রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

ফটিকছড়ির তরুণ উলামা ও স্বতন্ত্র প্লাটফরম

        মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী 

ভাবনা-৬৮

আজ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেও ফটিকছড়ির তরুণ আলিমদের জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগঠন করা খুব উৎসাহের ছিলো না হয় তো বড়জোর কোন সমিতিতে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ছিলো, এতোটুকুইধীরেধীরে দিন বদলেছে; চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে নিজ সমাজের কথা বিবেচনায় নিয়ে তরুণ আলিমদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে তাঁদের মধ্যে রাজনীতি-সচেতনতাও সৃষ্টি হয়েছে উত্তরোত্তর দেখা গেছে, বিভিন্ন ইসলামী রাজনীতিক দলের ছাত্র-সংগঠনে বেড়েছে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা আগে যেখানে কদম বাড়াতো না সেখানে আজ বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে তাঁদের দেখা যাচ্ছে এমন কি যা কখনো কেউ কল্পনা করেনি সেই ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংগঠনের নির্বাচনেও কওমী তরুণ আলিম-ছাত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যাচ্ছে বিষয়টিকে আমি সর্বান্তকরণে স্বাগত জানাই হ্যা, বলতে পারেন, সেখানে নেতিবাচকতার সম্ভাবনাও বিদ্যমান মানছি, কিন্তু ইতিবাচকতার দিকটিকেও তো অস্বীকার করা যায় নাপৃথিবীর প্রত্যেক জিনিসেও হা না এর মিশ্রণ আছে জীবনটাও তো আরাম-ব্যারামের সমাহার এর মধ্য দিয়েই সংগ্রাম করে মানুষকে বেঁচে থাকতে থাকতে হয়এখানেও ব্যাপারটি তেমন 

এক সময় ধর্মীয় গণ্ডির সীমাবদ্ধ জায়গা ছিলো এখন সেই সীমাবদ্ধতাকে আরও উদার করে জায়গা বিস্তৃত করে দেয়া হয়েছে বন্যার পর যেমন পানি সরে গেলে নতুন জেগে ওঠা চরে বানভাসী মানুষ নতুন করে ফলবৃক্ষের চারা পুঁতে দিয়ে তার সীমাকে প্রসারিত করে তেমনি আজকের তরুণ আলিমরাও সংকীর্ণতাকে সরিয়ে নতুন জেগে ওঠা তাঁদের মনস্তাত্বিক চরে নবচেতনার চারা রোপণ করে এক বাঁধভাঙ্গা সমাজ গড়ার মিছিলে হাজির হচ্ছে তাই আমি আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানাই কিন্তু এখানে একটি কথা আছে। তা হলো, আমাদের তরুণ আলিমরা এগিয়ে যাকএটা আমি সর্বান্তকরণে চাই। তবে যাচ্ছেতাইভাবে নয়। যোগ্য না হলে যেমন চাকরীতে যোগদান নয় তেমনি নিজেকে প্রকৃতার্থে যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলার আগে যেন তরুণ আলিমরা নেতৃত্বের জন্য ভুল পদক্ষেপ না নেয়। কারণ, ঘোড়ায় চড়তে শেখার আগে সওয়ার হলে আহত হওয়া অনিবার্য। বিষয়টি মনে রাখতে হবে। প্রশ্ন হলো, কি করে যোগ্য হবেন? আজ সে বিষয়ে বলবো না। পরে বলবো।

আগে বলে এসেছি, মনস্তাত্বিক নতুন চরে চারা রোপণের কথা। আমি সবসময় ভেবেছি, আমাদের তরুণ আলিমদের কোন জায়গাটাতে স্থাপন করা গেলে তাঁরা সমাজে মর্যাদার সাথে স্বীকৃতি পাবেন, স্মরণীয়-বরণীয় হবেন? কখন তাঁরা জাতিকে বোঝাতে পারবেন, তাঁরাই প্রকৃত অভিভাবক বিপদের বন্ধু? এখন পরিচয় পেলে মানুষ মনে করে আমরা জাতির অনুগ্রহে বেঁচে থাকা একটি অবহেলিত প্রজন্ম; দোয়া বিলানোর ভারপ্রাপ্ত ঠিকাদার কিন্তু কেন? এর মূল কারণ, আমাদের আচরণ স্বভাব জাতি ভাবে, মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না তেমনি আমরা অর্থাৎ মাদরাসাওয়ালারাও চাঁদা-সদকা উসূলের রশিদ বই ছাড়া বাঁচি না বছরের দুই ঈদ বিশেষত রোজার ঈদে দোকানে-দোকানে হানা দেয়ার প্রথা বা চিত্র আমাদের আলিম-সমাজের অনুগ্রহপ্রার্থীতাকে করুণভাবে উপস্থাপিত করেআমি বলছি না, মাদরাসার জন্য চাঁদা-সদকা তোলা যাবে না, অবশ্যই যাবে তবে সেটা যেনো সম্ভান্ত অংশকে মাদরাসায় খিদমাত করা থেকে দূরে সরিয়ে না দেয় বা মাদরাসার প্রতি বিরূপ ধারণার সৃষ্টি না করে ইসলামে সৎকাজে অর্থ-সম্পদ সংগ্রহের যেমন নিয়ম আছে তেমনি আত্মমর্যাদাবোধ রক্ষার কথাও আছে আমার মতো মূর্খসূর্খ মানুষ জানে না, সৎকাজে আত্মমর্যাদাবোধকে বিলীন করার কোন কথা আমাদের দ্বীনে আছে কি না প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো বৃটিশ আমলের কথা ইমামুল মুজাহিদীন হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষব্যাপী চরম বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছিলেনইংরেজ গোষ্ঠী উপায়ান্তর না দেখে হায়দ্রাবাদের এক নবাবের শরণাপন্ন হলেন। উল্লেখ্য, নবাব সাহেব প্রতি মাসে দারুল উলূম দেওবন্দে একটি বড় অঙ্কের চাঁদা প্রদান করতেনইংরেজ তাঁকে বোঝালো: তারা মাওলানা হুসাইন আহমদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কারণ, একে তো তিনি হিন্দুস্তানে মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, তার ওপর দেওবন্দের শাইখুল হাদীস। অন্তত নবাব সাহেব যেনো দেওবন্দে একটি চিঠি লিখে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীকে মাদরাসা থেকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। বেচারা নবাব সাহেব ইংরেজদের চাপ বরদাশত করতে না পেরে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম বরাবরে একটি চিঠি লিখলেন: অনতিবিলম্বে দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ যেনো হযরত মাদানীকে মাদরাসা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদায় করে দেন। অন্যথায় তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিমাসের চাঁদা বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন, হাকীমুল ইসলাম কারী তয়্যিব সাহেব রহ.। কারী তয়্যিব সাহেব রহ. চিঠির জবাবে লিখলেন: জনাব, হযরত মাদানী সাহেব মাদরাসার একজন উস্তাদতিনি একদিন মাত্র ছুটি পান। ঐ একদিনেই তিনি আন্দোলন করেন। আর তাতেই ইংরেজদের এ অবস্থা। এখন যদি তাঁকে মাদরাসা থেকে বিদায় করে দিই, তিনি তো পুরো সাত দিন সময় পেয়ে যাবেন। তখন তো ইংরেজদের অবস্থা একদম মরার অবস্থা হবে। এখন আপনিই বলুন, কি করা যায়? নবাব সাহেব আর কোন উচ্চবাচ্য করলেন না। এদিকে কিছুদিন পর বিষয়টি হযরত মাদানী রহ. কোন না কোনভাবে জানতে পেরে কারী তয়্যিব সাহেবের কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। হযরত মুহতামিম সাহেব তখন নবাব সাহেবের চিঠি এবং জওয়াবী খত্ দুটোই হযরত মাদানীর সামনে দিয়ে বললেন, হযরত! এই হলো তাফসীল। তখন হযরত মাদানী রহ. কারী তয়্যিব সাহেবকে বললেন, এক্ষুণি নবাব সাহেবকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিন: তিনি এ পর্যন্ত মাদরাসায় কতো টাকা দিয়েছেন তার হিসাব লিখে পাঠাকমাদরাসা তার সব টাকা ফেরৎ দিয়ে দিবে। তার মনে রাখা উচিৎ, এ মাদরাসা তার চাঁদায় চলে না; আল্লাহর সাহায্যে চলেএটাই সেই আত্মর্যাদাবোধ যার কথা একটু আগে উল্লেখ করে এসেছি। আত্মমর্যাদাবোধ ইসলামের একটি অপরিহার্য দিকবিষয়টি ভুলে থাকার কোন অবকাশ নেই। এদিকটাই আমাদের তরুণ আলিমদের ভাবতে হবে। তাঁদের ভাবতে হবে, আমরা আর কতো দিন নিজেদেরকে সমাজের বোঝা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবো? আর কতোদিন অনুগ্রহপ্রার্থী হিসাবে হিসাবের খাতায় নাম লিখাবো?

