ভাবনা-৫৫
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের চলমান কিছু চিত্র নিয়ে কথা ভাবতে হচ্ছে। কিছু প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে: জাতি কি কোন রাজনীতিক দলের কাছে জিম্মী? সর্ববৃহৎ রাজনীতিক দল হলেই কি জাতির প্রতিনিধিত্ব করার লাইসেন্স পায়? সর্ববৃহৎ বা বৃহত্তম রাজনীতিক দলের কর্ণধারেরা কি যাচ্ছেতাই করার বা বলার অধিকার রাখেন? কথাগুলো ভাবছিলাম দেশের সাম্প্রতিক হালাবস্থা দেখে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের পর দেশের রাজনীতিক দলগুলো বিশেষত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কারণ, তাদের গণিতে ছিলো না: হাসিনার পতন এতো তাড়াতাড়ি হবে। তা’ছাড়া ফখরুল সাহেবরা ধারণায় নিতে পারেননি হাসিনা-পরবর্তী যুগ সহসাই আসতে চলেছে। বিপ্লবের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে ফেস দ্য পিপল নামের এক টকশোতে বলেন, “২০ জুলাই (২০২৪) আমরা সরাসরি বিএনপির হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। (বলেছিলাম,) খু'নের পর খু'ন হচ্ছে, আমরা বড় কিছু ভাবতেছি। (তখন) আমাদেরকে বলা হয়েছিল, আমরা এখনও শেখ হাসিনার পতন নিয়ে ভাবছি না।" নিশ্চয় হাইকমান্ডে ফখরুল সাহেব ছিলেন। এ ছাড়া জনাব ফখরুল সাহেব ২০২৪’র ১৭ই জুলাই স্পষ্টভাবে বলেন: এ আন্দোলনের সাথে আমরা সরাসরি জড়িত নই। এ থেকে প্রমাণীত হয়, বিএনপি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সাথে কোন সম্পর্ক রাখেনি। কিন্তু পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পাল্টায় বিএনপি। মহাসচিব থেকে শুরু করে অন্য নেতৃবৃন্দকেও বলতে শোনা যায় জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের প্রেক্ষাপট রচনা করেছে বিএনপি। তাহলে প্রশ্ন হলো: অবস্থানের এ পরিবর্তন কেন? কোনটি সঠিক?
হাসিনা-পরবর্তী যুগের মাস তিনেক না পেরুতেই হঠাৎ বিএনপি সব পেছনে ফেলে নির্বাচন নিয়ে হাঁকডাক দিতে শুরু করে। বিষয়টি জনমানুষ ভালোভাবে নেয়নি। হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার যেনো দ্বিতীয় সারির এজেন্ডা বিএনপির কাছে। নিহত-আহতদের খোঁজখবর নেয়ার চেয়ে বিএনপির কাছে নির্বাচনটাই যেনো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সংস্কার বা জনগণের বহুদিনের দাবি রাষ্ট্র-মেরামতের কাজটিও বিএনপির কাছে খুব গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হলো না। বিশেষ করে দলের মহাসচিবের অস্থির বক্তব্য আম-জনতার মাঝে বিরক্তির সৃষ্টি করে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আগে যেমন আওয়ামী লীগকে মানুষ পথেঘাটে গাল দিতো তেমন না হলেও বিএনপিকে তুলোধুনো করে ছাড়ছে সাধারণ মানুষ। মানুষ বলছে, এতো জিয়ার বিএনপি নয়। উপরন্তু বাহ্যত ভারতের সুরে শীঘ্র নির্বাচন, ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন, পতিত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা ইত্যাদিতে মানুষ এখন অনেকটাই বিএনপির সমালোচক। তৃণমূলের অভিজ্ঞতা এমনই প্রকট। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, বিএনপি ভারতের প্রেসক্রিপশনে চলছে। এখান থেকে বিএনপি অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে না পারলে সামনে ভয়াবহ বিপদ। মনে রাখতে হবে, একটি রাজনীতিক দলের জন্য জনবিচ্ছিন্নতা চরম বিপর্যয়কর। আওয়ামী লীগ তার বড় প্রমাণ।
ক’দিন আগে বিএনপি নেতৃবৃন্দ জনাব ফখরুল সাহেবের নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস বরাবরে সাক্ষাৎ করেছেন নির্বাচনের দিনক্ষণ জানতে। বৈঠকের পর বেরিয়ে মহাসচিব বললেন, প্রধান উপদেষ্টার কথায় তাঁরা সন্তুষ্ট নন। নির্বাচন-নির্বাচন করতে থাকা বিএনপির এ ধরনের কথায় সাধারণ মানুষ আরেক দফা ক্ষেপেছে। আমরা বুঝতে পারছি না, বিএনপি কেন বারবার এক-ই ভুলে পা দিচ্ছে। এখন আম-জনতা প্রশ্ন করতে শুরু করেছে: জাতি কি বিএনপির কাছে জিম্মী? বিএনপিকে এমন প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার কে দিয়েছে? বিএনপি নিঃসন্দেহে বর্তমানে সর্ববৃহৎ রাজনীতিক দল। কিন্তু তাদের বাইরেও তো বিশাল জনগোষ্ঠী আছে যারা তাদেরকে ভোট দেবেন না। ফলে পুরো জাতির অভিভাবকত্ব তো বিএনপি করতে পারে না। ড. ইউনুস এখন যেভাবেই হোক দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা; নির্বাহী প্রধান। তালাশ করলে দেখা যায় তাঁর জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। মানুষ তাঁর মাঝে আস্থা খুঁজে ফিরছে। এখন মানুষের পছন্দ বা আকাঙ্খার বিপরীতে বিএনপি যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে অনির্বাচিত বা মেন্ডেটবিহীন বলে কোণঠাসা করতে চাইছে—সেটা খোদ বিএনপির জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ, বিএনপির বর্তমান অবস্থান জনমানুষের বিপরীতে। নিরানব্বই ভাগ মানুষ এখন আগে সংস্কার এবং পরে নির্বাচন চায়। নাম কা ওয়াস্তে কিছু কলমের কাটাছেরাকে সংস্কার বলে চালিয়ে দেয়াকে মানুষ সংস্কার বলে গ্রহণ করতে চায় না। মানুষ চায় ফ্যাসিস্টদের বিচার, পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, পরে নির্বাচন। অন্যথায় আবারও নতুন ফ্যাসিস্টের আগমন ঘটবে।জঞ্জাল সাফ করা না হলে বিএনপিও হতে পারে পরবর্তী ফ্যাসিস্ট। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
এখন বিএনপিকে কালক্ষেপণ না করে ফযসালা করতে হবে: জনমানুষের আকাঙ্খার কাছে তাঁরা নতি স্বীকার করবে কি না।একান্তুই যদি তাঁরা সন্দিগ্ধ হন তবে সংস্কার ও নির্বাচনপ্রশ্নে গণভোটের প্রস্তাব করতে পারেন।সে পথে হলেও সমাধান খোঁজা যেতে পারে।এসব না করে খালি সকাল-বিকাল বেসুরো সুরে নির্বাচনের ডুগডুগি বাজালে কি লক্ষ্য অর্জিত হবে? সাহস থাকলে জনগণের কাছে যান।তাঁদের সিদ্ধান্ত মানুন। মনে করবেন না, আপনারা জাতির অলিখিত অভিভাবক; জাতিই আপনাদের অভিভাবক। অযথা অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে নিজেদের ভবিষ্যৎকে কালিমাযুক্ত করবেন না। আপনাদের বর্তমান চালচলন জিয়ার আদর্শ বহন করে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন