বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫

শাপলা কমিশন না হওয়া ও হেফাজতের দায়

ভাবনা-৫৮

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 

২০১৩ সালের মতিঝিলের শাপলা চত্বরের গণহত্যা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে কথা হয়নি কেবল যথার্থ করণীয় নিয়ে আমি দেখেছি, ২০১৩ সালের বছর দুয়েক পার না হতেই হেফাজত নেতৃবৃন্দগণহত্যাএবং গণগত্যার বিচারের দাবি থেকে দৃশ্যত সরে আসেন তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে এসব নিয়ে খুব একটা জোর নযরে আসেনি আমি তখন খবর নিয়ে জেনেছি, তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাথে সম্পর্ক মেরামতের কৌশলে এবং সরকারের আবদারে হেফাজত নেতৃত্বের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট গণহত্যা তার বিচারের দাবিকে অন্তরালে নিয়ে যায় আমার দাবির প্রমাণ পাওয়া যাবে শাপলা গণহত্যার বছর দুয়েক পরের জাতীয় দৈনিকগুলো ঘেঁটে দেখলে ২০১৮ সালের কলঙ্কিত শোকরানা মাহফিল তার স্পষ্ট দলিল সেখানে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তৎকালীন সামরিক সচিবের কণ্ঠে শাপলার ঘটনায় যখন কোন গুলি খরচ হয়নি; কেউ মারাও যায়নি ইত্যকার লোমহর্ষক মিথ্যা বয়ান দেয়া হচ্ছিলো, উপস্থিত হেফাজত নেতৃবৃন্দের কেউই টু-শব্দটিও করেননি সেটাই ছিলো হেফাজতে ইসলামের নৈতিক পরাজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ যা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বরঞ্চ উক্ত মাহফিলে এক দরবারী মোল্লা কর্তৃক শেখ হাসিনাকেকওমী জননীখেতাব দেয়ার পর তাকে হেফাজতের দুর্গে শরমনাক অভ্যর্থনাও দেয়া হয় সেদিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তারা আশা করি সে স্মৃতি ভুলে যাননিশাপলার মৌলিক দাবির প্রতি হেফাজতে ইসলামের অবজ্ঞার রেশ এখনো যে নেই, তা নয় তার এক নতুন সংস্করণ দেখতে পাই আগস্ট বিপ্লবের পর

আমি আমার বিভিন্ন লেখায় ২০১৬ সাল থেকে বলে আসছি, হেফাজতে ইসলাম ধীরেধীরে তার লক্ষ্য থেকে সরছে হেফাজতের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেটের কিছু সুবিধাবাদী চরিত্র আমার বক্তব্য নিয়ে তৎকালীন মহাসচিব পরবর্তীতে আমীর হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.কে ভুল বুঝায় সে খবর আমি যথাসময়ে পাই কিন্তু আমি আমার বক্তব্যের সততা নিয়ে কোন দ্বিধায় ছিলাম না বিধায় তোয়াজ করে কারও পদমর্দনে যাইনি আমার দৃঢ় আকীদা ছিলো: ব্যক্তির চেয়ে হেফাজত বড় হযরতের খাদিম মাও.এনাম বিষয়ে কিছু জানতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস কিভাবে হেফাজতে ইসলাম তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে এসেছে, সে বিষয়ে বলছি ২০১৩ সালের গণহত্যা হলো কিন্তু হেফাজতে ইসলামের মতো একটি জাতীয় প্রভাবশালী সংগঠনের নিজস্ব কোন তদন্ত কমিটি হয়নি কথা ছিলো, ঢাকা অবরোধ হবে; কর্মী-সমর্থকদেরকেও তাই জানানো হয়েছিলো কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আবরোধকে পরিরব্তন করা হলো জমায়েতেকথা ছিলো, অবরোধ শেষ করে সবাই ফিরে আসবে কিন্তু অর্ধবেলায় মতিঝিলে সবাইকে ঢোকানো হলো কিভাবে পরিবর্তন এলো? কোন্ কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নিলো? যে সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি গণহত্যার পথ প্রশস্ত হলোসে সিদ্ধান্ত কারা নিলো? হেফাজতের ভেতর থেকে কারা সেদিন সেনা গোয়েন্দাসংস্থার সাথে যোগোযোগ করে নেতৃবৃন্দের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করেছিলো? কারা সেদিন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সরকার পতনের ছক কষেছিলো? কারা সেদিন শহীদদের রক্তকে পুঁজি করে গোপনে কিছু রাজনীতিক দলের সাথে আঁতাত করে বস্তাভর্তি টাকা গুনতে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলো? কারা সেদিন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.কে না জানিয়ে কল্পিত রেজুলুশান তৈরি করে অবরোধকে শাপলা জমায়েতে রূপ দিয়েছিলো? কারা আমীরে হেফাজতকে রাতে শাপলায় আসতে না দেয়ার ছক কষেছিলো? কারা সেদিন মঞ্চে উগ্র বক্তব্য দিয়ে পরদিন বিদেশের ফ্লাইট ধরেছিলেন? এসব প্রশ্নের কি কোন উত্তর পাওয়া গেছে? কেন পাওয়া যায়নি? কারণ, হেফাজত নিজস্ব কোন তদন্ত করেনি এটাই হেফাজতের বৃহৎ ব্যর্থতা শুধু ব্যর্থতা বলবো না, বলবো সিন্ডিকেটের দুরভীসন্ধিও হেফাজতের ব্যর্থতার পেছনে আওয়ামী সরকারের কোন যোগসাজশ ছিলো কি না জানা নেই কিন্তু সন্দেহ আছে

২০২০ সালের মুদিবিরোধী আন্দোলনের কথাই ধরা যাক এতোগুলো মানুষকে অন্যায়ভাবে মারা হলো; জেলে পুরা হলো, কৈ কোন তদন্ত কমিটি কি হয়েছিলো? ঘটনার আসল কারণ জানতে কোন চেষ্টা হয়নি কেন? এতো বড়ো ঘটনার পর রিসোর্ট কেলেঙ্কারী হলো, কৈ, তদন্ত কি হয়েছিলো? কিছুই হয়নি ফলে সামনে আসেনি এমন দুটো মর্মান্তিক ঘটনার রহস্য উদঘাটন আগস্ট বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতন হলো আমরা ভেবেছিলাম, এবার শাপলার শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত হবে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মতো শাপলার একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন হবে কিন্তু কি দেখলাম? বিপ্লবে আহত-নিহত সাধারণ ছাত্রদের তালিকা প্রকাশিত হলো কিন্তু শাপলার শহীদদের তালিকা প্রকাশিত হলো না বেশ পরে অবশ্য আংশিক তালিকা পেলাম এখনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা আসেনি তাহলে কি দাঁড়ালো? প্রশ্ন উঠলো: ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নেতারা কি করলেন? কেবলই মঞ্চ গরম করার কসরৎ? কেন হেফাজত কমিশন গঠনের কোন দাবি তুলতে পারেনি? এর কি কোন জবাব আছে? বিপ্লেবের কতোদিন পর হেফাজতের মামলা হলো? আসলে হেফাজত আগের মতোই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে তারা যতোই অস্বীকার করুক হেফাজত এখনও সিন্ডিকেটের দখলে ওদের সাথে বাইরের হট লাইন একটি স্বঘোষিত অরাজনীতিক সংগঠন হবার পরও হেফাজতে সিন্ডিকেট সক্রিয় কখনো জামায়াতের সাথে ঐক্য গড়ার লাইনে আবার কখনো বিএনপি সাথে সম্পর্ক গড়ার অভিপ্রায়ে তাইতো এক নেতা বলেন: ৩০শে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হেফাজতও চায় এই হলো হেফাজতের অরাজনীতিক চরিত্র

শাপলার কমিশন হলে আজ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতো বেরিয়ে আসতো অনেক রহেস্যের খেলা ইদানিং বিভিন্ন আলোচকের কাছে শুনতে পাচ্ছি, শাপলার ঘটনায় বিএনপি মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস এবং আমীর খসরু মাহমূদের ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথে যোগসাজশ ছিলো তারাও ইন্ধন যুগিয়েছেন বিষয়গুলোর তদন্ত হওয়া দরকার তদন্ত কমিশন হলে এগুলোর সত্যাসত্য আমরা জানতে পারতাম এখনো সময় আছে, আমার মনে হয়, অতিশীঘ্র তদন্ত কমিশনের দাবি তুলে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করা উচিৎ অন্যথায় হেফাজতে ইসলাম জাতি ইতিহাসের কাছে তার দায় এড়াতে পারবে না

26.06.2025        

 

  

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...