শনিবার, ২৮ জুন, ২০২৫

শাপলার খলনায়কদের পুনর্বাসিত করছে কারা?

 ভাবনা-৫৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

শাপলাবাংলাদেশের কওমী জগতের এক অবিস্মরণীয় চেতনার নাম; অবিচ্ছেদ্য এক মর্যাদাবোধের নাম। এখান থেকে যারা সরে যাবে বা অস্বীকার করবে, তারা কওমী-ঘরানার আর কেউ নন। যেমনটা إنه ليس من أهلك বর্তমান প্রজন্ম হয়তো শাপলার সে ঘটনা থেকে দূরবর্তী কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। জনপরম্পরায় তারা জানে একটা গণহত্যা হয়েছিলো রাতের অন্ধকারে; আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আক্রমণে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। যেহেতু আমার বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য ঘটনার বর্ণনা নয় তাই সেদিকে যাচ্ছি না। এটা সবার জানা দরকার, শাপলার ৬ই এপ্রিলের লংমার্চ এবং ৫ই মার্চের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে একটি গুপ্তমহল তাদের কায়েমী স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা গড়ে তোলে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা হেফাজতে ইসলামের প্রথম আমীর আল্লামা আহমদ শফী রহ.কে কেন্দ্র করে গড়ে তোলে অপ্রতিরোধ্য নেওয়ার্ক যেখানে মহাসচিব হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েন। অসহায়ত্বের এ বিষয়টি তিনি আমাকে তাঁর ইন্তিকালের বছরখানিক আগে নিজ বাড়িতে বসে বর্ণনা করেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম: হযরত, অবরোধ থেকে শাপলায় প্রবেশ কিভাবে সম্ভব হলো? সেটা কি কোন বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো? হয়ে থাকলে আপনার অবস্থান কি ছিলো? আমি এও বললাম, মাও. নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব তো একটি রেজুলুশানের কপি সংবাদ-মাধ্যমে দেখিয়েছেন। হযরত বাবুনগরী রহ. আমাকে কাছে বসিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন: প্রথম থেকেই আমাদের অবরোধের সিদ্ধান্ত ছিলোভেতরে ঢোকার কোন কথা হয়নি। এমন কি আমি ঢাকা পৌঁছার পরও আমাকে জানানো হয়নি। ভিতরে ঢোকার সিদ্ধান্তটি কোন সম্মিলিত বৈঠকেও হয়নি। অমুক-অমুক(নাম প্রকাশ করা হলো না) একটি রেজুলুশান তৈরি করে তাতে আমীর সাহেবের দস্তখত নিয়ে নেয়। সেটা দেখিয়ে সবার দস্তখত আদায় করে। এটাই সংবাদ-মাধ্যমে প্রদর্শিত রেজুলুশানের হাকীকত। হযরতের স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কতো বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী ছিলো।

সিন্ডিকেটের একটি ভীতিকর চিত্র ধরা পড়ে ৫ই মে দুপুরের পর। হেফাজতের প্রাক্তন নেতা ও লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক মুফতী ইজহারুল ইসলাম দা.বা. আমাকে বলেন: তিনি ৫ই মে দুপুরের পর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আশ্রয় নিতে দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে উঠে পড়েন। সেখানে তিনি সিন্ডিকেটের তিন জনকে (নামোল্লেখ করা হলো হলে না) বস্তাভর্তি টাকা গুনতে দেখেন। তাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাকাগুলো একটি রাজনীতিক দলের কাছ থেকে নেয়াবিষয়টি হেফাজতের অন্য একজন নেতাও মুফতী ইজহারুল ইসলাম সাহেবের কাছ থেকে শুনেছেন বলে আমাকে জানান। এ ছাড়া চট্টগ্রামেও অর্থের আদান-প্রদান হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তখনকার হেফাজতে ইসলামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি (নামোল্লেখ করা হলো না) মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা কোটি টাকার উপরে ফান্ডে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। এক সময় হাটহাজারী সদরে তার টাকায় নির্মিত বহুতল ভবন ছিলো যা সম্ভবত পরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। একদিকে এসব নেতা লেনদেনে নিমগ্ন ছিলেন অন্যদিকে নিজেদেরকে নেতা বলে জাহির করে প্রচার-মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতেন। ২০২০ সালে মুদিবিরোধী আন্দোলনে আসা যাক।  এ সময় আওয়ামী সরকার সারা দেশে অর্ধশত আলিম-ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কয়েক হাজার আলিম ও ছাত্রকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এখনও অনেক আলিম-ছাত্র কারাগারে অন্তরীণ। সেই দিনগুলোতে ঐ স্বার্থান্বেষী চক্র যারা শাপলার খলনায়ক হিসাবে পরিচিত, আলিম-উলামার গ্রেফতারে গোপনে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দাসংস্থার অফিসে গিয়ে, হাটহাজারী থানার ওসি রফিকের সাথে সখ্যতা সৃষ্টি করে আলিম-ছাত্রদের গ্রেফতার ও নির্যাতনে যেমন ভূমিকা রাখে তেমনি জামিন নিয়ে বের হতে না পারার জন্য অর্থ দিয়ে তদবীরও করে। তাদের এমন ন্যাক্কারজনক তৎপরতার কথা কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন। রিমান্ডেও এসব তথ্য গোয়েন্দাসংস্থার কোন কোন কর্মকর্তা জানিয়ে দেন। কেউ জামিনে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলে তাকে আবার গেটের বাইরে গ্রেফতার করতে ঐ সিন্ডিকেট থানা ও গোয়েন্দাসংস্থায় রাতদিন তদবীর করতো বলে জানা যায়এভাবে এরা হেফাজতের কারাবন্দীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। ঐ খলনায়কেরা এতোই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে চায়ের দাওয়াতও পায়। এদের একজন তো হাসিনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবে শাপলার খলনায়কেরা কওমী জগতে এক অরাজক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

