মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

নারী কমিশন রিপোর্ট ও হেফাজতের দাবি

ভাবনা-৫৬

নারী বিষয়ক কমিশনের রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ কমিশনের রিপোর্টে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোতে ভিন্নমত পোষণ করে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। গত ২০শে এপ্রিল রোববার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিষদের (মজলিসে আমেলা) এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উক্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ ছাড়া, আগামী ৩ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে বলে জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। পাশাপাশি আগামী ২৫ এপ্রিল (শুক্রবার) থেকে ২৮ এপ্রিল (সোমবার) পর্যন্ত সারা দেশে জেলা ও থানায় স্থানীয় নেতাকর্মী এবং ওলামায়ে কেরাম গণসংযোগ কর্মসূচি ডেকেছে সংগঠনটি। তাঁরা আরও জানান, ২৫ এপ্রিল জুমার নামাজের পর সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করবে। বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে মহাসমাবেশের ঘোষণা দেন মহাস‌চিব সা‌জিদুর রহমান।

হেফাজতের বিবৃতির ধরন ভাষা সম্পূর্ণ গতানুগতিক এখানে নতুনত্ব বা ব্যতিক্রম বলে কিছু নেই এমনটাই প্রত্যাশিত ছিলোএখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় কিন্তু ২০১০ সালের ১৯শে জানুয়ারী মূলত সংগঠনটি গঠন করা হয়, দেশে গজিয়ে ওঠা এক শ্রেণীর নাস্তিক ব্লগারদের চরম ইসলাম-বিদ্বেষী লেখাজোখার কারণে সেদিন হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠিাতাগণ মনে করেন, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা-ব্যবস্থার কারণে নব্বই ভাগ মুসলিমের দেশে ধরনের নাস্তিকতাচর্চা ইসলামবিরোধী অপতৎপরতার সৃষ্টি ফলে হেফাজতে ইসলাম নাস্তিক ব্লগারদের বিরোধিতার পাশাপাশি উগ্র-সেক্যুলার শিক্ষারও প্রবল বিরোধিতা করতে বাধ্য হয় হেফাজতে ইসলাম মনে করে, মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিশেষত উগ্রহিন্দুত্ববাদের প্রভাব সৃষ্টি করে মুসলিম সন্তানদের মধ্যে ইসলামবিমূখ পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণা গড়ে তুলতে সেক্যুলার শিক্ষা-ব্যবস্থার আয়োজন তাই তাঁরা সমূহ জাতীয় বিপদের আশঙ্কা করে প্রথম থেকেই প্রবল বিরোধিতার পথ বেছে নেয় সঙ্গতকারণে, ২০১৩ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী আল্লামা আহমদ শফী রহ. দেশবাসীর উদ্দেশে ঐতিহাসিক খোলাচিঠি সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশ করেন তখন থেকেই আহমদ শফী হেফাজতে ইসলামের নাম দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে ২০১৭ সালের ১৭ই মে তৎকালীন আমীর আল্লামা আহমদ শফী রহ. মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. কর্তৃক স্বাক্ষরিত প্রথম মূল গঠনতন্ত্রে হেফাজতের ইসলামের সেসব চিন্তাধারার প্রমাণ পাওয়া যায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হেফাজতে ইসলামকে চরম মাত্রায় উস্কে দেয়ার ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী ইসলাম মহানবী সা.কে কটুক্তিকারী ‘থাবাবাবা’ খ্যাত পাপিষ্ঠ রাজিবের বাসায় গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা শোক জানিয়ে তার পরিবারকে সান্ত্বনা জানান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চয়তা দেন সেখানে আরও ছুটে যান শেখ হাসিনার ছেলে জয় শেখ হাসিনা রাজিবের বাসায় গিয়ে তাকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ(!) বলে ঘোষণা দেন ঘটনাটি ঘটলো একেবারে আগুনে ঘি ঢালার মতো হেফাজতে ইসলাম ধরে নিলো নাস্তিক ব্লগারদের এমন ধৃষ্টতার পেছনে আওয়ামী সরকার পুরো পৃষ্ঠপোষকতা করছে এমন কি সাধারণ মানুষও মনে করতে শুরু করে ইসলাম মহানবী সা. সম্পর্কে ব্লগারদের অপতৎপরতার পেছনে আওয়ামী সরকারের ইন্ধন আছে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে দেশহাসিনা সরকার কৌশলে শাপলার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে মৌলবাদ উগ্রবাদের উত্থান তা দমনে তার প্রয়োজনীয়তা দেখাতে ব্যবহার করার চেষ্টা করে

নারী বিষয়ক কমিশনের রিপোর্টে প্রস্তাবিত সুপারিশমালার পেছনে উস্কে দেবার কোন ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার কারণ, এতে বহিঃশক্তির ইন্ধনে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা থাকা মোটেও অসম্ভব নয় আমরা সবাই জানি, মুহূর্তে ভারতীয় আধিপত্যবাদ হিন্দুত্ববাদের নগ্নথাবা আমাদের দিকে তাক করা আছে আমাদের সামান্য আবেগীয় ভুলে দেশ দশের বড় বিপদ হতে পারে বিশেষ করে হেফাজতের মতো বড় সংগঠনের অভ্যন্তরে বাইরের এজেন্ট সক্রিয় থাকার সুযোগ পেলে বা তাদের হয়ে কোন সিন্ডিকেট শাপলা ও মুদিবিরোধী আন্দোলনের মতো সওদাবাজি করলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বিষয়টি আমাদের সবার জানা থাকা দরকার কিছুদিন আগে এক টকশোতে শুনলাম, একজন আলোচক দাবি করছেন: জামায়াত, হেফাজতেও প্রচুর ইন্ডিয়ান এজেন্ট কাজ করছে। বিষয়টি সত্যি হয়ে থাকলে দেশ ও জাতির জন্য কতোটা বিপজ্জনকতা কি ভাবা যেতে পারে? সুতরাং দাবি-দাওয়া উপস্থাপন আদায়ে অত্যন্ত কৌশলি না হলে বলা যায়, আরও একটি বিপর্যয় দরোজার কড়া নাড়ছে হেফাজতের দাবিগুলোর উল্লেখে আরও বিজ্ঞতা বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার দরকার ছিলোদাবিগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত ক্রমানুসারে এখানে তুলে ধরছি:

১. ফ্যাসিবাদের আমলে দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ৫ মে শাপলাসহ সব গণহত্যার বিচার দ্রুত করতে হবে।

২. বহুত্ববাদের পরিবর্তে সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল করতে হবে।

৩. নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশে ধর্মীয় বিধান,ইসলামী উত্তরা‌ধিকার আইন ও পা‌রিবা‌রিক বৈষম্য প্রস্তাব ও কমিশন বাতিল করতে হবে।

৪. ভারতের মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ ও ওয়াকফ আইন বাতিলে ভারত সরকারকে বাধ্য করতে হবে।

৫. ফিলিস্তিন দখলদার মুক্ত করার জন্য বিশ্ব মুসলিম নেতাদের উদ্যোগ গ্রহণ করা।  

দফাগুলো কারা লিখেছেন জানি নাযারাই লিখুননা কেন ভেবে যে লিখেননি তা বলা যায় ধরনের দাবির সন্নিবেশ ঘটানোর পূর্বে দেখতে হবে কোন্ দাবিটি সর্বাধিক সমসাময়িক, গুরুত্বপূর্ণ সর্বাধিক ভাবকে গর্ভধারণ করেসেটিকেই প্রথমে উল্লেখ করতে হবেএক নাম্বার, দুই নাম্বার দিয়ে কিছু কথা লিখে দিলেই দাবি-লিখন হয়ে যায় নাএকটি অভিজ্ঞ প্রশাসন দাবির ক্রম ভাষা থেকেই আপনাদের গভীরতা মেপে নিতে পারেআপনি লাউড স্পীকারে কতোটা চিৎকার করে শ্রোতাদের বিনোদন দিতে পারলেন, সেটা দিয়ে আপনার বাহ্বা আসতে পারে কিন্তু যোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণীত হতে পারে নাদাবি সজ্জিতকরণে আপনারা দুর্বল হলে প্রশাসন একটি দাবির আশ্বাস দিয়ে বা পূরণ করে পুরো আন্দোলনে পানি ঢেলে দিতে পারেএমনটাই হয়েছিলো শাপলার তের দফায়যার ফলে একটি দাবিও আনুষ্ঠানিকভাবে আদায় করা সম্ভব হয়নি

এখানে যেমন ধরুন, প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে ফ্যাসিবাদ আমলে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার এবং শাপলা গণহত্যার বিচারদ্বিতীয় নাম্বার সংবিধানে প্রস্তাবিত বহুত্ববাদ নিয়েতিন নাম্বারে এসেছে নারী বিষয়ক রিপোর্টের কথাটিচার পাঁচ ভারতের ওয়াকফ আইন ফিলিস্তীন বিষয়এখন পাঠকরাই বলুন, সবচেয়ে সমসাময়িক বিষয় কোনটি? নিশ্চয় তিন নাম্বার, তাই না? প্রয়োজন ছিলো বিষয়টি এক নাম্বারে যাবারএখন সরকার যদি বলে বসে: ঠিক আছে, সব দাবি তো একসাথে মানা সম্ভব নয়প্রথমটিই মেনে নিচ্ছিতখন তো হেফাজত বিপদে পড়বেসরকার বলবে, প্রথমটি তো মেনেছিইতাহলে বুঝুন, প্রথমটি মানা হলে মূল এজেন্ডা বিতর্কিত নারীবিষয়ক প্রস্তবানার কি হবে? আন্দোলনে যাবেন? যান! তখন ওজন থাকবে নাদশজনে আপনাদেরকে দুষবে, দাবি জানাতে দুর্বল অবস্থানের জন্যদুনম্বরে  সংবিধানে প্রস্তাবিত বহুত্ববাদ বিষয়টি ঠিক আছেএক নাম্বারে শাপলার বিষয় নিয়ে আসার মধ্যে হেফাজত নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতা পরিলক্ষিত হয়সবাই জানবে, বৃহত্তর  স্বার্থকে পেছনে ফেলে ওরা নিজেদের মামলা থেকে নিষ্কৃতির দাবি তুলছেচার নাম্বারে ওয়াকফ আইন নিয়ে ভারতকে বাধ্য করার অবাস্তব কোন অধিকার বাংলাদেশের আছে কি ভারত যেখানে ভিন্ন রাষ্ট্র? পাঁচ নাম্বারে ফিলিস্তীনকে দখলদারমুক্ত করতে বিশ্বের মুসলিম নেতাদের উদ্যোগী হবার ধারণাটি কেমন? বিষয়টি তো পরিস্কার হলো নাবলা দরকার ছিলো, বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্যোগী করতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকাএই হচ্ছে হেফাজতের আন্দোলনের অন্যতম দুর্বল দিকএগুলো আসলে নেতৃবৃন্দের গুণগত ব্যর্থতার গুরুতর অধ্যায়

যে কথা বলছিলাম। সেই ২০১৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত দেখছি, হেফাজতের মৌলিক কি কোন পরিবর্তন এসেছে? সেই আবেগ; সেই ভাষা; সেই শব্দচয়ন; সেই গতানুগতিতা আজও সম্বল। এতো সময় পার হলো এখনো আমরা কৌশলী হতে শিখিনি, দাবি প্রতিষ্ঠা ও আদায়ের কলাকৌশল রপ্ত করতে শিখিনি। তাই তো আমরা বারেবারে হোঁচট খাই। 

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...