মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫

ইসলামী দলগুলোর বর্তমান রাজনীতি

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭৬ 

চব্বিশের বিপ্লবের পর বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি এক নতুন কক্ষে পরিগ্রহ করতে শুরু করেছে বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধারার ইসলামী রাজনীতি চলমান এক, কওমীভিত্তিক রাজনীতি, দুই, চরমোনাইভিত্তিক রাজনীতি এবং তিন, জামায়াতভিত্তিক রাজনীতিএর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনীতিক দল যারা ইসলামের নামে রাজনীতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে তবে চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে জামায়াতকে একটি ইসলামী বা প্রচলিত রাজনতিক দল হিসাবে চিহ্নিত করার মধ্যে বিতর্ক আছে তাই যতো সহজে অন্য দুধারার দলকে ইসলামী বলে আখ্যায়িত করা যায় জামায়াতকে ততো সহজে করা যায় না সঙ্গতকারণে, সমালোচকদের কাছে জামায়াতের নির্দিষ্ট চরিত্র নিয়ে সন্দেহ আছে এর উপর কওমীরা জামায়াতকে ইসলামী দল বলে মানতে নারায ইসলামী ধারার অন্য যে দুটো শাখা এখন সক্রিয় তাদের মধ্যে চরমোনাইপন্থী ইসলামী আন্দোলন একটি পীরভিত্তিক রাজনীতিক দল। অতীতে তাদের রাজনীতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ছিলো, এখনও আছে। তবে একটি বিষয় হলো, দল হিসাবে তারা কওমীদের মতো শতধা বিভক্ত নয়। এর প্রধান কারণ, তারা এক পীরের অনুসারী। অন্যদিকে কওমীদের কোন একটি দলকে বিবেচনায় আনা কঠিন কারণ, তাঁরা শতধা বিভক্ত কিছু রাজনীতিক শক্তির পাশাপাশি চলমান স্রোতধারার মতো। দলীয় সমর্থন কি আছে, কি নেইসে হিসাবে না গিয়ে তাঁরা একটি দল নিয়ে দাঁড়াবার দিকেই মনোযোগী। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে তাঁদেরকে আপন-আপন দল নিয়ে এক মহাবলয় ভাবার প্রবণতা দেখা যায়। অনিবার্যভাবে মাদরাসাভিত্তিক হওয়ায় পুরোপুরি রাজনীতিক হয়ে ওঠা তাঁদের জন্য সম্ভব নয়। ফলে তাঁরা অপেক্ষাকৃত কর্মসূচীভিত্তিক রাজনীতিতেই বেশি তৎপর। দেশের বৃহদাংশের চাহিদাকে সামনে রেখে পথচলা তাঁদের জন্য কঠিন। এর মূল কারণ, কওমীভিত্তিক দলগুলোর বিভক্তি, বিচ্ছিন্নতা ও গতানুগতিক সীমাবদ্ধ চিন্তাধারা। এখানে ঘোষিত রাজনীতিক দল না হলেও হেফাজতে ইসলামের কথা কিছু বলতে হয়। কারণ, হেফাজতে ইসলাম কাগজে-কলমে অরাজনীতিক হলেও তার রাজনীতিক ব্যবহার অনস্বীকার্য ও বাস্তব। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান হেফাজতে ইসলামকে উভয়লৈঙ্গিক দল হিসাবে বিবেচনা করতে চাই। দলটিতে দলীয় শৃঙ্খলা বা প্রটোকল বলতে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। সিন্ডিকেটনির্ভরতা দলটিকে এক প্রকার নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।ফলে প্রচলিত রাজনীতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হেফাজতকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়। উদাহরণসরূপ বলা যায়, একবার তাঁদের একটি অংশ জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্লোগান দেয় আবার কিছুদিন বাদে বিএনপির সাথে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। জামায়াত নিয়ে আমীরে হেফাজত যে বক্তব্য দিয়েছেন অধঃস্তন নেতৃবৃন্দ সেটাকে ব্যক্তিগত ও অসাংগঠনিক বলে মন্তব্য করেছেন। এ যুক্তিতে হেফাজতের এ যাবৎ প্রকাশিত ও প্রচারিত সব বক্তব্যই কি সাংগঠনিক?এমন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।   

ইসলামী দলগুলোর বর্তমান রাজনীতি নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা সম্ভবত কম্পাসের কাঁটার দিক সনাক্ত করতে পারছেন না। তাই তাঁদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।জনমনে তাঁদের আন্দোলন দুর্বোধ্য বলে মনে হচ্ছে। জামায়াত এখন যে কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে সেটাকে কৌশল বলা হবে কি নাতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটা অনেকটা ধোঁয়ালো পথের মাঝে দিগ্বিদিক হারিয়ে ছোটাছুটি করার মতো ব্যাপার বলে মনে হয়। একদিকে তারা জুলাই সনদ ও তার আইনি ভিত্তির নিশ্চয়তা দাবি করে আন্দোলন করছে আবার দাবি পূরণ হওয়া ব্যতিরেকে স্বাক্ষর করছে। স্বাক্ষরের পর বলছে, সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করলে স্বাক্ষর প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। মানুষের কাছে এমন অবস্থান সন্দেহের উদ্রেক করে। এখানে কওমীভিত্তিক দলগুলো বরাবরের মতো বিভক্ত। কিছু জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে আছে আবার কিছু তার বাইরে। আমার মনে হয়, এই প্রথমবারের মতো কওমীভিত্তিক দলগুলো জামায়াতপ্রশ্নে বিভক্ত হয়েছেন। এখানে অন্তত জামায়াত নিজেদেরকে অন্যতম ইসলামী শক্তি বলে কওমীদের একটি অংশ থেকে স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছেন বলে স্বীকার করতে হয়।এটি জামায়াতের জন্য একটি সাফল্য বলতেই হবে। কারণ, আমি আগেই বলেছি, কওমীরা তাঁদের আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াতকে ইসলামী দল হিসাবে স্বীকার করে না।বর্তমান কওমী আলিমদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে বিভক্তি দেখা যায়। সঙ্গতকারণে বলা যায়, জামায়াতের ব্যাপারে কওমীদের আদর্শিক অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মনে রাখতে হবে, আকাশের জমানো মেঘ বৃষ্টির পূর্বলক্ষণ। আমার মনে হয়, এ বিষয়টিতে কওমীদেরকে জাতির কাছে অবস্থান পরিস্কার করা দরকার। তা না হলে, তাঁরা জাতির কাছে সন্দিগ্ধ হয়ে থাকবেন।  

সর্বোপরি, বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো জাতির মৌলিক দাবি পূরণ করতে পারছে কি নাতা তাঁদেরকেই প্রমাণ করতে হবে। তাঁরা যে কেবল ধর্মীয় নয়, জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে ঐক্যবদ্ধ, তাও প্রমাণ করতে হবে।

21.10.2025