সোমবার, ৫ মে, ২০২৫

রক্তাক্ত ৫ই মে হেফাজতের সমাবেশ ও প্রাসঙ্গিক কথা

ভাবনা-৫৭ 

আজ রক্তাক্ত ৫ই মে। বাংলাদেশের একমাত্র অন্তর্নিহিত শক্তির স্মৃতিতে এক অমোচনীয় দিন; অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আজ থেকে ১২ বছর আগে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া এ শতাব্দীর অন্যতম ট্র্যাজেডীকে স্মরণ করতে হচ্ছে বিচারহীনতা, দাবী আদায়ের ব্যর্থতা আর হেফাজত-আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার নিগড়ে। হয়তো কোন-কোন সুহৃদ আমার এ ধরনের মন্তব্যে আহত বোধ করতে পারেন কিন্তু ভেতরে-বাইরের যে দৃশ্য আর সুর দেখেশুনে বারোটি বছর পার করেছি সেসবের সাথে তো অসততা দেখানো যায় না। ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’এ নীতিতে নিজের বিবেককে বন্ধক দেয়ার যে চরিত্র অনুশীলণ করে এসেছি, তা-ই আমার অর্জিত ও রক্ষিত সম্পদ। এখানে আপোস করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।

মে মাসের ৩ তারিখ ঢাকায় মহাসমাবেশ ডাকা হলো। মূল ইস্যু: সরকারের গঠিত নারী সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত প্রস্তাবনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও একাধিক দাবী। হতে পারে; ক্ষুধার্ত মানুষের কি কেবল ভাত দিয়ে হয়? সাথে অনিবারর্য ডাল-নুনও তো লাগে। কিন্তু সংশয়ে পড়লাম, সমাবেশ ৫ তারিখে না হয়ে ৩ তারিখে কেন? এতো বড়ো একটি সমাবেশের আয়োজন; এতো ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর প্রস্তুতি, তারিখের বিষয়টি কি আরও ঘষামাজা করে ঠিক করা যেতো না? আমি অবশ্য জানি না, এর ভেতরে অন্য কোন ফালসাফা রয়েছে কি না। সমাবেশটি ৫ তারিখে হলে তাৎপর্য বাড়তো; বহুদিন পর প্রথম বারের মতো বার্ষিকী পালিত হতো; ৫ই মে’কে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হতো। আম-জনতা অধিকতর সম্পৃক্ত হতো কওমী অঙ্গনের সাথে; সহানুভূতি সৃষ্টি হতো তাঁদের কাতারে। এখানে হেফাজতে ইসলামের দাবীগুলোর মধ্যে একটি দাবী থাকার দরকার ছিলো বলে আমি মনে করি। তা হলে, হেফাজতের আত্মমর্যাদার প্রশ্নটি উহ্য হতো না। দাবীটি হলো: ৫ই মে’কে সরকারীভাবে হেফাজত-দিবস বা শহীদ দিবস বা শাপলা গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা। এতে হেফাজতে ইসলামের জাতীয় ও অন্তর্জাতিক সচেতনতার চিহ্ন বেঁচে থাকতো।

গতকালের মহাসমাবেশের দুটো বিষয় নিয়ে আমি দু’কথা বলতে চাই। এক, এনসিপি’র হাসনাত আব্দুল্লাহ ও দুই, অকুতোভয় সৈনিক, মজলূম সম্পাদক জনাব মাহমুদুর রহমান। সমাবেশে জনাব হাসনাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতি এবং বক্তৃতা প্রদান নিঃসন্দেহে আয়োজকদের একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। সে-সাথে আরও কয়েকজন ডানপন্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনা-কর্মকর্তা ও রাজনীতিক ব্যক্তিত্বকে রাখা গেলে ভালো হতো। হেফাজতের সমমনা অনেকেই আছেন যাঁরা রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম। জনাব হাসনাতের বক্তব্য যথার্থ ছিলো। তিনি যা বলেছেন সচেতনভাবে বলেছেন। হেফাজতের নারী সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাবনা নিয়ে তিনি সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ ও আলোচনার কথা বলেছেন। আমার মনে হয়, হাসনাত আব্দুল্লাহ’র এমন বক্তব্যের পর হেফাজতের উচিৎ সরকারকে আলোচনায় আহ্বান জানানো বা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে লিখিত বক্তব্য হস্তান্তর করা। এতে আমাদের সমমনাদের মাঝে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। অনর্থক বাহ্বা আর হাততালি জোগার করতে আগুন জ্বলবে-ফাগুন জ্বলবে ইত্যাদির বাগাড়ম্বর না করে কৌশলগত অবস্থানকে সুসংহত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব বলে-বলে আমরা এক যুগ তো পার করে এলাম। কৈ, দাবীর করা-কণ্টও তো অর্জিত হয়নি। এবার অন্তত সংযত হওয়া দরকার। হাসনাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতি প্রতিপক্ষদের আঁতে কি পরিমাণ ক্ষতের সৃষ্টি করেছেতা বোঝা যায় বিবিসি বাংলার রিপোর্টে। হাসনাতের সহজ কথায় ওদের যেনো ঘুম হারাম হবার জোগাড়। হাসনাতের উপস্থিতিটাই ওরা সহ্য করতে পারছে না। হাসনাতের সাথে যদি আরও কিছু বিজ্ঞজনকে আনা যেতো তাতে নিঃসন্দেহে বিবিসি বাংলার গায়ে নুনের ছিটা পড়তো। কারণ, এদের ইসলামবিরূপ রক্তমাংস। এই বিবিসি বাংলা কিন্তু সম্পূর্ণ ভারতীয় আধিপত্যবাদের অনুচর। এরা ফ্যাসিবাদের দোসর। সুতরাং একটি অরাজনীতিক সংগঠন হিসাবে হেফাজতে ইসলামের উচিৎ সমাজের বিজ্ঞজনদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা এবং তাঁদেরকে কওমী মাদরাসার মাহফিলে আমন্ত্রিত করা। এতে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি কৌশলগত প্লাটফরমের উদ্ভব হবে।

মহাসমাবেশে জনাব মাহমুদুর রহমানের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গৌরবোজ্জ্বল। মাহমুদুর রহমানকে আনার জন্য অয়োজকবৃন্দ অবশ্যই মুবারকবাদ পেতে পারেন। মাহমুদুর রহমান গতকালের সমাবেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, বিপ্লব-পরবর্তী এতাদিন হয়ে গেলো, এখনো হেফাজতে ইসলাম শাপলার ঘটনার জন্য মামলা করেনি কেন? প্রশ্নটি অবশ্যই মৌল-বিবেচনায় শীর্ষস্থানীয়। এটি হেফাজতে ইসলাম নেতৃবৃন্দের একটি অনিবার্য ব্যর্থতা বা অসচেতনতাকে নির্দেশ করে। এখানে মাহমুদুর রহমানকে একটি বিশেষ পরিচয়ে পরিচয় করে দিতে হয়। মাহমুদুর রহমান মূলত হেফাজতে ইসলামকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করার প্রথম কারিগর। ২০১৩ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত খোলা চিঠির কথা ভুলে যাবার কথা নয়। জানা দরকার, সে-সময় একটি বহুল পরিচিত জাতীয় দৈনিকের আধা পৃষ্ঠা জুড়ে খোলা চিঠি প্রকাশ চাট্টিখানি কথা নয়। যেহেতু চিঠিটি বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়, বোঝা দরকার এর জন্য প্রয়োজন বিশাল আর্থিক ব্যয়। জনাব মাহমুদুর রহমান বিষয়টিতে কেবল আর্থিক বিবেচনাকে প্রাধান্য না দিয়ে ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থে খোলা চিঠি প্রকাশে প্রধান ভূমিকা রাখেন বলে মুফতী হারুন ইজহার আমাকে একান্তে বলেছেন। তা’ছাড়া খোলা চিঠি রচনায় মুফতী হারুন ইজহারের অনবদ্য ভূমিকা ও ত্যাগ ইতিহাসের অপ্রকাশিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। মূলত দৈনিক আমার দেশ-এ আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র খোলা চিঠি প্রকাশের মধ্য দিয়ে হেফাজতের আহ্বান দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই জনাব মাহমুদুর রহমানের আপত্তির জায়গাটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি আন্তরিকতায় ভরপুর। আমি জানি না, বর্তমান হেফাজত নেতৃবৃন্দের কাছে এর কোন জবাব আছে কি না। কারণ, যে হেফাজত নেতৃবৃন্দ আজ অব্দি নিজেদের তত্ত্বাবধানে শাপলার শহীদ ও আহতদের তালিকা করতে পারেননি তারা কি করে মামলা করবেন?সে প্রশ্ন তো অখণ্ডনীয়। এর কি কোন জবাব আছে? সন্দেহ নেই, জনাব মাহমুদুর রহমানের উক্ত আপত্তির বাস্তবতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের সাংগঠনিক দীনতা এবং জাতীর প্রতি দায়বদ্ধতার অনাগ্রহকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় 

আসলে আজ বারো বছর পরেও হেফাজত স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতাকে আলিঙ্গন করতে পারেনি। ২০১৩ সালের শাপলা, ২০২০ সালের মুদিবিরোধী আন্দোলনের ভয়ানক পরিণতি; কোথাও নিজস্ব তদন্ত কমিটি হয়নি। বিশাল আর্থিক দান-অনুদানের নিরপেক্ষ অডিটও হয়নি। নানা ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে প্রচুর। হেফাজত নেতৃবৃন্দ  কোন  কিছুকেই আমলে নেননি। ঘটনা ঘটার পর কেবল আগের কমিটি ভেঙ্গে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই সার। জনাব মাহমুমুর রহমান আজ যে আপত্তির কথা খোলা ময়দানে লক্ষ জনতার সামনে তুলে ধরলেন সেখান থেকে শিক্ষা নেবার সুযোগ হবে কি না জানা নেই। কারণ, অতীতে তেমন ‍কিছু জাতি দেখতে পায়নি।  

পাঠকদের জানা থাকবার কথা, শাপলার পর বছর দুয়েক বাদে গণহত্যার কথা বা বিচারের দাবি হেফাজত যেনো ভুলেই গিয়েছিলো। সমালোচনার মুখে মাঝেমধ্যে ক্ষীণস্বরে দু’এক বার বলে দায় সারানোর চেষ্টা ছিলো দৃষ্টিকটু। ২০১৪ থেকে জাতীয় দৈনিকগুলো ঘেঁটে দেখলে আমার কথার সার বোঝা যাবে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিলো, আহতদের সাহায্য বা দেখভালে প্রচুর অনাগ্রহ ও ব্যর্থতা। হেফাজতের তৎকালীন কয়েকজন দায়িত্বশীল আমাকে বলেছেন, উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে কিছু বলে সুরাহা পাওয়া যেতো না। প্রশ্ন ওঠে: তাহলে দেশ ও বাইরের আগত দান-অনুদানের টাকাটা গেলো কোথায়? কোথায় খরচ হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। শাপলার শহীদদের তালিকা প্রকাশের কথা উঠলে বলা হতো, সব আছে। আওয়ামী সরকার বিদায় নিলে সব প্রকাশ করা হবে। আজ বছর হতে চললো আওয়ামী সরকার বিদায় নিয়েছে। কৈ, তালিকা তো সূর্যের মুখ দেখলো না। এখন আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, হেফাজতের দায়িত্বশীলরা কি করেছিলেন? এ জবাবদিহিতার কি কোন বন্দোবস্ত হবে? তার উপরে কথিত ‘শোকরানা মাহফিল’ আমাদের উপর সওয়ার হয়ে আছে অনস্বীকার্য কলঙ্কের বোঝা হয়ে। ‘কওমী জননী’র জন্মদাতাকে আমরা সংবর্ধিত করেছি। যারা সে মাহফিলের বন্দোবস্ত করেছিলেন তাদের আজও দেখা যায় হেফাজতের সামনের সারিতে। সবকিছু দেখে আমাদের মানতে হবে: যাহা লাউ তাহাই কদু।

আজ ৫ই মে’র বিয়োগান্ত বার্ষিকীতে এসবের নিশ্চিদ্র মূল্যায়ন সময়ের দাবী। হেফাজত নেতৃবৃন্দ যদি ভেবে থাকেন: কেবল কর্মসূচী ঘোষণা করে তাঁদের দায় এড়াবেনতা আমরা মেনে নিতে পারি না। সকল প্রকার সিন্ডিকেটবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অন্যায় কর্মকান্ডের সুস্পষ্ট জবাবদিহিতা এবং মেধাবীদের মাধ্যমে মধ্যপন্থার একটি কৌশলগত সাংগঠনিক অবস্থান নির্দ্ধারণ নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। চোখে ধুলো দিয়ে হেফাজতের অরাজনীতিক সত্ত্বাকে বিসর্জন দেয়ার ষড়যন্ত্রকে আমরা কখনোই গ্রহণ করবো না। আজকের শাপলা দিবসের এই হোক আমাদের  মূল প্রত্যয়। আল্লাহ হাফিয।

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...