এখন সময় এসেছে, আমাদের কওমী তরুণ আলিমদের নতুন করে পথ সৃষ্টি করার যে পথ আকাবীরে উম্মাহর অনুসৃত, তাঁদের বাদ দিয়ে নয়। এ পথে থাকবে ইস্তিকামাত বিল উসূল; ইস্তিকামাত বিল ইতিদাল। আমি জানি তাঁরা হন্য হয়ে তাঁদের পথ খুঁজতে উদগ্রীব। এ মুহূর্তে তাঁদের প্রয়োজন একটি স্বতন্ত্র প্লাটফরম; স্বতন্ত্র সিরাত যেখানে থাকবে আত্মমর্যাদাবোধ, সচেতনতা, আন্তর্জাতিকতা ও ইসলামের তাহরীকে দাওয়াত। আপাতত ফটিকছড়ি হতে পারে তাঁদের প্রাথমিক পরীক্ষাগার। অসংখ্য কওমী মাদরাসা, আলিম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা ফটিকছড়ির মাটি হতে পারে আমাদের তরুণ আলিমদের দারুল ইসলাম। মনে রাখতে হবে, এ লক্ষ্য সহজ নয় সত্য, তবে প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁরা হয়ে উঠবে সময়ের বিশ্বস্ত সৈনিক। কেবল ভারী পকেটের অধিকারী হলেই সমাজ আপনাকে নেতৃত্বের আসনে বসাবেএমন ভুল ধারণা থেকে তরুণ আলিমদের সরে আসতে হবে। আগে নিজের মাঝে যোগ্যতা সৃষ্টি করুন; বিনয় সৃষ্টি করুন; আকাবীর-আসলাফদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নির্মাণ করুন। অন্যথায় প্রচারমুখিতার দুর্গন্ধময় স্রোতে ভেসে যেতে হবেতাম্মাৎ বিল খাইর।

30.08.2025

শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাম্প্রতিক বয়ান ও কিছু কথা।

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৭ 

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রথমত, ফটিকছড়ির সুপ্রাচীন দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া বাবুনগরের সম্মানিত পরিচালক এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অরাজনীতিক দল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান আমীর। বয়স এখন তাঁর (তাঁর কথায় জন্ম:১৯৩৫ সাল) ৯০ বছর। তিনি উপমহাদেশের ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’র দরসে হাদীসের অন্যতম ছাত্র। তাঁর কথায় তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর দারুল উলূম দেওবন্দে হযরত শাইখুল ইসলাম রহ.’র শিষ্যত্বে ছিলেন। জীবনের প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এই বয়োজজ্যেষ্ঠ আলিমে দীনের সহপাঠীরা আজ কেউ বেঁচে নেই। বারবার আশঙ্কাজনক রোগাক্রান্ত অবস্থা থেকে মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের অগণিত ধর্মপ্রাণ মুসলমানের নেতৃত্বে প্রয়োজনে। এখন তাঁর দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিও শূণ্যের কাছাকাছি। তবুও বৃহত্তর স্বার্থের প্রয়োজনে আজও সবার তাগাদায় ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। সবার মনে থাকবার কথা, সাবেক আমীরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র আমলে য্খন হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর দৃষ্টিতে কোন ত্রুটি দেখা দিতো তখন দেশের একমাত্র কাণ্ডারী হিসাবে তিনিই ফটিকছড়ি থেকে দেশবাসীকে সতর্কবার্তা শোনাতেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর সাহসী ও নির্ভীক আওয়াযে সেদিন একদিকে যেমন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতো তেমনি স্বৈরাচারীনী হাসিনা শাহীর মসনদও কেঁপে উঠতো। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমীর মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.(হযরত মুহব্বিুল্লাহ বাবুনগরীর আপন ভাগ্নে)’র ইন্তিকালের পর ২০১৯ সালের ১৯শে আগস্ট আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা. তীব্র অনিচ্ছায় সকল আলিম-ঊলামার একান্ত অনুরোধে হেফাজতে ইসলামের আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরে তিনি আমাকে সরাসরি বলেন: তিনি চোখে কম দেখেন; কানেও কম শুনেন। তিনি আর কতোদিন বাঁচবেন। শরীরও দুর্বল। তাই তিনি দায়িত্ব নিতে চাননি। ওরা(আলিম-উলামা) জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে।

নব্বই বছরের এমন একজন বয়োবৃদ্ধ আলিমের পক্ষে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আমীরে হেফাজতের মতো গুরু দায়িত্ব পালনের ধকল কতো গম্ভীর তা বলাই বাহুল্য। তবুও তিনি সবকিছু উপেক্ষা করে ছুটে যান বিভিন্ন প্রোগ্রামে। ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ফিরতে হয় অবস শরীর নিয়ে। হযরতের এমনি এক প্রোগাম ছিলো গত ৪ঠা আগস্ট, সোমবার বাদমাগরিব ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভাস্থ চৌধুরী সখিনা কমিউনিটি সেন্টারে। হযরত বাবুনগরীর সেদিন প্রোগ্রাম ছিলো সাগরতীরবর্তী চট্গ্রামের দক্ষিণে ৯৭ কি.মি. দূরের পেকুয়া উপজেলায়। সড়কপথে সেখান থেকে যানজট পেরিয়ে নাজিরহাটে আসতে মাগরিবের পর হয়ে যায়। সঙ্গতকারণে, তিনি ছিলেন ক্লান্ত-শ্রান্ত। সফরের ধকল যেন সইতে পারছিলেন না। চৌধুরী সকিনা সেন্টারে তিনি শারীরিক কারণে নামতে চাননি। তবুও তাঁকে নামানো হলো। সেখানে প্রোগ্রামটি ছিলো, ব্যানারে লিখা: আগামীর ফটিকছড়ি বিনির্মাণে উলামায়ে কেরামের করণীয়। সেখানে আমারও আমন্ত্রণ ছিলো। আমি আমার নির্দ্ধারিত সময়ে বক্তব্য রেখে ঘরে চলে আসি। এরপর হযরত আসেন। প্রোগাম শেষ হবার ছত্রিশ ঘন্টা পরে আমাকে কেউ ফোন করে জানান, হযরতের একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিছু রাজনীতিক কর্মী হুযূর সম্পর্কে বাজে কথাবার্তা লিখেছে। এরপর আমি খোঁজখবর নেয়া শুরু করলাম। জানলাম, হুযূর আসন্ন নির্বাচনে হেফাজতের ব্যানারে কেউ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সাথে কোন জোট হবে না। এরপর মাও. মওদূদী সাহেবের অনুসারী জামায়াতে ইসলামের বিষয়ে তিনি আকীদা-সম্পর্কিত কিছু সমালোচনামূলক কথা বলেন। তবে সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা ‘জামায়াত কাদিয়ানী থেকে খারাপ’ মর্মে হযরত বাবুনগরী সাহেব কোন কথা বলেননি বলে জানান। তাঁদের একজন ফটিকছড়ির বরবিল মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাও. শামসুল আলম সাহেব। আমাকে খেলাফত মজলিসের একজন তরুণ নেতা চট্টগ্রাম শহর থেকে ফোন করে বলেন, প্রচার করা হচ্ছে: হযরত বাবুনগরী নাকি বলেছেন, জামায়াত কাদিয়ানী থেকে খারাপ। কেউকেউ বিষয়টিকে রাজনীতিক অপপ্রচার বলে উল্লেখ করেন।

এখানে একটি কথা বলা দরকার। আগে বলে এসেছি, নির্দ্ধারিত প্রোগামের বিষয়বস্তু ছিলো, আগামীর ফটিকছড়ি বিনির্মাণে আলিম-সমাজের করণীয়। সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিলো, একজন বিশেষ প্রার্থীকে চট্টগ্রাম-২ অর্থাৎ ফটিকছড়ি আসন থেকে সংসদীয় প্রার্থী ঘোষণা করা। ব্যানারে উল্লেখ ছিলো কেবল দু’জন মেহমানের নাম: একজন হলেন হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী; অপরজন হলেন, জামিয়া ওবাইদিয়ার পরিচালক হযরত মাও.সালাহ উদ্দীন সাহেব। অথচ এ ধরনের প্রক্রিয়া সমস্ত আলিম-উলামা নিয়ে করতে হয়। যা হোক, জেনেছি, পরে নাকি ফয়সালা হয়েছে: পরবর্তীতে ফটিকছড়ির আলিম-ঊলামা ডেকে ফয়সালা করা হবে ফটিকছড়ি থেকে সবার ঐক্যমতের প্রার্থী কে হবেন। আমার মনে হয়, এ ধরনের প্রচেষ্টা হযরত বাবুনগরীর পছন্দ  করেননি। সেদিক থেকেও তাঁর ক্ষোভ ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই হযরত বাবুনগরীর কাছে অস্বস্তিকর ঠেকে।

এখানে কিছু প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়। বিষয়গুলো হলো, মাহফিলের সভাপতি ছিলেন, জামিয়া বাবুনগরের সহকারী পরিচালক মাও. আইয়ুব বাবুনগরী সাহেব। বিশেষ অতিথি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক ও প্রার্থী মাও. শেখ শাহজাহান সাহেব ও আয়োজকবৃন্দ। আমি নিশ্চিত তাঁরা জানতেন হযরত বাবুনগরী কি বলেছেন বা কি বলেননি। দেখা যায়, বিতর্ক ওঠার ছত্রিশ ঘণ্টা পরও তাঁদের কেউই হযরত বাবুনগরীর বিষয় নিয়ে কোন কথা বলেননি বা জবাব তুলে ধরেননি। বিষয়টি রহস্যজনক। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, হযরত বাবুনগরীর পক্ষে কথা বলার কেউ নেই? তাঁরা সব জেনেশুনে হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে অকথ্য ভাষায় কুৎসাকারীদের পক্ষ থেকে গালি-গালাজ করার পরও বুঝেশুনে নীরব থেকেছেন বলে কি ধরে নিতে হবে? বিল্ আখির প্রশ্ন হলো, এসব খেলা আর কতোদিন চলবে? তাঁরা কি জানেন না, হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী নতুন কিছু বলেননি? তিনি তো যুগযুগ ধরে চলে আসা উলামায়ে হক্কানীর কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। মাও. মওদূদী সাহেব ও তাঁর দলের ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে কথা তো নতুন নয়। ইসমাতে আম্বিয়া, মি’য়ারে হক্কে সাহাবীয়ে রাসূল সা. ইত্যাদি নিয়ে তর্ক কি নতুন? আশির দশকে দেখেছি, কওমী ছাত্রদের মধ্যে; উলামা হযরাতের মধ্যে এসব বিষয়ে বিস্তারিত মুতালিয়া, মুযাকিরা, মুবাহিসা, মুনাযিরা হতো। এখন তো সব গেছে। অনেকেই জানে না; ভ্রান্ত আকীদাগুলো কি কি। যা জানেনভাসা ভাসা। হ্যা, কথা হলো একটি জায়গায় একটি তর্ক করা যায়। তা হলো, সময়জ্ঞানে কখনো-কখনো পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা, না বলা; বলার কৌশল ঠিক করা ইত্যাদিতে মুসলিহাহ্ থাকতে পারে। সেখানে যদি কোন ফাঁক থেকে থাকে সেটাকে আমরা মেরামত করবো; সে কথা বলবো। কিন্তু প্রতিপক্ষের ইলযামে নীরব থাকবো কেন? এটা কোন ধরনের পুরুষত্ব?

আমার মনে হয়, ফটিকছড়ির গুরুত্বপূর্ণ আলিমদের ডেকে এ বিষয়ে পরামর্শ নেয়া উচিৎ। এখন হযরত বাবুনগরী বলছেন, বাকিরা চুপ করে আছেন। বললে পরামর্শ করে সবাই বলবেন আর চুপ থাকলে পরামর্শ করে সবাই চুপ থাকবেন। বিভক্তি কেন? আল্লাহ হাফিয।

07.08.2025

 

বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫

বিএনপি’র মাদরাসা পরিদর্শন ও বামপন্থী ভাবধারা

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৬ 

গত ১লা আগস্ট ২০২৫, শুক্রবার বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব নজরুল ইসলাম খান ও সালাহ উদ্দীনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসা পরিদর্শন ও ফটিকছড়িতে জামিয়া বাবুনগরে হেফাজত আমীরের সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নির্দেশে তাঁরা এ সফর করেন। বিষয়টি নিয়ে আম জনতায় বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের ভেতরে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপি হঠাৎ করে কেন হেফাজতের দূর্গে পা রাখলো সে বিষয়ে নানা গুঞ্জন থাকা স্বাভাবিক। বাহ্যত বিষয়টিকে সরলভাবে দেখা হলেও প্রকৃতার্থে সরল ছিলো না। এর পেছনে কিন্তু রাজনীতির ছাপকে সহজে বোঝা যায়। আমার যতোটুকু মনে হয়, সফরটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। কারণ, বিএনপি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সফর করেছে কিন্তু সুদূর অতীতে কখনো হাটহাজারী মাদরাসা বা আলিম-উলামাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেএমন নযীর আমি পাইনি। শাপলার আন্দোলন, মুদিবিরোধী আন্দোলনঅনেক কিছুই তো হলো, বিএনপিকে এমন সফর করতে দেখা যায়নি। মনে আছে, শাপলার রাতে বেগম খালেদা জিয়া যখন নেতাকর্মীদেরকে হেফাজতের পাশে দাঁড়াতে বলেন, তখনও বিএনপি নেতৃবৃন্দ তাতে সাড়া দেননি। এর পর অনেক সময় গড়িয়েছে, অনেক সূর্য উঠেছে-ডুবেছে, বিএনপি প্রত্যক্ষভাবে নিগৃহীত আলিম-উলামার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায় না। কেন জানি মনে হয়, অজানা কারণে বিএনপি দীর্ঘদিন থেকে আলিম-উলামার সাথে একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। যতোটুকু জানা যায়, চারদলীয় জোটের বিজয়ের পর বিএনপি যখন ক্ষমতাসীন হয়, দেখা যায়, আলিম-উলামার সাথে বিএনপি একটি বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। অভিযোগ আছে, বিএনপি নেতৃত্ব চারদলীয় আন্দোলন চলাকালে আলিম নেতৃবৃন্দকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সে সময় বিএনপি’র মহাসচিব ছিলেন প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভুইয়াঁ। অথচ চারদলীয় জোটের আন্দোলন ও জোটের বিজয়ে আলিম-উলামার বিশাল অবদান অনস্বীকার্য। তৎকালীন চারদলীয় জোটের অন্যতম নেতা মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী একবার আমাকে আব্দুল মান্নান ভুইয়াঁর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেখান যেখানে তাঁকে একটি দেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পরে রক্ষা করা হয়নি। আমি এখানে তিনি রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনে সক্ষম কি সক্ষম নয়সে প্রশ্ন না তুলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নযীরটি তুলে ধরছি। অভিযোগ রয়েছে, চারদলীয় জোটের অন্যতম সহযোগী জামায়াতের প্ররোচনায় কওমী আলিম নেতৃবৃন্দকে বিএনপি মূল্যায়ন করেনি।

আমি একটি কথা দীর্ঘদিন থেকে বিশ্বাস করি। তা হলো, আওয়ামী লীগ আত্মস্বীকৃত সেক্যুলার এবং বিএনপি অঘোষিত সেক্যুলার দল। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি গঠিত হয়েছিলো মূলত মাও. আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রহ.’র ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের অধিকাংশ সদস্য নিয়ে। এই যে বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীক দেখছেন সেটাও ভাসানী ন্যাপের। তখন ছিলো ‘ধানের ছড়া’ আর বিএনপি সেটাকে বানালো ‘ধানের শীষ’। ভাসানী ন্যাপের ছায়ায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় বামপন্থী সেক্যুলাররা জিয়ার দেশ গড়ার আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেয়। কিন্তু বেশ ক’জন যোগ দেয়া নেতা বিএনপিতে থেকেও তাদের বামপন্থী ও সেক্যুলার ধ্যান-ধারণামুক্ত হতে পারেননি। ফলে জিয়ার জবিদ্দশায় এসব নেতা নিজেদের খোলস ছেড়ে বের হতে না পারলেও বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে ঠিক-ই খোলস ছেড়ে কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। তবে প্রকাশ্যে নয়। বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুইয়া ও বর্তমান মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে দলেরই অন্তর্ভুক্ত। এরা সবাই এসেছেন বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন থেকে। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বেগম খালেদা জিয়াও মহাসচিব নিয়োগে এসব কট্টরপন্থী বাম সেক্যুলারদের বেছে নেন। এরাই মূলত বিএনপিকে ভেতর থেকে সেক্যুলার রঙ দিতে তৎপর হয় এবং জিয়ার বিএনপিকে আদর্শহীন করে তোলে। বর্তমানে একজন বিশিষ্ট টকশো আলোচককে দাবি করতে শুনেছি, ২০১৩ সালের শাপলার ক্র্যাকডাউন নিয়ে শেখ হাসিনা যে গোপন বৈঠক ডাকেন তাতে বর্তমান বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসও উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দেখলাম কেউ কথা বলেননি। সারকথা হলো, বিএনপি এখন আর জিয়ার বিএনপি নেই। এর প্রমাণ পাই, মির্জা ফখরুলের বিভিন্ন বয়ানে। তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতে গিয়ে সেখানকার সাংবাদিকদেরকে বলেছিলেন‘বিএনপি শরীয়া আইনে বিশ্বাস করে না।’(২৯শে ডিসেম্বর ২০১৮, দৈনিক ইত্তেফাক) দেখুন কথাটি কতোই মারাত্মক। একেজন মুসলমান এ কথা বলার পর মুসলিম থাকে কি না; তার বিয়ের শরয়ী বন্ধন অটুট থাকে কি না; তাওবা ও বিবাহ নবায়ন ব্যতিরেকে মুসলমানের কবরস্থানে তাকে কবর দেয়া বৈধ কি নাএসব বিষয়ে ফয়সালা হওয়া দরকার ছিলো। আশ্চর্য হলাম, দেশের কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্ন তোলা হয়নি। অথচ বিএনপিকে কেউকেউ বলেন: ইসলামী মনোভাবাপন্ন। ধারণাটির কোন ভিত্তি আছে বলে মনে করি না। হ্যা, বিএনপির সেক্যুলার আওয়ামী লীগের মতো উগ্র ও ইসলামবিদ্বেষী নয়। জনাব ফখরুল ইতোমধ্যে মন্তব্য করেছেন: রাজনীতিতে ডানপন্থী বা দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে তিনি শঙ্কিত।(২৯শে জুলাই, ২০২৫, প্রথম আলো) এখানে তিনি জামায়াতের দিকে আঙ্গুল তোলেননি, তুলেছেন আলিম-উলামার দিকে। তিনি শঙ্কিত হলে তো জামায়াতের কথা বলতেন। জামায়াতও তো দক্ষিণপন্থী। তাদেরকেই তো মন্ত্রীত্ব দিয়ে গাড়িতে জনাব ফখরুলরা জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। মনে আছে সে কথা? এসব লোকের কাছে আমাদের আলিম-উলামার কেউ যখন কোন সুবিধা নিতে যান তখন তো আমাদেরও লজ্জিত হতে হয়।


বিএনপি এখন আর ডানপন্থী কোন দল নয়। তাই তো মির্জা ফখরুলদের এই শঙ্কা। মহাসচিব পদে তাঁর নিয়োগে একটি পত্রিকা খবর করে, ‘ডানমুখী বিএনপিতে আবার বাম ঘরানার মহাসচিব।’(বিডি নিউজ ২৪ ডট কম, ৩০শে মার্চ ২০১৬) আওয়ামী লীগ থেকে আসা ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট ফজলুর রহমানের মাদরাসা ও ইসলামপন্থীদের নিয়ে কুৎসিৎ ও কটাক্ষপূর্ণ বক্তব্য সম্পর্কে সবাই জানেন। এগুলো মূলত বিএনপি’র বাম দিকে রথযাত্রার প্রধান নিদর্শন। উল্লেখ্য, বিএনপির মধ্যে এ অবক্ষয় শুরু হয় প্রধানত সাবেক মহাসচিব মারহুম আব্দুস সালাম তালুকদারের ইন্তিকালের পর থেকে। শুধু ধর্মীয় দিক বলে কথা নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে বিএনপি’র নমনীয় অবস্থান এবং ভারতের সহানুভূতি অর্জনের প্রচেষ্টার পেছনে এই বামপন্থী লবীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। সর্বশেষে ড. ইউনুস সরকার আসার পর আওয়ামী লীগ, ফ্যাসিবাদের বিচার, সংস্কার ও নানা প্রশ্নে বিএনপি জনগণের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া শুরু করে। বিষয়গুলো জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অভিযোগ আছে, ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়াও এসব বামপন্থী লবীর প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে কট্টর আওয়ামী লীগার ড. কামালের ইমামতিতে হাসিনার গ্যাঁড়াকলে বিএনপিকে ফাঁসানোর নেপথ্য নায়ক বর্তমান মহাসচিব এই বামপন্থী ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মূলত এরাই জিয়ার বিএনপিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। তা না হলে, বিএনপি নেতা আমীর খসরুকে বিজেপি নেতা অমিত শাহের সামনে মাথা নত করে দাসসুলভ নিবেদনের কি রহস্য আছে? জাতি এসব জানতে চায়। ১৯৯১ সালের এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের কথা সবার জানা আছে। সে সময় জনঅভুত্থানের বড় শক্তি ছিলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্র দল। সেই ছাত্রদলকে তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুইয়াঁ দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে দেন। ফলে বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়ার দৃশ্য বিএনপিকে নীরবে সহ্য করতে হয়। তাদের কিছুই করার ছিলো না। এ ছিলো এক লজ্জাষ্কর অধ্যায়। এমন কি বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদ নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়াও দেখাতে পারেনি নেতৃবৃন্দ। এ ব্যর্থতায় ফখরুলের পদত্যাগ করা ছিলো তাঁর নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু করেননি। এর একটি বড় কারণ, বামপন্থী মেজাজের এসব নেতৃবৃন্দ সম্ভবত ডানপন্থী বেগম খালেদা জিয়াতে স্বস্তিতে ছিলেন না। বরঞ্চ হাসিনার আমলে বেগম জিয়ার কারান্তরীণ ও গৃহবন্দীত্বে বামপন্থী নেতারা স্বস্তিতেই ছিলেন বলে মনে হয়। তা না হলে, বেগম জিয়ার জন্য তাঁরা ফলপ্রসূ কী করতে পেরেছিলেন? কোন জবাব আছে?

এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলো: শহীদ জিয়ার বিএনপি’র এ দশা হলো কি করে? বিষয়টি বোঝার জন্য বিএনপি’র ইতিহাস বোঝা দরকার। তার আগে একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন। প্রশ্নটি হলো, কেন শহীদ জিয়া দল গঠন করেছিলেন? শুনুন তবে খোদ জিয়ার লেখায়, “এখন আপনারা দেখছেন রাজনীতি কত বড় শক্ত কাজ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে জনগণের টার্গেট করতে হবে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও জনগণ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও দর্শনএ দুটোকে মিলিয়ে দিতে হবে। তাহলেই আমরা সফল হবো।”(আমার রাজনীতির লক্ষ্য, শহীদ জিয়ার রাজনীতির লক্ষ্য বিএনপি’র গোড়ার কথা পৃ:২২, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯, সম্পাদনা: অধ্যাপক মাজিদুল ইসলাম, ঢাকা) কি সেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ? বিএনপি’র ক’জন নেতা আজ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করে? বিশ্বাস করে? খোদ তারেক রহমানই কি বোঝেন এই দর্শন? বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মানে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা; ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের প্রতিকল্প এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম। আজ সেখানে বিএনপি’র তথাকথিত নেতারা ভারতের বেদীতে পূজোর আস্বাদ নিতে দিওয়ানা। যেদিন থেকে এসব বাম ঘরানার নেতারা বিএনপিতে ধীরেধীরে তাদের সেক্যুলার ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে নকশা সৃষ্টি করে সেদিন থেকে বিএনপি আর জিয়ার বিএনপি থাকেনি; জনগণের বিএনপি হয়ে ওঠেনি।

অতিসম্প্রতি বিএনপি’র বাম ঘরানার নেতারা ইসলাম, মাদরাসা ও আলিম-উলামা নিয়ে যেসব আপত্তিকর মন্তব্য করছেন তাতে দেশব্যাপী মুসলিম জনাসাধরণে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এডভোকেট ফজলুর রহমানের আপত্তিকর মন্তব্যে আলিম-উলামার বিক্ষুব্ধ হন। বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডে আলোচিত হয় গুরুত্বের সাথে। সঙ্গতকারণে, আলিম-উলামার দূর্গ বলে খ্যাত হাটহাজারী মাদরাসা ও হেফাজত-আমীরের জামিয়া বাবুনগর পরিদর্শনের দৃশ্য সামনে আসে। এতে বিএনপি’র কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে হয়। এক, নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সম্পর্কে আলিম-উলামার প্রতিক্রিয়া জানা; দুই, আলিম-উলামার সাথে মতবিনিময়ে ক্ষোভ প্রশমিত করা ও তিন, জাতিকে একটি বার্তা দেয়া। আগেও বলেছি, বর্তমান বিএনপি তার উৎসগত আদর্শ থেকে সরে গিয়ে বামঘেষা নীতিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। এর দায় কেবল ঢুকে পড়া বামপন্থী নেতাদের নয় খোদ বেগম খালেদা জিয়াকেও নিতে হবে। তিনি একের পর এক নির্বিচারে বামপন্থী নেতাদের হাতে দলটিকে ছেড়ে দিয়েছেন। আজ সেটাই জাতির ঘাড়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ তৃণমূলের নেতারা এখনও সেসব নর্দমায়িত চিন্তাধারায় আক্রান্ত হননি।

উক্ত সফর নিয়ে হেফাজতে ইসলামের কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আছে কি না, আমার জানা নেই। যদি না থাকে তা দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, এসব বিষয় অস্পষ্ট থাকলে তা জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। আল্লাহ হাফিয।

06.08.2025