শুক্রবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৫

সিন্ডিকেট-নির্ভর হেফাজত দেশের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে

ভাবনা-৫৪

বলাবাহুল্য, হেফাজতে ইসলাম ঘোষিতভাবে কওমী আলিম-উলামা নিয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয় মাওলানা আহমদ শফী রহ.’ নেতৃত্বে মূলত তরুণ আলিমদের একটি অংশের প্রচেষ্টায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুরুতেই এমন একটি অংশ নেতৃত্বে প্রভাব সৃষ্টি করে যারা হেফাজতের কার্যক্রম বিস্তারের পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ সুগম করতে পারে চিত্র দেখা যায় একশ্রেণীর নেতৃত্বের তৎপরতায় রাতারাতি বদলে যাওয়া জীবনচিত্রে যাকে কেউকেউ আপডেটেড লাইফ-স্টাইলও বলতে পারেন যারা ছিলো এক সময় ছন্নছাড়া, অভাবগ্রস্থ পরমুখাপেক্ষীতারাই হয়ে গেলেন নতুন গাড়ির সামনের আসনের মালিকএকজনকে দেখেছি, এক রাস্তার মোড়ে ভাতের দোকান দিয়ে খদ্দেরের হস্ত মুবারকে ভাত তুলে দিয়ে দিন গুজরান করতে তাকেও দেখলাম, রাতারাতি নেতা বনে কওমী-জগতের অভিভাবক বনে যেতে আমি কারও জৈবিক উন্নয়নের বিরোধিতা করছি না; বিরোধিতা করছি, অন্যায়ভাবে বড়লোকি নেতাগিরি দেখিয়ে আসন দখল করার বদ-খাসলতের এরা কেউ আবার হেফাজতের নিরপেক্ষ কাউন্সিলে নির্বাচিত নন হেফাজতের শুরুতে এরা নিজেরা বসে নিজেদের মত করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ দখলে নেয় এবং ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে গড়ে তোলে সিন্ডিকেট হযরত আহমদ শফী রহ.কে সামনে রেখে চলতো এদের সাংগঠনিক জমিদারী আর আহমদ শফী রহ.কে কিভাবে ম্যানেজ করা হতো তাতো কারও অজানা নয় যারাই সিন্ডিকেটের বিরোধিতা করতেন তাদেরকে কৌশলে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফুটপাতে বসিয়ে রাখা হতো হেফাজতে ইসলামের দ্বিতীয় আমীর মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’ সাথে উক্ত সিন্ডিকেটের দূরত্ব তৈরি হয় কিন্তু প্রভাব সৃষ্টির কারণ থেকেই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, হযরত বাবুনগরী রহ. পূর্বের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিলেও পুরনো কিছু সিন্ডিকেটবাজের সমন্বয়ে নতুন এক সিন্ডিকেটের আভির্ভাব ঘটে অবশেষে হেফাজত আর সিন্ডিকেটমুক্ত হতে পারলো না এখনো চলছে সেই ঐতিহ্যবাহী বংশধারা

অভিযোগ উঠে, সক্রিয় সিন্ডিকেট সময়ে-সময়ে হেফাজতের বিভিন্ন কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে বিশেষত নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সী, রাজনৈতিক দল ব্যক্তি পর্যায় থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে হেফাজতের সৃষ্ট সিন্ডিকেট সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করে ২০১৩ সালে শাপলার সমাবেশ এবং ২০২১ সালে মুদিবিরোধী আন্দোলন হরতালকে কেন্দ্র করে তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম নেতা চট্টগ্রামের মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী নিজে এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন সময়টা আমার মনে নেই তবে খুব সম্ভবত মুফতী হারুন ইজহারের প্রথম কারামুক্তির পর সেখানে মুফতী হারুন ইজহার মাও. আজিজুল হক ইসলামাবাদীও উপস্থিত ছিলেন কথা হচ্ছিলো লালখান বাজার মাদরাসায় মুফতী ইজহারুল ইসলাম সাহেব বলেছিলেন: ৫ই মে শাপলার ঘটনার দিন বিকেল দুটা-আড়াইটার মতো হবে, তখন দুএকজন শহীদ হয়েছেন, পুলিস র‌্যাবের ধাওয়া খেয়ে মুফতী সাহেব  দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে আশ্রয়ের জন্য উঠে যান সেখানে তিনি দেখেন তৎকালীন যুগ্ম মহাসিচব পদবীধারী মাইনুদ্দীন রুহী, মোজাম্মেল অন্য একজন মিলে বস্তাভর্তি টাকা গুনছেন মুফতী সাহেবকে দেখে তারা হতচকিত হয়ে টাকা গোনা বন্ধ করে দেন পরবর্তীতে আমি হেফাজতের দায়িত্বশীল একজন থেকে জানতে পারি, সে টাকা একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নেয়া বিষয়টি আমি ২০২১ সালে আমার রিমান্ডের সময় মুফতী হারুন ইজহারের উপস্থিতিতে হাটহাজারী থানায় উত্থাপণ করি কিন্তু রুহীদের সাথে হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকায় বিষয়টিতে তদন্ত হয়নি আমি এখনো বলি, উক্ত বিষয়ে একটি বিস্তৃত সরকারি তদন্ত হওয়া উচিৎ তাহলে, অনেক থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে এখানে আমি আরও একটি তথ্য দিচ্ছি ফটিকছড়ির জামিয়া আরবিয়া নাজিরহাট মাদরাসার সাবেক শিক্ষা পরিচালক মাও.সলিমুল্লাহ সাহেব যিনি এখন জামিয়া ফারুকিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, হাটহাজারী মাদরাসার একজন সিনিয়র শিক্ষক মাও. হাফিয মাহবুব সাহেবকে (ফটিকছড়ি) একটি তথ্য দিয়েছেন বিষয়টি মাও. মাহবুব সাহেব আমাকে নিশ্চিত করেছেন দুদুবার উল্লেখ্য, মাও.সলিমুল্লাহ সাহেব আহমদ শফী রহ.’ হযরতের ছোট সন্তান মাও.আনাসের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত হযরত মাহবুব সাহেবের কথায়: মাও.সলিমুল্লাহ সাহেব তাঁকে দুবার বলেছেন যে, মাও. আনাস বিদেশ থেকে অনুদান হিসাবে আসা কোটি টাকার উপরে হেফাজতের টাকা একাউন্টে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বিষয়টিও সরকারিভাবে তদন্ত করা দরকার অভিযোগ ওঠে, ২০২১ সালে মুদিবিরোধী আন্দোলন ২৭শে মার্চের হরতালকে ঘিরে সক্রিয় সিন্ডিকেট বড় ধরনের অর্থের লেনদেন করে এগুলো তদন্ত হলে অনেক অজানা তথ্য জাতি জানতে পারবে ২০২১ সালের হেফাজতের মামলায় গ্রেফতার থাকাকালীন চট্টগ্রাম কারাগারে শুনেছি, কনডেম সেলে রকী বড়ুয়া নামে একজন ভারতীয় -এজেন্ট আছে শুনেছি, তাকে ডিজিএফআই গ্রেফতার করেছে তার সাথে আলাপ করে একজন কারারক্ষী আমাকে জানায়, রকী বড়ুয়ার ভাষ্যমতে এদেশে নাকি ভারতের দুধরনের এজেন্ট আছে একটি অংশ যারা বামপন্থীদের সহযোগে ইসলামপন্থী ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে কাজ করে আর অপর অংশটি হলো, যারা ইসলামপন্থী ডানপন্থীদের সাথে মিশে দেশকে অস্থিতিশীল করতে উস্কানী দেয় সেখানে তারা বিরাট অংকের অর্থেরও যোগান দেয় বলে জানায় এসব বিষয় নিয়ে পুর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে

সিন্ডিকেটবাজদের একটি বড় সওদাবাজি চলে শাপলার ঘটনার দিন রাতে সেদিন কথা ছিলো কেবল ঢাকা অবরোধ হবে কিন্তু সরকারের এজেন্টগুলো হেফাজতের সামনে একটি ট্র্যাপ বা ফাঁদ তৈরি করে যেনো হেফাজতের নেতাকর্মীরা অবরোধের পরিবর্তে শাপলায় ঢুকে যায়এতে হেফাজতের কর্মীদের বেছেবেছে টার্গেট করা সহজ হবে কথামতো হেফাজত অজানা যাদুর কাঠির স্পর্শে শাপলায় সমাবেশ করার অনুমতি পেয়ে যায় যেখানে বিএনপি চেষ্টা করেও পায়নি মাত্র ঘণ্টা খানিকের মধ্যে সরকারের অনুমতি পাওয়া ছিলো রহস্যজনক অথচ ব্যাপারে আগেভাগে তৎকালীন মহাসচিবকে কিছুই জানানো হয়নি এখানেই সিন্ডিকেটদের চলে গোপন বাণিজ্য এরপরও রাতে শাপলা ত্যাগের জন্য হযরত বাবুনগরী রহ. সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও কুশীলবদের ষড়যন্ত্রে আহমদ শফী রহ.কে শাপলায় আসতে না দিয়ে গণহত্যার পথ নিরাপদ করা হয় এখানেও চলে সিন্ডিকেটবাজদের গোপন বাণিজ্য এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে      

ইদানিং সিন্ডিকেটের বিষয়টি আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে জামায়াতের সাথে একতর্ফা বৈঠক করে তাদের নেতৃত্বে ইসলাম কায়েমের যে ঘোষণা হেফাজতের একটি অংশ দিয়েছে, সেটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় কিন্তু যারা সেখানে গেছেন তারা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। জামায়াত বিষয়ে হেফাজতের আমীরের বক্তব্য সিন্ডিকেট মোটেও আমলে নেয়নি উপরন্তু আমীরের বক্তব্য প্রচারে কৌশল করে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে ২০২৪ সালের ১৮ই নভেম্বর রবিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ঢাকার হেফাজত নেতৃবৃন্দসহ হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক হযরত খলীল আহমদ সাহেব সহকারে এমন একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আমীরের জামায়াতবিরোধী বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয় এমন কি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসাবে মাও. খলীল আহমদ সাহেব আমীরে হেফাজতের বক্তব্য কেবল লিখিত আকারে দেয়ারও প্রস্তাব করেন। বিষটি হেফাজতের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যিনি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, আমাকে জানান বৈঠকে আমীর মাও. মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা. স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি আকাবীরে দেওবন্দের আদর্শের বাইরে যেতে পারবেন না তিনি আরও বলেন, কোন ঐকমত্য ছাড়া অন্যদের জামায়াতের সাথে জোট করার চিন্তাভাবনা থাকলে তিনি হেফাজত ত্যাগ করতে প্রস্তুত অথচ দেখা যায়, এরপরও হেফাজত নেতৃবৃন্দের একটি অংশ সংবাদ-মাধ্যমে জামায়াতের সাথে ঐক্য করার কথা বলে যাচ্ছেন এখানে গুরুতর আপত্তিটা হলো: প্রথমত, হেফাজত একটি অরাজনীতিক সংগঠন এবং দ্বিতীয়ত, কোন রাজনীতিক দলের সাথে ঐক্য গড়ার মানেই হলো হেফাজতকে সমূলে ধ্বংস করা দৃষ্টিকোণে হেফাজত আমীরের অবস্থান যথার্থ তাঁর কথা হলো, অন্য কেউ চাইলে অন্য প্লাটফরম থেকে কোন রাজনীতিক দলের সাথে জোট করতে পারে কিন্তু হেফাজতের নাম ব্যবহার করে নয় গত ৬ই এপ্রিল ২০২৫ রবিবার হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন নেতৃবৃন্দ বিএনপি সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দের সাথে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেন বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় নির্বাচন নিয়ে হেফাজতের বৈঠকের যৌক্তিকতা কোথায়? এভাবে বারবার হেফাজতকে বিতর্কিত করা হচ্ছে যারা এসব করছেন তারা আমীরের কোন কথাই মানছেন না নাই যদি মানা হবে, বর্তমান আমীরকে রেখে লাভ কি? তাঁরও উচিৎ হেফাজতের শীর্ষপদ ছেড়ে দেয়া তাহলে দেখা যাবে কতো ধানে কতো চাল

এভাবে হেফাজতকে বিতর্কিত করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের রাজনীতি আর কতোকাল চলবে? সিন্ডিকেট করে হেফাজতকে সওদাবাজির হাতিয়ার বানানোর দিন কি শেষ হবে না? সেই পুরনো মডেলদের দিয়ে হেফাজতের পদ দখলের সংস্কৃতি আর কতোদিন চলতে দেয়া হবে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, হেফাজতের তরফে কখনো এসব বিষয়ে না তদন্ত করা হয়েছে, না ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে গোলেমালে-গোলেমালে কাটছে দিন আমার মনে হয়, স্বচ্চতার জবাবদিহিতার খাতিরে হেফাজত বিষয়ে সরকার দুদকের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার কে কোথায় কিভাবে লেনদেন করেছে, সব উদঘাটন হওয়া আবশ্যক গোপন সওদাবাজির চিত্র প্রকাশ না পেলে এবং সিন্ডিকেটমুক্ত হেফাজত প্রতিষ্ঠিত করা না গেলে দেশ জাতি বিপদগ্রস্থ হবে হয়তো এক সময় দেখা যাবে, দেশের বাইরের কোন শক্তি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সৎ পরহেজগার তরুণ আলিম-সমাজকে; প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তাঁদেরকেই আমরা চেয়ে আছি তাঁদের পানে আল্লাহ হাফিয

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...