ভাবনা-৫২
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সাথে দেশের ইসলামী দলগুলোর ঐক্য নিয়ে কথা ওঠে কালেভদ্রে। আবার স্বাভাবিক নিয়মে মিলিয়েও যায়। কখনো স্থায়ী হতে দেখিনি। এর মূল-কারণ কওমীভিত্তিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান এবং জামায়াতের রাজনীতির নিজস্ব ভাবধারা ও কৌশল। জামায়াতের সাথে কওমী দলগুলোর আকীদা ও দৃষ্টিভঙ্গীগত মতপার্থক্যকে একপাশে সরিয়ে রেখে রাজনীতির দিক থেকেও জামায়াতকে নিয়ে অস্বস্তি দৃশ্যমান। এ কেবল কওমীভিত্তিক দলগুলোর বিষয় নয়, প্রথাগত রাজনীতিক দলগুলোরও এক-ই অবস্থা। এখানে বিএনপি’র কথা সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। যা হোক, কওমী দলগুলোর জামায়াতনীতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তা বহুলাংশে ধর্মীয়। ধর্মীয় দিক থেকে দূরে এসে রাজনীতিক ও সামাজিক নীতির কোন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো চোখে পড়েনি। এটি কওমীদের কৌশলগত দুর্বলতা বললে ভুল হবে না। কারণ, একজন মানুষ জামায়াত সম্পর্কে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করবে—এমন ধারণা নির্ভরযোগ্য নয়। তার রাজনীতিক বা সামাজিক ধারণা নিয়েও তৃষ্ণা থাকতে পারে। সেখানে সমাধান কি? দেখা যায়, বর্তমান কওমীভিত্তিক দলগুলো এখানে যথেষ্ট দুর্বল। এ দুর্বলতার সুযোগ জামায়াত বা অন্য যে কোন দল সহজে নিতে পারে। আমার জানামতে এখানে কওমীরা তেমন কাজ করেনি। শুধু এখানে নয়, ধর্মীয় যেসব দিক নিয়ে কওমীরা জামায়াতকে বিবেচনা করেন সেসবেও বর্তমান কওমীরা খুব যে জ্ঞান রাখেন, তা নয়। ফলে বর্তমানে জামায়াতের সামগ্রিক বাহাসে তাঁরা অস্বস্তি বোধ করেন অথবা অজ্ঞতাপ্রসূত তাদের পক্ষাবলম্বন করেন। অথচ নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমরা দেখেছি, কওমীদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মোটামুটি ভালো পড়াশোনা ছিলো। ১৯৮৫ সালের ১০ই ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় যে হামলার ঘটনা ঘটে তার পরবর্তী সময়ে কওমীদের জামায়াত-নীতি ছিলো সবচেয়ে সচেতনমূলক। উক্ত হামলার জন্য সাধারণভাবে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মুফতী জসীম উদ্দীন(শিক্ষক, উক্ত মাদরাসা) কর্তৃক রচিত ‘দারুল উলূম হাটহাজারীর ইতিহাস’ গ্রন্থে উক্ত হামলার জন্য দুবৃত্ত বা বহিরাগতদের দায়ী করা হলেও কোথাও জামায়াত-শিবিরের নাম নেয়া হয়নি। তবে এটাও সত্য যে, প্রকাশিত গ্রন্থটি হাটহাজারী মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য হিসাবে প্রকাশিত হয়নি; হয়েছে ব্যক্তি-উদ্যোগে। ঘটনার পর ১২ই ডিসেম্বর পত্র-পত্রিকায় গ্রেফতারকৃত হামলাকারী হিসাবে যে ৪২ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয় তাদের কোন রাজনীতিক পরিচয়ও দেয়া হয়নি। ঘটনার প্রতিবাদে যাঁরা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাঁরা প্রায় সবাই হামলাকারীদের ইসলামের লেবাসস্বর্বস্ব একটি দলের কাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন(দারুল উলূম হাটহাজারীর ইতিহাস)। মুফতী জসীম উদ্দীন সাহেবের গ্রন্থটিতে ঘটনা-পরবর্তী মাদরাসার বক্তব্য, মামলা বা মামলার পরিণতি নিয়ে কোন ধারণা দেয়া হয়নি। আমার মনে হয় কওমীদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোন কাজ করা হয়নি।বলছিলাম, কওমীদের সাথে জামায়াতের ঐক্য নিয়ে। বলেছি, কওমীদের জামায়াত-নীতি নিয়ে। আমি আগেও বলেছি, জামায়াতের রাজনীতি অন্যদের মতো নয়। জামায়াতের আছে নিজস্ব নীতি, আছে কৌশল। বলতে পারেন, তা তো অন্য দলেরও থাকতে পারে। হ্যা, থাকতে পারে। তবে জামায়াত যে আবরণে তাদের পথ ও মতকে এগিয়ে নেয় তা অনেকটা আড়ালে-আবডালে বলা যায়। প্রথমত, তারা বেশ হিসাব-নিকাশ করে ঠিক করে কার সাথে যাবে বা যাবে না। গেলে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে কি না। অন্যদের পক্ষে তাদের কৌশল ধরতে পারা কঠিন। কারণ, তারা যা করে মঞ্চে তা বলে না আবার মঞ্চে যা বলে তা করে না। অতীত থেকে এসব কথার ধারণা পেতে পারেন। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া দরকার। সেটি হলো, জামায়াত যদি নিজ থেকে ঐক্যের কথা বলে অথবা অন্য কেউ যদি জামায়াতের সাথে ঐক্যের কথা তোলে—এ দু’কথার মধ্যে কি কোন ভিন্নতা আছে কি না। মনে রাখতে হবে, ঐক্যের কথা জামায়াতের পক্ষ থেকে ওঠা অথবা অন্যের পক্ষ থেকে জামায়াতের সাথে ঐক্যের কথা ওঠা এক অর্থ বহন করে না। জামায়াত যদি ঐক্যের কথা নিজ থেকে তোলে, বুঝতে হবে তারা কোন না কোন দিক থেকে ব্যাকফুটে বা কোণঠাসায় অথবা তারা নিজ থেকে সক্রিয় হতে অক্ষম। যেমন ১৯৭৬ সালে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রাব্বানী, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (ইডিপি) ও ইমারত পার্টির সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ
ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ সংক্ষেপে আইডিএল’র কথা। আইডিএল’র প্রস্তাবনা এসেছে মূলত জামায়াতের পক্ষ থেকে। কারণ, সে সময় জামায়াত নিজস্ব গণ্ডি থেকে রাজনীতি করার অবস্থায় ছিলো না। তারা জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হবার চেষ্টায় ছিলো। বিশিষ্ট কওমী ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ সাহেব রহ.কে সামনে রেখে জামায়াতের মাওলানা আব্দুর রহীম সাহেব আইডিএল গঠন করেন। এতে কওমী-জগতের অনেকের আপত্তি ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো উক্ত জোটের মাধ্যমে জামায়াত নিজস্ব গণ্ডি তৈরি করতে এবং অস্তিত্ব-সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয় এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে জামায়াত আইডিএলের ২০টি আসনের মধ্যে ৬টি আসনে জয়লাভ করে। দেখা যায়, জামায়াত জোটকে অবলম্বন করে জোটভিত্তিক বলয় তৈরির চেয়ে নিজস্ব দলীয় জোট সৃষ্টি করতে বেশি তৎপর ছিলো। এরই ফলে আইডএলে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয় এবং ১৯৭৯ সালে জামায়াত নিজস্ব নামে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। কারণ, তাদের আর জোটের প্রয়োজন ছিলো না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো: এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী তাঁর লেখা ‘বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির তিন দশক (১৯৭১-২০০০)’ গ্রন্থে বিস্তারিত লিখেছেন।
এরপর আসে চারদলীয় ঐক্যজোটের কথা। ১৯৯৯ সালে গঠিত হয় এ জোট। বিএনপি, জামায়াত, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও কওমীভিত্তিক ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে এ চারদলীয় জোট। এখানেও জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে কওমী মহল থেকে আপত্তি আসে বেশি। অভিযোগ উঠে, জামায়াত আন্দোলন চলাকালীন ও বিজয়ের পর সূক্ষতার সাথে চেষ্টা চালায় যেনো কওমীরা বেশি সুযোগ না পায়। বিশেষ করে নবগঠিত সরকারে কওমীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণেও জামায়াতের প্রচেষ্টা ছিলো বলে কওমী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শোনা যায়।
এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে। তা হলো, জামায়াতের দলগত পরিচয়। কেউকেউ জামায়াতকে একচ্ছত্র ইসলামী দল হিসাবে বিবেচনা করেন। বিষয়টি তেমন নয়। জামায়াতের ধর্মীয় দিক যেমন আছে তেমনি প্রচলিত রাজনীতিক দিকও আছে। অনেকটা এক শরীরের দুই মাথা থাকার মতো। জামায়াতের গঠনতন্ত্রের বিবর্তন ও তৎপরতা তার বড়ো প্রমাণ। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি জামায়াতের সাথে রাজনীতিক জোট করবেন না কি ধর্মীয় জোট করবেন? এটা স্পষ্ট, কওমীদের সাথে জামায়াতের ধর্মীয় জোট গঠন অসম্ভব। রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা বা যৌক্তিকতা তাত্ত্বিকভাবে হতে পারে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সে যৌক্তিকতার পরিণতি কতোটুকু দৃশ্যমান তা বিচারযোগ্য। কারণ, ফলেই বৃক্ষের পরিচয়। তাই রাজনীতির মাঠে কেউ যদি জামায়াতের সাথে জোট করার কথা ভাবেন তাদের প্রয়োজন সুস্পষ্ট চুক্তি করা যেমনটি মাও.আজিজুল হক সাহেবের খেলাফত মজলিসের সাথে আওয়ামী লীগের হয়েছিলো। এতে জামায়াতের মতো দলগুলোর সাথে জোট করা কম-ঝুঁকির হতে পারে। কারণ, এসব চুক্তি সাময়িক। এখন যারা কওমীদের ক্ষুদ্র ও পরিচিত একটি অংশ জামায়াতের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বলছেন, তারা এদিকটা ভেবে দেখেন বলে মনে হয় না। এর মূল কারণ, ইতিহাস-অজ্ঞতা বা এড়িয়ে যাবার প্রবণতা অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্য।
আমি আগেই বলেছি, জামায়াতের নিজস্ব নীতি ও কৌশল আছে যা খালি চোখে দেখা যায় না। তাই তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ কিছু করা সরলরৈখিক চিন্তা বাদ দিয়ে আগপাছ হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জামায়াত রাজনীতিক দল হিসাবে অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ। তাদের রয়েছে এমন একটি নেতা-কর্মীর দল যারা সকল পরিস্থিতিতে দলের সমালোচনা না করে একচ্ছত্র সমর্থন দিয়ে যায়। সেদিক থেকে কওমীভিত্তিক দলগুলোর অবস্থান অনেক দুর্বল। তাই সবল-দুর্বলে জোট হলে কারা এগিয়ে যাবে—সে প্রশ্ন অবশ্যই না বুঝার নয়। আর রাজনীতি মানে নীতি-নৈতিকতা নয়, দ্বন্দ্বের খেলা; প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে।। এ খেলায় জামায়াতের নীতি-নৈতিকতা না কি রাজনীতি স্থান পাবে—সেটাই মীমাংসার দাবিদার।
12.01.2025 Mail:gr.islamabadi@gmail.com
বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
জামায়াতের সাথে ঐক্য ও কিছু কথা
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
ভেতরের পাতা
Featured Post
মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়
মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭ সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন