ভাবনা-৫১
৫ই আগস্টের পর থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিবৃতি সামনে আসছে। অতীতে আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র আমলে আমীরের বিবৃতি নিয়ে বিতর্ক উঠেছিলো। পত্রিকা অফিসে প্রকাশের জন্য হেফাজতের অফিসিয়াল প্যাডে যেসব বিবৃতি পাঠানো হতো সেগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে খোদ আমীর কতোটুকু জানেন, তা ছিলো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। এমনও হতো, আমীর জানতেনই না তাঁর নামে কোন বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। পরে বিতর্ক হলে দেখা যেতো দায়িত্বশীলদের কেউ না কেউ আমীরের নামে বিবৃতি ছেড়ে দিয়েছে যা সম্পর্কে তিনি জানেন না। ইদানিংকালের হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নামে কিছু বিবৃতি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ, সেগুলোতে এক ধরনের রাজনীতিকরণের চিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে। বলাবাহুল্য, হেফাজত প্রতিষ্ঠা থেকে একটি অরাজনীতিক। কিন্তু প্রথম থেকেই হেফাজতে ইসলামের আমীর ও মহাসচিব বাদে বাকিদের অধিকাংশ ছিলেন রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ। ফলে, একটি অরাজনীতিক সংগঠনের রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ কখনো বিতর্কের ক্ষেত্র পেরুতে পারেননি। ২০২০ সালের হাটহাজারী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হেফাজতের কাউন্সিল নির্বাচনের পর দেখা গেলো, জমিয়তে ইসলাম থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন ৩৬ জন এর খেলাফত মজলিসের নির্বাচিত হন ১৭/১৮ জন। এ জন্য কাউন্সিলপূর্ব লবিং ও তদবীরের খবরও জানাজানি হয়। অরাজনীতিক হেফাজতের মধ্যে এমন মেরুকরণ কখনো প্রত্যাশিত ছিলো না। এতে বোঝা যায়, হেফাজতের অভ্যন্তরে রাজনীতির প্রভাব কতোটুকু ছিলো। এসব কারণে হেফাজত বিতর্কিত হয়েছে বারবার। হেফাজতের গৃহীত সিদ্ধান্তাবলীতে রাজনীতির রঙটাই চোখে পড়েছে বেশি। ২০১৩ সালের ১৩ই মে’র ঘটনার পেছনে রাজনীতিক উপাদান ছিলো যথেষ্ট পরিমাণে। ২০২১ সালে মুদিবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনীতিক উপাদান কাজ করেছে বেশি।
এখনো হেফাজত সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। একটি বিশেষ রাজনীতিক সিন্ডিকেট যেমন আল্লামা আহমদ শফী রহ. ও হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র আমলে তাদের আধিপত্য বিস্তার ও নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলো তেমনি এখনো তারা বর্তমান আমীর হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অন্ধকারে রেখে বিভিন্ন স্বার্থ বাস্তবায়নে সচেষ্ট আছে বলে একটি সূত্র আমাকে জানিয়েছে। এর একটি গুরুতর দিক হলো, বর্তমান আমীরের বিবৃতি। সূত্র আমাকে জানাচ্ছে, হযরতের পক্ষ থেকে যেসব বিবৃতি পত্রিকা অফিসে যাচ্ছে বা প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে হযরত বাবুনগরীকে খুব একটা জানানো হয় না। সূত্র জানায়, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচীতে হেফাজত আমীরের সংহতি জানানোর যে বিবৃতি সামনে আসে তাও প্রকৃতার্থে হেফাজত আমীর জানতেন না। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন গোয়েন্দাসংস্থা দৌড়ঝাঁপ করলেও ছাত্র্রদের বিপ্লব সফল হওয়ায় আর সামনে এগোয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, এসব হচ্ছে কি করে? সূত্র জানায়, হেফাজতের পুরনো সিন্ডিকেটের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যিনি এখনো একটি উচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, হেফাজত আমীরের বিবৃতিগুলো তৈরি করছেন যার কিছু অংশ কালেভদ্রে আমীরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জানানো হয় না। জানা গেছে, হেফাজত আমীরের পূর্বের কিছু প্যাডে দেওয়া বিবৃতির কপিকে এডিট করে নতুন বিবৃতি ছাড়া হয় যেখানে আমীরের দস্তখত ও সীলমোহর কপি করে বসিয়ে দেওয়া হয়।
যেহেতু হেফাজতের ভেতর থেকে আমাকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে জানানো হয়েছে তাই আমার বিবেচনায় কঠোর তদন্তের প্রয়োজন। বিশেষত হেফাজত আমীরের মতো একজন জাতীয় নেতার পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতির খসড়া তৈরির জন্য একটি রাজনীতিসংশ্লিষ্টতামুক্ত তিন জন বিশিষ্ট একটি কমিটি থাকা এবং প্রকাশের পূর্বে হযরতকে (বয়োবৃদ্ধতার কারণে) পড়ে শোনানোর বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। তা না হলে, অন্যপক্ষ থেকে আমীরের বিবৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। এতে প্রশাসন ও জাতি বিভ্রান্ত হতে পারে। তা’ছাড়া এ ধরনের তৎপরতা স্পষ্ট প্রতারণা(من غشّ فليس مني) যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আশা করি, বিষয়টি সর্বমহলে বিবেচনায় নেয়া হবে।
রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
হেফাজত আমীরের বিবৃতি ও আতঙ্কিত মেকানিজম
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
ভেতরের পাতা
Featured Post
মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়
মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭ সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন