শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

হারিয়ে যাওয়া এক ভাষা-সৈনিকের ইতিকথা

ভাবনা-৫৩

আজ মহান ভাষা আন্দোলনের ৭৩তম দিবস। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা প্রজন্মের অনেকেই জানে না ইতিহাস বলে, ঢাকার রাজপথে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকার মাটিতে আত্মোৎসর্গিত রফিক, সালাম আর বরকতদের কথা কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাহান্নোর আন্দোলন নিয়ে মানোত্তীর্ণ কোন কাজ বাংলার ইতিহাসবিদ বা লেখক-সাহিত্যিকদের হাতে হয়নি আজ ৭৩ বছর পরে এসে দেখছি, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জায়গা দখল করে নিয়েছে মাতৃভাষা আন্দোলনের নতুন পরিভাষা দায় কার? তার হিসাব দেয়ার দরকার জাতির কলমসৈনিকদের; জাতির রাষ্ট্রশক্তিরহারিয়ে গেছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অজানা সৈনিকদের সংগ্রামের ইতিকথা গতানুগতিক ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে: ন্দোলন ছিলো ঢাকার আন্দোলন, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নয় ইতিহাস শিখিয়েছে, আন্দোলন নিছক তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে একটি নিছক প্রতিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব মাত্র এসব সুগভীর বিকৃতকরণের চাপে পিষ্ট হয়ে বিদায় নিয়েছে এমন অনেক ভাষা-সৈনিকের আমলনামা যাঁদের আজ স্মরণ- করা হয় না অথচ তাঁদের প্রচারবিমুখ ভূমিকার কথা আজ ইতিহাস বলে না ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তাঁদের আন্দোলনের নামটাই যেখানে আত্মসাৎ হয়ে গেছে সেখানে তাঁদের কথা কোথায় ধ্বনিত হবে?

আজ যাঁর কথা বলছি, তিনি মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর জন্ম চট্টগ্রামের তৎকালীন ফটিকছড়ি থানার  দৌলতপুর ইউনিয়নের মুন্সী আলতাফ মিয়া চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩০ সালে তিনি তাঁর পিতার তৃতীয় পুত্র-সন্তান। তাঁর পিতা মরহুম মুন্সী আলতাফ মিয়া চৌধুরী(১৮৭৪-১৯৭৭) ছিলেন তৎকালীন উত্তর চট্টগ্রামের স্বনামধন্য স্বভাবকবি পণ্ডিত ব্যক্তি তিনি একজন আলাওল-গবেষক হিসাবেও পরিচিত ছিলেন ভাষা-সৈনিক মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী ফটিকছড়ি থানায় স্থানীয় ভাষা আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন ফটিকছড়ি আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বরেণ্য আইনজীবী মরহুম মুহাম্মাদ লোকমান সাহেব ১৯৯০/৯১ সালে বর্তমান লেখককে বলেন: ১৯৫২ সাল, তখন আমরা ফটিকছড়ি থানার রোসাঙ্গিরী হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ২১শে ফেব্রুয়ারীতে দেখি স্থানীয় নাজিরহাট কলেজের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র ঢাকায় ছাত্র নিহত হবার প্রতিবাদে ক্লাস বয়কটের ডাক দিয়ে আমাদেরকে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে বলছিলেন জনাব এডভোকেট মরহুম লোকমান হোসেন বলেন: অঞ্চলে তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং আন্দোলনকে সংগঠিত করেন

ভাষা-সৈনিক মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম জীবনে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের পর তাঁর মরহুম পিতার অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য প্রথম পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে চাকুরি নেন সেখানে তাঁর সাথে ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা তাঁর কাছ থেকে শুনেছি, ‍তখন থেকেই পূর্বপাকিস্তানীদের প্রতি পশ্চিমা প্রশাসনের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গী ছিলো চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি লক্ষ করলেন, চাকরিরত কাউকেই শুক্রবারে জুমার নামায আদায় করার সুযোগ দেয়া হয় না দেখলেন, অনুরোধ করেও নামাযের অনুমতি মিলছে না অর্থাৎ, নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানে ইংরেজ আমলের আইনই জারি ছিলো বিষয়টি তিনি তাঁর পিতাকে চিঠিযোগে অবহিত করেন পিতা মরহুম মুন্সী আলতাফ মিয়া চৌধুরী তৎক্ষণাৎ টেলিগ্রামে জানিয়ে দেন, নামাযবিহীন চাকুরির পয়সা তাঁর দরকার নেই তিনি নির্দেশ দেন, বার্তা পাবার সাথেসাথেই চাকুরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে চলে আসতে বাবার স্পষ্ট বার্তা পেয়ে জহুরুল ইসলাম চৌধুরী উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে বসেন কিন্তু উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কটুক্তিমূলক মন্তব্যের জেরে তার সাথে জহুরুল ইসলাম চৌধুরী প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডতায় জড়িয়ে পড়েন এমন কি বিষয়টি হাতাহাতিতে পর্যায় পর্যন্ত গড়ায় এক পর্যায়ে অফিস থেকে তরুণ কর্মচারী জহুরুল ইসলাম চৌধুরীকে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে বাকবিতণ্ডার জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয় নোটিস পেয়ে তিনি লিখিত জবাব দেন: আমাদের পাকিস্তান একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র কিন্তু  ‍দুর্ভাগ্যজনক যে, এখানে ইসলামের একটি মৌলিক বিধান নামাযের জন্য সময় দেয়া হচ্ছে না এটা কি পাকিস্তানের মূলনীতিবিরোধী নয়? তাছাড়া উর্দ্ধতন কর্মকর্তা যেভাবে ইসলামী বিধান নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন সেখানে নীরব থাকা কি সম্ভব? মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরীর জবাব পেয়ে তদন্ত করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে তাঁকে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানান সেই থেকে তৎকালীন বিমান বাহিনীতে জুমার নামাযের জন্য ছুটির বিধান জারি করা হয় মূলত তাঁর কারণেই পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে প্রত্যেক শুক্রবারে জুমার নামায আদায়ের জন্য কর্মচারীদের ছুটি পাবার রীতি চালু হয় বিষয়টি জহুরুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর বাবা মরহুম মুন্সী আলতাফ মিয়া চৌধুরীকে টেলিগ্রামে জানান বাবা তাকে জানান: সব ঠিক আছে কিন্তু যেহেতু একটি ঘটনা ঘটে গেছে তাই আমার আশঙ্কা, তারা কোন না কেন সময় প্রতিশোধ নিতে পারে অতএব, চাকুরি ছেড়ে দিয়ে পূর্বপাকিস্তানে চলে এসো বাবার সিদ্ধান্ত নতশিরে মেনে নিয়ে মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরী উচ্চাভিলাষী বিমান বাহিনীর চাকুরি ছেড়ে পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন এবং আনুমানিক ১৯৫৩/৫৪ সালের দিকে হাবিব ব্যাংক লিমিটেডের চট্টগ্রামের লালদীঘি শাখায় স্টোনোগ্রাফার কাম টাইপিস্ট হিসাবে যোগদান করেন তাঁর অভাবনীয় মেধা, সৃজনশীলতা দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে অফিসার পদে আসীন হন ১৯৬৪ সালে হাবিব ব্যাংকের প্রথম বাঙ্গালী অফিসার হিসাবে পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে নয় জন পশ্চিম পাকিস্তানীর সাথে তিনি ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বিলাতে(বর্তমান লন্ডন) প্রশক্ষিণে যান ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সংগঠকের কারণে পাকিস্তান গোয়েন্দাসংস্থার নযরে আসেন এবং চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীর হত্যার তালিকায় তাঁর নাম আসে খবরটি একজন পাকিস্তানী শুভাকাঙ্খী জানিয়ে দেয়ার পর মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরী আত্মগোপনে চলে যান এরপর তিনি আর ব্যাংকে ফিরে যাননি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর যুদ্ধ শুরু হলে পাঞ্জাবী সৈন্যরা চট্টগ্রামের প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের পূর্বপাশে হাসান মঞ্জিলে তাঁর বাসা লুট করে এবং সবকিছু নিয়ে যায় বাসা লুট হবার ত্রিশ মিনিট আগে তিনি তাঁর ছোট ভাই মাও. শামসুল আলম চাটগামী রহ.সহ বাসা দেখতে যান বাসার জানালায় সাদা ক্রসচিহ্ন দেখে বিপদ বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সটকে পড়েন এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যান

২৫শে মার্চের গণত্যার পূর্ব পর্যন্ত মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী স্থানীয় সুপরিচিত মক্কী মসজিদে নিয়মিত নামায় পড়তেন যুদ্ধ শুরু হলে একদিন তিনি ফজরের নামায পড়তে মসজিদে যান এবং ফেরার পথে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের পাহাড় থেকে পাঞ্জাবী সৈন্যরা তিন বার গুলি করে অলৌকিকভাবে তিনটি গুলিই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার পর পাকসৈন্যরা আর গুলি করেনি পরবর্তীতে সেই ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন: প্রথম গুলির সময় তিনি জোরে দোয়া পড়ছিলেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করছিলেন তিনি স্পষ্ট দেখছিলেন, প্রথম গুলি তার সামনে দিয়ে চলে যায়, দ্বিতীয় গুলি তাঁর কদম বাড়ানো অবস্থায় দুপায়ের ফাঁক দিয়ে চলে যায় এবং তৃতীয় গুলি তাঁর পেছন দিয়ে চলে যায় এমতাবস্থায় তিনি দোয়া পড়তে-পড়তে বাসায় পৌঁছুতে সক্ষম হন তিনি সেই ঘটনাকে তাঁর মা-বাবার নির্ভেজাল দোয়ার প্রতিফলন বলেই উল্লেখ করতেন যুদ্ধের সময় অনেকে তাঁকে ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে যাবার পরামর্শ দিলেও তিন ঘরে বৃদ্ধ পিতাকে ফেলে যেতে রাজি হননি তাই যুদ্ধের নয়টি মাস তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করে আত্মগোপনে থাকতেন এবং সময়ে-সময়ে এসে বৃদ্ধ পিতাকে বাড়িতে দেখে যেতেন তাঁর বাড়ি নাজিরহাট হাসপাতাল যা পাক-সৈন্যদের ফটিকছড়ির সদর দফতর ছিলো, তার পূর্বপাশে লাগোয়া ছিলো ফলে, সৈন্যরা সকাল-বিকাল তাঁর খোঁজে বাড়িতে হানা দিতো তিনি মাঝেমাঝে পাশের বিলের ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকতেন ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর যেদিন পাকবাহিনী সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হয়ে নাজিরহাট ত্যাগ করে চলে যায়, সেদিন জীর্ণশীর্ণ পোষাকপরা মুক্তিবাহিনীকে নিয়মিত খানা খাওয়ানো হতো মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে তাঁর ঘরে অথচ মুক্তিযুদ্ধের অলিখিত ইতিহাস কেউ জানে না ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে তিনি প্রাক্তন হাবিব ব্যাংক পরবর্তীতে অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিপুটি কন্ট্রোলার অব ব্রাঞ্চেজপদে যোগদান করেন ১৯৭৬ সালে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিচালনা দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ঢাকায় বদলির প্রস্তাব দেন কিন্তু তিনি বৃদ্ধ পিতার দেখভালের কারণে যেতে অস্বীকার করেন এবং প্রয়োজনে চাকুরি ছেড়ে দেবার হুমকিও দেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাঁর অভাবনীয় পিতৃভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে চট্টগ্রামেই রেখে দেন পরে ১৯৭৭ সালে তাঁর পিতা মরহুম মুন্সী আলতাফ মিয়া চৌধুরী ১০৩ বছর বয়সে ইন্তিকাল করলে ১৯৭৮ সালে মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপরিবারে ঢাকায় চলে যান সেখানে তিনি অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে লোকাল অফিসে এজিএম পদে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে অডিট ডিভিশনের ডিজিএম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ব্যাংকিং জগতে তিনি এম. জেট. আই চৌধুরী হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন তার দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর দায়িত্বাধীন কার্যালয়ে সব মুসলিম পুরুষকে জামাতে নামায পড়তে হতো তিনি নিজে জোহর আসরের ইমামতি করতেন মাঝেমাঝে মাগরিবেরও ইমামতি করতেন মুসল্লীর সংখ্যা ছিলো য়ের কাছাকাছি আর মুসলিম মহিলা কর্মচারীরা আলাদাভাবে নামায পড়তেন তাঁর পরিচালনা এবং নৈতিকতা এতো সুন্দর ছিলো যে, তাঁর অধীন অফিসাররা তাঁকেবাবাবলে সম্বোধন করতেন তিনিও সবাইকে পুত্রসম স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতেন সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে ঢুকে চেম্বারে বসলেই অফিসজুড়ে পিনপতন নীরবতায় সব ঢেকে যেতো কেউ কোন প্রকার অযথা আড্ডায় মেতে উঠতেন না তাঁর প্রতি কর্মচারীদের শ্রদ্ধা ভালোবাসার এমন নযীর মিলতো যে, কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের দাম্পত্য বিষয়ের সমস্যা নিরসনে স্বস্ত্রীক তাঁর বাসায় গিয়ে হাযির হতো তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাদের সমস্যা নিরসন করে দিতেন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত নামাযের নসীহত করতেন; স্ত্রীদেরকে পর্দা করতে বলতেন তাঁর কারণে অনেক কর্মচারীর ঘরের সমস্যা নিরসন হতে দেখা গেছে এবং দ্বীনদারও হয়েছে তবে তিনি কোন প্রকার হাদিয়া বা উপটৌকন গ্রহণকে কঠোরভাবে অস্বীকার করতেন যেন কেউ কোন অন্যায় আবদার নিয়ে আসতে না পারে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও কারো কারো উপটৌকন ফেরৎ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে          

মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরী একটি ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান হিসাবে বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত ধর্মভীরু পিতামাতার প্রতি অনুগত ছিলেন এলাকায় পিতামাতার প্রতি তাঁর অতুলনীয় ভক্তির কথা সুবিদিত ছিলো তাঁর পিতা মরহুম মুন্সী আলতাফে মিয়া চৌধুরী তাঁর বিভিন্ন নথিপত্রে পুত্র মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরীর অনুপম পিতৃমাতৃভক্তির কথা, পরিবার এবং ভাইবোনদের জন্য তার অসামান্য অবদানের কথা অকপটে লিখে গেছেন আধ্যাত্মিকসূত্রে মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী শাইখুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’ বিশিষ্ট খলীফাশেখে বাঘাখ্যাত হযরত মাও.বশীরুল্লাহ সাহেব রহ.’ মুরীদ ছিলেন তাছাড়া, পাকিস্তান আমলে বিখ্যাত আলিমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুফতী শফী সাহেব রহ.(মুসান্নিফে মাআরিফুল কুরআন), হাফেযুল হাদীস হযরত আব্দুল্লাহ দরখাস্তী রহ., মাও. গোলাম গওস হাযারভী রহ. মুফতী মাহমূদ সাহেব রহ.’ সাথে গভীর সম্পর্ক ছিলো তাই তাঁরা চট্টগ্রামে এলেই জহুরুল ইসলাম চৌধুরীর চট্টগ্রামস্থ বাসায় আরাম করতেন বিশেষ করে মুফতী মাহমূদ সাহেব রহ.’ সাথে তাঁর ঘনিষ্টতা ছিলো সুপরিচিত তাই হযরত চট্টগ্রামে এলে তিনি বিমানবন্দর থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে আসতেন এমন এক পর্যায়ে মুফতী মাহমূদ সাহেব রহ. একবার তার পাশে বসে কাঁধে হাত দিয়ে স্নেহসুরে বলেছিলেন,“ইয়ে চৌধুরী মাশরেকী পাকিস্তান মে ম্যারা ড্রাইভার হ্যায়সম্ভবত এসব কারণে মরহুম জহুরুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর সন্তান-সন্ততির ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষায় কঠোর ছিলেন বাল্যবয়স থেকেই তিনি দ্বীনদার ছিলেনতরুণ বয়সে শেখে বাঘার হাতে বাইয়াতে আবদ্ধ হবার পর থেকে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত তাঁর তাহাজ্জুদ কাযা হতে দেখা যায়নি যে কোন পরিস্থিতিতে শেষ রাতে তাঁর জিকির এবং কান্না বিজড়িত মুনাজাতের মৃদুধ্বনি প্রতিবেশীদের কানে পৌঁছাতো তাই তাঁর নৈতিক শক্তি এবং সাহস ছিলো বিস্ময়কর ঘোর বিপদেও তাঁর উপর বর্ষিত খোদার সাহায্য দেখা যেতো কাছ থেকে জীবনে এক অপরাজেয় জীবন তিনি রেখে যান ছাত্র-জীবন থেকে প্রচণ্ড আর্থিক অনটন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি উঠেন খ্যাতির শিখরে এলাকায় দরিদ্র মানুষের দুয়ারে তাঁর অবদানের কথা আজও ঘরেঘরে স্মরিত হয় তিনি সন্তানদের বলতেন, তাঁর জানাযায় কেউ যেনো একথা না বলে যে, কেউ কোন টাকা-পয়সা পেলে যোগাযোগ করবেন কারণ, তাঁর কথায় তিনি কারো কাছ থেকে ধার করেননি বা তাঁর কাছে কারও পাওনাও নেই বরং অনেকের কাছে তিনি পাওনাদার আছেন যাদেরকে তিন ক্ষমা করে দিয়েছেন

যুদ্ধের পর অনেককেই দেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের নামে বিভিন্ন সুবিধা নিতে কিন্তু মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী সুবিধা দূরের কথা, মুখ খুলে কখনো দেশ জাতির প্রতি তাঁর অবদানের কথা প্রকাশ্যে বলতেন না তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের প্রথমদিকে যখন তিনি শহরে আসেন তখনো ব্যাংকগুলোতে লুটপাটের চিহ্ন দৃশ্যমান ব্যাংকের লকারগুলো ভাঙ্গা, ফেলে যাওয়া স্বর্ণ পড়ে আছে কেউকেউ তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেগুলোর কোন মালিক নেই তিনি যেনো সব কুড়িয়ে নেন কিন্তু সেসব কথায় কান না দিয়ে তিনি বলেছিলেন: ওগুলো আমার নয়, নিলে শান্তি পাবো না শেষমেষ তিনি নেননি এবং লিখিত ডক্যুমেন্ট তৈরি করে পরিত্যক্ত স্বর্ণগুলো ব্যাংকে জমা দেনএমন কি চট্টগ্রাম শহরের পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত জায়গাজমি পড়ে থাকার পরও মরহুম জহরুল ইসলাম চৌধুরী সেদিকে ফিরেও তাকাননি তাঁর এককথা, ওগুলো আমার নয়; আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে এমন নির্লোভ নীতিবান ছিলেন তিনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম শহরে তিনি কোন সম্পদ গড়ে তোলেনি এই ভয়ে যে, তাঁর সন্তানেরা বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে আল্লাহকে ভুলে যাবে অথচ তিনি নিজ চোখে দেখেছেন: তাঁর অধঃস্তন অনেকেই যুদ্ধের পর জায়গাজমি দখল করে সম্পদশালী হতে

মহান ভাষা ভাষা আন্দোলনের এই সৈনিকের কথা আজ আর ইতিহাসে নেই থাকার কথাও নয় এঁরা ছিলেন দেশ জাতির প্রতি সততার দায়ে আবদ্ধ তাই বোধ করি স্বার্থবাজদের ভিড়ে এসব নীরব দেশপ্রেমীদের আর চোখে পড়ে না এটাই মাটির গুণ ভাষা সৈনিক মরহুম মুহাম্মাদ জহুরুল ইসলাম চৌধুরী ২০১৯ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রাম শহরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৯ বছর বয়সে আল্লাহর দরবারে হাযির হন আল্লাহ হাফিয

21.02.2025 Mail: gr.islamabadi@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...