বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭৭ 

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যমান সম্পর্ক নিয়ে কথা উঠেছে। বিষয়টিকে কে রাজনীতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবার কেউ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। ফলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিভিন্ন কথা উঠেছে। এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার। তা হলো, বাস্তবতাকে বাস্তবতা দিয়ে বিচার করতে হবে; আবেগ দিয়ে নয়। যেখানে আলোচ্য বিষয় কোন ব্যক্তি বা দলের আচরণের সাথে জড়িত সেখানে ঐ ব্যক্তি বা দলের দর্শন ও আচরণকেও বিবেচনায় রাখা বাধ্যতামূলক। তাই জামায়াতকে বিচার করতে গেলে অবশ্যই জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদূদী সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গী এবং আচরণকেও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, তিনিই জামায়াতের দর্শন ও রাজনীতির মূলভিত্তি। জামায়াতের সামগ্রিক পথচলায় মাওলানা মওদূদীর ফয়সালাই জামায়াতের প্রধান নীতি। এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা জামায়াতের অনুসরণ করেন তাদের জন্য ইসলামের স্বীকৃত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মৌলনীতি ও মাসাঈল বরণীয় নয় বরঞ্চ মাও.মওদূদী সাহেবের বিবৃত ব্যাখ্যাই জামায়াত অনুসারীদের প্রধান উপজীব্য। জামায়াতের অতীত নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও প্রশিক্ষণ পাঠ্যসূচী দেখলেই তার প্রমাণ মেলে।

বলছিলাম, জামায়াতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে। আগেই বলেছি, জামায়াতকে বিচার করতে গেলে তাদের প্রবক্তা মাও. মওদূদী সাহেবের বিচার-বিশ্লেষণের বিকল্প নেই। বলাবাহুল্য, মাও.মওদূদী সাহেব জন্ম গ্রহণ করেন ১৯০৩ সালে। তার প্রথম গ্রন্থ ‘আল জিহাদ ফিল ইসলাম’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭-২৮ সালে যখন তার বয়স ২৭ বা ২৮ বছর। মনে রাখা দরকার, ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভের সময়টাতে বিশ্বে বামপন্থার উজ্জীবন ঘটে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ সালে খোদ মার্কিন মুল্লুকে আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। কমিউনিস্ট-ব্যবস্থা সে সময় নাস্তিক্যবাদী একটি দর্শন হিসাবেও পরিচিতি পায়। ১৯১৭ সালে লেলিনের নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের গোড়াপত্তন হলে এশিয়া ও ইউরোপব্যাপী এক বিশাল কমিউনিস্ট রাষ্টের জন্ম হয়। বিশ্ব মার্কিন ও সোভিয়েত দুই ব্লকে বিভক্ত হয়। এভাবেই স্নায়ুযুদ্ধ-যুগের শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বলয়কে বৃদ্ধি ও রক্ষা করতে উত্থিত কমিউনিজমের যাত্রাকে প্রতিহত করতে নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়ন করে। তাদের কথায়:

কখনও কখনও আমরা বিদেশীদের প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের এখানে নিয়েতে পারি, যা আমাদের কাঙ্খিত। তারা যখন দেশে ফিরে যাবে তখন গণতন্ত্রের(মার্কিন স্বার্থ) জন্য তাদের অবদান বৃদ্ধি করবে, পাশাপাশি তারা তাদের জনগণের জীবনকে আরও ভালভাবে বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করবে। এতে প্রায়শই আমরা অন্য দেশগুলোকে প্রচুর পরিমাণে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করতে পারি [Sometimes we can bring foreigners to our own country for training which we hope will increase their contribution to democracy when they return home, at the same time that they help us to understand better the life of their people. And very often we supply other countries with large amounts of economic aid.(United States Foreign Policy: Sterile Anti-Communism? By George Lister.)]

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিস্কার বোঝা যায় তারা তাদের আর্থনীতিক অস্ত্রকে বহির্বিশ্বে কমিউনিজম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করার কথা বলেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র সেদিকেই তার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ইতিহাসে দেখা যায়, লেলিন বিপ্লবের পরপরই ভারত উপমহাদেশে কমিউনিজমের উদ্ভব ঘটে। কমরেড মোজাফফর আহমদের ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০-১৯২৯’ গ্রন্থে দেয়া তথ্য সে-কথারই প্রমাণ। মোটকথা, ঊনিশ শতকের শুরুতে ভারত উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের শুরু হলেও তিরিশ-চল্লিশের দশকে তা যৌবনত্ব লাভ করে। সে আন্দোলনকে ঘিরে ভারতেও শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তৎপরতা। লক্ষ্য হয় মার্কিন ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ভারতে চলমান বৃটিশ উপনিবেশবাদের কারণে তাতে যুক্ত হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উপাদান। সব মিলিয়ে ভারতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক বিস্তৃত স্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়। উল্লেখ করতে হয়, সেদিনকার কমিউনিস্ট আন্দোলনে মুসলিম যুবক ও ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশও অংশগ্রহণ করে। এতে শঙ্কিত হয়ে পড়ে ইঙ্গো-মার্কিন ব্লক। পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রহণ করা হয় বিভিন্ন প্রচেষ্টা। তারই ফলশ্রুতিতে মাঠে নামানো হয় এমনসব লেখকদের যারা কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রতিহতে ও মুসলিম যুবকদের কমিউনিস্ট আন্দোলনে অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করবে। তারই অন্যতম উদাহরণ মাও.আবুল আলা মওদূদী।

মাও.মওদূদী সরাসরি আমেরিকা থেকে অর্থ নিয়েছেনএমন প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু পাকিস্তান ও লন্ডন থেকে প্রচারিত দু’টো অনলাইন পোর্টাল একটি চাঞ্চল্যকর লেখা প্রকাশ করে ২০২৩ সালে। একটি হলো humsub.com.pk অপরটি হলো ‘হাফতা রোযাহ্ ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন’। এর একটি ঐ বছরের ১লা মে এবং অপরটি ৭ই মে। অভিন্ন খবর দু’টিতে বলা হয়, মাও. মওদূদীকে মূলত মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা সিআইএ অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করে। তবে তা সরাসরি নয়, তৎকালীন সৌদি রাজ-পরিবারের মাধ্যমে। খুব সম্ভবত মাও. মওদূদী সাহেব বিষয়টি না জেনেও থাকতে পারেন। কারণ, তার যোগাযোগ ছিলো সৌদি রাজ-পরিবারের সাথে। রিপোর্টে বলা হয়:

مولانا مودودی نادانستہ طور پر سی آئی اے کے بالواسطہ سہولت کار تھے،  انہیں سعودی عربیہ کے ذریعے کمیونزم کے خلاف اسلامی مزاحمت کو آگے بڑھانے کے لیے رکھا گیا تھا۔ یہاں تک کہ اسے شاید معلوم نہ ہو کہ اسے سی آئی اے نے استعمال کیا تھا۔ مولانا مودودی کو امریکیوں نے سعودی عرب کے ذریعے لامحدود رقم ادا کی تھی۔ اسے پھنسانے کے لیے، اس کے لیے انہوں نے شاہ فیصل ایوارڈ جیسا نیا ایوارڈ تخلیق کیا یہاں تک کہ سی آئی اے کے ایک اہلکار نے اپنی یادداشتوں میں دعویٰ کیا ہے کہ وہ سودی عرب کے ذریعے مولانا مودودی کی ہزاروں کتابیں خریدتے تھے اور ان تمام کتابوں کو بحیرہ عرب میں پھینک دیتے تھے۔

(মাওলানা মওদুদী অজ্ঞাতে সিআইএ-এর একজন পরোক্ষ সহায়তাকারী ছিলেনকমিউনিজমের বিরুদ্ধে ইসলামী প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সৌদি আরব তাকে নিয়োগ করেছিল। তিনি হয়তো জানেনও না যে সিআইএ তাকে ব্যবহার করছে। সৌদি আরবের মাধ্যমে আমেরিকানরা মাওলানা মওদুদীকে সীমাহীন অর্থ প্রদান করে। তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য তারা বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ডে’র মতো একটি নতুন পুরস্কারের ব্যবস্থা করে। একজন সিআইএ কর্মকর্তা তার স্মৃতিকথায় দাবি করেছেন যে, তিনি সৌদি আরবের মাধ্যমে মাওলানা মওদুদীর হাজার-হাজার বই কিনে এবং এই সমস্ত বৃহত্তর আরবে ছড়িয়ে দিতেন)

