মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৭২
সুদূর বা অদূর অতীতে ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংসদ নির্বাচন নিয়ে এতোটা আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু সম্প্রতি ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংসদের নির্বাচন নিয়ে যা হলো, মনে হলো জাতীয় নির্বাচন বুঝি হয়ে গেলো। আমি রাজনীতিবিদ নই, কোন সংগঠনের শীর্ষপদীও নই। তাই যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া সহজও নয়। তবুও যতোটুকু জানশোনা আছে; দুর্বল মস্তিষ্কে যা ধারণ করি সেটাকেই অবলম্বন করে দু’কথা লিখছি। কেন এমন হলো? কেন ঢাবির নির্বাচন এতো মাত্রা পেলো? কেমন করে দাঁড়িয়ে গেলো এমন ফলাফল? এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন আমার মতো অনেকেই। বিশেষত জুলাই-আগস্ট বিপ্লবপরবর্তী সময়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা থেকে যে নতুন দিনের প্রত্যাশায় জাতি বুক বাঁধলো—সে প্রত্যাশার নিরিখে চমকে উঠলাম ঢাবি’র ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেখে। অবশ্য এমন হবার নিশ্চয়তা না থাকলেও আশঙ্কা ছিলো বিশেষ কিছু কারণে।দীর্ঘ সতের বছরব্যাপী ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির তল্পিবাহক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দখলদারিত্বের যুগটি ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় কলঙ্কিত অধ্যায়। ছাত্র-জনতা ও কওমীদের সমন্বিত বিপ্লবহেতু ফ্যাসিবাদের উৎখাত না হলে আজও আমরা ভারতীয় উপনিবেশে বন্দী হয়ে থাকতাম। তখন আর ঢাকসু, চাকসু, জাকসু ইত্যাদির টুল-বেঞ্চে বসার সুযোগও হতো না। জাতির অনেক কৃতিসন্তানদেরও ঘরে ফেরা হতো না দেশের জন্য কিছু করতে। আজ আমরা স্বাধীন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত। তাই, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবং সর্বাত্মক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে পারলো ঢাকসু-জাকসু’র মতো নির্বাচন। এ কথা মনে রেখেই তুলছি ফলাফলের প্রশ্ন। বলাবাহুল্য, সতের বছরের ফ্যাসিবাদের সময় জাতি উৎকণ্ঠিত হয় অর্জিত অনেক কিছু বিসর্জনের ভয়ে। এ বিসর্জনের ভয় যেমন ছিলো, স্বাধীনতা-অখণ্ডতার; ’৭১-এ বাংলাদেশের অর্জিত ভূমি হারাবার; ভারতীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার; ইসলামী প্রভাব হ্রাসের তেমনি সর্বোপরি জাতি হিসাবে আত্মমর্যাদাশীল ও স্বাধীন সত্ত্বা হারাবার। জাতি বারবার দেখেছে, যখন-ই এ দেশে বিপদের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন না কোন ফয়সালা নেমে আসে। ’৭৫ ও ’২৫ তার স্পষ্ট প্রমাণ। বলা দরকার, ফ্যাসিবাদে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ যখন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকে: এ ফিরাউনের কি পতন হবে না? তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের জনমানুষের স্বীকৃত আশ্রয়স্থল বলে পরিচিত শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাতীয়বাদী দল ক্ষমতামুখী হয়ে গোপনে ভারতের সহানুভুতি অর্জন করার দিকে মনোনিবেশ করে। ভারতের কট্টর সাম্প্রদায়িক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে আমীর খসরু মাহমুদের লজ্জাষ্কর ছবি পুরো জাতিকে লজ্জিত করে তোলে। ভারত সফরে গিয়ে মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শরীয়ত অস্বীকারের ঘোষণায় আমরা স্তম্ভিত হই। দেশের সর্ববৃহৎ দলকে নেতৃত্ব দেয়া একজন শিক্ষিত মানুষ যখন ভারতে গিয়ে ক্ষমতার স্বার্থে নিজের ধর্মকে অস্বীকার করে বক্তব্য দেয় তখন আমাদের আদর্শিক জায়গাটা ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হবার জোগাড়। এটা এমন একটা পরিস্থিতি যখন মানুষ নদীভাঙ্গনের তীব্র হানায় নতুন ভিটার সন্ধানে বের হয়।
ঢাকা ভার্সিটির সাম্প্রতিক নৈর্বাচনিক ফলাফল দেশপ্রেমী শিক্ষার্থীদের মানসে ঠিক তেমনই নতুন ভিটের সন্ধানের মতো এক অভাবনীয় বিবর্তন চলে আসে। সেখানে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের ছাত্র-সংগঠন ছাত্র লীগের অনুপস্থিতি বিএনপি’র ছাত্রদলের জন্য এক মহাসুযোগ হিসাবে দেখা দেয়। এমন কি বড়দের মধ্যেও সে স্বপ্ন গেড়ে বসে। বড়রা ভাবে, হাতের মোয়া বুঝি মুখের কাছেই। তারা ভাবেননি, আবেগের যুগ পেরিয়ে একটি বিপ্লবোত্তর মানসিকতার ধারক হিসাবে সচেতন ছাত্র-সমাজ আদর্শিক জায়গাকে অক্ষত রেখে ব্যালট-বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। এ ছিলো অনেকটা কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ের মতো ঘটনা। কচ্ছপ যে পৌঁছে গেছে সে খবর খরগোশ পেয়েছে সুখনিদ্রা ভাঙ্গার পর। তখন তো আর কিছুই করার ছিলো না। বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অসংখ্য সতর্কতার তোয়াক্কা না করে যেভাবে একগুয়েমি করে জাতি-রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তা ছিলো এক কথায় চরম আত্মঘাতী। তারা ভেবেছিলো, ছাত্ররা আর যাবে কোথায়? এর মোক্ষম জবাব শিক্ষার্থীরা মাঠেই দিয়ে দেখিয়েছে। যে শিবিরকে তারা গণনাতেই রাখেনি, ছাত্র-সমাজ তাদের নিরাপত্তার জায়গা থেকে ছাত্রদলকে এড়িয়ে শিবিরের পাল্লাতে ভোটগুলো রেখে দেয়।তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আদর্শের কারণে বা শিবিরের রাজনীতি পছন্দ করে নয়, তারা ভোট দিয়েছে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশেষ করে, ছাত্রী ভোটাদের বিপুলভাবে শিবিরের বাক্সে রায় দেয়া তরুণ-সমাজের এক নতুন দিককে উম্মোচিত করেছে। সাথেসাথে তারা কিন্তু এও স্পষ্ট করেছে: তাদের এ রায় শিবিরের রাজনীতি ও আদর্শকে পছন্দ করে নয় বরঞ্চ নারী-নিরাপত্তার খাতিরে। এখানে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাই। তা হলো, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দখলদারিত্ব, অনৈতিকতাহেতু নিরাপত্তার অভাব, কুৎসিত দলীয় রাজনীতির দুর্গন্ধ ইত্যাদি থেকে বাঁচার আকুতি, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে যা প্রকটভাবে দেখা দেয়। পাশাপাশি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ধর্মীয় গরজের অনুভব উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা দেয়। বিশেষ করে তাঁদের হিজাব ও পর্দা বিষয়ে সচেতনতা এক ব্যতিক্রমধর্মী দিগন্তকে উম্মোচিত করে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তরুণ ছাত্র-সমাজ ছাত্রদলের মতো কথিত মধ্যপন্থী দলকেও রায় দিতে রাজি হয়নি।
আমার উপরোক্ত বক্তব্যের প্রমাণ হলো, ঢাকসু’র অব্যবহিত পরে জাকসু’র নির্বাচনের ফলাফল। সেখানে কিন্তু অধিকাংশ পদে ছাত্র শিবির সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হলেও ভিপি পদে ছাত্র শিবির জয়ী হতে পারেনি। সেখানে রায় দেয়া হয়ে হয়েছে এক স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদকে যিনি শিবিরের প্রার্থীকে প্রায় হাজার খানিক ভোটে পরাজিত করে ভিপি হয়েছেন। অর্থাৎ, ডাকসুতে যেখানে শিবিরকে এগিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে শিবিরকে পেছনে ফেলে জাকসুতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে এগিয়ে আনা হয়েছে। এটিকে একটি Balance of activity বা সক্রিয়তার ভারসাম্য হিসাবে দেখা যেতে পারে। এখানে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে কিন্তু শিবির। কারণ, শিবির জানে ভার্সিটিগুলোতে তারা যে ভোট পেয়েছে আসলে তাদের সে ভোট বা অনুসারী নেই। এখন তারা যদি নিজেদের সর্বাংশে বিজয়ী মনে করে তাদের সনাতনী রাজনীতিতে মগ্ন হয় বা আদর্শ প্রচার করে তবে দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে এক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। তাই, তাদেরকে উভয়দিক সামলে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখী হতে হবে। হ্যা, তারা যদি কৌশলগতভাবে জামায়াতের প্রভাব এড়িয়ে তাদের আদর্শ বা সনাতনী রাজনীতি পরিহার করে ছাত্র-সমাজের চাওয়া-পাওয়ার সমস্যার সমাধানের দিকে নযর দিতে পারে তবে তারা নিরাপদ থাকতে পারবে বলে মনে হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, এখানে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কাজ করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিক দলগুলো যদি এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পথ চলতে না পারে তা হলে তারা কখনো তাদের সনাতনী গলাবাজি করে রক্ষা পাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব সর্বোপরি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিস্কার করতে না পারলে জাতীয় পর্যায়েও তাদের হোঁচট খেতে হতে পারে। বিশেষত ভারতপন্থী মানসিকতাকে পরিহার করতেই হবে। অন্যথায়, ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কথিত ডানপন্থী বলে পরিচিত বিএনপিকে ছাত্র-সমাজের প্রত্যাখ্যানের নযীর জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। আমি বলছি না, জাতীয় পর্যায়ে জামায়াত জয়ী হবে। কিন্তু জয়ী না হলেও তাদের অর্জিত ভোটের হার তো বাড়তে পারে। এটাকে অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে বিএনপি’র মতো দলগুলোকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবার সুযোগও কিন্তু জনগণ দেবে না। জনগণ হয় তো ‘না’ ভোটে যাবে অন্যথায় ডান-বাম বাদে অন্যকে কাছে টানবে। তবুও ভারতীয় আধিপত্যবাদপ্রশ্নে কোন ছাড় দেবে না। এখন প্রমাণ হয়েছে, তারেক, ফজলু, ফখরুল, আব্বাস, সালাহুদ্দীন, খসরুদের ছাত্র-সমাজ আর চায় না। তারা চায় একদল বাংলাদেশপ্রেমিক সৈনিককে যারা অতীতের কোন দাগ ছাড়াই জাতির আকাঙ্খাকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে।
14.09.2025




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন