মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫

ইসলামী দলগুলোর বর্তমান রাজনীতি

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭৬ 

চব্বিশের বিপ্লবের পর বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি এক নতুন কক্ষে পরিগ্রহ করতে শুরু করেছে বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধারার ইসলামী রাজনীতি চলমান এক, কওমীভিত্তিক রাজনীতি, দুই, চরমোনাইভিত্তিক রাজনীতি এবং তিন, জামায়াতভিত্তিক রাজনীতিএর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনীতিক দল যারা ইসলামের নামে রাজনীতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে তবে চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে জামায়াতকে একটি ইসলামী বা প্রচলিত রাজনতিক দল হিসাবে চিহ্নিত করার মধ্যে বিতর্ক আছে তাই যতো সহজে অন্য দুধারার দলকে ইসলামী বলে আখ্যায়িত করা যায় জামায়াতকে ততো সহজে করা যায় না সঙ্গতকারণে, সমালোচকদের কাছে জামায়াতের নির্দিষ্ট চরিত্র নিয়ে সন্দেহ আছে এর উপর কওমীরা জামায়াতকে ইসলামী দল বলে মানতে নারায ইসলামী ধারার অন্য যে দুটো শাখা এখন সক্রিয় তাদের মধ্যে চরমোনাইপন্থী ইসলামী আন্দোলন একটি পীরভিত্তিক রাজনীতিক দল। অতীতে তাদের রাজনীতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ছিলো, এখনও আছে। তবে একটি বিষয় হলো, দল হিসাবে তারা কওমীদের মতো শতধা বিভক্ত নয়। এর প্রধান কারণ, তারা এক পীরের অনুসারী। অন্যদিকে কওমীদের কোন একটি দলকে বিবেচনায় আনা কঠিন কারণ, তাঁরা শতধা বিভক্ত কিছু রাজনীতিক শক্তির পাশাপাশি চলমান স্রোতধারার মতো। দলীয় সমর্থন কি আছে, কি নেইসে হিসাবে না গিয়ে তাঁরা একটি দল নিয়ে দাঁড়াবার দিকেই মনোযোগী। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে তাঁদেরকে আপন-আপন দল নিয়ে এক মহাবলয় ভাবার প্রবণতা দেখা যায়। অনিবার্যভাবে মাদরাসাভিত্তিক হওয়ায় পুরোপুরি রাজনীতিক হয়ে ওঠা তাঁদের জন্য সম্ভব নয়। ফলে তাঁরা অপেক্ষাকৃত কর্মসূচীভিত্তিক রাজনীতিতেই বেশি তৎপর। দেশের বৃহদাংশের চাহিদাকে সামনে রেখে পথচলা তাঁদের জন্য কঠিন। এর মূল কারণ, কওমীভিত্তিক দলগুলোর বিভক্তি, বিচ্ছিন্নতা ও গতানুগতিক সীমাবদ্ধ চিন্তাধারা। এখানে ঘোষিত রাজনীতিক দল না হলেও হেফাজতে ইসলামের কথা কিছু বলতে হয়। কারণ, হেফাজতে ইসলাম কাগজে-কলমে অরাজনীতিক হলেও তার রাজনীতিক ব্যবহার অনস্বীকার্য ও বাস্তব। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান হেফাজতে ইসলামকে উভয়লৈঙ্গিক দল হিসাবে বিবেচনা করতে চাই। দলটিতে দলীয় শৃঙ্খলা বা প্রটোকল বলতে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। সিন্ডিকেটনির্ভরতা দলটিকে এক প্রকার নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।ফলে প্রচলিত রাজনীতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হেফাজতকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়। উদাহরণসরূপ বলা যায়, একবার তাঁদের একটি অংশ জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্লোগান দেয় আবার কিছুদিন বাদে বিএনপির সাথে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। জামায়াত নিয়ে আমীরে হেফাজত যে বক্তব্য দিয়েছেন অধঃস্তন নেতৃবৃন্দ সেটাকে ব্যক্তিগত ও অসাংগঠনিক বলে মন্তব্য করেছেন। এ যুক্তিতে হেফাজতের এ যাবৎ প্রকাশিত ও প্রচারিত সব বক্তব্যই কি সাংগঠনিক?এমন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।   

ইসলামী দলগুলোর বর্তমান রাজনীতি নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা সম্ভবত কম্পাসের কাঁটার দিক সনাক্ত করতে পারছেন না। তাই তাঁদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।জনমনে তাঁদের আন্দোলন দুর্বোধ্য বলে মনে হচ্ছে। জামায়াত এখন যে কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে সেটাকে কৌশল বলা হবে কি নাতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটা অনেকটা ধোঁয়ালো পথের মাঝে দিগ্বিদিক হারিয়ে ছোটাছুটি করার মতো ব্যাপার বলে মনে হয়। একদিকে তারা জুলাই সনদ ও তার আইনি ভিত্তির নিশ্চয়তা দাবি করে আন্দোলন করছে আবার দাবি পূরণ হওয়া ব্যতিরেকে স্বাক্ষর করছে। স্বাক্ষরের পর বলছে, সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করলে স্বাক্ষর প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। মানুষের কাছে এমন অবস্থান সন্দেহের উদ্রেক করে। এখানে কওমীভিত্তিক দলগুলো বরাবরের মতো বিভক্ত। কিছু জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে আছে আবার কিছু তার বাইরে। আমার মনে হয়, এই প্রথমবারের মতো কওমীভিত্তিক দলগুলো জামায়াতপ্রশ্নে বিভক্ত হয়েছেন। এখানে অন্তত জামায়াত নিজেদেরকে অন্যতম ইসলামী শক্তি বলে কওমীদের একটি অংশ থেকে স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছেন বলে স্বীকার করতে হয়।এটি জামায়াতের জন্য একটি সাফল্য বলতেই হবে। কারণ, আমি আগেই বলেছি, কওমীরা তাঁদের আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াতকে ইসলামী দল হিসাবে স্বীকার করে না।বর্তমান কওমী আলিমদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে বিভক্তি দেখা যায়। সঙ্গতকারণে বলা যায়, জামায়াতের ব্যাপারে কওমীদের আদর্শিক অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মনে রাখতে হবে, আকাশের জমানো মেঘ বৃষ্টির পূর্বলক্ষণ। আমার মনে হয়, এ বিষয়টিতে কওমীদেরকে জাতির কাছে অবস্থান পরিস্কার করা দরকার। তা না হলে, তাঁরা জাতির কাছে সন্দিগ্ধ হয়ে থাকবেন।  

সর্বোপরি, বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো জাতির মৌলিক দাবি পূরণ করতে পারছে কি নাতা তাঁদেরকেই প্রমাণ করতে হবে। তাঁরা যে কেবল ধর্মীয় নয়, জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে ঐক্যবদ্ধ, তাও প্রমাণ করতে হবে।

21.10.2025

শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫

ফটিকছড়িতে ভোট-রাজনীতির সাম্প্রতিক মানচিত্র

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭৫ 

ফটিকছড়ি এখন আর একক উপজেলা নয় যদিও আসন হিসাবে অভিন্ন ফটিকছড়ি ভেঙ্গেফটিকছড়ি উত্তরনতুন উপজেলা নামে সরকারের অনুমোদন পেলেই শুরু করবে যাত্রা স্থানীয় জনসাধারণের অবকাঠামোগত উন্নয়ন মানব-সম্পদ উন্নয়নের জন্য ফটিকছড়ি উত্তরের প্রয়োজন অনস্বীকার্য উপজেলা হিসাবে মানচিত্রের পরিবর্তন হলেও নির্বাচনী আসনের কোন পরিবর্তনের হবে নাএটা সত্য  তবুও নতুন উপজেলার ভাবনা উত্তরাংশের ভোটের ভবিষ্যৎকে যে প্রভাবিত করবে তা এক প্রকার বলা যায়কারণ, আসন্ন নির্বাচনোত্তর নতুন উপজেলার উন্নয়নে কে বা কারা ভূমিকা রাখতে পারেসে হিসাব উত্তরে অবশ্যই প্রধান বিবেচনার স্থান দখল করবে সে হিসাব সামনে রেখে ফটিকছড়িতে চলছে নীরব ও সরব প্রচারণা।

ফটিকছড়ির উত্তরে প্রচলিত ধারণামতে জামায়াতের একটি শক্ত অবস্থান আছে। বিষয়টি কি কেবল প্রচার না রাজনীতিক কৌশল না শাক দিয়ে মাছ ঢাকাতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিদার। এক সময় ফটিকছড়ি থানা ৭৭৩.৫৪ বর্গ.কিমি.(২৯৮.৬৭ বর্গমাইল) আয়তনের হলেও ২০০৭ সালে সৃষ্ট ভুজপুর থানার আয়তন ৬ য়ুনিয়নকে যুক্ত করে ৪৮৯.৮৬ বর্গ. কিমি। মূলত ভৌগলিকভাবে সুয়াবিল য়ুনিয়ন বাদে বাকি ৫ য়ুনিয়ন যথাক্রমে: বাগান বাজার, দাঁতমারা, নারায়নহাট, হারুয়ালছড়ি ও ভুজপুর নিয়ে উত্তর ফটিকছড়ি। মনে করা হয়, এখানে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের সংখ্যা একটি-দু’টির বেশি না হওয়ায় বৃহত্তর ফটিকছড়িতে যা চট্টগ্রাম-২ আসন হিসাবে পরিচিত, কাদের ভোট বেশিতা কাগজে-কলমে দেখা যায়নিহাসিনা সরকারের পতনের পর মানুষ এখন মনে করছে, সরকারের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ঠিক থাকলে এবার হয়তো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে। তবে বর্তমানে ফটিকছড়ির সামগ্রিক চিত্রকে সামনে রাখলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা বা দখলদারিত্বের নির্বাচনের শঙ্কা দু’টোই সামনে আসতে পারে। কথাটি কেন বলছি, সে-কথায় পরে আসছি।  আগে বলেছি, উত্তর ফটিকছড়িতে প্রচলিত ধারণামতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান আছে। মনে রাখতে হবে, জামায়াতের রাজনীতি ও সমর্থনের চিত্র সাধারণ নয়। বলতে গেলে অনেকটাই ব্যতিক্রম। এখনো জামায়াতের পরিচয় ক্যাডারভিত্তিক। সঙ্গতকারণে, জামায়াত বা তার অঙ্গ-সংগঠন ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক বৃক্ষ বেশ মজবুত বলে ধরে নেয়া হয়। আমার যতোটুকু মনে হয়, এ ধরনের প্রচারণা শতাংশ বাস্তব যেমন নয় তেমনি অবাস্তবও নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোর চিত্রের দিকে তাকালে জামায়াতের রেখাচিত্র খুব একটা সুখকর মনে হয় না। যেমন ধরুন, ১৯৭৩ সালে আইডিএল’র ব্যানারে ৬ আসন, ১৯৮৬ সালে ১০ আসন, ১৯৯১ সালে ১৮ আসন, ১৯৯৬ সালে(জুন) ৩ আসন, ২০০১ সালে বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১৭ আসন এবং ২০০৮ সালে জোটবদ্ধ হয়ে ২ আসন। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে রাজনীতিক বিরোধিতার কারণ বলে যদি উল্লেখও করা হয় তবুও বলা যায়, জামায়াত-প্রভাবিত এলাকায় শক্ত অবস্থানের প্রচারণার নিরিখে প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ হতাশাজনক।  সেদিক থেকে উত্তর ফটিকছড়িতে জামায়াতের ভিত্তিজনিত আসন্ন ভোটের সম্ভাবনা নিয়ে আশান্বিত অনুমান করা কঠিন। এর মূল কারণ, জামায়াতের তৃণমূল-জনগণের সাথে সম্পর্কের চিত্র দুর্বল। বাস্তবতার তুলনায় প্রচারের ভাগটা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো জামায়াত ও সংশ্লিষ্টদের একটি অলিখিত নিয়ম। এটা আমার ধারণা নয়। আমার ছাত্র ও পেশাগত জীবনে বিষয়টি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এগুলো করা হয় বিশেষত কর্মীদের মনোবল ঠিক রাখতে এবং বাইরে একটি মনস্তাত্বিক বলয় তৈরি করে সাধারণে প্রভাব সৃষ্টি করতে। তারা মনে করে, এতে মানুষের ভোট টানা যাবে। আমার এ ধারণার একটি আলামত পেলাম গত পরশু উত্তর ফটিকছড়ির এক সচেতন ব্যক্তির মন্তব্য থেকে। টেলিফোনে তাঁর কাছে জানতে চাইলাম: ওখানে জামায়াতের অবস্থা কেমন? তিনি জানালেন, তাদের দৌড়াদৌড়ি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখ ধানের শীষের দিকে। তাঁর কথায়: ভোট বিএনপি পাবে।  তবে সমস্যা হলো, সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধানের শীষের ভোটগুলো কুড়িয়ে বাক্সে ভরার সাংগঠনিক ক্ষমতা বিএনপি’র নেই। এটাই ভয়ের জায়গা। জামায়াত উত্তর ফটিকছড়িতে বিএনপি’র এ দুর্বলতাকেই কাজে লাগাতে চাইছে।

মধ্য ফটিকছড়ি মূলত বিএনপি’র সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র। কিন্তু আছে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। এখন পর্যন্ত যে দু’জন আলোচিত প্রার্থী বিএনপি থেকে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা কিন্তু মধ্য ফটিকছড়ির। যদিও এখনও কেউ মনোনয়ন পাননি, তাঁরা কিন্তু জনসংযোগ করছেন। তাদের জনসম্পৃক্ততা বাস্তবার্থে প্রশ্নের সম্মুখীন। সাধারণ মানুষের কথায়, এরা মধুর মাছি। ভোট আসলে তাঁদের দেখা যায়। তাঁদেরই একজনের পাড়ার এক রিক্সাচালকের সাথে ক’দিন আগে হাট থেকে বাড়িতে আসতে-আসতে কথা হচ্ছিলো ঐ প্রার্থী সম্পর্কে। এলাকার মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক কেমন; সাহায্য-সহযোগিতা করেন কি নাএসব নিয়ে জানতে চাচ্ছিলাম। রিক্সাচালক বললেন, “আমরা গরীব মানুষ। আমাদের সাথে তাঁদের সম্পর্কই বা কিসের? মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসেন আবার জুমা পড়ে চলে যান। ওনারা বড় মানুষ। মন চাইলে কিছু মানুষকে ক’পয়সা দান-দক্ষিণা করেন। তবে মানুষের প্রয়োজন হিসাবে নয়। যার দরকার দশ টাকা তাকে দেন এক-দুই টাকা আর কি। তাতে কি জরুরত মিটে?” বুঝলাম, এ প্রার্থীর সম্বল কেবল তার অর্থস্বত্ব। ভাত একটি টিপলেই বুঝা যায় হাড়ির অবস্থা কেমন। অন্য প্রার্থীর বিষয়ে দেখলাম মানুষের ধারণা ইতিবাচক নয়। তাঁকে কেউ মানুষের সমস্যা-সমাধানে দেখেনি; কাছেও পায়নি।  এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ ‘না’ ভোটে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। প্রার্থীদ্বয়কে দেখলাম, লোকবল নিয়ে বড়বড় মাদরাসার পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করতে। এখন সময় পাল্টেছে; মানুষের সচেতনতা পাল্টেছে। অন্যের কথায় ভোট দেয়ার সেদিন আর নেই। মানুষের সাথে মিশতে না পারলে; তাঁদের প্রকৃত বন্ধু হতে না পারলে বড়দের কাছে গিয়ে লাভ যে খুব একটা হবে, মনে হয় না। মানুষ এখন বুঝে: ফলেই বৃক্ষের পরিচয়।

দক্ষিণ ফটিকছড়ি দীর্ঘদিন থেকে ফ্যাসিস্টদের হাতে বন্দী ছিলো। সেখানে স্বাধীনভাবে কারও কিছু করার ছিলো না। আজ মুক্ত বাতাসে মানুষ ভোট দেবার; নিজের মতো করে কিছু বলার স্বপ্ন দেখছে। স্বাভাবিক নিয়ম হলো, জবরদস্তি পরিবেশের অবসান হলে সেখানে আশার বৃক্ষ দ্রুত ও তাড়াতাড়ি বাড়ে। সে হিসাবে আওয়ামী লীগ ভিন্ন কোন মতাদর্শকে সেখানে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়া হয়নি। আজ তাই রাজনীতিক দলগুলো নিজনিজ পরিকল্পনায় ভোট-রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। খবর নিয়ে জানলাম, সেখানে জামায়াত তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। বিএনপি’র অবস্থা উত্তরের মতো। সাংগঠনিকভাবে তারা দুর্বল। তাদের আরেক বিপদ হলো: তাদের ধারণায় তারা অবশ্যই ক্ষমতায় যাচ্ছে। তাই, রাত জেগে পড়ার দরকারটাই বা কি? এ ধরনের মানসিকতায় খরগোশ-কচ্ছপের দৌড়ের উদাহরণ চলে আসতে পারে। আগে বলেছি, দক্ষিণে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় জামায়াত। বিশেষ করে দক্ষিণের দক্ষিণাংশে বিশেষ করে সমিতির হাট ও তৎসংলগ্ন এলাকায় জামায়াত তার তৎপরতা অনেক বৃদ্ধি করেছে। ভোটের ফলাফলকে কাছে টানতে তারা অতীতের রক্ষণশীলতা ঝেরে ফেলে নতুনভাবে উপস্থিত হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে, নারীদের ব্যবহার এবং অপরটি, আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সাধারণ কর্মীদের জামায়াতের অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা। সেখানকার একজন আমাকে জানালেন, আদর্শ বদল না করেও আওয়ামী কর্মীদের এই বলে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে: বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হবে কিন্তু জামায়াত সরকার গঠন করলে আওয়ামী কর্মীদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হবে না। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সেখানকার এক য়ুনিয়ন চেয়ারম্যান যিনি আওয়ামী রাজনীতি করতেন, এখন বিদেশে পালিয়ে গেছেন, কর্মীদের বার্তা দিয়েছেন: এ মুহূর্তে জামায়াতের সাথে কাজ করতে এবং তাদের অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করতে। ইতোমধ্যে জামায়াতের একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী কর্মীদের উপস্থিতির বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখান থেকে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, অন্তত দক্ষিণে জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের একটি গোপন ও অলিখিত সমঝোতা হয়ে গেছে যা তারা ভোট-রাজনীতিতে ব্যবহার করবে বলে মনে হয়

বলাবাহুল্য, ফটিকছড়ি হেফাজতে ইসলামের ঘাঁটি এবং আমীরের অবস্থান এখানেই। উল্লেখ্য, হেফাজত-আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর দেয়া জামায়াত-বিরোধী বক্তব্যে ফটিকছড়ির মানুষের একটি বিশেষ অংশ কিন্তু প্রভাবিত হবেএটা নিশ্চিত।  জামায়াতের জন্য বিষয়টি মহাবিপদের মতো। তারা না পারছেন যথাযোগ্য জবাব খাড়া করতে, না পারছেন সহ্য করতে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জামায়াত মাওলানা মওদূদী সাহেবের মতবাদ মানেন না বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা দিতে নারায। জামায়াতের প্রতি আলিম-সমাজের বড় আপত্তির জায়গাটা এখানেই। উদাহরণসরূপ বলা যায়, ২০২৪ সালের ২৯শে অক্টোবর মঙ্গলবার জামায়াত নেতা জনাব শাহজাহান চৌধুরী ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আমীরে হেফাজতের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে জামেয়া বাবুনগরে যান। আলোচনার এক পর্যায়ে জনাব শাহজাহান চৌধুরী মাওলানা মওদূদী সাহেবের মতবাদ মানেন না বলে দাবি করেন। কিন্তু সেখান থেকে আজাদী বাজার গিয়ে জামায়াতের এক অনুষ্ঠানে মাও.মওদূদীকে তাঁদের আদর্শ বলে উল্লেখ করেন। এখান থেকেই জামায়াতের ব্যাপারে আমীরে হেফাজত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।  প্রথমদিকে আমীরে হেফাজত জামায়াতের সাথে আদর্শিক ভিন্নতার কথা তুললেও পরবর্তীতে জামায়াতকে ভোট না দিতে আহ্বান জানাতে থাকেন। আমীরে হেফাজতের বিষয়ে জামায়াত প্রথম দিকে কঠোর অবস্থান নিলেও পরবর্তীতে বিপদ বিবেচনায় পিছিয়ে এসে নীরবতা অবলম্বনের পথ বেছে নেয়। সবদিক বিবেচনায় জামায়াত স্বস্তির ভাব দেখালেও ভেতরে তারা খুব অস্বস্তিতে আছে। কারণ, আসন্ন ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত আওয়ামী ভোটকে টার্গেট করে এগুলেও আলিম-সমাজের বিরোধিতার বিষয় নিয়ে শঙ্কা অনেক। তবে এ বিষয়টিকে বিএনপি তাদের পক্ষে সুযোগ হিসাবে দেখছে। এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ কোন দিককে বেছে নেবে? জাতীয়ভাবে জরিফে দেখা যাচ্ছে ভোটের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার যেখানে তরুণদের সংখ্যাই বেশি।  এরা মূলত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচনের এক মাস পূর্বের সময়টিতে। তখনই নির্বাচনী খেলা জমে উঠবে। মনে রাখতে হবে, আগামী জানুয়ারীর মধ্যেই কওমী মাদরাসাগুলোর বার্ষিক সম্মেলন প্রায় শেষ হয়ে যাবে। দেশব্যাপী এ মাহফিলগুলো আগামী নির্বাচনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদানে যে পরিণত হবেতাতে কোন সন্দেহ নেই।  ফটিকছড়িরও তার বাইরে যাবে না। এখানে জামায়াত যদি মাথা গরম করে কিছু করে বা বলে বসে তবে হিতে বিপরীত হবার কোন বিকল্প থাকবে না। তাই জামায়াতের চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনীতির মাঠে নয়, কওমী আলিম-সমাজের পক্ষ থেকেও। যতোদিন জামায়াত বিষয়টিতে সমাধানে না আসবে ততোদিন এ বিপদ দূর হবে বলে মনে হয় না।  

জামায়াতের আরেক বিপদের কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের তরুণকর্মীদের কাছে টানার কৌশল। যেহেতু তারা বিগত সতের বছরে সরকারের পক্ষ হয়ে ভোটকেন্দ্র দখল, রাতের ভোট, দলীয় সংঘর্ষ ইত্যাদিতে অংশ গ্রহণ করে এসেছে, তাই এরা স্বেচ্ছায় বা দলীয় নির্দেশে ভোটকেন্দ্রগুলোতে অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটালে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে জামায়াতকেই। নির্বাচন কমিশন তো ঘোষণা করে দিয়েছে, কোন একটি কেন্দ্রে গণ্ডগোল হলে পুরো আসনের ভোট বাতিল করতে পারে কমিশন। তেমন কিছু জামায়াতের তরফে ঘটলে কিন্তু সর্বনাশ হবে। তাই ফটিকছড়িতে যেহেতু এখন আওয়ামী লীগ নেই, জামায়াত এ শূণ্যতার সুযোগে যতোই অতিরিক্ত সক্রিয় হবে ভোট কেন্দ্রগুলোর ঝুঁকি ততোই বাড়বে। এক-ই যুক্তি বিএনপির বেলায়ও খাটেবিএনপি যদি জামায়াতকে চাপে রাখতে শক্তি দেখাতে চায় তবে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কা থাকবেই।  এ ধরনের ঘটনায় বিএনপি জড়িত হলে তাদেরও সমূহ ক্ষতি হবে। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচন পতিত সরকারের দোসররা চাইবে না। গণ্ডগোল হবে তাদের আরাধ্য। তাই ফটিকছড়ির নির্বাচনী মাঠকে নিরাপদ রাখতে রাজনীতিক দলগুলোকে প্রশাসনের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।  

12.10.2025