২০২০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। আমীরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র শ্যালক মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের তৃতীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-৩ এ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অথচ একই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর আল্লামা আহমদ শফী রহ. চট্টগ্রামের একটি ক্লিনিকে স্বাভাবিকভাবে ইন্তিকাল করেন। এটা সবারই জানা। উক্ত মামলার নেপথ্যশক্তি কিন্তু ঐ খলনায়কেরা। মামলায় হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.সহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। কওমী মাদরাসার ইতিহাসে এমন ঘটনার কোন নযীর পাওয়া যায় না। এ ছিলো এক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা। হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীকে বশে নিতে না পেরে শাপলার ঐ খলনায়কদের সহযোগিতায় হাসিনা-সরকার এ মামলা রুজু করে ও অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিশেষ করে জুনায়েদ বাবুনগরীকে ফাঁসাতে শাপলার ধান্ধাবাজ খলনায়কেরা রাতের ঘুম হারাম করে উঠে পড়ে লাগে। এমন কি সরাসরি মিডিয়ায় বক্তব্যও দেয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, জুনায়েদ বাবুনগরী ও তাঁর সহযোগীদের হেনস্থা করা। এরাই মূলত আহমদ শফী রহ. ও জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী যারা দুদিকে দুধরনের কথা বলে পরিস্থিতি বিষময় করে তোলে।

২০২৪র আগস্টে এসব কুলাঙ্গার খলনায়কের দল আওয়ামী লীগের পতনে বিপদে পড়ে যায়। তাদের কেউ আত্মগোপনে চলে যায় আর কেউ নির্বাসিত জীবন গ্রহণ করে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, আগস্ট বিপ্লবের পর যেমন বিএনপি’র একটি বিশ্বাসঘাতক অংশ আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিএনপিতে পুনর্বাসিত করতে থাকে তেমনি কওমীদেরও একটি বিশ্বাসঘাতক অংশ শাপলার খলনায়কদের পুর্বাসনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এরা ঘাঁটি গাড়তে চাইছে ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে। বলাবাহুল্য, জামিয়া বাবুনগর বর্তমান আমীরে হেফাজত মাও. মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর পরিচালনাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এখানেই হযরত অবস্থান করেন। জানা গেছে খলনায়করা তাদের সাথে সম্পর্কিত একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমীরে হেফাজতের ঘনিষ্ট কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করে। এদের মাধ্যমে শাপলার খলনায়কদের কুখ্যাত একজন সবুজ-সংকেত পেয়ে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ করে। সে তার বিরুদ্ধে হাটহাজারীতে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারে আমীরের হস্তক্ষেপ কামনা করে। এমন কি এই খলনায়কের মেয়ের বিয়ের আকদ দেয়ার জন্য আমীরে হেফাজতের উপস্থিতির অনুরোধও করে বসেএ নিয়ে কারামুক্ত হেফাজত-কর্মীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা উক্ত খলনায়কদের বাবুনগরে আসার সবুজ-সংকেত দেয়? কাদের প্রশ্রয়ে ঐ খলনায়ক জামিয়া বাবুনগরে গিয়ে আমীরে হেফাজতকে মেয়ের বিয়েতে দা’ওয়াত দেয় এবং মামলা প্রত্যাহারের তদবীর করার সাহস পায়? প্রসাঙ্গিভাবে বলতে হয়, এ খলনায়ক শাপলার ঘটনার পর বেশ কিছুদিন গ্রেফতার এড়াতে জামিয়া বাবুনগরে আত্মগোপন করেছিলো। হযরত আমীরে হেফাজত একবার আমাকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন: ওকে বিপদের সময় আমিই জায়গা দিয়েছি। আমার ছেলে তার হাতখরচ দিয়েছে। আর সে গোপনে আওয়ামী লীগের সাথে যোগসাজশ করে। অনেকেই জানেন, জনাব আমীরে হেফাজত ২০১৮ সালের ৪ঠা অক্টোবর ইসলামী ঐক্যজোটের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। সেদিন থেকে ঐ খলনায়কেরা বিভিন্নভাবে হযরত মুহিব্বুল্লাহ সাহেবকে মত বদলানোর সমূহ চেষ্টা করে কিন্তু প্রতিবারই হযরত তা প্রত্যাখ্যান করেন। পদত্যাগের পরদিন সংবাদ-মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ঐ খলনায়কদের আওয়ামী এজেন্ট বলে তিরস্কার করেন। আর এখন এরাই বাবুনগরে আসার সাহস পায়! কাদের আস্কারায় এসব হচ্ছে?

আমরা আশ্চর্য হই, যে হয়রত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র সাথে চরম অভদ্র আচরণ করেছিলো সে আজ বাবুনগরে এসে মামলা থেকে বাঁচতে তদবীর করছে। এখানে আমি পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে একটি চিত্র তুলে ধরছি। ২০২০ সালের ১৬ই অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে শাহ আহমদ শফীর জীবনকর্ম, অবদান শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাঈনুদ্দীন রুহী জুনায়েদ বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

আপনি বহুরূপী। আপনি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আপনি একজন বড় প্রতারক। রুমের মধ্যে একরকম, রুমের বাইরে গেলে আরেকরকম। সরকারের কার সঙ্গে কোথায় গেছেন, কার পায়ে ধরেছেন জানা আছে। কার কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছেন, কোন জায়গায় গিয়ে টাকা নিয়েছেন- সব আমাদের জানা আছে। আমরা যদি মুখ খুলি মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারবেন না।বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ‘সাবধান হয়ে যান। মিথ্যা কথা বলবেন না। আপনাকে নিয়ে লোকজন ঠাট্টা করে, হাসাহাসি করে। আমাদের লজ্জা হয়।দেশে বহু নিষিদ্ধ-বিতর্কিত সংগঠনের সঙ্গে বাবুনগরী হাত মিলিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সময়মতো মুখ খুলব। তখন টিকে থাকতে পারবেন না।’ (১৭ই ডিসেম্বর, ২০২০; ডেইলি স্টার বাংলা) এই হলো বাবুনগরী রহ.’র সাথে শাপলার খলনায়কদের ব্যবহার।

আমি আগেই বলেছি, শাপলার ওসব খলনায়কদের কারা কালো থেকে সাদা করতে চাচ্ছে? কারা পুনর্বাসিত করতে চাচ্ছে? এরা আগে থেকেই সিন্ডিকেটের অনুসারী ছিলো। সর্বক্ষণ এরা খলনায়কদের সাথে যোগযোগ রক্ষা করে চলে। ফটিকছড়িতে এরা এখন ধীরেধীরে পাখা মেলতে চাইছে। কিছুদিন আগে এই চক্র জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণসভার আড়ালে মাঠে নামতে চেষ্টা করেছে। যারা তাদেরকে সহায়তা করেছে তারা মোটামুটি চিহ্নিত; সবাই চেনেন। কিন্তু তাদেরও জানা থাকা দরকার: সেরের উপর সোয়া সেরও আছে। কেউ না কেউ জেগে আছে। যারা এসব করছে তাদের আমরা চিনি। তারা বিরত না হলে জাতির সামনে তাদের মুখোশ খুলে দেয়া হবে। এ বিষয়ে জামিয়া বাবুনগর কর্তৃপক্ষেরও নযরদারি দরকার কেউ যেন আমীরে হেফাজত ও জামিয়াকে বিতর্কিত করতে না পারে। আমরা যেন ভুলে না যাই আহমদ শফী রহ.কে কিভাবে বিতর্কিত করা হয়েছিলো। শুধু ফটিকছড়ি নয়, বৃহত্তর চট্টলার তরুণ আলিম-সমাজেরও এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আওয়ায তোলা দরকার।

27.06.2025

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...