বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে কওমী জগৎ

ভাবনা-৮০ 

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা যায়নি আজকের এ দৃশ্য দেখতে হবে কওমীদের। যে কওমীদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ছিলো; আনুগত্যবোধ ছিলো, ছিলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের স্বীকৃত আদর্শ ও বিশ্বাস, আজ সেখানে বিচরণ করছে অনাস্থা, সন্দেহ ও বিদ্রোহের দুর্গন্ধময় পরিবেশের হুমকি। সেই দিনগুলোতে রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা কওমী মাদরাসাগুলোতে দেখা মিলতো এক অসাধারণ নিয়ম-শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদনের চিত্র। ছাত্ররা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অনেকাংশেই বিসর্জন দিতো শুধু ইদারা, উস্তায ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আত্মসমর্পণ করে একজন হাক্কানী আলিম হিসাবে গড়ে উঠতে। তখন রাজনীতি ছিলো না, স্মার্টফোন ছিলো না, অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছিলো না, কথায়-কথায় দারসে তালা দেয়ার অভদ্রতা ছিলো না, দারসে শিক্ষক-পছন্দের স্বাধীনতা ছিলো না; ছিলো না মন চাহিবামাত্র রাস্তায় নামার অনুশীলন। আসাতিযায়ে কেরামের মনে তালিবে ইলমদের কাছ থেকে অনাহুত আচরণের মুখোমুখি হবার ভয় ছিলো না। তালিবে ইলমদের মনে সবসময় গেঁথে থাকতো ‘বা-আদব বা-নসীব, বে-আদব বদনসীবে’র অনুভব। لا يُستطاع العلم براحة الجسد-র মর্মবাণীকে বুকে নিয়ে কওমী তালিবে ইলমরা মেহনত করে যেতো দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। সময়ের বিবর্তনে সময় আজ বদলেছে। কওমীদের নৈতিক অবস্থানের অবনমন এখন দৃশ্যমান। হযরত নানুতুভী রহ.’র উসূলে হাশতেগানাকে এড়িয়ে সরকারী বরাদ্দ পাবার দাবি তোলা হচ্ছে। শিক্ষাকালীন দীর্ঘ সময়ে যাদেরকে বাতিল বলে শিক্ষা দেয়া হয়েছে তাদের সাথে রাজনীতিক বন্ধনের নামে সখ্যতা গড়ে তোলা হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির নামে; সচেতনতা সৃষ্টির নামে তালিবে ইলমের মাঝে ছড়ানো হচ্ছে দলীয় বিভক্তির বিষ। মুরুব্বীদের বাধ্য না থাকবার মুখরোচক স্ট্যাটাস দিয়ে কওমীদের মাঝে ছড়ানো হচ্ছে বিদ্রোহের লেলিহান শিখা। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা করছে এসব? কেমন করে সৃষ্টি হচ্ছে এমন পরিবেশ?

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ২০১৬ সালে যখন স্বীকৃতির তর্ক নিয়ে কওমী আলিম-সমাজ দ্বিধাবিভক্ত, স্বীকৃতিপন্থীরা সমর্থন লাভের আশায় ছাত্রদের মাঝে স্বীকৃতির পক্ষে প্রচার চালাতে সচেষ্ট হয়। তারা কিছু অনলাইন পোর্টার ও প্রিন্ট মিডিয়ায় স্বীকৃতির পক্ষে প্রচার চালাতে থাকে। বিশেষ করে মাও.ফরীদ উদ্দীন মাসউদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারী মদদে এসব প্রচার বিশেষ অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। কওমী আলিমদের মধ্যে হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ., হযরত সুলতান যওক নদভী রহ., হযরত মুব্বিুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা.সহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তিত্ব সরকারী হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নিতে অস্বীকার করেন। তাঁরা এটাকে কওমী এতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন। ঐ সময়ে ঢাকা থেকে প্রচারিত দু’টো অনলাইন পোর্টালের কথা না বললেই নয়। সেগুলোর একটি ‘কমাশিসা’ অপরটি ‘আওয়ার ইসলাম’। পোর্টাল দু’টোতে ক্রমাগত স্বীকৃতির প্রশ্নে মতবিরোধকারী উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে এমনসব উস্কানীমূলক বক্তব্য, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি প্রচারিত হতে থাকে যা কওমী ছাত্র-অঙ্গনকে দ্বিধান্বিত করে তোলে এবং নীতিনির্দ্ধারণী উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে আনুগত্য ও সম্মানপ্রশ্নে তির্যক মনোভাব পোষণে উৎসাহিত করে। পরবর্তী ঘটনাক্রম আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  

এরপর আসে ছাত্র-রাজনীতির কথা। একটা সময় ছিলো কওমী মাদরাসায় যখন ছাত্র-রাজনীতির অস্তিত্ব ছিলো না। ৮০’র দশকের শুরুতে ঢাকার মাদরাসাগুলোতে প্রথম ছাত্র-রাজনীতির প্রসঙ্গ আসে যখন হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.’র খেলাফত আন্দোলন দেশব্যাপী পরিচিতি পায়। সে সময় চলমান ঘটনাবলীকে কাছ থেকে দেখেছেন খেলাফত আন্দোলনের সে-সময়কার দু’দুবারের এমপি পদপ্রার্থী ও বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী। তিনি আমাকে বলেন: লালবাগ মাদরাসায় তর্ক ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রদের রাজনীতিক সংগঠন হবে কি না—তা নিয়ে। মাও.আজিজুল হক রহ. ও মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ছিলেন আনুষ্ঠানিক ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে। অন্যেরা ছিলেন ছাত্র-রাজনীতির বিপক্ষে। তবে হযরত হাফেজ্জী হুযূরের মতামত ছিলো: আন্দোলনের প্রয়োজনে ছাত্ররা হুযূরদের তত্ত্বাবধানে সভা-সমিতিতে যাবে আবার তাঁদেরই তত্ত্বাবধানে ফিরে আসবে। ছাত্রদের নিজস্ব কোন রাজনীতিক প্লাটফরম থাকবে না। এ বিতর্কের সূত্র ধরে লালবাগ ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় জামিয়া যাত্রাবাড়ি এবং ভাঙ্গনের মুখে পড়ে খেলাফত আন্দোলন। পরবর্তীতে ছাত্ররা প্রকাশ্যে না হলেও অপ্রকাশ্যে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ধীরেধীরে কওমীভিত্তিক ইসলামী দল বাড়তে থাকলে ছাত্রদের মাঝে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবও ছড়াতে থাকে। ফলে, কওমী মাদরাসাগুলোতে ছাত্রদের মধ্যে বিভক্ত চিন্তাধারার উম্মেষ ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অরাজনীতিক ও কেবল তালিমভিত্তিক চেতনার প্রতিপক্ষ হিসাবে আবির্ভাব হয় ছাত্র-রাজনীতি চিন্তার। রাজনীতিপন্থীরা ছাত্রদের রাজনীতি-সচেতন হবার  প্রয়োজনীয়তাকে প্রচার করতে থাকলে কওমী আলিম-ছাত্রদের মধ্যে বিভক্ত চিন্তার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। যেসব উস্তায মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতেন তাঁরা ছাত্রদের একটি অংশ দ্বারা তির্যক মনোভাবের শিকার হতেন। তবে সব ক্ষেত্রে নয়, কিছু ক্ষেত্রে। রোগটি ধীরেধীরে বেড়েছে আপন গতিতে। কারণ, সে সময় রোগের চিকিৎসার কোন দূরদর্শী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি মাদরাসার প্রশাসন থেকে। বিশেষ করে ৮০’র দশক এবং পরবর্তীতে দেশব্যাপী কিছু মাদরাসায় সংঘটিত দুর্ঘটনার পেছনে ছাত্র-রাজনীতির প্রতিক্রিয়াগুলো ক্রিয়াশীল ছিলো।

হেফাজতে ইসলাম নিয়ে এখানে কিছু কথা না বললে নয়। হেফাজতে ইসলাম মূলত গঠিত হয়েছিলো দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী অপশক্তিকে মুকাবিলা, ইসলামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও প্রসারমান নাস্তিক্যবাদী শক্তিকে উৎখাত করার লক্ষ্যে। সঙ্গতকারণে, হেফাজতের বিভিন্ন কর্মসূচীতে কওমী আলিম-ছাত্রদের অংশগ্রহণের বিকল্প ছিলো না। হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব ছাত্রদেরকে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের পূর্বাপর কোন নির্দেশিকা দিতে ব্যর্থ ছিলো বলে মনে করা হয়। ফলে, কর্মসূচী ঘিরে ছাত্রদের অনেক আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা যায়। কর্মসূচী হেফাজতের হলেও তাতে কওমীভিত্তিক রাজনীতিক দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা অস্বীকার করার ছিলো না। সমাবেশে বা মিছিলে কোন দলের কোন নেতা কতো নম্বরে বক্তব্য দিয়েছেন, কাকে মঞ্চে উঠতে দেয়া হলো বা হলো না, কে আগে ছিলেন বা পরে ছিলেন—এসব নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে দলীয় চিন্তায় বিতর্ক দেখা দেয়। এক-ই মাদরাসার ছাত্র হয়েও রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পরস্পর প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। জন্ম নেয় পারস্পরিক দূরত্ব, সন্দেহ ও অবিশ্বাস। এর মধ্যে বহুল পরিচিত সিন্ডিকেটের বিতর্কিত ভূমিকা ও ক্ষমতাভোগ এবং নেতৃত্ব কর্তৃক তা সমাধান করার ব্যর্থতা শিক্ষক-ছাত্রদের একটি বিশাল অংশকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সৃষ্টি হয় এক মনস্তাত্বিক বিদ্রোহ। ছাত্ররা সমালোচনার আঙ্গুল তুলতে শুরু করে নেতৃবৃন্দের প্রতি যাঁরা প্রকারান্তরে কোন না কোন মাদরাসার শিক্ষক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের(২০২৬) কিছু কথা এখানে আনতে হয়। অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচন ছিলো অভূতপূর্ব ব্যতিক্রম। এর মূল কারণ, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ও তাতে কওমীদের কিছু দলের অংশগ্রহণ। যারা কওমী মাদরাসায় পড়েছেন তারা বিলক্ষণ জানেন, দেওবন্দী শিক্ষা-ব্যবস্থায় বাতিল ফিরকাগুলোর বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত কঠোর। বিশেষ করে মাও.মওদূদীর আকীদাসম্পন্ন জামায়াতে ইসলামীর কট্টর বিরোধী কওমী-জগৎ। দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, মাও.মওদূদীর আকীদাসম্পন্ন জামায়াতে ইসলামী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে কয়েকটি কওমীভিত্তিক রাজনীতিক দলের অংশগ্রহণকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি সংখ্যাগরিষ্ট কওমী-জগৎ। এমন পরিস্থিতিতে আমীরে হেফাজত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা. জামায়াতবিরোধী যে বক্তব্য দেন এবং এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে আমীরে হেফাজতকে যে কদর্য কায়দায় আক্রমণ করা হয় তাতে ১১ দলীয় জোটের কওমীদের নীরবতা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। অতীতে দেখা যেতো, কোন কওমী আলিম বাতিল ফিরকা কর্তৃক আক্রান্ত হলে সকল কওমী প্লাটফরম প্রতিবাদে সরব হতেন। কিন্তু এবারে তা ছিলো অভূতপূর্ব ব্যতিক্রম। বরঞ্চ এ বিষয়ে জামায়াতের অপপ্রচারের জবাব দিতে বলা হলে হেফাজতের একজন উর্দ্ধতন দায়িত্বশীল তার তার ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারে বার্তা পাঠান: মুরুব্বীদের নিষেধ আছে। সঙ্গতকারণে, প্রশ্ন জাগে, আমীরে হেফাজতের চেয়ে বড় মুরুব্বী কে? বোঝা যায়, ১১ দলীয় কথিত সমঝোতার কারণে কওমীদের অভ্যন্তরে কি পরিমাণ ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আমীরে হেফাজতের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে অথচ আমীরে হেফাজতের পক্ষ হয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব গুপ্ত ব্যক্তিরাই আবার হেফাজতের ওপরের কমিটিগুলোতে স্থান পায়। ১১ দলীয় সমঝোতার প্রতিক্রিয়ার ভয়াবহতম আরেক দিক হলো, জামায়াতের সাথে গাঁট-বাঁধা কওমী দলগুলোর কারণে কওমী শিক্ষক ও ছাত্রদের একটি বিভ্রান্ত ও বিপদগামী অংশকে জামায়াতের প্রতি দুর্বল হয়ে আমীরে হেফাজতের আপত্তিকর নিন্দা করতে দেখা যায়। কওমী দলগুলো যতোই বলুক তারা কেবল রাজনীতিক সমঝোতা করেছেন কিন্তু মাঠের ফসলে পোকার আক্রমণ কি বার্তা দেয় তারা তার জবাব দেবেন। এসবের দায় কি তাঁরা নেবেন না? কিছু দিন আগে একজন সুহৃদ মুঠোফোনে আমাকে জানান, চট্টগ্রামের একটি পরিচিত মাদরাসার ফারিগ জামায়াতের রুকন হবার জন্য ইতোমধ্যে সাক্ষাৎকারও দিয়ে ফেলেছেন। এরপরও কি বুঝবার উপায় আছে, ১১ দল কেবল রাজনীতিক বা নির্বাচনী সমঝোতা? 

কওমী মাদরাসাগুলো সরকারী সাহায্যবিহীন একটি জগৎ হিসাবে খ্যাত। এর বিবিধ বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো স্বকীয়তা বা স্বতন্ত্রতা রক্ষা। এখানে কওমী মাদরাসার সবচেয়ে বড় কৌশলগত রক্ষাকবচ নিহিত আছে বলে ধরা হয়। কারণ, সরকার  স্থায়ী কোন কাঠামো নয়। সময়ে এর যেমন রঙ ও চরিত্র পাল্টায় তেমনি মেয়াদ এবং স্থায়ীত্বও পাল্টায়। তাই, যে সরকার কোন জিনিসকে হালাল বলে অপর সরকার এসে সেটাকে আবার হারাম বলে। কোথায় পড়েছি এ মুহূ্র্তে মনে নেই, হযরত নানুতুভী রহ.কে জিজ্ঞাসা করা হলো: হযরত, যদি ইসলামী হুকুমাত কায়েম হয়ে যায় তখনো কি উসূলে হাশতেগানার সরকারী সাহায্যের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে? হযরত নানুতুভী রহ. উত্তর দিয়েছিলেন: হ্যা, থাকবে। কারণ, ইসলামী হুকুমাতও একদিন খতম হয়ে যেতে পারে। তাই, কওমী মাদরাসা ইসলামী হুকুমাতের অধীনে চলে গেলে এবং পররব্তীতে কোন এক সময় হুকুমাত শেষ হয়ে গেলে তখন কওমী মাদরাসাগুলোর কি হবে? সুতরাং কওমী মাদরাসা সরকারের স্থায়িত্ব ও চরিত্রের উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে উসূলে হাশতেগানার বাস্তায়নের উপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাগুলোয়(ইল্লা মাশাআল্লাহ) উসূলে হাশতেগানাকে এড়িয়ে আলিয়ার মতো না হলেও বিভিন্নভাবে বিশেষ করে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে সাহায্য নেয়া হয়। এখানে অবশ্য একটি যুক্তি দাঁড় করানো হয়। তা হলো, ছোটখাট সাহায্যগুলো কওমী মাদরাসা না নিলে সেগুলো এমনসব প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারে যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি নয় বা বিরোধী শক্তি। তা’ছাড়া এসব গ্রহণে সরকারী হস্তক্ষেপের সুযোগও নেই। যুক্তিটি পরখ করা যেতে পারে। কারণ, ইতোমধ্যে ওসব ছোটখাট সাহায্যের কারণে কওমী মাদরাসায় হস্তক্ষেপের স্ম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—এমন কোন উদাহরণ নেই।

দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সরকারী সাহায্যকে যেমন প্রত্যাখ্যান করে এসেছে তেমনি সরকারী সাহায্য না নেবার দর্শনকে প্রতিটি কওমীর মন-মগজে প্রবিষ্ট করেছে। কারণ, হযরত নানুতুভী রহ.’র উসূলে হাশতেগানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো কওমী মাদরাসা সাহায্য নেবে আমজনতার কাছ থেকে, সরকার বা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নয়। দেওবন্দের দর্শনে মাদরাসার বুনিয়াদকে আমজনতার স্বতঃস্ফুর্ত সাহায্য-সহযোগিতার সাথে বেঁধে দেয়া হয়েছে। এখানে ক্ষমতা বা হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ থাকে না। কিন্তু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কওমী থেকে আসা একজন সাংসদ দেশের কওমী মাদরাসাগুলোর জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দাবি করেছেন। বিষয়টি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে কওমীদের মুখপাত্র-প্রতিষ্ঠান হেফাজতে ইসলাম বা অন্য কোন কওমী প্লাটফরম থেকে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া আসেনি। প্রশ্ন হলো, এখন যদি সরকার বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা সাংসদ থেকে বিষয়টি উত্থাপিত হতো তবে কি কওমী নেতৃবৃন্দ নীরব থাকতেন? যেহেতু সরকারী বরাদ্দের দাবি কওমীদের ভেতর থেকে এসেছে তাই কি বিষয়টি লঘু হিসাবে দেখা হচ্ছে? এ ধরনের তৎপরতা কিন্তু স্পষ্ট দেওবন্দী দর্শনের খেলাফ। এ ধরনের দাবিকে যদিও লঘু হিসাবে দেখা হচ্ছে, মনে রাখতে হবে ভবিষ্যতে এটাই কওমীদের বিষফোঁড়া উঠতে পারে। তখন কিন্তু সামাল দেয়া কঠিন হবে। ভয়ের বিষয় হলো, এ ধরনের দাবিকে একটি মহলের পক্ষ থেকে ‘অধিকার’ হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা। এটাকে কওমীদের ভেতর থেকে কওমী মাদারাসাকে আলিয়াতে রূপান্তরিত করার প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। পরবর্তীতে রক্ষক ভক্ষকে পরিণত হবার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।

বর্তমানে কওমী মাদরাসার আরেক বিপজ্জনক দিক হলো লবিংভিত্তিক মজলিসে শুরা। কওমী মাদরাসার অনেকেই জানেন না, আসলে কওমী মাদরাসায় মজলিসে শূরার প্রয়োজন ও তাৎপর্য কি? অনেকেই মনে করেন, মজলিসে শূরা মূলত মুশাওয়ারাহ বা পরামর্শ করার একটি পরিষদ। আগ্রহী পাঠকগণ এ বিষয়ে মাওলানা রিয়াসাত আলী বিজনৌরী রহ.’র লিখিত ‘শূরা কি শরয়ী হাইসিয়্যাৎ’ কিতাবটি দেখতে পারেন। কিতাবটি অধ্যয়ন করলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, শুরা নিছক মুশাওয়ারাহ বা পরামর্শ করার পরিষদ নয়। যা হোক সে আলোচনা ভিন্ন।  বর্তমানে এমন কিছু নযীর সামনে এসেছে যেখানে মজলিসে শূরার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতা ও সিন্ডিকেটবাজির অভিযোগ এসেছে। কিছু কেসস্টাডি করে দেখা গেছে, মজলিসে শুরার ভেতর এমন কিছু সদস্য থাকেন যাঁরা কোন না কোন মাদরাসার মুহতামিম বা পরিচালক। এদের একটি সিন্ডিকেট থাকে। তাঁদের সাথে আবার যুক্ত থাকে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এরা বৈঠকের আগে কোন মাদরাসায় কে মুহতামিম হবেন তা নিয়ে আগেভাগে ঐক্যমতে আসেন। শূরাসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এতে সুপারিশের মাধ্যমে ভূমিকা রাখেন। কোন মুহতামিম যতো দুর্নীতি করুক; তার বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ প্রমাণীত হোক, ঐ শূরা-সিন্ডিকেট অভিযুক্ত মুহতামিমকে পদে রাখার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলতঃ দেখা যায়, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অপরাধী স্বপদে বহাল থাকে। এক কেসস্টাডিতে দেখা গেছে, অভিযুক্তকে স্বপদে বহাল রাখতে পরবর্তী শূরার বৈঠক কয়েক বছর বিলম্বে আহ্বান করার পরামর্শও দিয়ে থাকে ঐ শূরা-সিন্ডিকেট। এখানে বলা প্রয়োজন, কওমী মাদরাসার অনেক পরিচালক বিভিন্নভাবে দুর্নীতিতে জড়িত। কিন্তু শুরা-সিন্ডিকেটের কারণে তাদের সাত খুন মাফ হয়ে যায়। এ যেন জিম্মাদার থেকে জমিদার হওয়ার নীরব পদ্ধতি। এলাকার কেউ মাদরাসার স্বার্থে কথা বললে তার উপাধি হয়—মাদরাসার দুশমন। অথচ শূরাকে হবার কথা ছিলো মাদরাসার অভিভাবক ও তত্ত্বাবধানকারী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। পরিবর্তে শূরা হয়ে পড়ে মুহতামিমের আজ্ঞাবহ একটি প্রতীকী পরিষদ ও দুর্নীতিবান্ধব অঙ্গ। এভাবে কওমী মাদরাসাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেবল সাইনবোর্ডের জামিয়াতে পরিণত হয়। এখানে আরও একটি বিষয় বলা দরকার। প্রতি শূরার আগে পরিচালক শূরার সদস্যদের গোপনে হাদিয়া প্রদান করেন যেন তার পদটি বহাল থাকে।

প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে বলতে পারি, কিছুকিছু মজলিসে শূরার আচরণই কওমী মাদরাসার স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা। তাঁরা তাঁদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে অনেক অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করেন বা এড়িয়ে যান। শিক্ষকদের আপত্তিকে তদন্ত না করে মুহতামিমের বক্তব্যকে দলীল সাব্যস্ত করে একপক্ষীয় ব্যবস্থা নেন। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে মাদরাসার স্বার্থ বিঘ্নিত হয় এবং কেউ না কেউ প্রকৃত বিচার পেতে ব্যর্থ হন। কিছু কেইস স্টাডি করে দেখা গেছে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কোন কোন মুহতামিম তার পছন্দের শিক্ষকদেরকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সেই সিন্ডিকেট শুরার সদস্যদের কাছে তদবীর, মিথ্যা তথ্য প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে নিরপেক্ষ শিক্ষকদেরকে একদিকে কোণঠাসা করে রাখেন অন্যদিকে মুহতামিমের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা অর্জন করে স্বপদে বহাল থাকেন। উপরের জামায়াতে কিতাব বণ্টনে এই সিন্ডিকেট বিশেষ ভূমিকা রাখে। একটি বিষয় এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ যে, মাদরাসার কোন শিক্ষক যদি মুহতামিমের চাইতে পঠন বা পরিচালনায় যোগ্য হন অথবা মুহতামিমের কোন কাজে অমত পোষণ করেন তবে তাঁকে কোণঠাসা করতে মুহতামিম সাহেব ঐ সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করেন। আরেকটি পদ্ধতি হলো, কোন জামায়াতের ছাত্রদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঐ যোগ্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে মুহতামিম বরাবরে এই মর্মে দরখাস্ত লেখানো হয় যে, ছাত্ররা ঐ শিক্ষকের কাছে কিতাব বুঝতে পারছে না। এ ধরনের দরখাস্তকে ব্যবহার করে মুহতামিম শূরার কাছে নালিশ করেন বা শিক্ষককে বিদায় করে দেন। এসব মজলিসে শূরা খুব একটা কানে তোলেন না।

কওমী মাদরাসার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একটি অনস্বীকার্য বিষয়। এ ধরনের চর্চা সংগোপনে মাদরাসাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এগুলো নিয়ে বিরোধ কখনো-কখনো ভেতরে-বাইরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় মুহতামিমের পদের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হবার নযীরও আছে। অথচ এখানে শিক্ষা দেয়া হয় সকল লোভ-লালসা, মোহ ত্যাগ করার আদর্শ। সবাই অবশ্য এসবে জড়িত হন না। দু’একজনের নষ্ট রাজনীতি সবাইকে বদনামীর ভাগিদারে পরিণত করে। আমরা ভাবি, কওমী মাদরাসার ভেতরের এসব চর্চা বাইরে গেলে বিপদ হবে। কিন্তু বাইরে যাবার ইতিহাস তো আগেই হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের এক পরিচিত মুহতামিম তো পদ দখলে নিয়েছেন আদালতে মামলা করে। সে যুগ-দর-যুগ আগের কথা। তখন কি সেটা ভেতরে ছিলো? নিকট অতীতের একটি বিষয় আজ সামনে আনছি পাঠকদের সচেতনতার লক্ষ্যে। ২০২৪ সালে সিনিয়র সহকারী জজ ৫ম আদালত, সদর, চট্টগ্রামে অপর মামলা নং ২০২/২০২৪ দায়ের হয়। মামলার বাদী-বিবাদীর নাম এখানে উল্লেখ করলাম না। মামলার বিষয় কওমী-জগতের। মামলার রায় দেয়ার সময় আদালত কওমী মাদরাসার ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে একটি ভয়ংকর পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। তাই আজ তুলে ধরছি:

“আদালতের নিকট ইহা গভীর বেদনার যে, আদালত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ এবং ইসলামী নেতাদের মধ্যে এইরূপ প্রকৃতির বিরোধের বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছে যেই প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নিবেদিত। অভ্যন্তরীণ এমন বিরোধ শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের অখণ্ডতাকে অবমূল্যায়ন করে; বরং একটি হতাশাজনক নজির সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং সেই সমাজের জন্য যেই সমাজের সেবা তাহারা করে থাকেন। তাহাদের উচিৎ শিক্ষা দানের মহৎ উদ্দেশ্যে মনোনিবেশ করা। ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতার উপর নহে।” 

আশা করি আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে পাঠক আমার আলোচনার যথার্থতাকে উপলব্ধি করতে পারছেন। কেবল মানুষের মুখের কথা বা শোনা-কথার উপর নির্ভর করে কওমী মাদরাসাগুলোর(ইল্লা মাশাআল্লাহ) অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তির আধিপত্যের চিত্র আঁকা হয় না। এগুলো কওমী মাদারিসকে ভেতর থেকে কিভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে—তা আজ সকল কওমীর বিবেকের বিচার্য বিষয়।

কওমী ছাত্রদের পক্ষ থেকে সরকারী চাকুরী পাবার দাবি নিয়ে এখানে কিছু কথা বলতে হয়। বিষয়টি বুঝতে হলে স্বীকৃতির অধ্যায়কে বোঝা জরুরী। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে কওমী ছাত্রদের জন্য সনদের স্বীকৃতি একটি আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়। এখনো বিষয়টি নিয়ে কওমীদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি দৃশ্যমান। সনদের স্বীকৃতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদরাসা বোর্ড হাইয়াতুল উলিয়ার সদস্য হয়নি কিছু কওমী মাদরাসা যার মধ্যে আমীরে হেফাজতের জামিয়া বাবুনগরও সামিল। কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতি নিয়ে যাঁরা ঐক্যমতে ছিলেন না তাঁদের মধ্যে সাবেক আমীরে হেফাজত মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ, মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ., বর্তমান আমীরে হেফাজত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। স্পষ্টভাবে না বললেও মধ্যবর্তী অবস্থানে নীরব ছিলেন একটি অংশ। মাওলানা ফরীদুদ্দীন ও মাওলানা রুহুল আমীনের নেতৃত্বে অন্য অংশটি ছিলেন প্রকাশ্যে সরব। হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র সাথে ঐক্যমত পোষণকারী উলামায়ে কেরাম আশঙ্কা করলেন, স্বীকৃতি স্বত্ত্বা হিসাবে আপত্তির যোগ্য নয় কিন্তু একবার স্বীকৃতি নিয়ে ফেললে সে পথ ধরে কওমী-জগতের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার উপর আঘাত আসতে পারে। বিষয়টি ছাড়াও অন্যপক্ষ দাবি করলেন, এতে সনদের মূল্যায়নের পাশাপাশি সরকারী চাকুরীতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এবং প্রশাসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এমন পরস্পর মতাদ্বৈত অবস্থানের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনীতিক স্বার্থে যেনতেন প্রকারে কওমী সনদকে স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগী হলে কওমীর বিভাজিত অংশগুলো দুই মন্দের মধ্যে কম মন্দ অংশকে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং আলোচনাসাপেক্ষে স্বীকৃতিকে গ্রহণ করেন। সরকার কওমী-জগতের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতায় সরকারী হস্তক্ষেপ হবে না মর্মে প্রজ্ঞাপণ জারির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কওমী তাকমীলের সনদকে স্বীকৃতি দান করে। 

স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে হাইয়াতুল উলিয়া গঠিত হলে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় কওমী ছাত্রদের মৌলিক মতাদর্শে একটা বড় পরিবর্তন দেখা গেলো। পরিবর্তনটি হলো, এতোদিন ধরে চলে আসা কওমী ছাত্ররা মাদরাসায় আসতো নিছক ইলম হাসিল, আমল এবং দ্বীন ছড়িয়ে দেয়ার মানসে। তাঁরা জানতো, এক আল্লাহ ছাড়া তাঁদের আর কেউ আশ্রয় দেবে না। কোন পার্থিব স্বীকৃতি নয়, কেবল আল্লাহর স্বীকৃতির গরজে এসব তালিবে ইলম জীবনটা উৎসর্গ করতো; দুনিয়ার অস্বচ্ছলতাকে মেনে নিয়ে কুরআন-হাদীসের আলো ফেরি করে বেড়াতো। ফিরে গিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতো। তাঁদের ঝুলিতে ছিলো, জনসাধারণের অতূলনীয় সস্মান। আগে তাঁরা কখনো জাতীয় পরীক্ষায় মেধা অর্জনের লোভে বা প্রচারের গরজে কিতাব নিয়ে বসতো না। কুরআনের হুকুম প্রয়োগ ও রাসূল সা.’র সুন্নাহ’র অনুসরণই ছিলো তাঁদের একমাত্র ব্রত। এবার তাঁরা সনদের আশায় পরীক্ষায় এগিয়ে যাবার মানসে গাইডভিত্তিক ক্যারিকুলাম নিয়ে বসলো। রাতদিন কষ্ট করে পুরো কিতাব চষে বেড়ানোর দিন যেন শেষ হয়ে এলো। এ যেন বাপের ভিটা ত্যাগ করে পরের বাড়িতে আশ্রয়গ্রহণের মতো দৃষ্টান্ত। ফলতঃ গ্রন্থগত রসমী উলূম অর্জিত হচ্ছে বটে কিন্তু ইলমের রূহ আর আযমত উড়ে যাবার চিত্র ক্রমাগত শক্তি হারাতে থাকলো। 

হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.সহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম তখনই আশঙ্কা করেছিলেন, স্বীকৃতির পথ ধরে কওমীদের মধ্যে সরকারী পদের প্রতি মোহ তৈরি হতে পারে। তাঁরা হয়তো রেজায়ে মাওলার তোয়াক্কা না করে সনদ এবং সরকারী পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে। তাই যদি হয় তবে সেটা হবে কওমীদের বড় কিয়ামত। আজ সেটা চাক্ষুষ দেখা যাচ্ছে। কওমীদের একটি অংশ এখন দাবি করছেন প্রশাসনের বিভিন্ন পদে পদায়ন তাঁদের অধিকার। তাঁদের যুক্তি হলো, সেটা করা না হলে প্রশাসন ইসলামবিরূপ ও সেক্যুলার শক্তির খপ্পরে চলে যেতে পারে। অনস্বীকার্য, এ যুক্তি কম শক্তিশালী নয়। প্রশাসনে পদায়িত না হলে সেখানে দা’ওয়াত ও তাবলীগের কাজ করা দূরূহ। বলতে হয়, সবকিছুর একটা ভারসাম্য থাকা জরুরী। প্রশাসনে কওমীদের একটি অংশ থাকলে দ্বীনের সুবিধা হয় কিন্তু কি পরিমাণ প্রশাসনে থাকবে আর কি পরিমাণ দারস-তাদরীসে থাকবে তার কি কোন সংখ্যাগত পরিকল্পনা দেখানো যাবে? প্রশাসনের পদে যোগ দিতে গিয়ে যদি দেখা যায়, মাদরাসাগুলোতে মেধাবী আলিম-ছাত্র তৈরি হচ্ছে না তবে সে দায় কারা নেবে? কি হবে তখন?

মোদ্দাকথা হলো, প্রশাসনে কওমী ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিয়ে একটি জাতীয় কাউন্সিলের বিকল্প নেই। সেখানে প্রশাসনে সনদভিত্তিক পদায়ন ও কওমী-জগতকে ভেতর ও বাহির থেকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্লেষণ ও আলোচনা হতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সর্বসম্মত রেজুলুশান পাশ করে একটি জাতীয় নির্দেশনা উপস্থাপন করতে হবে। কারণ, বর্তমানে শক্তিশালী নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের অভাবে কওমী-জগৎ ভীষণভাবে দুর্বল, বিক্ষিপ্ত ও অসংগঠিত অবস্থায় রয়েছে। এর বড় কারণ, অদূরদর্শী ও অপরিকল্পিত রাজনীতিক ও আন্দোলনকেন্দ্রিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ এবং কওমী প্রতিষ্ঠানগুলোর দারস-তাদরীসের দুর্বল নেযাম ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মেধা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আলিমদের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত একটি পরিকল্পিত রোডম্যাপ ও অনুসরণকে এখানে পথ্য হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। 

এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সেটি হলো, সরকারী পদে পদায়ন নিয়ে কথা এ প্রথম নয়। এটি আমাদের আকাবির হযরাত রহিমাহুমুল্লাহ’র জমানা থেকে চলে এসেছে। সঙ্গতকারণে তাঁদের তৎকালীন নির্দেশনা ও ভবিষ্যতের করণীয় নাসীহাগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে একটি পথচিত্র নির্বাচন এখন সময়ের দাবি। বিষয়টির একটি সুচিন্তিত সমাধান না হলে কওমী-জগতের বিপদ অনিবার্য। পাকিস্তানেও বিষয়টি মাঝেমধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান বিশ্বের বহুল পরিচিত ফকীহ মুফতী তাকী উসমানী দা.বা. এ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও পূর্বসূরীদের দৃষ্টান্ত টেনে কওমীদের সরকারী পদমুখী হবার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ভিডিও লিঙ্ক (https://youtu.be/cUp7gB5lqUQ?si=2yIVpf-q-hqcFe3p) থেকে ভিডিওটি সবাই দেখতে পারেন। এখান থেকে সমঝদারদের জন্য করণীয় নির্দ্ধারিত হতে পারে। 

-MGRI

রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

মামুনুল হকের বক্তব্য ও হেফাজতের ঐক্য

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 ভাবনা-৭৯

গত ১৭ই মে, রোববার ১১ দলীয় সমঝোতার অন্যতম শরীক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রধান মাও.মামুনুল হক জামিয়া বাবুনগরে আমীরে হেফাজত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। জামায়াতের সাথে নির্বাচনী মোর্চায় অংশ নিয়ে গত সংসদ নির্বাচনের পর এটাই আমীরে হেফাজতের সাথে মাও.মামুনুল হকের এটিই প্রথম সাক্ষাৎ। সাক্ষাতের প্রেক্ষাপট হিসাবে প্রকাশ্যে কিছু বলা না হলেও ভেতরের সূত্র, প্রচারিত ভিডিও ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, হেফাজতের বর্তমান বেহালদশা থেকে উত্তরণের চেষ্টা হিসাবে মাও.মামুনুল হককে আমীরে হেফাজতের কাছে নিয়ে এসে অন্তত একটি আপোষচিত্র নির্মাণের কুশিশ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, ২০২৫ সালে পীর সাহেব চরমোনাই কর্তৃক গঠিত এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় কথিত নির্বাচনী সমঝোতায় মাও. মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আরও একাধিক কওমীপন্থী ইসলামী রাজনীতিক দলের সাথে অংশগ্রহণ করে। তখন থেকেই আমীরে হেফাজত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতের সাথে কওমীপন্থী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করার সমালোচনা করতে থাকেন এবং জামায়াতকে ‘গোমরাহ’ বা পথভ্রষ্ট আখ্যা দিয়ে শরীক কওমীপন্থী দলগুলোকেও ‘গোমরাহ’ বলে সমালোচনা করেন। জনাব আমীরে হেফাজত জামায়াতের মৌলিক দর্শন মওদূদী মতবাদ সম্পর্কে আহলে সুন্নাহর আকাবির ও আসলাফদের আদর্শের উল্লেখ করে জাতিকে তাঁর ভাষায় সতর্ক করতে থাকেন। ধীরেধীরে দৃশ্যত হেফাজত আমীরের সাথে মাও.মামুনুল হকের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তিনিই শুধু নন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন অন্যান্য কওমীপন্থী দলগুলোর সাথেও আমীরে হেফাজতের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আমজনতার মাঝে সঙ্গতকারণে হেফাজত বিভক্ত হবার ধারণা তৈরি হয়। 

বিভিন্ন সূত্রে আমি জেনেছি, মাও.মামুনুল হক বিষয়ে ১১ দলে থাকা নিয়ে হেফাজতের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে আসতে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির পরামর্শেই মূলত মাও.মামুনুল হকের বাবুনগরে আগমন। জামিয়া বাবুনগরে আমীরে হেফাজতকে পাশে রেখে মাও. মামুনুল হক যে ভিডিও বক্তব্য দেন তাতে কয়েকটি বিষয় পরিস্কার। প্রথমত, তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলে কেবল রাজনীতিক উদ্দেশ্যে ছিলেন বলে দাবি করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি জামায়াতের ব্যাপারে উলামায়ে দেওবন্দের আদর্শকে বিশ্বাস ও অনুসরণ করেন বলেও দাবি করেন। প্রশ্ন হলো, কেন মামুনুল হককে এসব বলতে হলো? কেউ তো বলেননি, তিনি ১১ দলীয় সমঝোতায় গিয়ে মওদূদী মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে গেছেন। কেউ তো অভিযোগ করেননি যে, তিনি মওদূদী মতবাদ গ্রহণ করে উলামায়ে দেওবন্দের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গী ত্যাগ করেছেন। বাবুনগরে সে দিন তিনি যা বলেছেন তা তো আগেও বলেছেন। নতুন করে পুরনো কথা বলার দরকারটাই বা কি ছিলো? বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। বলাবাহুল্য, জামায়াত নিয়ে দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গী নতুন কিছু নয়, অনেক পুরনো; উনবিংশ শতাব্দীর সেই চল্লিশের দশক থেকে য্খন মাও.মওদূদী সাহেব জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে জামায়াত যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে তৎকালীন আমীর মাও.আব্দুর রহীম সচেষ্ট হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী শক্তিগুলোর একতাবদ্ধ প্লাটফরম গঠনের কথা বলে নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি খতীবে আযম মাও.সিদ্দীক আহমদ রহ.কে উদ্বুদ্ধ করে আইডিএল বা ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করেন। জোটের নেতৃত্বে ছিলেন নেজামে ইসলাম প্রধান মাও.সিদ্দীক আহমদ। জামায়াতের পক্ষ থেকে খতীবে আযম রহ.কে সভাপতি মেনে নেয়ার প্রধান কারণ ছিলো জামায়াতের বিতর্কিত রাজনীতিক পরিচয়হেতু অস্তিত্ব সঙ্কট।  জোট গঠিত হলে দেখা যায়, মাও.আব্দুর রহীম সাহেব ভেতরে-ভেতরে জামায়াতের কার্যক্রমকেই এগিয়ে নিচ্ছেন। এক পর্যায়ে জোটের চেয়ে জামায়াতের পদচারণাই প্রধান হয়ে ওঠে। বিষয়টি বুঝতে পেরে খতীবে আযম রহ. জামায়াতকে আইডিএল থেকে বহিস্কার করেন। ১৯৭৭ সালের ১০ই অক্টোবর ঢাকা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত উক্ত সংবাদ সম্মেলনে নেজাম ইসলাম পার্টির প্রধান হযরত খতীবে আযম রহ.কে প্রশ্ন করা হয়, জামায়াতে ইসলামীকে বহিস্কারের কারণে আইডিএল দুর্বল হয়ে পড়লো কি না। জবাবে খতীবে আযম রহ. বলেন, 

“টিউমার অপারেশন করে বের করে ফেললে স্বাস্থ্য খারাপ হয় না বরং সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে। জামাতীরা আইডিএল’র মাঝে টিউমারসরূপ বিরাজ করছিল। তাদের বহিস্কারের ফলে আইডিএল নিরুপদ্রবে কাজ করে যেতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।”

এরপরের ঘটনা ১৯৮১ সালে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ. বাংলাদেশের ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে বৈঠক করেন। ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে জামায়াতের সাথে মওদূদী মতবাদের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। বিষয়টিতে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ. জামায়াতকে তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে বলেন। তারা বৈঠকে মওদূদী মতবাদের বিশ্বাসী নন বলে দাবি করলে হাফেজ্জী হুযূর রহ. জাতির সামনে স্পষ্টভাবে ঘোষণার দাবি জানান। কিন্তু জামায়াত আজকাল করে-করে প্রকাশ্যে তো ঘোষণা দেনই নি বরঞ্চ বৈঠকেও অনুপস্থিত থাকেন। পরবর্তীতে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ. সকল আলিমের সাথে পরামর্শ করে ঐতিহাসিক ‘সতর্কবাণী’ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করেন।

খতীবে আযম রহ. ও হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.-র উপরোক্ত ঘটনা দু’টি এ জন্যই বর্ণনা করলাম, আমাদের মহান পূর্বসূরীদের আদর্শ ও চরিত্র কেমন ছিলো তা যেন আমজনতা বুঝতে সক্ষম হয়। রাজনীতিক কারণে জামায়াতের সাথে আহলে হকের জোটবদ্ধ হবার অতীত ইতিহাস আছে বটে কিন্তু সে সবের তিক্ত স্বাদও অকাট্য ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। পবিত্র হাদীসে আছে:  لا يُلْدَغُ المؤمنُ من جُحْرٍ واحد مرتينঅর্থাৎ, মু’মিন এক-ই গর্তে দু’বার দংশিত হয়না। সে হিসাবে আমাদের অতীতের ঐতিহাসিক যাত্রা ভিন্ন রকম হবার কথা ছিলো। কিন্তু হয়নি। মাও.মামুনুল হক সাহেব দাবি করেছেন, তিনি তাঁর পূর্বসূরদের আদর্শে আজও বিশ্বাসী ও অনুসারী। তাই যদি হয়ে থাকে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় সমঝোতায় তিনি অংশ হলেন কি করে? এখানে দু’টি বিষয় প্রণিধানযোগ্য: এক, জামায়াতের সহযোগী হওয়া ও দুই,তাদের নেতৃত্ব মেনে নেয়া। মাও.মামুনুল হকের কথা মেনে নিলে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের পূর্বসূরীবৃন্দ তো জামায়াতের সাথে কোন প্রকার রাজনীতিক বা অরাজনীতিক সমঝোতা বা জোট গঠনে অনুমতি দেননি। তদুপরি কোন বাতিল শক্তি বা ফিরকার নেতৃত্ব তো সীরাত বা উসূলে দ্বীনের মাপকাঠিতে মুসলমানরা মেনে নিতে পারেন না। দেওবন্দী উলামায়ে কেরাম তো মাও.মওদূদী সাহেবের জামায়াতকে বাতিল ও আহলে সুন্নাহ থেকে খারিজ বিবেচনা করেন। মাও.মামুনুল হক সাহেব কি তেমনটা মনে করেন না? মনেই যদি করে থাকেন, আহলে বাতিলের সাথে সহযোগী হওয়া এবং তাদের নেতৃত্ব কেমন করে মেনে নিলেন? যেহেতু তিনি ১১ দলে অংশ নিয়েছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত হিসাবে জামায়াত-প্রার্থীদের এলাকায় জামায়াতকে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন সঙ্গতকারণে পূর্বসূরীদের আদর্শে বিশ্বাসী হলেও অনুসারী হবার দাবি তিনি বাস্তবে কতোটুকু প্রমাণ করতে পারবেন? সে প্রশ্ন নিবারণ করা যায় না। বিশ্বাস করি, আসলেই মাও.মামুনুল হক নির্বাচনী সমঝোতায় অংশ নিলেও জামায়াতের আকীদা-বিশ্বাসে তিনি কস্মিনকালেও বিশ্বাসী নন। কিন্তু সেটা মেনে নিলেও প্রশ্ন উঠে, তাঁর দ্বিচারিতা কি জাহির ও বাতিনকে পরস্পরবিরোধী করে তুললো না? আমার মনে হয়, এ বিষয়টিতে মাও.মামুনুল হক নিজেকে অস্পষ্ট করে ফেলেছেন বলেই তাকে জামিয়া বাবুনগরে নতুন করে বলতে হলো তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। শুধু তাই নয়, উক্ত বৈঠকে আমীরে হেফাজতকে পাশে রেখে তিনি দু’বার তাঁর ১১ দলে অংশ নেয়ার যৌক্তিকতা বয়ান করেছেন এবং সেখান থেকে সরে আসার কোন সম্ভাবনার কথাও তিনি বলেননি। এতে পরিস্কার যে, মাও.মামুনুল হক একদিকে যেমন দাবি করেছেন তিনি পূর্বসূরীদের পথ ত্যাগ করেননি অন্যদিকে জামায়াতের সাথে রাজনীতিক সমঝোতার অবস্থান থেকেও সরে আসেননি। এটাকে তাঁর এক ধরনের ‘মাশকুকুল হাল’ অবস্থান হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। এখান থেকেই মূলতঃ হেফাজতের বিভক্তির ধারণা গড়ে ওঠে। মাও.মামুনুল হক হেফাজতের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ধারণাকে যেভাবে বিভ্রান্তির প্রচারচেষ্টা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তা কিন্তু বাস্তবে সঠিক নয়। কারণ, হেফাজতের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ধারণা জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলে কিছু কওমী দলের বাস্তব অংশগ্রহণ থেকে গড়ে ওঠে।

বৈঠকের আপাদমস্তক যা প্রদর্শিত হয়েছে তাতে আমীরে হেফাজত মাও.মামুনুল হকের পাশে নীরব বসেছিলেন। আমি জানি না, আমীর মুহতারাম তাঁর দুর্বল শ্রবণশক্তির কারণে কতোটুকু শুনতে পেয়েছেন। ভরা মজলিসে যাঁরা বসেছিলেন তাঁদের কেউই কোন কথা বলেননি; কোন প্রশ্ন তোলেননি। এই কথা না বলা থেকে আমীরে হেফাজতের ইতিপূর্বেকার সমালোচনাকে হয় প্রত্যাহার করা হয়েছে বা সহনীয় গণ্য করা হয়েছে বোঝা যায়। কারণ, মাও.মামুনুল হক তাঁর রাজনীতিক অবস্থান থেকে সরে আসার কোন চিহ্ন রাখেননি। তিনি বারবার বলেছেন, জামায়াতের সাথে অংশগ্রহণ আকীদাভিত্তিক সমঝোতা নয়; রাজনীতিক সমঝোতা। এবং এটাকে তিনি সর্বান্তকরণে বৈধ দাবি করেছেন। এখানেই আমীরে হেফাজতের মূল আপত্তি ছিলো। বৈঠকের এদিকটা নির্দেশ করে, মাও.মামুনুল হককে গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে একটা মীমাংসা করার জন্য আমীরে হেফাজতের কাছে নিয়ে আসা হয়। প্রকৃতপক্ষে মীমাংসা কতোটুকু ফলপ্রসু হয়েছে তা সময়ে বোঝা যাবে। 

গত ১৭ই মে’র বাবুনগরের বৈঠকে মাও.মামুনুল হকের ব্ক্তব্যের আলোকে আমরা কিছু বিষয় ইতোমধ্যে আলোচনা করে এসেছি। বৈঠকে উপসংহার টানা হয়েছে অবিভক্ত হেফাজত ও পূর্বাবস্থায় থাকার দাবি নিয়ে। আমরাও চাই হেফাজত এক ও ঐক্যবদ্ধ থাকুক। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। কথা হলো, জনাব মামুনুল হক বলেছেন, তিনি জামায়াতপ্রশ্নে পূর্বসূরীদের আদর্শে অটল আছেন এবং ১১ দলীয় সমঝোতার নামে যা হয়েছে তা নিছক রাজনীতিক ঐক্য বৈ কিছু নয়। এখানে কিছু বিষয় উঠে আসে:

প্রথমত, মেনে নিলাম, তিনি নিছক রাজনীতিক ঐক্যের স্বার্থে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতায় যোগ দিয়েছেন। একজন আলিমে দ্বীন হিসাবে তাঁর কোন না কোন মুসলিহাহ ছিলো। কিন্তু আমাদের মতো গো-গর্দভরা তো কিছু প্রশ্ন করতেই পারি। ১১ দলের শরীক কওমী দলগুলোকে অনুসরণ করে যেসব কওমী তরুণ আর কর্মী ১১ দলকে সমর্থন দিতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরকে হালাল বুঝেছেন, মওদূদীপন্থার সমালোচনা করায় হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে অনলাইনে বা মেলা-মজলিসে গালমন্দ করেছেন, তাঁর কথাকে ‘বস্তাপঁচা’ বলে ধিক্কার দিয়েছেন তারা সবাই কি সেদিনের বৈঠকে পুনর্মিলনের প্রত্যয় ঘোষণা করতে এসেছিলেন? যাদেরকে মাও.মামুনুল হক সাহেববৃন্দ কেবল রাজনীতিক সমঝোতার নামে আধা-জামায়াতী বানিয়েছেন তাদের ফেলে জামিয়া বাবুনগরে এসে কি তিনি চরম স্বার্থপরতা দেখাননি? আহলে হকের পথ থেকে যারা বিচ্যুত হয়ে মুরুব্বী উলামায়ে কেরামের নিন্দায় সরব হয়ে নাফরমান প্রজন্মে পরিণত হয়েছে মাও.মামুনুল হক কি কাল কিয়ামাতের মাঠে তাদের হয়ে দাঁড়াবেন? জামায়াতীদের না হয় মুরুব্বী নেই; আকাবির নেই; আসলাফ নেই, আমরা তো তাদের মতো মুরুব্বীহীন সন্দেহযুক্ত প্রজন্ম নই। তাহলে মাও.মামুনুল হক সাহেববৃন্দ কেন নিছক রাজনীতিক ঐক্যের নামে উঠতি কওমী প্রজন্মকে দূষিত করার দায় নেবেন না? এ প্রশ্নের কি উত্তর আমরা পেতে পারি?  

দ্বিতীয়ত, ১১ দলের নামে যা হয়েছে যুক্তি যাই হোক না কেন, কওমী যে আদর্শিকভাবে বিভক্ত হয়েছে—তা বাহ্যত হলেও মেনে নিতে  হবে। কওমীকে সকল অপঘাত থেকে রক্ষা করতে কওমী আকাবির-আসলাফ শত বছর ধরে যে অক্লান্ত কুরবানী দিয়ে গেছেন তাকে ১১ দলের রাজনীতিক ঐক্য নিঃসন্দেহে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। অতীতে কোন সময়েই কওমী ঐক্যকে কেউ এমন করে আঘাত করতে পারেনি। একদিকে আমীরে হেফাজতের বক্তব্য অন্যদিকে জামায়াতীদের অনলাইন বিষোদগার আর ১১ দলের শরীক কওমী নেতৃবৃন্দের অভাবনীয় নীরবতা দেখে আমরা আশ্চর্য হয়েছি। ফলাফল যা সামনে এসেছে তা হলো, ১১ দলের মূল প্রফিট বা লভ্যাংশ জমা হয়েছে জামায়াতের ঝুলিতে। কওমীরা পেয়েছে কেবল বে-হযম যন্ত্রণার দহন। যে জামায়াত অতীতে কখনো দুই অংকের সীমা পেরুতে পারেনি সেই জামায়াত কওমীদের ‘হেইয়্যো ঠেলায়’ ৭০টি আসন নিয়ে এখন বিরোধী দলে। জনাব মামুনুল হক কি বলবেন এ ব্যবসার লভ্যাংশ জামায়াত তাঁদেরকে কতোটুকু দেবে? চারদলীয় জোটের সময়ে দু’জন মন্ত্রী হয়ে কওমী সনদের স্বীকৃতি নিয়ে জামায়াতের ভূমিকা কি এতো সকালেই স্মরণ থেকে সরে গেলো? তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন কি বলেছিলেন? আমাদের আকাবির-আসলাফ কি জামায়াতের সাথে এমন বান্ধব হবার আদর্শ রেখে গিয়েছিলেন? 

তৃতীয়ত, গত নির্বাচনে ১১ দলের তৎপরতায় কওমীরা যেভাবে ভেতর থেকে বিভক্ত হয়েছে তার নযীর এবারই প্রথম। জানি না এ ক্ষত আদৌ দূর হবে কি না বা কতোদিনে হবে। মনে রাখতে হবে এসবের সিংহভাগ দায় মাও.মামুনুল হককেই নিতে হবে। কারণ, তিনি ১১ দলে কওমী নেতৃত্বে সবার অগ্রে অবস্থান করেছেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে নীরব থেকেছেন। মাও.মামুনুল হক যদি ১১ দলে যাবার আগে কওমী দলগুলোকে নিয়ে সবার উপস্থিতিতে একটি সম্মিলিত কওমী ইত্তিহাদ গঠনে চেষ্টা করতেন তবে ইতিহাস ভিন্ন রকমেরও হতে পারতো। সেখানে হেফাজতের সমর্থনও পাওয়া যেতো। আমীরে হেফাজতকে জামায়াত যেভাবে তাদের অনলাইন বাহিনী দিয়ে নানা অপবাদে আক্রমণ করেছে তা ৮০’র দশকের প্রথম ভাগে হাফেজ্জী হুযূর রহ.কে নিয়ে তাদের অপপ্রচারের স্মৃতিকে টেনে আনে। আমাদের মুরুব্বীরা বারবার বলে গেছেন, জামায়াত কস্মিনকালেও কওমীর শুভাকাঙ্খী হতে পারে না। তাঁদের এমন সতর্কবার্তাকে পাত্তা না দিয়ে ১১ দলের কওমী দলগুলো যেভাবে জামায়াতের পক্ষ হয়ে নীরব থেকেছেন তা কিন্তু ইতিহাসে ক্ষতচিহ্ন হয়ে লেখা থাকবে। এসবের দায় মাও.মামুনুল হকবৃন্দ কখনো এড়াতে পারবেন না। ১১ দল নিশ্চিত ক্ষমতায় যাচ্ছে—এমন ফাঁদে পা দিয়ে মাও.মামুনুল হক নিজেদের যে ক্ষতি করেছেন তা কিন্তু তাঁদের রাজনীতিক ভবিষ্যতকেই সন্দেহযুক্ত করে তুলেছে।

পরিশেষে বলতে হয়, ১৭ই মে’র বাবুনগরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শোকরানা মাহফিলের মতো সবার নীরবতা এবং কোন প্রশ্ন না তোলার চিত্র একদিকে যেমন আমীরে হেফাজতের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তেমনি জনাব মামুনুল হকের নিজ অবস্থানে অনড় থাকার যুক্তি কওমীদের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্বিক বিভক্তিকে প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। কেবল হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ইত্তিহাদ কায়েম হয় না। গাছপাকা আম খুশবুতে চেনা যায় আর ফরমালিনের আম রঙেই কেবল বিভ্রান্ত করে; স্বাদ ও খুশবুতে নয়। 

29.05.2026 

Featured Post

ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে কওমী জগৎ

ভাবনা-৮০  মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা যায়নি আজকের এ দৃশ্য দেখতে হবে কওমীদের। যে কওমীদের মধ্...