খবরে আরও বলা হয়:

ہندوستان نہرو کے ساتھ سوشلسٹ آئیڈیلزم کے ساتھ غیر وابستہ تحریک کا رکن تھا۔ مولانا مودودی کیپٹل ازم اور کمیونزم کی سپرمیسی جنگ کے درمیان محض ایک پیادہ تھا

(ভারত নেহেরুর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক আদর্শবাদের সাথে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য ছিল। মাওলানা মওদুদী ছিলেন পুঁজিবাদ এবং সাম্যবাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের মধ্যে কেবল একটি গুটি।)

নবগঠিত পাকিস্তানে মাও.মওদূদী সাহেবের ভূমিকা নিয়ে বলা হচ্ছে:

اس نے کبھی پاکستانی جاگیرداری کی برائیوں کے بارے میں بات نہیں کی بلکہ اس کا قریبی حلقہ بدنام پاکستانی جاگیرداروں پر مشتمل تھا۔ اس نے ملحد کمیونسٹ طاقتوں کے خلاف عالمی جہاد کے بارے میں بات کی، اور یہ خیال بالواسطہ طور پر سوویت یونین کے خلاف امریکہ کی حمایت اور فائدہ پہنچا رہا تھا۔

(তিনি কখনও পাকিস্তানী সামন্ততন্ত্রের(জমিদারী) কুফল নিয়ে কথা বলেননি বরঞ্চ তার আশেপাশের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ ছিলো কুখ্যাত পাকিস্তানী জমিদারে ভরা । তিনি নাস্তিক কমিউনিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জিহাদের কথা বলে যা পরোক্ষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন এবং সহায়তারে)

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মাও.মওদূদীর ভূমিকা নিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে:

جب بنگالی مسلمان پاکستانی اسٹیبلشمنٹ کی سفاکیت کے خلاف اپنی آزادی کی جنگ لڑ رہے تھے تو مولانا مودودی نے البدر الشمس کو نیم فوجی ملیشیا بنا کر بے گناہ بنگالیوں کے قتل عام میں بھی حصہ لیا۔ درحقیقت مولانا مودودی صاحب کو بنگالیوں کے حقوق کے لیے بولنا چاہیے تھا اور ان کے ساتھ کھڑے ہونا چاہیے تھا۔ اسے بنگالیوں کے ساتھ ہمدردی رکھنی چاہیے اور ان کے زخموں پر مرہم لگا کر بغاوت کو ٹھنڈا کرنا چاہیے، بجائے اس کے کہ وہ البدر جیسی قاتل ملیشیا بنا سکے۔ مختصراً یہ کہ جماعت اسلامی ہمیشہ تاریخ کے غلط رخ پر کھڑی رہی ہے۔ مولانا مودودی الاعلیٰ اور آرمی اسٹیبلشمنٹ نے پاکستان کو جو نقصان پہنچایا ہے وہ کبھی پورا نہیں ہو سکتا۔

(যখন বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তানী শাসনযন্ত্রের বর্বরতার বিরুদ্ধে তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিল তখন মাওলানা মওদূদীও আল-বদর, আশ-শামস আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে নিরীহ বাঙালীদের গণহত্যায় অংশগ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে, মাওলানা মওদূদী সাহেবের উচিত ছিল বাঙালীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো। আল-বদরের মতো খুনি বাহিনী গঠনের পরিবর্তে তাঁর বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের ক্ষত প্রশমিত করা উচিত ছিল। জামায়াতে ইসলামী সর্বদা ইতিহাসের ভুল দিকে ছিল। মাওলানা মওদুদী এবং সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তা কখনই পূরণ করা যাবে না।)

মাও. মওদূদী সাহেবের সাথে মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা সিআইএ’র সম্পর্ক নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ১৯৫৩ সালে সংঘটিত খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনের মামলার নথি থেকে। বিষয়গুলো উঠে আসে খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনের সে সময়কার এক কারাভোগী মুজাহিদ চৌধুরী গোলাম নবীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্বলিত ‘তাহরীকে কাশ্মীর সে তাহরীকে খতমে নবুওয়াত তক’(تحریک کشمیر سے تحریک ختم نبوت تک) গ্রন্থে। উল্লেখ্য, জনাব নবী দীর্ঘ সময় পর্যন্ত করাচির জেলে বন্দী ছিলেন। তিনি খতমে নবুওয়াৎ অন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা শাহ আতাউল্লাহ বুখারী রহ.’র একজন ভক্ত ও কাছের মানুষ ছিলেন। সঙ্গতকারণে জনাব গোলাম নবী খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনে বিচারপতি মুনিরের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের জেরা-জবানবন্দীগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ পান। তাঁর সেদিনকার দেখা ঘটনাবলী নিয়েই প্রকাশিত হয় গ্রন্থটি। প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে লাহোর থেকে। বইটির ২০৪, ২০৫, ২২৩ ও ২৫১ পৃষ্ঠায় মাও. মওদূদী সাহেবের সাথে মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থার সম্পর্কের বিষয় ও খতমে নবুওয়াৎসংক্রান্ত জাস্টিস মুনিরের তদন্ত কমিশনে মওদূদী সাহেবের বিতর্কিত জবানবন্দীর উল্লেখ করা হয়। তাঁর গ্রন্থটি নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসাবে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়।

সবাই জানেন, মাও.মওদূদী সাহেব খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, তিনি জাস্টিস মুনিরের তদন্ত কমিশনে তার অংশগ্রহণকে সুকৌশলে অস্বীকারের চেষ্টা করেন। গ্রন্থের ২০৪ থেকে ২০৫ পৃষ্ঠার বিবরণে দেখা যায়, জাস্টিস মুনিরের কমিশনে তাকে প্রশ্ন করা হয়:

-মাওলানা, আপনি কি খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন?

প্রশ্নের জবাবে মাও.মওদূদী সাহেব বললেন, ‘জনাবওয়ালা! আমার অংশগ্রহণটা ছিলো এমন, আমি সড়কের কিনারা দিয়ে যাচ্ছিলাম আর পেছন থেকে ট্রাক চলে আসলো। প্রাণ বাঁচাতে আমি পাশের ক্ষেতে লাফিয়ে পড়লাম, ট্রাকও ক্ষেতে গিয়ে আমার উপর পড়লো। হা, আমার দলের কিছু লোক আন্দোলনে শরীক হয়েছিলো। তাদের মধ্য থেকে আমি দু’জনকে দল থেকে বের করে দিয়েছি।’

গ্রন্থে উল্লেখ করা হচ্ছে: অথচ ঐ জবানবন্দীর আগেই মাও.মওদূদী লাহোর মূচী দারওয়াজা নামক স্থানে অনুষ্ঠিত এক জলসায় সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন,-‘যদি কাদিয়ানী বিষয়ে আপনারা মুসলমানদের দাবি না মানেন তবে ১৯৪৭’র চেয়েও বেশি রক্তক্ষয় হবে।’ তার এ বক্তব্য নিয়ে সিআইডি রিপোর্টে আইজি পুলিস কমিশনকে বলেন: আন্দোলনে মাও.মওদূদী সাহেব যে অংশগ্রহণের কথা অস্বীকার করছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এরপর জাস্টিস মুনির মওদূদী সাহেবকে প্রশ্ন করেন,-‘এটা তো আপনার দেয়া বক্তব্য।’ তখন মওদূদী সাহেব চুপ থেকে যান।

গ্রন্থে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি মুনির কমিশনের জেরা চলাকালীন। খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের কথা হচ্ছিলো। তারা হলেন মাওলানা মাযহার আলী আযহার এবং মাওলানা মারতুযা মেকশ। এক পর্যায়ে মাও.মেকশ মাও.মাযহার সাহেবকে প্রশ্ন করেন,-‘মাওলানা! আপনি কি জানেন নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী মাও.মওদূদী সম্পর্কে আদালতে কি বলেছেন?’ গ্রন্থের লেখক চৌধুরী গোলাম নবী মাঝখান থেকে বলে উঠেন: কী বলেছেন?

মাও.মাযহার সাহেব বলেন,-‘নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী বলেছিলেন,-‘মওদূদীর কাছে আমেরিকা থেকে অর্থ-সাহায্য আসে।’

-জাস্টিস মুনীর প্রশ্ন করেন,-‘আপনার কাছে এর কি কোন প্রমাণ আছে?’

জবাবে নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী আদালতকে বলেন,-‘জনাব! আমি যদি প্রমাণ ফাঁস করে দেই তবে সরকারের অনেক গুপ্ত বিষয় বেরিয়ে যাবে।’

-নাসরুল্লাহ কাদিয়ানীর কথায় জাস্টিস মুনীর নীরব হয়ে গেলেন।

খতমে নবুওয়াৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি বলে মাওলানা মওদূদী সাহেব তদন্ত কমিশনে যে দাবি করেছিলেন তা কিন্তু পরবর্তীতে শাহ আতাউল্লাহ বোখারী রহ.’র প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে। গ্রন্থের ২২৩ পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে: জেল থেকে মুক্ত হবার পর আমীরে শরীয়ত হযরত আতাউল্লাহ বোখারী রহ. ফয়সালাবাদে দেয়া তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বলেন: 

‘ভায়েরা! মওদূদী কিন্তু তাহরীকে খতমে নবুওয়াতে ছিলেন না বলে মিথ্যা দাবি করেছে। শুনে রাখ, সে করাচির জলসায় আমার হাটুর সাথে হাটু লাগিয়ে বসেছিলো। সেখানে সব আলিম-উলামা বসা ছিলেন। এ আন্দোলনে সর্বপ্রথম সরকারকে দাবি মেনে নিতে এক মাসের যে আল্টিমেটাম দেয়া হয় সেখানে প্রথম দস্তখত করেছে মওদূদী। এরপর সকল আলিম-উলামা দস্তখত করেন। এতো বড় ঝুটা, ধোঁকাবাজ, মিথ্যাবাদী আমি আর দেখিনি!’

মাওলানা মওদূদী সাহেবের কাছে সৌদি শাসকদের মাধ্যমে মোর্কিন গোয়েন্দাসংস্থা থেকে যে বিপুল অর্থ-সাহায্য আসতোসে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে গ্রন্থের লেখক চৌধুরী গোলাম নবী আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন ২৫১ পৃষ্ঠায়। তাঁর কথায়:

“তখন শাহ জ্বী (আতাউল্লাহ বোখারী রহ.) জীবিত ছিলেন। মাওলানা মুরতাযা খান মেকশ রহ. দৈনিক নাওয়ায়ে পাকিস্তান প্রকাশ করেছেন। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন খোদ মাও.মেকশ এবং প্রকাশক ও মালিক ছিলেন শাইখুত তাফসীর মাও.আহমদ আলী লাহোরী রহ.। হযরত মেকশ রহ. হযরত শাইখুত তাফসীর রহ.’র সাথে পরামর্শ করে কাদিয়ানী ও মাও.মওদূদী সম্পর্কে দু’টো কলাম লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। পত্রিকায় কয়েকদিন পরে মাও. মেকশ রহ. জাস্টিস মুনীরের আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দীর কথা উল্লেখ করে লিখলেন:

‘কাদিয়ানীদের কাদিয়ানী উকীল স্যার জাফরুল্লাহ কাদিয়ানীর সহকর্মী নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী জাস্টিস মুনীরের সামনে জবানবন্দী দেয়ার সময় বলেছিলেন যে, জামায়াতে ইসলামী আমেরিকা থেকে অর্থ-সাহায্য পায় যার নেতৃত্বে আছেন মাও.মওদূদী। এ বিষয়ে জাস্টিস মুনীরের পক্ষ থেকে প্রমাণ চাওয়া হলে নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী বলেন, যদি আমি প্রমাণ প্রকাশ্যে আনি তবে সরকারের অনেক গোপন বিষয় জানাজানি হয়ে যাবে। তখন জাস্টিস মুনীর নীরব হয়ে যান।”

দৈনিক নাওয়ায়ে পাকিস্তান-এ খবর বের হলে মাওলানা মওদূদী সম্পাদক মাও.মেকশ ও প্রকাশক মাও.আহমদ আলী লাহোরীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। মামলায় বলা হয়: এতে তাদের সম্মানে আঘাত করা হয়েছে। মামলা দায়ের হবার পর মাও.মেকশ রহ. বিষয়টি নিয়ে শাইখুত তাফসীর মাও.আহমদ আলী লাহোরী রহ.’র কাছে যান। মাও. মেকশ বলেন: হযরত, যা সত্য তা তো লিখে দিয়েছি। কথা হলো, মূল অভিযোগ তো করেছে নাসরুল্লাহ কাদিয়ানী। প্রমাণ থাকলে তার কাছেই আছে। কিন্তু তার কাছে তো যাওয়া সম্ভব নয়। এখন তো আদালতে প্রমাণ পেশ করতে হবে। হযরত! দোয়া করুন যেন আমাদের সম্মান বহাল থাকে। জবাবে হযরত লাহোরী রহ. বলেন, ‘আল্লাহর দিকে মনোযোগী হোন। আল্লাহ ভাল করবেন। প্রমাণ যদি একান্তই পাওয়া না যায় তবে সাজা ভোগ করতে হবে আর কি। কোন সমস্যা নেই।’ এদিকে আদালেতে মানহানি মামলার কার্যক্রম শুরু হবার পালা। মাও.মেকশ রহ. বলেন: ‘আমি প্রমাণ হাযির করার ব্যাপারে পেরেশান ছিলাম। মাও.মওদূদী সাহেব যে মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা থেকে অর্থ পানএ বিষয়ে তথ্য দেয়ার জন্য আমি সাধারণ বরাবরে পত্রিকায় আবেদন প্রকাশ করি।’ আবেদন প্রকাশের পর আমি (লেখক চৌধুরী গোলাম নবী) মাও. মুরতাযা আহমদ মেকশ’র অফিসে যাই। সেখানে আরও কয়েকজন কাছের লোকজন বসা ছিলেন। সবার আলোচনা ছিলো মওদূদী সাহেবের অর্থ গ্রহণ নিয়ে। এমন সময়ে এক অপরিচিত মানুষ মাও.মেকশ’র সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তিনি লোকটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাক্ষাৎ করলেন। লোকটি পণ্ডিত নেহেরুর মতো হাতকাটা কোট পরিহিত ছিলেন; ক্লিন শেভকরা ছিলেন। মাও. মেকশ লোকটিকে তাঁর পাশে বসিয়ে কর্মচারিকে বললেন,‘জলদি চা নিয়ে এসো, সাথে নাস্তাও নিয়ে এসো!’

মাও.তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভাই, করাচি কখন এলেন?’ তিনি উত্তরে বললেন,‘আজই এলাম।’ মাও.মেকশ বলে উঠলেন,‘ভাই, আমি এক বিষয় নিয়ে বড় পেরেশানিতে আছি।’ মেহমান জানতে চাইলেন,‘কী পেরেশানী? আমি যদি কিছু করতে পারি, বলুন!’ তখন মাও. মেকশ বলতে লাগলেন,‘আমি খবরের কাগজে লিখেছি, মওদূদীর কাছে আমেরিকা থেকে সাহায্য আসে। উনি আদালতে মাও.আহমদ আলী লাহোরী এবং আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দিয়েছেন। মওদূদীর দাবি, আমরা মিথ্যা কথা ছেপেছি। আমি মার্কিন দূতাবাসে চাকরি করেন। আপনি কি বলতে পারেন মওদূদীর কাছে কিভাবে অর্থ সাহায্য আসে?’

মেহমান একটু হাসলেন, বললেন:

‘মাওলানা সাহেব, আমার কাছে ছোট্ট একটি কথা আছে। এর দ্বারা যদি আপনার কাজ হয় তবে ভালো।’

মাও.মেকশ বলে উঠলেন:

-হ্যা..হ্যা বলুন!

মেহমান বলতে লাগলেন:

‘মাওলানা! আমি একদিন আমার অফিসে রাখা একটি বড় আলমিরা খুলি। দেখলাম, আলমিরার তাকগুলো সব মাওলানা মওদূদী সাহেবের লেখা কিতাবে ভরা। মনেমনে ভাবলাম, এ কি! মাও. মওদূদী তো মুসলিমদের একজন মৌলভী। তার কিতাবের সাথে এসব ইংরেজদের কি লেনাদেনা?

একদিন আমার সাহেব(রাষ্ট্রদূত) শরাব পান করে বেশ খোশ মেজাজে বসেছিলেন। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, ঐ আলমিরাতে মুসলিমদের মৌলভী মওদূদী সাহেবের অনেক কিতাব। ওগুলো দিয়ে আপনারা কি করেন? তিনি এক অট্টহাসি দিয়ে বল্লেন:

‘তুমি একটা নির্বোধ। তুমি আমার সাথে এতদিন থাকলে আর এতোটুকু কথা বুঝলে না?’ তিনি বলতে লাগলেন, মিস্টার! আমরা এসব বই খোদ মওদূদী সাহেবকে দিয়ে লেখাই যেগুলো ইসলামের নামে হবে কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ইসলামী হবে না। এর ফলে মানুষ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকবে না। মনে কর, এগুলোর একটির মূল্য যদি দশ রুপি হয় সেগুলোর জন্য আমরা মওদূদী সাহেবকে পঞ্চাশ রুপি দেই। এভাবে তাকে সাহায্যও করছি আবার আমাদের কাজও হয়ে যাচ্ছে।’

-মাওলানা মেকশ বলে উঠলেন, ‘ব্যাস, এতেই আমাদের কাজ হয়ে যাবে। আমি আমেরিকার রাষ্ট্রদূতকে আদালতে তলব দিয়ে প্রমাণ করবো।’

এদিকে দৈনিক নাওয়ায়ে ওয়াক্ত পত্রিকার লাহোরের সম্পাদক রব্বানী হামিদ নেযামী মাওলানা আহমদ আলী লাহোরী রহ.কে চিঠি দিয়ে জানালেন:

‘মাওলানা! আপনি প্রমাণের জন্য কেন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছেন? আপনি বললে আমেরিকা থেকে মওদূদীর নামে আসা অর্থের চেকের ফটোকপিও আপনার বরাবরে পাঠিয়ে দিতে পারি।’

উক্ত চিঠি জনাব হামিদ নেযামী দৈনিক নাওয়ায়ে পাকিস্তানে ছাপিয়েও দিয়েছিলেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো জানাজানি হয়ে গেলে জামায়াতে ইসলামী তাদের করা মানহানির মামলা প্রত্যাহার করে নেন।

শেষকথা:

অধুনা নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক গড়তে মার্কিন আগ্রহের কথা প্রকাশিত হবার প্রেক্ষিতে অনেকে মনে করেছেন এটি সাম্প্রতিক একটি বিচ্ছিন্ন বিষয়। ব্যাপার আসলে তেমন নয়। এখানে আছে সুদূর অতীতের সম্পর্কের পুনর্মিলনআছে সম্পর্ককে এগিয়ে নেবার বিশেষ কৌশল। এ কৌশলের জন্য জামায়াতকে অনেক ছাড় দিতে হয়েছে। মানুষের কাছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুনতে হচ্ছে, শরীকদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবুও জামায়াত আগামী সংসদে ক্ষমতার মসনদে বসতে আমেরিকাকে সহযোগী হিসাবে পেতে উদ্গ্রীব। সুতরাং রাজনীতির মাঠের একটি প্রচলিত ধারণা‘রাজনীতিতে কোন স্থায়ী শত্রু-মিত্র নেই’ কথাটির সফল বাস্তবায়ন জামায়াত-মার্কিন মুলাকাতের সাম্প্রতিক মানযার।

04.02.2026 

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...