মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৬৮
আজ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেও ফটিকছড়ির তরুণ আলিমদের জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগঠন করা খুব উৎসাহের ছিলো না। হয় তো বড়জোর কোন সমিতিতে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ছিলো, এতোটুকুই। ধীরেধীরে দিন বদলেছে; চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে। নিজ ও সমাজের কথা বিবেচনায় নিয়ে তরুণ আলিমদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তাঁদের মধ্যে রাজনীতি-সচেতনতাও সৃষ্টি হয়েছে উত্তরোত্তর। দেখা গেছে, বিভিন্ন ইসলামী রাজনীতিক দলের ছাত্র-সংগঠনে বেড়েছে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা। আগে যেখানে কদম বাড়াতো না সেখানে আজ বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে তাঁদের দেখা যাচ্ছে। এমন কি যা কখনো কেউ কল্পনা করেনি সেই ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংগঠনের নির্বাচনেও কওমী তরুণ আলিম-ছাত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টিকে আমি সর্বান্তকরণে স্বাগত জানাই। হ্যা, বলতে পারেন, সেখানে নেতিবাচকতার সম্ভাবনাও বিদ্যমান। মানছি, কিন্তু ইতিবাচকতার দিকটিকেও তো অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীর প্রত্যেক জিনিসেও হা ও না এর মিশ্রণ আছে। জীবনটাও তো আরাম-ব্যারামের সমাহার। এর মধ্য দিয়েই সংগ্রাম করে মানুষকে বেঁচে থাকতে থাকতে হয়। এখানেও ব্যাপারটি তেমন।এক সময় ধর্মীয় গণ্ডির সীমাবদ্ধ জায়গা ছিলো। এখন সেই সীমাবদ্ধতাকে আরও উদার করে জায়গা বিস্তৃত করে দেয়া হয়েছে। বন্যার পর যেমন পানি সরে গেলে নতুন জেগে ওঠা চরে বানভাসী মানুষ নতুন করে ফলবৃক্ষের চারা পুঁতে দিয়ে তার সীমাকে প্রসারিত করে তেমনি আজকের তরুণ আলিমরাও সংকীর্ণতাকে সরিয়ে নতুন জেগে ওঠা তাঁদের মনস্তাত্বিক চরে নবচেতনার চারা রোপণ করে এক বাঁধভাঙ্গা সমাজ গড়ার মিছিলে হাজির হচ্ছে। তাই আমি আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানাই। কিন্তু এখানে একটি কথা আছে। তা হলো, আমাদের তরুণ আলিমরা এগিয়ে যাক—এটা আমি সর্বান্তকরণে চাই। তবে যাচ্ছেতাইভাবে নয়। যোগ্য না হলে যেমন চাকরীতে যোগদান নয় তেমনি নিজেকে প্রকৃতার্থে যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলার আগে যেন তরুণ আলিমরা নেতৃত্বের জন্য ভুল পদক্ষেপ না নেয়। কারণ, ঘোড়ায় চড়তে শেখার আগে সওয়ার হলে আহত হওয়া অনিবার্য। বিষয়টি মনে রাখতে হবে। প্রশ্ন হলো, কি করে যোগ্য হবেন? আজ সে বিষয়ে বলবো না। পরে বলবো।
আগে বলে এসেছি, মনস্তাত্বিক নতুন চরে চারা রোপণের কথা। আমি সবসময় ভেবেছি, আমাদের তরুণ আলিমদের কোন জায়গাটাতে স্থাপন করা গেলে তাঁরা সমাজে মর্যাদার সাথে স্বীকৃতি পাবেন, স্মরণীয়-বরণীয় হবেন? কখন তাঁরা জাতিকে বোঝাতে পারবেন, তাঁরাই প্রকৃত অভিভাবক ও বিপদের বন্ধু? এখন পরিচয় পেলে মানুষ মনে করে আমরা জাতির অনুগ্রহে বেঁচে থাকা একটি অবহেলিত প্রজন্ম; দোয়া বিলানোর ভারপ্রাপ্ত ঠিকাদার। কিন্তু কেন? এর মূল কারণ, আমাদের আচরণ ও স্বভাব। জাতি ভাবে, মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না তেমনি আমরা অর্থাৎ মাদরাসাওয়ালারাও চাঁদা-সদকা উসূলের রশিদ বই ছাড়া বাঁচি না। বছরের দুই ঈদ বিশেষত রোজার ঈদে দোকানে-দোকানে হানা দেয়ার প্রথা বা চিত্র আমাদের আলিম-সমাজের অনুগ্রহপ্রার্থীতাকে করুণভাবে উপস্থাপিত করে। আমি বলছি না, মাদরাসার জন্য চাঁদা-সদকা তোলা যাবে না, অবশ্যই যাবে। তবে সেটা যেনো সম্ভান্ত অংশকে মাদরাসায় খিদমাত করা থেকে দূরে সরিয়ে না দেয় বা মাদরাসার প্রতি বিরূপ ধারণার সৃষ্টি না করে। ইসলামে সৎকাজে অর্থ-সম্পদ সংগ্রহের যেমন নিয়ম আছে তেমনি আত্মমর্যাদাবোধ রক্ষার কথাও আছে। আমার মতো মূর্খসূর্খ মানুষ জানে না, সৎকাজে আত্মমর্যাদাবোধকে বিলীন করার কোন কথা আমাদের দ্বীনে আছে কি না। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। বৃটিশ আমলের কথা। ইমামুল মুজাহিদীন হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষব্যাপী চরম বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। ইংরেজ গোষ্ঠী উপায়ান্তর না দেখে হায়দ্রাবাদের এক নবাবের শরণাপন্ন হলেন। উল্লেখ্য, নবাব সাহেব প্রতি মাসে দারুল উলূম দেওবন্দে একটি বড় অঙ্কের চাঁদা প্রদান করতেন। ইংরেজ তাঁকে বোঝালো: তারা মাওলানা হুসাইন আহমদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কারণ, একে তো তিনি হিন্দুস্তানে মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, তার ওপর দেওবন্দের শাইখুল হাদীস। অন্তত নবাব সাহেব যেনো দেওবন্দে একটি চিঠি লিখে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীকে মাদরাসা থেকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। বেচারা নবাব সাহেব ইংরেজদের চাপ বরদাশত করতে না পেরে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম বরাবরে একটি চিঠি লিখলেন: অনতিবিলম্বে দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ যেনো হযরত মাদানীকে মাদরাসা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদায় করে দেন। অন্যথায় তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিমাসের চাঁদা বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন, হাকীমুল ইসলাম কারী তয়্যিব সাহেব রহ.। কারী তয়্যিব সাহেব রহ. চিঠির জবাবে লিখলেন: জনাব, হযরত মাদানী সাহেব মাদরাসার একজন উস্তাদ। তিনি একদিন মাত্র ছুটি পান। ঐ একদিনেই তিনি আন্দোলন করেন। আর তাতেই ইংরেজদের এ অবস্থা। এখন যদি তাঁকে মাদরাসা থেকে বিদায় করে দিই, তিনি তো পুরো সাত দিন সময় পেয়ে যাবেন। তখন তো ইংরেজদের অবস্থা একদম মরার অবস্থা হবে। এখন আপনিই বলুন, কি করা যায়? নবাব সাহেব আর কোন উচ্চবাচ্য করলেন না। এদিকে কিছুদিন পর বিষয়টি হযরত মাদানী রহ. কোন না কোনভাবে জানতে পেরে কারী তয়্যিব সাহেবের কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। হযরত মুহতামিম সাহেব তখন নবাব সাহেবের চিঠি এবং জওয়াবী খত্ দুটোই হযরত মাদানীর সামনে দিয়ে বললেন, হযরত! এই হলো তাফসীল। তখন হযরত মাদানী রহ. কারী তয়্যিব সাহেবকে বললেন, এক্ষুণি নবাব সাহেবকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিন: তিনি এ পর্যন্ত মাদরাসায় কতো টাকা দিয়েছেন তার হিসাব লিখে পাঠাক। মাদরাসা তার সব টাকা ফেরৎ দিয়ে দিবে। তার মনে রাখা উচিৎ, এ মাদরাসা তার চাঁদায় চলে না; আল্লাহর সাহায্যে চলে। এটাই সেই আত্মর্যাদাবোধ যার কথা একটু আগে উল্লেখ করে এসেছি। আত্মমর্যাদাবোধ ইসলামের একটি অপরিহার্য দিক—বিষয়টি ভুলে থাকার কোন অবকাশ নেই। এদিকটাই আমাদের তরুণ আলিমদের ভাবতে হবে। তাঁদের ভাবতে হবে, আমরা আর কতো দিন নিজেদেরকে সমাজের বোঝা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবো? আর কতোদিন অনুগ্রহপ্রার্থী হিসাবে হিসাবের খাতায় নাম লিখাবো?
এখন সময় এসেছে, আমাদের কওমী তরুণ আলিমদের নতুন করে পথ সৃষ্টি করার যে পথ আকাবীরে উম্মাহর অনুসৃত, তাঁদের বাদ দিয়ে নয়। এ পথে থাকবে ইস্তিকামাত বিল উসূল; ইস্তিকামাত বিল ই’তিদাল। আমি জানি তাঁরা হন্য হয়ে তাঁদের পথ খুঁজতে উদগ্রীব। এ মুহূর্তে তাঁদের প্রয়োজন একটি স্বতন্ত্র প্লাটফরম; স্বতন্ত্র সিরাত যেখানে থাকবে আত্মমর্যাদাবোধ, সচেতনতা, আন্তর্জাতিকতা ও ইসলামের তাহরীকে দা’ওয়াত। আপাতত ফটিকছড়ি হতে পারে তাঁদের প্রাথমিক পরীক্ষাগার। অসংখ্য কওমী মাদরাসা, আলিম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা ফটিকছড়ির মাটি হতে পারে আমাদের তরুণ আলিমদের দারুল ইসলাম। মনে রাখতে হবে, এ লক্ষ্য সহজ নয় সত্য, তবে প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁরা হয়ে উঠবে সময়ের বিশ্বস্ত সৈনিক। কেবল ভারী পকেটের অধিকারী হলেই সমাজ আপনাকে নেতৃত্বের আসনে বসাবে—এমন ভুল ধারণা থেকে তরুণ আলিমদের সরে আসতে হবে। আগে নিজের মাঝে যোগ্যতা সৃষ্টি করুন; বিনয় সৃষ্টি করুন; আকাবীর-আসলাফদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নির্মাণ করুন। অন্যথায় প্রচারমুখিতার দুর্গন্ধময় স্রোতে ভেসে যেতে হবে। তাম্মাৎ বিল খাইর।
30.08.2025

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন