে। হযরতের এ উপদেশের অক্ষরাক্ষর প্রতিফলন দেখেছি হযরত মসীহুল্লাহ খান সাহেব রহ.-র দরবারে। বাইরে থেকে মনেই হবে না, এখানে আল্লাহর এক জবরদস্ত অলী রূহের খোরাক বন্টন করে যাচ্ছেন। তখন দুপুর, হযরতের মূল খানকার বাইরে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, দুপাশে দুসারিতে মুরীদরা বসে আছেন। ভেতর থেকে বেশ গরম-স্বরে হযরতের ইসলাহ-ধ্বনি ভেসে আসছিলো। আওয়ায শুনে ভয়ে আমরা কাঁপছিলাম। বাইরে দাঁড়ানো খাদিমকে আমাদের কাফেলার আমীর চকরিয়ার মাওলানা হাফেজ ইলিয়াস ভাই সাহস করে বললেন, আমরা দেওবন্দ থেকে এসেছি, হযরতের সাথে দেখা করতে চাই। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, খাদিম গিয়ে বলা মাত্রই হযরতের আওয়ায বন্ধ হয়ে গেলো। ভেতর থেকে খাদিম এসে বললেন, হযরত আমাদেরকে যেতে বলেছেন। অনেক ডরে-ভয়ে আমরা কজন লাইন ধরে যথাসম্ভব আদব রক্ষা করে হযরতকে সালাম দিয়ে ঢুকলাম। এতক্ষণ ধরে ভয়ে-ভয়ে যার আওয়ায শুনছিলাম, দেখি, অত্যন্ত সাধারণ এক মানুষ; হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। অতি সাধারণ এক সাদা পান্জাবী পরে বসে আসেন। আমরা পরিচয় দিয়ে বললাম, আমরা দেওবন্দ থেকে এসেছি হযরতের নাসীহাহ নিতে। আমি প্রথম দফাতেই হযরতের ডান হাতের কব্জি ধরে হযরতের নূরানী চেহারার দিকে চেয়ে রইলাম। আহ, কী দারুণ অনুভূতি! সে কি বোঝানো যায়? হযরত ইত্তিবায়ে সুন্নাহর উপর জোর দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নাসীহাহ প্রদান করলেন। বাইরে বেরিয়ে ভাবছিলাম, যাঁর ভয়ে সবাই কাঁপছে, তিনিই আমাদের কাছে কতো বে-তাকাল্লুফ হয়ে দেখা দিলেন। কতো যথার্থই না বলেছেন কবি: উলা-ইকা আ-বা-য়ী ফাজিঅ্নী বিসলিহিম.

ফিদায়ে মিল্লাত হযরত আসআদ মাদানী রহ.-র কথা কখনও ভোলার নয়। এমন হাসিখুশি মানুষ আমি আর দেখিনি। কাছে-দূরে এক-ই রকম। মনে হতো, হযরতের জীবনে দুঃখ বলে কোন শব্দ নেই। পেরেসানী যেন তাঁর ধারকাছ দিয়েও যায়নি। অথচ বাইরের দুনিয়া জানতেও পারেনি, তিনি কতো উঁচু মানের বুজুর্গ ছিলেন। সকালে ফজরের নামাযের পর যখন অধিকাংশ ঘুমাতো, আমি বেরিয়ে পড়তাম হযরতের পেছন-পেছন হাঁটতে। লম্বাপথ ধরে হযরত মাদানী হাঁটতেন। হযরতের সাথে আমরা ছয়-সাত জন থাকতাম। এর মধ্যে কেবল আমিই ছিলাম বাঙ্গালী। আজও রহস্য জাগে হযরত মাঝেমাঝেই কেন জানি মাথা ঘুরিয়ে আমাকে এক নযর দেখে নিতেন। কিন্তু অজানা ভয়ে আমি কথা বলতে পারতাম না।

শরফে মুলাকাত হাসিল হলো দারুল উলূম দেওবন্দের তৎকালীন মুহাদ্দিস আল্লামা সায়্যিদ আহমদ পালনপুরী দা.বা.-র সাথে। দারুল উলূমের ছাত্রেরা দুজন উস্তাযকে বাঘের মতো ভয় করতো। তাঁদের একজন হলেন হযরত পালনপুরী, দ্বিতীয়জন হলেন, তৎকালীন নাযিমে তালিমাত হযরত আরশাদ মাদানী দা.বা.। দূর থেকে এ দুই হযরতকে যতোটা ভয়-জাগানিয়া মনে হতো, কাছে কিন্তু তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুসুলভ। হযরত পালনপুরী যখন ঘর থেকে বেরিয়ে মাদরাসার দিকে আসতেন আমরা ভয়ে অলিগলিতে ঢুকে পড়তাম। তাঁর চেহারার দিকে তাকাতে ভয়  হতো। একদিন আসরের নামাযের পর হঠাৎ দেখি হযরত পালনপুরী রহ. কয়েকজন ছাত্রকে ডাকছেন। আচানক অবাক করে দিয়ে আমাকেও শামিল করা হলো কাফেলায়। আহ, কী আনন্দ! এমন সুযোগ কি আর হবে? আমরা হযরতের পেছনে-পেছনে হাঁটছি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম হযরতের বাড়ির আঙ্গিনায়। মুহূর্ত পরে আমাদেরকে বসতে দেয়া হলো এক ঘরে। ঘরে বসে দেখি, যাঁর ভয়ে সবাই কাঁপে, সেই তিনি এখন অন্য এক মানুষ। সে কি বন্ধুসুলভতা তাঁর! যেন আমাদের-ই একজন। ভেতর থেকে একটা বড় থালা নিয়ে এসে আমাদের সামনে রেখে দিলেন। দেখে ভেবেছিলাম আপ্যায়ন বুঝি। ওমা, এ দেখি পেঁয়াজের স্তুপ। হযরতও বসে গেলেন। এবার হযরত পালনপুরী রহ. বললেন, এটা আমার নিত্যদিনকার কাজ। আমরা তো একেবারে থ। হযরত আমাদের মনের অবস্থা বুঝে বলতে লাগলেন, কেন বিবির সাথে কাজ আন্জাম দেয়া কি সুন্নাহ নয়? আমরাও হযরতের সাথে খুশিখুশি কাজে হাত দিলাম। এবার শুরু হলো অসাধারণ এক আলোচনা। হযরত বললেনআমি তো প্রতিদিন বিবির খিদমাত করি, তার কাজে সহযোগিতা করি। হযরত বলছিলেন: দেখ ভাই, আমার ছয়-সাতটি সন্তান। ওদের একজনের বেলায়ও জন্মের সময় আমি নার্স বা ধাত্রী ডেকে আনিনি। আমি নিজেই সব করেছি। কারণ, প্রথমত কাজটি আমি জানি আর দ্বিতীয় হলো, আমার স্ত্রীর সামনে আমার চেয়ে বড় মাহরাম আর কে? আমি খিদমাত হিসাবে এসব কাজ আন্জাম দিয়েছি। আল্লাহু আকবার! শুনে তো আমাদের শরীরের সব লোম খাড়া হয়ে গেলো বুঝি। তারপর একজনকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, ভাই মাওলানা! বিয়ে করেছো? সে বললো, জ্বী হযরত। হযরত বললেন, বলো কি! তোমার কি রস-কষ বলতে কিছু নেই? কে বলেছে তোমাকে এখানে আসতে? ঘরে বিবি আর তুমি এখানে! আজীব ইনসান তুমি! সবার মাঝে হাসির রোল পড়ে গেলো। সেদিনের স্মৃতি আজও মনে পড়ে। 

 

অরেকজন বড় মানুষের কথা না বললেই নয়। উনি ভারতের বিখ্যাত আরবী সাহিত্যিক আল কামুসুল জাদীদের লেখক মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান কিরানভী রহ.। পোষাক-আষাকে এমন পরিপাটি একজন মানুষ আমি আর দেখেছি বলে বলতে পারবো না। এতো সুন্দর করে একজন মানুষ কথা বলতে পারে, ভাবাও মুশকিল। উচ্চারণে কখনও দ্বিত্ব করতে দেখিনি তাঁকে। দেওবন্দের কুতুবখানা হুসাইনিয়াতে বসতেন নিয়মিত। কখনও জানতে পারিনি, কেন তিনি আমাকে এতো স্নেহ করতেন। হুসাইনিয়াতে এসেই আমার খোঁজে লোক পাঠিয়ে দিতেন। আমাকে পাশে বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতেন। ইতিহাস, তাঁর জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলে যেতেন অনুপম সাহিত্যের ভাষায়। আমি চেয়ে থাকতাম অপলক আর আত্মস্থ করতাম তাঁর কথা বলার শৈলী। কথা প্রসঙ্গে তিনি দারুল উলূমে তাঁর শিক্ষকতাকালীন বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন। একদিন তিনি বললেন, জানো মাওলানা! দারুল উলূম থেকে হাকীমুল ইসলাম কারী তয়্যিব সাহেব রহ.-র বিদায়ের পেছনে যে আন্দোলন হয়েছিলো তাতে নেতৃত্ব দিযেছিলাম আমি। মাশহূর যে, ওয়াহিদুজ্জামান যদি আন্দোলনে নেতৃত্ব না দিতেন তবে কারী তয়্যিব সাহেব স্বপদে থেকে যেতে পারতেন। সেদিনের কথা স্মরণ করে হযরত বললেন, ভাই রব্বানী, আজ বুঝতে পারছি, সেদিন আমি কতো বড় ভুল করেছিলাম। তাই পরবর্তীতে যখন আমাকেই বিদায় করার সিদ্ধান্ত হলো, বেরিয়ে আসার সময় আমি সব ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশে বলে এসেছিলাম: ভাই, আমার আজকের এ-দিন সেদিনের বদলা বা কাফ্ফারা মনে করো যেদিন আমি হাকীমুল ইসলাম কারী তয়্যিব সাহেবকে বের করে দেয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। এ জন্য আমি হযরতের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। হযরত কিরানভী রহ.-র এমন ইখলাসপূর্ণ কথায় সেদিন আমি না কেঁদে থাকতে পারিনি। দেওবন্দ থেকে আসার সময় সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে হযরত কিরানভীর কথা। আল্লাহ তাঁকে কবূল করুন। 

 

আমার স্মৃতির পাতাগুলোর কিছু অংশ আজ উল্টালাম আমাদের কওমী তরুণ আলিমদের জন্য। বলেছিলাম, বড়দের নৈকট্য আর সান্নিধ্যের কথা। আমি আজও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, দেওবন্দ যাবার প্রাক্কালে যদি হযরত গাযী সাহেব হুযুর রহ.-র দোয়া আর নাসীহাহ আমার শামিলে হাল না হতো তবে আমার সফর কোন অর্থ বহন করতো না। যা কিছু অধীনের কপালে জুটেছে, সবই আমার মুহতারাম আসাতিযায়ে কেরামের বদৌলতে। আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি বরকত এসেছে বলতে পারি আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাযবৃন্দের জুতো সিধা করার কাজ থেকে। এ কথা আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি  


আজ বড় ফিৎনার যুগ। বিশ্বাসগত নৈরাজ্য, আচরণগত অভদ্রতা আর প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃংখলা আমাদেরকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। কেউ বলছে: কিতাবই যথেষ্ট, আকাবির শরয়ী দলিল নয়; কেউ বলছে: যাহেরী অর্থই শিরোধার্য, ফিকহের কোন প্রয়োজন নেই। আবার কেউ দেশের বাইরে থেকে উচ্চডিগ্রী নিয়ে এসে এমনসব ব্যাখ্যা দিচ্ছে যা আমাদের উলামায়ে কেরামের ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যার পরিপন্থি। আমাদেরকে বোঝানো হচ্ছে, কওমী উলামা এতোদিন জাতিকে ভুল শিক্ষা দিয়ে এসেছেন। এমন অবস্থায় আমাদের কওমী তরুণ আলিমরা এক ঘূর্ণিচক্রের মুখোমুখি; এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কী করবে এখন তারা? তাদের সামনে দু’টো প্রশ্ন: তারা কি নিজেদেরকে রক্ষা করবে, না কি আত্মসমর্পণ করবে? ধরুন, আপনার দীর্ঘদিনের পৈত্রিক ভিটা যেখানে আপনি বংশানুক্রমে বসবাস করে আসছেন। এখন কেউ জাল খতিয়ান দেখিয়ে আপনাকে উচ্ছেদ করতে উদ্যত হলো। আপনি কী করবেন? আপনি কি বিনা খরচে আত্মসমর্পণ করে ভিটা ছেড়ে দেবেন, না কি যাবতীয় কাগজপত্র দেখিয়ে শত্রুপক্ষকে বিতাড়িত করবেন? নিশ্চয় আপনি যদি আপনার বংশের হালালী-সন্তান হয়ে থাকেন তবে বৈধ কাগজ দেখিয়ে শত্রুপক্ষকে বিদায় করবেন। এখন আসুন, সিদ্ধান্ত নিন: আপনি কওমী-জগতের বৈধ সন্তান কি না। যদি নিজেকে লস্করে নানুতুভীর বৈধ সন্তান বলে মনে করে থাকেন, আত্মসমর্পণ না করে আমাদের উলামায়ে কেরামের সিন্দুক থেকে বৈধ কাগজ বের করে কওমীর শত্রুপক্ষকে পরাজিত করুনহাতে কিতাবুল্লাহ, পথচলায় রিজালুল্লাহ আর অন্তরে তাকওয়াএ তিন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কওমীর ঝাণ্ডা করে রাখুন চির-উড্ডীন। 

মুহতারাম কওমী তরুণ আলিম-সমাজ, নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যোগ্য হিসাবে গড়ে ওঠা। যতোদিন না ফারিগ হচ্ছেন ততোদিন ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে থাকুন। মনে রাখবেন, মাদরাসায় ছাত্ররাজনীতি আত্মহত্যাসরূপ। আকাবিরদের উপর আস্থা ও ভালবাসা রাখুন। তাঁদের ইতিহাস আঁকড়ে ধরে রাখুন। নিজেদের সংশোধনে বড়দের পরামর্শ নিন। আপনার জিজ্ঞাস্য বিষয় উত্থাপন করে দারসকে প্রাণবন্ত করে রাখুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনাদেরকে বিজয়ী করবেন। আল্লাহু হাফিয।

২০১৯ 

 



বৈধতা নিয়ে বিতর্ক : মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে কারা কী ভাবছেন?

ফাতেহ ২৪

রাগিব রব্বানি :

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছাত্র-রাজনীতি বেশ প্রতিষ্ঠিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সবকয়টি আলিয়া মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চা বিদ্যমান। সেই সুবাদে আশির দশক থেকে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতেও শুরু হয় ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র-রাজনীতির চর্চা। বর্তমানে সবকয়টি ইসলামি দলের ছাত্র সংগঠন আছে এবং মাদরাসা-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র রাজনীতিতে সকলেই তৎপর। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর থেকে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তবে আলেমদের বড় একটি অংশ মাদরাসাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র-রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছেন শুরু থেকেই। এ বিষয়ে ইসলাম বিষয়ক লেখক মাওলানা মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী বিশিষ্ট রাজনীতিক মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী’র বরাতে বলেন, ৮০-র দশকে হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.-এর খেলাফত আন্দোলন চলাকালীন প্রশ্ন ওঠে মাদরাসায় ছাত্রেরা রাজনীতিতে যুক্ত হবে কি না। এ প্রশ্নে মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ও শাইখুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হক রহ. ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে মতামত দেন। পক্ষান্তরে লালবাগ মাদরাসার তৎকালীন পরিচালক মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ সাহেব রহ. ও মুহাদ্দিস মাওলানা ছালাহ উদ্দীন সাহেব রহ. মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির বিপক্ষে মতামত দেন। মুহতারাম মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী সাহেব, যিনি সে-সময় খেলাফত আন্দোলনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন, এমনটাই বলেছেন আমাকে।

মাওলানা গোলাম রব্বানী বলেন, এখান থেকেই খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষোক্ত দুই হযরত লালবাগ ছেড়ে জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি প্রতিষ্ঠা করে চলে যান। অর্থাৎ, বহুল আলোচিত খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের শুরুর কারণ ছিল মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির প্রসঙ্গ।

তবে শুরুতে হজরত হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর অমতের কারণে খেলাফত আন্দোলন মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করলেও বর্তমানে সংগঠনটি এ বিরোধিতা থেকে সরে এসেছে। বর্তমানকার ইসলাম-ভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র সংগঠন আছে এবং প্রায় সকল ঘরানার ইসলামি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাদরাসায় ছাত্ররাজনীতিকে সমর্থন করেন।

হাফেজ্জি হুজুর রহ. মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির কেন বিরোধিতা করেছিলেন এবং বর্তমানে কেন তাঁর দল এ বিরোধিতা থেকে সরে এল? এ বিষয়ে কথা বলেছেন খেলাফত আন্দোলনের বর্তমান আমির এবং হাফেজ্জি হুজুরের সাহেবজাদা মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জি।

মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চায় হজরত হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আব্বাজান রহ.-এর কাছে যখন অধ্যাপক আখতার ফারুক রহ.-সহ অনেকে ছাত্র সংগঠনের প্রস্তাব দিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ছাত্র সংগঠনের কিছু নিয়মনীতি থাকে আর মাদরাসারও নিয়মনীতি আছে। উভয় নিয়মনীতি, কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় কঠিন। আর ছাত্ররা দেখা যাবে অনেক সময় মাদরাসার নিয়মের চেয়ে সংগঠনের নিয়মকে বেশি প্রাধান্য দেবে। এর দ্বারা উস্তাদদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের আশঙ্কা থাকে। আর মাদরাসার ছাত্রদের পূর্ণ সফলতা নির্ভর করে উস্তাদদের নিয়মের কাছে নিজেদের পরিপূর্ণ সমর্পণের মধ্যেই। তাই আব্বার পরামর্শ ছিল ছাত্ররা উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে সরাসরি আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করুক। আলাদা ছাত্র রাজনীতির আওতায় না যাক। তবে যেহেতু স্কুল কলেজে সঠিক ইসলামি আন্দোলন করার সুযোগ নেই তাই আলেমদের সাথে তাদের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য সেখানে ইসলামি ছাত্র সংগঠন হতে পারে।

হাফেজ্জি হুজুরের সেই মত থেকে দলের সরে আসার বিষয়ে মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জি বলেন, সময় এখন অনেক বদলেছে। আব্বা রহ. যখন রাজনীতি করেছেন, তখন আলেমরা সবাই এক পতাকার নিচে ছিলেন। আলাদা ছাত্র সংগঠনের দরকার ছিল না। এখন বিভিন্ন সংগঠন হয়েছে, সহীহধারার পাশাপাশি বাতিল ধারার সংগঠনও বর্তমানে বিদ্যমান। তাই ছাত্রদের সহীহ ধারায় ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের তত্ত্বাবধানে ছাত্র সংগঠন করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ ও সময়ে পরিবর্তন এসেছে। পরিবেশ ও প্রয়োজনের ভিন্নতার কারণে যেহেতু শরিয়তের হুকুমও পরিবর্তন হতে পারে তাই হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর কথাও বর্তমান সময়ে এভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

রাজনীতিক আলেমগণ মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে সম্মত থাকলেও দেশের অরাজনৈতিক আলেমগণ এ ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে নেই। ছোটবড় অধিকাংশ কওমি মাদরাসায়ই ছাত্র রাজনীতি আইনত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ছাত্রদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি এবং একাধিক সংগঠন থাকার কারণে ছাত্রদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হতে পারে।

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ মাদরাসা জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদের নায়েবে মুহতামিম মুফতি নুরুল আমীন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ছাত্র রাজনীতির ফলে মাদরাসায় ছাত্রদের মধ্যে নানামাত্রিক উশৃংখলতার সৃষ্টি হয়। একাধিক দল থাকার কারণে মাদরাসায় রাজনীতির অনুমতি দিলে একদল আরেক দলের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া নিজ দলের সঙ্গে মাদরাসার কোনো উসতাদের মতের অমিল দেখলে সেই উসতাদকে নানাভাবে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করে ছাত্ররা। পড়াশোনার ক্ষতি তো আর আছেই। এসব এখন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছেন আমাদের মাদরাসার আকাবিররা। তাই শুরু থেকেই ফরিদাবাদে ছাত্র রাজনীতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

মুফতি নুরুল আমিনের এই কথাগুলোকে আরেকটু বিস্তারিত করে বলেছেন মাওলানা গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ছাত্র-রাজনীতির বিষয়টি এখন মাদরাসার জন্য বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দিয়ে তর্ক-বিতর্কের উঠোন হয় তো বড় করা যেতে পারে কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলাফল সকল যুক্তিকেই পরাজিত করছে এখন। ছাত্র-রাজনীতি কওমি মাদরাসার মধ্যে এখন দু’টো মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। এক. ছাত্রদের মধ্যে বিভক্তি। দুই. শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা হ্রাস। যেহেতু ছাত্রেরা তাদের পছন্দানুযায়ী দল করে, সেখানে একেক দলের একেক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনুসারী ছাত্রেরাও ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজ-দলের দৃষ্টিভঙ্গিকে অপর-দলের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রাধান্য দেয়ার পালা। জন্ম নেয় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা, নিজদলের নেতাদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন আর অন্যদলের নেতাদের ছোট করে দেখার মানসিকতা। এগুলোই ধীরে-ধীরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ব্যহত করে। ছাত্রেরা দলকে সবকিছুর ঊর্ধে স্থান দেবার চেষ্টা করে। যে শিক্ষক তার দলকে সমর্থন করেন না বা বিরোধিতা করেন, সে-শিক্ষককে তির্যক-দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা শুরু হয়। এখান থেকে জন্ম নেয় অভদ্র আচরণ বা শৃঙখলা ভঙ্গের মতো নিন্দনীয় কাজ। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দলের অনুসারী কোনো ছাত্রের বিরুদ্ধে মাদরাসা ব্যবস্থা নিলে সে-দলের অন্যেরা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়।

মাওলানা গোলাম রব্বানী বলেন, মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির অতীত থেকে আমি নিজে সেসব তিক্ত ঘটনার কথা জেনেছি। ১৯৮৫ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় কওমী আদর্শ পরিপন্থী একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থক কর্তৃক হামলার ঘটনায় উপরের সব উপাদান উপস্থিত ছিলো। ওসব কারণে পরবর্তীতে ফটিকছড়ির নাজিরহাট বড় মাদরাসায়ও হামলার ঘটনা ঘটে।

তবে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চার পক্ষে যাঁরা জোরালো বক্তব্য দেন, তাঁদের যুক্তি হচ্ছে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরি করা অতীব জরুরি, আর এ নেতৃত্ব তৈরির জন্য ছাত্র রাজনীতির চর্চা আবশ্যক।

এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজধানীর বারিধারা মাদরাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, একজন তালিবুল ইলমকে দরসি পড়াশোনার পাশাপাশি বক্তব্য ও লেখালেখিতে পারঙ্গম করে তোলা যেমন জরুরি, তেমনি দেশ ও উম্মাহ’র সংকট ও সম্ভবনা সম্পর্কে সচেতন করে তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের যোগ্যতা বিকশিত করাও আবশ্যক। আর এ জন্য ছাত্র রাজনীতির বিকল্প নেই।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, বাংলাদেশ বলুন আর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বলুন, মুসলিম উম্মাহ নানাভাবে বিপর্যস্ত আজ। বাংলাদেশে ইসলামি শক্তির অবস্থা নতজানু হয়ে আছে। যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এখানে প্রকট। আজকের মাদরাসার ছাত্ররাই আগামী দিনের উম্মাহর কাণ্ডারী। তাদেরকে যদি রাজনীতি বিষয়ে এখন থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া না হয়, তাহলে পড়াশোনা শেষ রাজনীতির এ যোগ্যতাটা হাসিল করবার সুযোগ তাঁদের আর হবে না। এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা বলি, দেশের প্রতিটা মাদরাসায় ইসলামি রাজনীতির চর্চা অবাধ করে দেওয়া জরুরি।

রাজনীতি করতে গিয়ে মাদরাসার অভ্যন্তরে নানাবিধ উশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বারিধারা মাদরাসার প্রবীণ এ আলেম বলেন, শিক্ষকদের সঠিক নেগরানি থাকলে এবং তাঁরা শুদ্ধধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে বা এ বিষয়ে সচেতন থাকলে ছাত্রদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ থাকবে না।

নিজের মাদরাসাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বারিধারা মাদরাসায় তো আমভাবে ছাত্ররা রাজনীতি করছে, কই এখানেতা বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় না৷ রাজনীতির কারণে ছেলেদের পড়াশোনায়ও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। বেফাকে প্রতি বছরই তো আমাদের ছেলেরা ভালো ফলাফল করে আসছে।


ভাইরাস করোনা সেক্যুলারত্বের অসহায়ত্ব

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

একটি আদর্শের পরীক্ষা হয় সমস্যার ধাক্কায় মেধাবীর মেধার পরীক্ষা যেমন তার আত্মস্থের সামর্থ্যে আর প্রতিভাবানের পরীক্ষা যেমন তার সৃজনশীলতায়, তেমনি একটি আদর্শ পাশ-নম্বর পায় সমস্যায় অনুসারীরা কতোটা সমাধান পায়, সেটার উপর অভিধান বলে: ‍আদর্শ হলো, কিছু বিশ্বাস বা নীতির অবস্থান যার উপর কোন রাজনৈতিক পদ্ধতি, দল বা প্রতিষ্ঠান স্থিতিশীল হয়। (a set of beliefs or principles, especially one on which a political system, party, or organization is based.) তাই যদি হয়, আমাদের দেশের ন্যাকা সেক্যুলাররাযারা সেক্যুলারিজমকে তাদের হাজার বছরের লালিত চৌদ্দ পুরুষের সংস্কৃতি বলেন, সংবিধানে নীতি বলে জবরদস্তি বসিয়ে রেখেছেন, তারা ভাইরাস করোনার এমন ধংসযজ্ঞের সময় তাদের সেক্যুলারিজমকে দিয়ে একটি মানুষকেও সান্ত্বনার বাণী শোনাতে পেরেছেন? এবার কিন্তু আমাদের ন্যাকা সেক্যুলারদের উপর ভয়াবহ একটা পরীক্ষা হয়ে গেলো ভাইরাস কোভিড-১৯ আসার পর কেমন যেন ন্যাকা সেক্যুলারমহল খেই হারিয়ে বসেছেন কোথায় গেলো তাদের হম্বিতম্বি, কোথায় গেলো মঙ্গল-শোভাযাত্রার মঙ্গলীয় উম্মাদনা, কোথায় গেলো সেক্যুলার-সংস্কৃতির লু-লু ধ্বনি! সত্যিই, তাদের দীনতা-হীনতার জন্য আমার খুব করুণা হয় কথায় বলে: বিপদে বন্ধুর পরিচয়

সেক্যুলারিজমকে যারা নীতি মানেন, পার্থিব জীবনের জাগতিক মানার বিষয় মানেনতাদের তুলনা কিন্তু সেই গাভীর মতো, যার কথা রচনা বইতে লিখা আছে কিন্তু না আছে দেহ, না আছে গৃহ আচ্ছা, না হয় ধরেই নিলাম, জাগতিক মানার টা পাই তাদের পকেটে আছে, তবে আজকের জাগতিক বিমার করোনার জন্য চামচ সেক্যুলার দাওয়াই দিতে পারেন কি? অথবা কালাম নিরাময়ের বা সান্ত্বনার বাণী শোনাতে পারেন কি? নাই যদি পারেন, তবে কোলকাতার বানানো শতরকমের পেঁচা-পেঁচির মুখোশ পরে, নর্দন-কুর্দন করে যে মঙ্গলযাত্রা করেছিলেন, সে-সবের সঞ্চয় অল্প বলবেন কি? আজ খবরে শুনলাম, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন সেক্যুলার অধ্যাপক নাকি দেশবাসীকে করোনা থেকে রক্ষায় খোদার দরবারে হাত তুলতে বলেছেনওমা একি শুনি! ষাঁড় কি তবে বাচুর প্রসবে দিকভ্রান্ত হইল? সতী নারী স্বামীর মরণে বিধবা হয় আর বেশ্যা পতিতালয় বন্ধে ঘড়ছাড়া হয় অবাক হবার কী আছে?

অধ্যাপক আবুল ফজলের কথা নতুন-প্রজন্ম না জানুক, বড়-প্রজন্মদের তো জানার কথা বাংলাদেশের নামকরা যে জন শিক্ষাবিদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেনতাঁদের মধ্যে তাঁকে শুমার করা যাবে নিঃসন্দেহে ১৯৮৩ সালে তাঁর ইন্তিকাল হয় সারা জীবন তিনি সেক্যুলারিজমের ওকালতিতে লিখেছেন, ইসলামী শাসনের অযৌক্তিতার পক্ষে কলম ধরেছেন, মোল্লা-মৌলভীদের দৌড় যে মসজিদে গিয়ে খতম হয়েছেসেসবও অবাধে বলেছেন তাঁর যুক্তি ছিলোধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার অতএব, রাষ্ট্র হবে ধর্মভিত্তিক নয়, সেক্যুলার; রাষ্ট্রের সংস্কৃতিও হবে সেক্যুলার ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর সমকালীন চিন্তাবইটি মাঝেমাঝে যখন হাতে নিই, মনে হয়: সময়ের কাছে মানুষ কতো অসহায়! সেই  অধ্যাপক আবুল ফজল যখন সেক্যুলারিজমের চৌহদ্দি ছেড়ে মৃত্যুশয্যায়; দেখলেন, ওপারে সেক্যুলরিজম নেইওপারে অপেক্ষা করছে অন্য এক ইজম, তার নাম: ইসলামঅসার হয়ে দেখা দিলো তাঁর সেক্যুলার-জীবন; একজন মৌলভী ডেকে তাওবা করলেন জীবনের করুণ সায়াহ্নে খবরটি যখন নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে দৈনিক ইনকিলাবের আলোচিত কলামকাজীর দরবার’- প্রকাশিত হলো, সেদিনকার সেক্যুলাররা শরমে মূর্ছা গিয়েছিলেন কিনা জানি না দোয়া করি, আল্লাহ মরহুম আবুল ফজলকে মাগফিরাত দান করুন কিন্তু স্মরণ করি, যে মৌলভীদের পেছনে তিনি কলম ঘুরিয়েছেন অহোরাত্র, শেষতক তাঁদের হাতেই হাত রেখে অনুতাপের স্বীকারোক্তি দিতে হলো মরহুম অধ্যাপককে এখানেই তো সেক্যুলারিজমের কলঙ্কিত পরাজয়, নির্লজ্জ ব্যর্থতা আজ যে জাবির জন সেক্যুলার শিক্ষক করোনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলেছেন, সেটাকে আমরা মুবারকবাদ জানাই, সাথেসাথে অনুরোধ করবো: তাঁরা যেন সেক্যুলারিজমের অসারতাকে উপলব্ধি করেন

