মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৭৮
রাজনীতি শুরু হয় নীতির আশ্রয়ে। বনী আদম যেমন অভিভাবকের আশ্রয়ে বড় হয়, ধীরেধীরে আরও বড় হয়; একদিন অভিভাবকের আশ্রয় থেকে দূরে সরে যায়, বুঝে নেয় নিজের চলার গতি ও গন্তব্য। তেমনি রাজনীতিও নীতির আশ্রয়ে বড় হয়ে মহাসড়কে পা রেখে নীতির অভিভাবকত্ব থেকে দূরে সরে যায়। ক্রমান্বয়ে নীতি হয়ে যায় তার কাছে অপরিচিত; আগান্তুক। যারা এটাকে মানতে নারায তারা রাজনীতির মাঠে অযোগ্য, অপদার্থ। এক সময় নীতির কদর ছিলো; রাজনীতি ছিলো মানুষের জন্য; রাজনীতিবিদরা কাজ করতেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য; জুলুমের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে উদ্ধারের জন্য। এখন রাজনীতি উদ্ধারের জন্য নয়, গদির জন্য, নিজেদের ঝুলি ভরাবার জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে অভিজ্ঞতা এমনই। যে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আগে গণমানুষের বন্ধু হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনিই দেশের গদি পেয়ে জালিমের অনেক রেকর্ডই ভঙ্গ করেন। এরপর শুরু হলো রাজনীতির এক নতুন মাত্রা—‘ইসলামী রাজনীতি’। বিশেষ করে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.’র ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর আমাদের ইসলামী রাজনীতির দিক-প্রবাহ বদলে যেতে থাকলো ভিন্ন দিকে। নীতির আশ্রয় থেকে বেরিয়ে নিজেকে রাজা হিসাবে দেখার খাহেশ জাগলো আমাদের ইসলামী রাজনীতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে। শুরু হলো পথচলা। চলতে-চলতে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বারপ্রান্তে আমরা। নীতির গলায় ছুরি দিয়ে কওমীরা ভাগ হয়ে গেলেন দু’ভাগে। জামায়াত হয়ে গেলো প্রতিপক্ষ বিএনপি’র মতো সেক্যুলার। তাদের ইশতিহারীয় বিবর্তনবাদ পরখ করলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় ‘মানুষ আসলেই বানর থেকে জন্মেছে’। জামায়াত কিভাবে নীতির কথা বলতে-বলতে নীতির কাছেই অপরিচিত হয়ে উঠলো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘২৬’র ইশতিহার। ৮০’র দশকে যারা ‘বিপ্লব-বিপ্লব! ইসলামী বিপ্লব!’-র গগনবিদারী ধ্বনিতে হাট-মাঠ গুলযার করে তুলতো তাদের কাছে এখন আর ইসলামী বিপ্লবের স্বাদ ভালো লাগে না। এক সময় তারা ইরানের শিয়া-বিপ্লবের মডেলেও কাজ করতে চেয়েছিলো। এখন মার্কিন-মডেলের বিপ্লবের সুবাসে(!) তারা মাতোয়ারা। পশ্চিমাদের মনোরঞ্জন যেন অগ্রাধিকার। ওদের গাড়িতে বাকি যারা উঠেছে তাদের অবস্থাও ভাড়াবিহীন যাত্রীর মতো। মুখে স্বস্তি মনে অস্বস্তি। শুরুটা হয়েছিলো ইসলামী শক্তির ঐক্যবদ্ধ স্লোগানে। পরে দেখো গেলো, গাড়িতে উঠলো নতুন প্যাসেঞ্জার। তারা কিন্তু ইসলামী নয়। ড্রেসকোডও ভিন্ন। শুরু হলো নতুন-পুরাতন মন কষাকষি। অবশেষে মাঝপথে এক যাত্রীর প্রস্থান। পক্ষ হলো প্রতিপক্ষ। জামায়াত তাদের ‘ইসলামী’ ব্যানারকে সামনে রেখে নিজেদের খলিফা বানালো এক মুর্তিপুজক দেব-খলিফাকে। তবুও তারা ‘ইসলামী’। সঙ্গীরাও মেনে নিলেন নামস্বর্বস্ব ব্যানার। কারণ, এখানে রাজনীতির রাজ।কওমীদের মধ্যে বিভক্ত যে দু’ধারা এখন ভোটের মাঠে বে-লিবাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কেউ বাতিলের সাথে মিশছে; কেউ মুশরিকদের শিরকের জন্য উৎসাহ প্রদান করছে। বাহ, কি চমৎকার! কতো নিষ্ঠুরভাবে হাদীসের ভবিষ্যবাণী সত্যে পরিণত হচ্ছে। অতীতেও রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার হয়েছে। তাঁরা বলছেন রাজনীতিক সমঝোতা। হ্যা, হতে পারে। কিন্তু যে মুসলিহার কথা বলে সমঝোতা হচ্ছে তা কি সীরাতে রসূল (সা.)’র সাথে সমাঞ্জস্যপূর্ণ? সীরাতে সমঝোতা হয়েছিলো ইহুদীদের সাথে কিন্তু নেতৃত্ব ছিলো স্বয়ং রসূল (সা.)’র হাতে এবং লিখিত। এখানে তো নেতৃত্ব বাতিল ও গোমরাহদের হাতে; সমঝোতা লিখিতও নয়। বাতিলের নেতৃত্বে আহলে হকের রাজনীতিক সমঝোতা কি শরীয়া কর্তৃক অনুমোদিত? এ কথা মানতে না চাইলে সরাসরি ঘোষণা করুন: জামায়াত আকীদাগত কারণ সত্ত্বেও আহলে হক ও আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের নেতৃত্বে কোন সমস্যা নেই। ঘোষণাও করবেন না আবার শরীয়ার দৃষ্টিকোণে বৈধ বলে দাবি করবেন—তা তো হয় না। এ ধরণের নৈতিক পরিবর্তন মেনে নেয়া কঠিন।মাস-দু’মাস হবে, দেখলাম, হাটহাজারী কলেজ মাঠে এক সুপরিচিত জ্বালাময়ী বক্তা ও ব্যক্তিত্ব মাঠ কাঁপিয়ে ঘোষণা করছেন: তিনি আগেও হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ডান হাত ছিলেন, মৃত্যু পর্যন্ত থাকবেন। অথচ সেখান থেকে উঠে গিয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জামায়াতের সাথে বৈঠক করে বাম হাত বনে গেলেন। কি আজব মানযার! আরেকজনকে দেখলাম, বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ এক দলের প্রার্থী হয়ে হাটহাজারী মাদরাসার সম্মিলিত শিক্ষকদের এক বৈঠকে বাতিল জামায়াত থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতিতে দোয়া নিচ্ছেন। মাদরাসার সম্মানিত পরিচালকও তাঁর সমর্থনে কথা বলছেন। এরপর দিন কয়েকের মধ্যে দেখলাম সেই প্রার্থী জামায়াতের নেতৃত্বে সমঝোতার অংশ হয়ে গেলেন। এখন বলুন, কি বলা যায়। কেউ রাজনীতির মাঠে যে কারো সাথে যেতে পারেন। কিন্তু একটা বলেকয়ে আরেকটা করবেন কোন যুক্তিতে? যাঁরা সেদিন তার পক্ষে দোয়া করেছেন তাঁদের কি মুখ পুড়লো না জাতির সামনে? এভাবেই রাজনীতির কাছে নীতি পরাজিত হয়। এখানে নীতিকথা খুব একটা মূল্য পায় না। তবে এটাও সত্য যে, দেখা যাবে সেই মানুষগুলো আবার কওমী মঞ্চে ঠিকই সমাদর পাচ্ছে; পাচ্ছে বেকসূরের জ্বলজ্বলে সনদ। অতীতের নমুনা তো তেমনই।
রাজনীতির জন্য নীতির বিষয়ে আপোষকামিতার দু’টি উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। বর্তমান জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতায় আবদ্ধ শরীকদের মধ্যে দু’টি অংশ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত। এক: ’৭৬ সালে গঠিত আইডিএল এবং ’৮০’র দশকের প্রারম্ভে গঠিত আমীরে শরীয়ত হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.’র নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। বলাবাহুল্য, আইডিএল বা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ গঠিত হয় আজকের মতো সকল ইসলামী শক্তির ঐক্যের কথা তুলে ৭(পরবর্তীতে ১১ দল) দলীয় আসন সমঝোতার প্লাটফরমের মতো। সেখানে অবশ্য নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির প্রধান কওমী-জগতের মহান ব্যক্তিত্ব খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ সাহেব রহ.। তা সত্ত্বেও তাঁর মতো দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের এমন সিদ্ধান্তে কওমী-জগতের সবাই একমত হতে পারেননি। ভিন্নমত কাতারে ছিলেন বর্তমান আমীরে হেফাজতের মরহুম পিতা ও জামিয়া বাবুনগরের প্রতিষ্ঠাতা হযরত হারুন বাবুনগরী রহ.। পরবর্তীতে দেখা গেলো জামায়াতের চিরাচরিত নিজস্ব কৌশলীয় রাজনীতির কারণে খতীবে আযম রহ. জামায়াতকে জোট থেকে বহিষ্কার করেন। ততোদিনে ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গেলো। জামায়াতকে বাদ দেয়ার বিষয়ে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে ১৯৭৭ সালের ১০ই অক্টোবর আহুত সাংবাদিক সম্মেলনে খতীবে আযম রহ. বলেন:
‘টিউমার অপারেশন করে বের করে ফেললে স্বাস্থ্য খারাপ হয় না, বরং সুস্থ ও সবল হয়ে উঠে। জামাতিরা আই,ডি,এল-এর মাঝে টিউমারস্বরূপ বিরাজ করছিল, তাদের বহিষ্কারের ফলে আই,ডি,এল নিরুপদ্রপে কাজ করে যেতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।’
হযরত খতীবে আযম রহ. জামায়াতের সাথে বিরোধের ক্ষেত্র সম্পর্কে আরও বলেন:
‘বিশ্বাস ও আকীদার ক্ষেত্রেও বিরোধ রয়েছে। এবং সে মতবিরোধ পূর্বেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে আমরা সে সকল বিরোধকে রাজনীতির ক্ষেত্রে টেনে আনতে চাইনি, তদুপরি আমরা মনে করেছি, একতেলাফ তো মওদূদীর সঙ্গে, এরা জামাতে ইসলামী করেছে বলে তো আর মওদূদী হয়ে যায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তারা নিজেদেরকে মওদূদী মতবাদের সাচ্চা অনুসারী ও প্রচারকার্যে নিয়োজিতরূপে প্রমাণ করেছে।’
ইতিহাসের আরেক অধ্যায় হলো, হযরত হাফেজ্জী হুযূরের খেলাফত আন্দোলন। বর্তমান প্রজন্ম সেই আন্দোলনের বিষয়ে অনেকটাই জানার বাইরে। সে সময়ে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য প্রচেষ্টার জন্য তৎকালীন জামায়াত নেতৃবৃন্দের সাথে হাফেজ্জী হুযূর কয়েকবার বৈঠকে বসেন। কিন্তু জামায়াতের চিরাচরিত হটকারী চরিত্রের কারণে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ হলে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ. ৪৫২ জন গণ্যমান্য আলিমের দস্তখত সম্বলিত ‘সতর্কবাণী’ প্রকাশ করেন। সেখানে জামায়াত ও তাদের হটকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। উক্ত ঐতিহাসিক ঘটনার উত্তরাধিকার হিসাবে একটি অংশ বর্তমানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতার অংশ। তারা সচক্ষে দেখেছেন, শুনেছেন কেন হাফেজ্জী হুযূর রহ. জামায়াত সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করে গেছেন। অবশেষে জামায়াতকে তার আগের চরিত্রে দেখা গেলো বর্তমান আসন সমঝোতায়।
কথাগুলো আমি এ জন্য তুলে ধরলাম যে, রাজনীতির জন্য নীতি বা পূর্বসূরীদের আদর্শ গণ্য নয় এখন। বর্তমান রাজনীতিতে নীতির জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ; পরাজয়ের চিত্রটাই বেশি। কারণ, নীতি ধরে থেকে রাজনীতি করা যায় না বলে মনে করা হয়। জামায়াতের ইসলামকে ছেড়ে মার্কিন এম্বেসিতে গিয়ে নীতি বিসর্জনের যে ঘোষণা সেক্রেটারী জেনারেল জনাব তাহের প্রকাশ্যে দিয়েছেন তা কি আমাদের মানুষগুলোর জন্য আদৌ বোধ জাগাবার নয়? এ প্রশ্ন ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকবে।
10.02.2026


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন