রবিবার, ২৮ মে, ২০২৩

কেবল কারামুক্তি নয় হুজুগমুক্তিও চাই

ভাবনা-৪৪


শুনে খুব ভালো লাগছে ২০২১ সালের মুদিবিরোধী বিক্ষোভ-হরতালের কারণে কারাবন্দীরা মুক্তি পাচ্ছেন। এখনও কয়েকজন বন্দী আছেন দেশের বিভিন্ন কারাগারে। আল্লাহ চাহে তো সবাই মুক্তি পান এবং বিনাদোষে যারা কারাগারে ধুঁকেধুঁকে কাল কাটাচ্ছেন তাঁরাও মুক্ত হোন—এ দোয়াই করি। বলাবাহুল্য, ২০২১ সালের মার্চে মুদিবিরোধী বিক্ষোভ-সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শতশত কওমী ধারার আলিম-ছাত্রকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। বলা চলে, সেটি ছিলো কওমীদের উপর সরকারের পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পিত ক্র্যাকডাউন। মুদির আগমনে সেদিন ২৬শে মার্চ শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাযের পর জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমে যা ঘটে তাতে স্পষ্ট বুঝে নেওয়া যায়: একটা গোলমালের প্রেক্ষাপট তৈরি করে কওমী বা হেফাজতকে শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো। কারণ, সরাসরি মুদির আগমনহেতু প্রতিবাদের কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হলে তা কেউ ভালো চোখে দেখবে না। তাই দরকার হয়ে পড়ে, একটি প্রেক্ষাপট তৈরির যেখানে হেফাজত বা কওমীদেরকে আক্রমণকারী হিসাবে চিত্রিত করা যাবে। তেমনটাই করতে গিয়ে সরকারের অজ্ঞতা ও অদূরদর্শীতার কারণে বল চলে যায় প্রতিবাদকারীদের কোর্টে। বাইতুল মুকাররমে ঘটিত ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও-ক্লিপ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সরকারদলীয় লোকেরাই উদ্ভুত গোলযোগের হোতা। পরের দিন সুপরিচিত দৈনিক মানবজমিনের শিরোণাম ছিলো: “বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সংঘর্ষ, পুলিশের সঙ্গে অ্যাকশনে যুবলীগ-ছাত্রলীগ”। সম্ভবত সরকারের হিসাব ছিলো, উক্ত ঘটনার রেশ ধরে দেশের অন্যান্য স্থানেও গোলমাল হবে এবং ব্যবস্থা নেয়ার পথ সৃষ্টি হবে। দুর্ভাগ্যবশত হয়েছেও তাই। সরকারের ওধরনের পরিকল্পনাকে ভেতর থেকে সহায়তা করেছে হেফাজতের একটি অংশের হুজুগনির্ভর ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ২৭ তারিখের ঘোষিত হরতাল নিয়ে আমি বিভিন্ন খোঁজ-খবর নিলাম। বুঝতে পারলাম, সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হচ্ছিলো সমন্বয়হীনভাবে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিলো, ঢাকায় মহাসচিব তা জানতেন না। আবার ঢাকা থেকে মহাসচিবকে এড়িয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছিলো, কেন্দ্র সে ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলো না। সম্মিলিত বৈঠক ডেকে সামগ্রিক আলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বিশেষত, হরতালের সিদ্ধান্ত নিয়ে ধোঁয়াশা ছিলো সর্বত্র। তা’ছাড়া, রহস্যজনক কারণে ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছিলো না। সেদিনকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে খোদ মহাসচিব যে অন্ধকারে ছিলেন তা তিনি কয়েকজনের কাছে ফোনে জানিয়ে ছিলেন বলে আমি নির্ভরযোগ্যসূত্রে জানতে পারি। এমন পরিস্থিতি কেমন করে হতে পারলো; কারা দায়ী ছিলো, জানি না। সময়ে একদিন তা প্রকাশিত হবে।

বাংলাদেশে আমাদের কওমীদের দ্বারা সংঘটিত আন্দোলনের গতিধারা পর্যালোচনা করলে কিছু পদ্ধতিগত ‍দুর্বলতা চেখে পড়ে। কারও কাছে ওগুলো দুর্বলতা বলে নাও মনে হতে পারে। তাঁদের মতামতকে সম্মান করে আমি আমার মতামতটাকে তুলে ধরছি মাত্র। আগে বলে রাখছি, সবকথা এখানে বলা সম্ভব নয়। আন্দোলন নিয়ে আমাদের ঐতিহাসিক ও তত্ত্বগত লেখাপড়া নগণ্য বলা চলে। যেমন ধরুন, একটি আন্দোলনের কল্পনাতে কতোগুলো শর্ত থাকতে হয়: আন্দোলনের উদ্দেশ্য, স্থান, কাল, দর্শন ও পদ্ধতি। এগুলো মৌলিক বিষয়। আমি অবশ্য এখানে প্রথাগত আন্দোলনের কথা বলছি না। এখানে আন্দোলন মানে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্থান, কাল ও দর্শনের মাপকাঠিতে প্রশিক্ষিত কর্মী ও সমমনা জনমত সৃষ্টি করে বাস্তবায়নে পদ্ধতির প্রয়োগ। দেশের বাইরে সংঘটিত আন্দোলন থেকেও আপনি উপযুক্ত উপাদান নিতে পারেন কিন্তু সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে নিজ স্থান, কাল ও কৌশলের ছাঁচে। হুবহু বাইরের আন্দোলনকে এখানে প্রতিষ্ঠিত করতে সমস্যা আছে। ধরুন, আপনি আফগানিস্তানের তালিবান আন্দোলন বা জিহাদের কথা বলতে পারেন। তাহলে প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে স্থান হিসাবে এটা আফগানিস্তান নয়। এখানে শত্রুপক্ষ দেশ দখলও করতে আসেনি। এখানকার সমাজ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী আফগানিস্তানের মতো নয়। এ বাস্তবতা আমাদেরকে বুঝতে হবে। হ্যা, আপনি তাঁদের বৃদ্ধিবৃত্তিক কৌশল, গৃহীত সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থান, প্রতিপক্ষের সাথে সংলাপের সামর্থ্য ইত্যাদি উপাদান নিতে পারেন। কিন্তু কথায়-কথায় অগ্নিশর্মা হয়ে আক্রমণাত্মক হতে পারেন না। যখন আপনি লক্ষ্য ঠিক করবেন, আপনাকে চিনতে হবে এখানকার সমাজকে; সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীকে; দেশীয় পরিবেশকে এবং জনসংখ্যার চিন্তাচেতনাকে। অন্যথায়, আমার-আপনার মাধ্যমে অনাসৃষ্টি হবে, সৃষ্টি হবে না।  তাই তো ইসলামের ফকীহবৃন্দ সর্বসম্মতে বলেন:

من لم يعرف بأهل زمانه فهو جاهل

(অর্থাৎ, যে তার চারপাশের মানুষকে জানে না সে মূর্খ।)

আসুন এবার ইতিহাসের দু’টো বিখ্যাত আন্দোলন নিয়ে কথা বলি। একটি হলো, দ্বীনে ইলাহীর বিরুদ্ধে মুজাদ্দিদ আলফে সানী রহ.-র আন্দোলন এবং অপরটি: আলিম-সমাজের ইংরেজবিরোধী আন্দোলন। দেখুন, দু’টো আন্দোলনের প্রতিপক্ষ, কাল, পরিবেশ, পদ্ধতি, চরিত্র ভিন্নভিন্ন। কিন্তু মৌলিক লক্ষ্য অভিন্ন। বাদশাহ আকবরের দ্বীনে ইলাহী—যা ছিলো ইসলামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ, মুজাদ্দিদ আলফে সানী রহ. তার মূলোৎপাটনে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, গভীর উপলব্ধিতে আনা উচিৎ। উপমহাদেশের বিখ্যাত আলিম ও গবেষক মাওলানা মানযূর নু’মানী রহ. তাঁর লেখা تذکرہ مجّدد الف ثانی   (তাযকিরায়ে মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ.) গ্রন্থে হযরত মুজাদ্দিদ সাহেবের কর্মতৎপরতার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেন: মুজাদ্দিদ সাহেব প্রথমে দৃষ্টি নিবন্ধ করেন দ্বীনে ইলাহী’র ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গীর উৎসের দিকে। এতে তিনি দেখেন তিনটি উৎস থেকে দ্বীনে ইলাহীর ধারণা এসেছে। সেগুলো: ১. প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি যারা সর্বশ্রেণীর ঐক্য ও রাজনীতিক স্বার্থের নামে ভুল ব্যাখ্যার কারণে নিজেদেরকে ইসলামী চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধর্মহীন (ধর্মনিরপেক্ষ), এর চেয়ে বেশি হিন্দুত্ববাদে প্রযুক্ত করে; ২. ওসব দরবারী আলিম (علمائے سو) যাদের অভিপ্রায় ছিলো ভালোভাবে পার্থিব স্বার্থ অর্জন, প্রশাসনের হর্তাকর্তা ও মন্ত্রীদের সন্তুষ্টি রক্ষাকল্পে অন্যায়কে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠিত করা এবং নিজ প্রবৃত্তির লালসা পূরণে ইসলামে অপব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি এবং ৩. ঔসব পথভ্রষ্ট সুফী যারা শরীয়তকে দৃশ্যবাদীদের খেলনা গণ্য করে পবিত্র শরীয়ত ও হাকীকতের নামে নিজেদের কল্পিত এক ধুম্রজাল সৃষ্টি করে রাখে, যেখানে মানুষ নিজেকে খোদা গণ্য করতে পারে আবার খোদার পুত্রও। এতে একজন আল্লাহওয়ালার জন্য কামিল হওয়া সত্ত্বেও গুনাহ ও প্রবৃত্তির প্রত্যেক শাখায় লিপ্ত হওয়ার পথ খোলা থাকে। (পৃ:১৩৮, প্রকাশ:১৯৭৭, দারুল ইশাআত, করাচী, পাকিস্তান)। হযরত মুজাদ্দিদ সাহেব রহ. উক্ত তিন উৎসকে সামনে রেখে তাঁর যাবতীয় দা’ওয়াতী ও ইসলাহী মিশন শুরু করেন এবং আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে সফলতা অর্জন করেন। এই হলো মুজাদ্দিদ আলফে সানী’র আন্দোলনের একটি ক্ষুদ্র ধারণা। এরপর আসে উপমহাদেশের ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন। বলাবাহুল্য, এ আন্দোলন আবার মুজাদ্দিদ সাহেবের আন্দোলনের সাথে ভিন্ন প্রকৃতির। কারণ, সম্রাট আকবরের জমানায় বহিঃশত্রুর প্রশ্ন ছিলো না। এখানে দখলদার ইংরেজশক্তির উপস্থিতি ছিলো; মুসলিমদের জন্য সরাসরি অবিশ্বাসীদের সাথে লড়াইয়ের ক্ষেত্র ছিলো। তাই, শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহ. কর্তৃক ‘দারুল হারব’ বা শত্রুকবলিত দেশ ঘোষণার পর তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। যেমন, মহীশুরের সুলতান ফতেহ আলী টিপুর যুদ্ধ, পলাশীর স্বাধীনতাযুদ্ধ, সায়্যিদ আহমদ শহীদের বালাকোটের জিহাদ, তিতুমীরের প্রতিরোধযুদ্ধ এবং সর্বোপরি ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ। অবশেষে ৫৭’র স্বাধীনতাযুদ্ধ ব্যর্থ হবার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে নেতৃত্বাস্থানীয় আলিম-সমাজ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ঠিক করার লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণে মনযোগী হন। তাঁরা লক্ষ করেন, ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে শতশত মেধাবী ও প্রতিভাবান আলিম শহীদ হয়েছেন; বাস্তুচ্যুত হয়েছেন; অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু বা পর্যুদস্ত হয়েছেন; সহায়-সম্পত্তি হারিয়েছেন অথবা কর্মহীন হয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে একসময় দক্ষ জনবলের অভাবহেতু ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই তাঁরা সামগ্রিক চিন্তা ও গবেষণার আলোকে কতোগুলো কাজকে অগ্রাধিকার হিসাবে গ্রহণ করেন। সেদিক থেকে মুসলিম সমাজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি রক্ষায় মনোনিবেশ করেন। মূলত আলিম-সমাজের লক্ষ্য ছিলো, ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং পুনরুজ্জীবনের মধ্য দিয়ে সচেতন ও বিপ্লবী একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা একদিন স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্তরূপ দেবে। এ লক্ষ্যে তাঁরা ১৮৬৭ সালে ভারতের সাহারানপুর জিলার দেওবন্দ বস্তিতে আজকের বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দের গোড়াপত্তন করেন। সঙ্গতকারণে, ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে শাইখুল হিন্দ মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহ.’র নেতৃত্বে আলিম-সমাজ কংগ্রেসে মুসলমানদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এর কারণ ছিলো, স্বাধীনতার চূড়ান্তরূপ অর্জন।

তাহলে আমরা কি পেলাম? আমরা দু’টো আন্দোলনের দু’ধরনের পদ্ধতি দেখলাম যা প্রতিপক্ষ ও স্থান, কাল হিসাবে ভিন্ন প্রকৃতির। আমাদেরকেও বিবেচনা করতে হবে আমাদের আন্দোলনের স্থান বাংলাদেশ, আর এখানে বিদেশী কোন সৈন্য এখনও আক্রমণ করেনি। আমরা যখন আমাদের সমাজ-কাল ইত্যাদি নিয়ে ভাববো এবং ইসলামের ভাবাদর্শনের সাথে সমন্বয় ঘটাবো, আমাদের আন্দোলনও তখন পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত হবে। আমাদের বুঝতে হবে, আন্দোলন মানেই মার-মার, কাট-কাট ধাঁচের কর্মক্রিয়া নয়। যাঁরা আমার মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন তাঁদেরকে বলবো: প্রখ্যাত আলিম মাওলানা মুহাম্মাদ মিয়া সাহেব রহ,’র লেখা বিখ্যাত উর্দূ ইতিহাসগ্রন্থ علماء ہند کا شاندار ماضی  (উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী)-র ১ম খণ্ডের মুজাদ্দিদ আলফে সানী রহ.’র আলোচনায় مجّدد صاحب نے بغاوت کیوں نہیں کی (কেন মুজাদ্দিদ সাহেব বিদ্রোহ করেননি?) অধ্যায়টি পড়ার জন্য।  উপরোক্ত দু’টো উদাহরণ থেকে আমরা সহজে বুঝতে পারি, হুজুগ বা আবেগ—কোনটাই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্য উপাদান হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, জোশ দিয়ে দ্বীন বোঝা যায় না, হুঁশ দিয়ে বুঝতে হয়। অতীতে আমাদের আন্দোলনের ব্যর্থ দিকগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, জোশ বা আবেগ আর হুজুগের উচ্ছৃংখল ব্যবহার দিয়ে আমরা নিজেদের কতো ক্ষতি করেছি। ২০২০ সালের ভাষ্কর্য বা মুদি বিরোধী আন্দোলনও এ থেকে বাদ যেতে পারে না। শতশত আলিম-ছাত্র যে বেকসূর জেল খেটেছেন, কোন যুক্তিতে? কাদের নেতৃত্বের লালসার বলি হতে হয়েছে তাঁদেরকে? কারা সেদিন মরহুম জুনায়েদ বাবুনগরীকে ভুল পরামর্শ দিয়ে প্রভাবিত করেছিলেন? কাদের চাপে ২৭ তারিখে হরতালের ঘোষণা দিতে হয়েছিলো? সম্মিলিত সভা থেকে সে সিদ্ধান্ত আসলো না কেন? এমন আরও প্রশ্ন থেকে গেছে জানি না এর উত্তর কোন দিন মিলবে কি না।

তাই আজ বড়ো ব্যথিতচিত্তে ভাবছি, কেন বারেবারে আমাদের এমন হয়? হুজুগ দিয়ে আমরা আর কতোদিন হুজুগে কওমী বনে থাকবো? আমরা বারবার কারগার থেকে মুক্তি পাই কিন্তু হুজুগ থেকে মুক্তি পাই না সহসা। কেন? আবেগ দিয়ে সর্বস্ব বিচার করতে চাই। ভেবেছিলাম, এবারের কারামুক্তি আমাদেরকে হজুগমুক্তির পথ দেখাবে, জানি না কখন আমাদের বোধোদয় হবে বা আদৌ হবে কি না। আল্লাহ হা-ফিয।

২৮.০৫.২০২৩

মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০২৩

রাজনীতিতে বিদেশমুখিতা ও বিদেশনির্ভরতা

ভাবনা-৪৩

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর বৌদ্ধদের এতো নির্যাতনের কারণ খুঁজতে গিয়ে আমি একটি অদ্ভুত কথা শুনতে পাই। রোহিঙ্গা-সংশ্লিষ্টজনদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তারাও বলেন সে-কথা। কথাটি হলো, রোহিঙ্গাদের মাঝে কোন ঝগড়াঝাটি হলে, মতবিতর্ক হলে বা মারামারি হলে তারা সালিশ হিসাবে মীমাংসা করার জন্য নিয়ে আসতো বৌদ্ধদের কাউকে। সুদূর অতীত থেকে চলে আসছে এ প্রথা। এতে বৌদ্ধরা বুঝতে পারে, এদের ভেতরটা কতোটা ক্ষয়ে গেছে। যারা নিজেদের ঝগড়াঝাটি মীমাংসা করতে শত্রুপক্ষকে নিয়ে আসে, তাদের পরিণতির ভয়াবহতা হিসাব করতে হয় না। রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বুঝতে পেরেই বৌদ্ধরা আজ যা ইচ্ছে তাই করার সাহস দেখাতে পারছে।  এই যদি হয় একটি জাতির বৈশিষ্ট্য সে কি কখনও স্বাধীন হতে পারে? বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের রাজনীতিতে হাল আমলে চলছে সেই আত্মঘাতী তৎপরতা। দেখেশুনে মনে হয়, আমরা কোন স্বাধীন ভূখণ্ডের বাসিন্দা নই; কোন ঔপনিবেশিক মকামের মানুষজন। তাই নিজেদের সমস্যা নিজেদের মেটাবার মুরোদ নেই, বিদেশকর্তাদের মুহতাজ হতে হয়। এ রোগ হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এসব রোগ-বালাই পিছু নিয়েছে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখে মনে হতে বাধ্য, কালেকালে জীবাণু এতো গভীরে ঢুকে গেছে, নিরাময় যেনো অসাধ্য কিছু।

যে জাতি শোষণের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, স্বাধীন জনমতের স্বপক্ষে যুদ্ধ করে নিজেদের স্বাধীন করেছে বলে দাবি করে, তারা যখন বহিঃশক্তির কাছে নিজেদের সমস্যা মিটমাট করতে ধর্ণা দেয়, প্রশ্ন করতে হয়: এই কি তবে স্বাধীনতা? আমাদের রাজনীতিকেরা এ প্রশ্নে কখনও দায় নেন না। কেউকেউ স্বপক্ষে ব্যাখ্যা দেন। বিদেশমুখিতা আর বিদেশনির্ভরতা কিন্তু এক নয়। একটি জাতিকে সুসংহত হতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতিরে বিদেশমুখিতাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হয়, অবশ্য পরিমিত হারে। এ পৃথিবীতে বাঁচতে হলে এক অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কিন্তু একটি জাতির জন্য বিদেশনির্ভরতা স্বাধীন চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই, প্রত্যেক সার্বভৌম দেশ ঘোষণা করে: তাদের একটি স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি রয়েছে। এর ভিত্তিতেই একটি স্বাধীন দেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপন স্বকীয়তা বজায় রেখে অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর থেকে আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার নামে বিদেশমুখিতাকে অতিক্রম করে বিদেশনির্ভর সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়েছি। ফলে, দেশের ভেতর থেকেই দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দেবার অভিযোগ ওঠে। যারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় গেলে সে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। কিন্তু কেন? বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক। প্রথমেই একটি বাস্তবতা মেনে কথা শুরু করতে হবে। সেটা হলো, এখন দু’একটি বাদে প্রায় সব দেশে চলছে কথিত গণতেন্ত্রর ভিন্নভিন্ন রূপ। মোটামুটি বলা যায়, গণতান্ত্রিক শাসন। এখন গণতান্ত্রিক শাসন বা সরকারের চরিত্র নিয়েও মতভিন্নতা বর্তমান। ভারতের কাছে তাদের যে পদ্ধতি গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত, সে দৃষ্টিকোণে মার্কিন গণতন্ত্র শুদ্ধ নয়। তেমনি মার্কিন গণতন্ত্রের পদ্ধতিগত দৃষ্টিকোণে ভারতের গণতন্ত্রও বিশুদ্ধ নয়। আবার তুরস্কের গণতন্ত্র দেখুন। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায়। এর উপর আছে প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের নিয়ম। এখন যে পদ্ধতিই হোক বাহ্যিকভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত সরকারকে প্রচলিত গণতান্ত্রিক সরকার বলে গণ্য করা করা হয়। বর্তমানে অবশ্য গণন্ত্রের প্রয়োগে অনেক শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। সব শর্ত পূরণ না হলেও অধিকাংশ শর্ত পূরণ হলে পাশ নম্বর দেয়া হয়।

বর্তমান বিশ্বে নিরপেক্ষ নির্বাচন, জনমত প্রকাশের অধিকার ও জনসম্পৃক্ততা সুশাসনের অন্যতম বড়ো সূচক হিসাবে চিহ্নিত। সেদিক থেকে আমাদের বাংলাদেশের নৈর্বাচনিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস বড়ো করুণ।  সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, জনসম্পৃক্ততা, স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার, বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রদান ইত্যাদি প্রচলিত সুশাসনের সূচক হিসাবে স্বীকৃত। মূলত যে সরকার উক্ত বিষয়গুলোতে যতো শক্তিশালী, পররাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় সে সরকার ততো বেশি শক্তিশালী। পক্ষান্তরে, জনসম্পৃক্তহীন ও সুশাসনবিহীন সরকারের অবস্থান ততো দুর্বল। এই যে বিদেশনির্ভরতা বা বিদেশীদের হস্তক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসে নিজেদের নৈতিক অবস্থানের গভীর-অগভীরতার নিরিখে। তাই, কোন সরকার যদি চায় পররাষ্ট্রের সাথে তার শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক থাকুক, তাহলে তাকে অবশ্যই জনসম্পৃক্ততা ও সুশাসনসম্পন্ন সরকার হতে হবে যেনো বাইরের শক্তি কোন দুর্বলতা খুঁজে না পায়। দুর্বলতা থাকলে কেউ না কেউ সুযোগ নিতে চাইবে। বনের বাঘ-সিংহ সব সময় দুর্বল শিকারীকেই খোঁজে। সুতরাং, যে দেশে বিদেশী হস্তক্ষেপ হয় বুঝতে হবে সে দেশের সরকারের সুশাসন ও জনসম্পৃক্ততার সূচকের দুর্বলতা অধিক। দেশে সুশাসন থাকলে বিদেশী হস্তক্ষেপের পরিস্থিতিতে জনগণ প্রতিবাদ করে সরকারের সাথে একাত্মতার জানান দেয়। এটাই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূলশক্তি। তাবৎ বিশ্ব একে সমীহ করে। আর সুশাসনের অভাব হলে জাতি বিভক্ত হয়, বিদেশী হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনপ্রশ্নে বিদেশী হস্তক্ষেপ বলে যে বলাবলি হচ্ছে, সেটি মূলত দেশে সামগ্রিকভাবে সুশাসনের অভাবহেতু। সঙ্গতকারণে, বিদেশীদের একতর্ফা দোষ দিয়ে আমরা খেয়া পার হবো—সে চেষ্টা বৃথা। রোহিঙ্গা মুসলিমদের টানা উদাহরণ থেকে যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ না করি, নিজেদের ঝগড়ার মীমাংসায় বাইরের সালিশ নিয়ে আসার প্রবণতাকে রোধ করতে না পারি, তবে স্বাধীনতা তো অবশ্যই হারাবো। আমাদের কেউ দাম দেবে না।

২৩.০৫.২০২৩

Featured Post

জুলাই জাদুঘরে হেফাজত-ভাষ্কর্য: দায় কার?

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮২  সম্প্রতি জুলাই জাদুঘরে হেফাজতে ইসলামের ৫ই মে’র একটি হৃদয়বিদারক চিত্রকে অবলম্বন করে নির্মিত ভাষ্...