করোনা ভাইরাস যখন ঘরের দোরগোড়ায় ঠকঠক শব্দ করছিলো, আমাদের সেক্যুলাররা তখন কোন প্রাণীর মুখোশ পরেছিলেন, তাদের বাঙ্গালি সংস্কৃতির কাছে মঙ্গল কামনায় বিভোর ছিলেন কিনা জানি না তবে, সেসব বাদ দিয়ে তারা যে, বিদেশী সংস্কৃতির অষুধের বোতল হাতড়াতে সচেষ্ট ছিলেন, তা বলতে পারি সহজেই কারণ, আমি আগেই বলেছি, সেক্যুলারদের দেহ নেই, গৃহ নেইওদের বিশ্বাসের কোন ভিটা নেইওদের সংস্কৃতি যেমন ওদের কথায়বহমান নদীর মতো’, তাই বিশ্বাসও বোধ করি ভাসমান মেঘের মতো ভাসমান মেঘ যেমন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, তেমনি ওদের বিশ্বাসও হারিয়ে যায় হঠাৎ করেতখন- ওরা হয়ে পড়ে নাস্তিক ছাত্রজীবন থেকে বিশ্বাস আমার দৃঢ় হয়েছে: সেক্যুলারিজম হচ্ছে নাস্তিকতার প্রবেশদ্বার আমাদের বাংলাদেশেই ধরা যাক, যারা নাস্তিক বলে পরিচিতি পেয়েছেন, তারা কিন্তু এক লাফে নাস্তিক হননি; সেক্যুলারিজমের দরোজা দিয়েই নাস্তিকতায় প্রবেশ করেছেন আরও শক্তিশালী উদাহরণ দেই যেমন ধরুন, সংবিধানে সেক্যুলারিজমকে ঢোকানো হলো, কি হলো? করোনা ঢুকতেই সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের পাইক-পেয়াদারা পর্যন্ত শুধু হম্বিতম্বি ছাড়া মুখে একবারও আল্লাহ-খোদার নাম নেয়নি কারণ,ওটা নিলে আবার সংবিধানের মূলনীতি লঙ্ঘন হয় যদি! অতীতের অন্যসব সরকারের সময় শুনতাম জাতীয় কোন বিপদে মসজিদে-মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানাতে এখন ওগুলো সেক্যুলারপরিপন্থী, তাই না! এভাবেই একদিন প্রশাসনযন্ত্র নাস্তিকতার লেবাসে আক্রান্ত হবে সেদিন তো সেক্যুলার সংস্কৃতির ব্যানারে সরকার পর্যন্ত স্কুলে-স্কুলে দেশ জাতির মঙ্গল কামনায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করতে হুকুম জারি করেছিলো কই, মঙ্গল যে এলো না! রবিন্দ্রগীতিতে তো চিড়া ভিজলো না কোলকাতাইয়া বাবুরা পানি ছাড়তে পারে, মঙ্গল ছাড়তে পারে না?

বিশ্বাস যদি আজ এমন হতো যে, সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ; তিনিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, তিনিই একমাত্র রোগ নিরাময়কারীতাহলে আজ সরকারী সম্প্রচারে দোয়ার কথা উঠতো তা না বলে, বলা হচ্ছে: অমুক আমাদের নেত্রী, তাই করোনার ভয় নেই ইসলামের ভাষায় এগুলো স্পষ্ট শিরক ধর্মত্যাগী কাণ্ড আজকের ন্যাকা সেক্যুলাররা অন্তত মরহুম অধ্যাপক আবুল ফজলের মতো বিবেকের পরিচয় দিতে পারতেন তাতে তাদের- মঙ্গল হতো সে মঙ্গল আসতো ওপাড় থেকে নয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সেক্যুলারদের অসহায়ত্বের দৃশ্য দেখে এতোটুকুই লিখলাম

২৩.০৩.২০২০

 

 


কোন মন্তব্য নেই: