শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাম্প্রতিক বয়ান ও কিছু কথা।

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৭ 

আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রথমত, ফটিকছড়ির সুপ্রাচীন দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া বাবুনগরের সম্মানিত পরিচালক এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অরাজনীতিক দল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান আমীর। বয়স এখন তাঁর (তাঁর কথায় জন্ম:১৯৩৫ সাল) ৯০ বছর। তিনি উপমহাদেশের ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’র দরসে হাদীসের অন্যতম ছাত্র। তাঁর কথায় তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর দারুল উলূম দেওবন্দে হযরত শাইখুল ইসলাম রহ.’র শিষ্যত্বে ছিলেন। জীবনের প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এই বয়োজজ্যেষ্ঠ আলিমে দীনের সহপাঠীরা আজ কেউ বেঁচে নেই। বারবার আশঙ্কাজনক রোগাক্রান্ত অবস্থা থেকে মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের অগণিত ধর্মপ্রাণ মুসলমানের নেতৃত্বে প্রয়োজনে। এখন তাঁর দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিও শূণ্যের কাছাকাছি। তবুও বৃহত্তর স্বার্থের প্রয়োজনে আজও সবার তাগাদায় ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। সবার মনে থাকবার কথা, সাবেক আমীরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র আমলে য্খন হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর দৃষ্টিতে কোন ত্রুটি দেখা দিতো তখন দেশের একমাত্র কাণ্ডারী হিসাবে তিনিই ফটিকছড়ি থেকে দেশবাসীকে সতর্কবার্তা শোনাতেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর সাহসী ও নির্ভীক আওয়াযে সেদিন একদিকে যেমন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতো তেমনি স্বৈরাচারীনী হাসিনা শাহীর মসনদও কেঁপে উঠতো। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমীর মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.(হযরত মুহব্বিুল্লাহ বাবুনগরীর আপন ভাগ্নে)’র ইন্তিকালের পর ২০১৯ সালের ১৯শে আগস্ট আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা. তীব্র অনিচ্ছায় সকল আলিম-ঊলামার একান্ত অনুরোধে হেফাজতে ইসলামের আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরে তিনি আমাকে সরাসরি বলেন: তিনি চোখে কম দেখেন; কানেও কম শুনেন। তিনি আর কতোদিন বাঁচবেন। শরীরও দুর্বল। তাই তিনি দায়িত্ব নিতে চাননি। ওরা(আলিম-উলামা) জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে।

নব্বই বছরের এমন একজন বয়োবৃদ্ধ আলিমের পক্ষে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আমীরে হেফাজতের মতো গুরু দায়িত্ব পালনের ধকল কতো গম্ভীর তা বলাই বাহুল্য। তবুও তিনি সবকিছু উপেক্ষা করে ছুটে যান বিভিন্ন প্রোগ্রামে। ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ফিরতে হয় অবস শরীর নিয়ে। হযরতের এমনি এক প্রোগাম ছিলো গত ৪ঠা আগস্ট, সোমবার বাদমাগরিব ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভাস্থ চৌধুরী সখিনা কমিউনিটি সেন্টারে। হযরত বাবুনগরীর সেদিন প্রোগ্রাম ছিলো সাগরতীরবর্তী চট্গ্রামের দক্ষিণে ৯৭ কি.মি. দূরের পেকুয়া উপজেলায়। সড়কপথে সেখান থেকে যানজট পেরিয়ে নাজিরহাটে আসতে মাগরিবের পর হয়ে যায়। সঙ্গতকারণে, তিনি ছিলেন ক্লান্ত-শ্রান্ত। সফরের ধকল যেন সইতে পারছিলেন না। চৌধুরী সকিনা সেন্টারে তিনি শারীরিক কারণে নামতে চাননি। তবুও তাঁকে নামানো হলো। সেখানে প্রোগ্রামটি ছিলো, ব্যানারে লিখা: আগামীর ফটিকছড়ি বিনির্মাণে উলামায়ে কেরামের করণীয়। সেখানে আমারও আমন্ত্রণ ছিলো। আমি আমার নির্দ্ধারিত সময়ে বক্তব্য রেখে ঘরে চলে আসি। এরপর হযরত আসেন। প্রোগাম শেষ হবার ছত্রিশ ঘন্টা পরে আমাকে কেউ ফোন করে জানান, হযরতের একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিছু রাজনীতিক কর্মী হুযূর সম্পর্কে বাজে কথাবার্তা লিখেছে। এরপর আমি খোঁজখবর নেয়া শুরু করলাম। জানলাম, হুযূর আসন্ন নির্বাচনে হেফাজতের ব্যানারে কেউ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সাথে কোন জোট হবে না। এরপর মাও. মওদূদী সাহেবের অনুসারী জামায়াতে ইসলামের বিষয়ে তিনি আকীদা-সম্পর্কিত কিছু সমালোচনামূলক কথা বলেন। তবে সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা ‘জামায়াত কাদিয়ানী থেকে খারাপ’ মর্মে হযরত বাবুনগরী সাহেব কোন কথা বলেননি বলে জানান। তাঁদের একজন ফটিকছড়ির বরবিল মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাও. শামসুল আলম সাহেব। আমাকে খেলাফত মজলিসের একজন তরুণ নেতা চট্টগ্রাম শহর থেকে ফোন করে বলেন, প্রচার করা হচ্ছে: হযরত বাবুনগরী নাকি বলেছেন, জামায়াত কাদিয়ানী থেকে খারাপ। কেউকেউ বিষয়টিকে রাজনীতিক অপপ্রচার বলে উল্লেখ করেন।

এখানে একটি কথা বলা দরকার। আগে বলে এসেছি, নির্দ্ধারিত প্রোগামের বিষয়বস্তু ছিলো, আগামীর ফটিকছড়ি বিনির্মাণে আলিম-সমাজের করণীয়। সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিলো, একজন বিশেষ প্রার্থীকে চট্টগ্রাম-২ অর্থাৎ ফটিকছড়ি আসন থেকে সংসদীয় প্রার্থী ঘোষণা করা। ব্যানারে উল্লেখ ছিলো কেবল দু’জন মেহমানের নাম: একজন হলেন হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী; অপরজন হলেন, জামিয়া ওবাইদিয়ার পরিচালক হযরত মাও.সালাহ উদ্দীন সাহেব। অথচ এ ধরনের প্রক্রিয়া সমস্ত আলিম-উলামা নিয়ে করতে হয়। যা হোক, জেনেছি, পরে নাকি ফয়সালা হয়েছে: পরবর্তীতে ফটিকছড়ির আলিম-ঊলামা ডেকে ফয়সালা করা হবে ফটিকছড়ি থেকে সবার ঐক্যমতের প্রার্থী কে হবেন। আমার মনে হয়, এ ধরনের প্রচেষ্টা হযরত বাবুনগরীর পছন্দ  করেননি। সেদিক থেকেও তাঁর ক্ষোভ ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই হযরত বাবুনগরীর কাছে অস্বস্তিকর ঠেকে।

এখানে কিছু প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়। বিষয়গুলো হলো, মাহফিলের সভাপতি ছিলেন, জামিয়া বাবুনগরের সহকারী পরিচালক মাও. আইয়ুব বাবুনগরী সাহেব। বিশেষ অতিথি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক ও প্রার্থী মাও. শেখ শাহজাহান সাহেব ও আয়োজকবৃন্দ। আমি নিশ্চিত তাঁরা জানতেন হযরত বাবুনগরী কি বলেছেন বা কি বলেননি। দেখা যায়, বিতর্ক ওঠার ছত্রিশ ঘণ্টা পরও তাঁদের কেউই হযরত বাবুনগরীর বিষয় নিয়ে কোন কথা বলেননি বা জবাব তুলে ধরেননি। বিষয়টি রহস্যজনক। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, হযরত বাবুনগরীর পক্ষে কথা বলার কেউ নেই? তাঁরা সব জেনেশুনে হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে অকথ্য ভাষায় কুৎসাকারীদের পক্ষ থেকে গালি-গালাজ করার পরও বুঝেশুনে নীরব থেকেছেন বলে কি ধরে নিতে হবে? বিল্ আখির প্রশ্ন হলো, এসব খেলা আর কতোদিন চলবে? তাঁরা কি জানেন না, হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী নতুন কিছু বলেননি? তিনি তো যুগযুগ ধরে চলে আসা উলামায়ে হক্কানীর কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। মাও. মওদূদী সাহেব ও তাঁর দলের ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে কথা তো নতুন নয়। ইসমাতে আম্বিয়া, মি’য়ারে হক্কে সাহাবীয়ে রাসূল সা. ইত্যাদি নিয়ে তর্ক কি নতুন? আশির দশকে দেখেছি, কওমী ছাত্রদের মধ্যে; উলামা হযরাতের মধ্যে এসব বিষয়ে বিস্তারিত মুতালিয়া, মুযাকিরা, মুবাহিসা, মুনাযিরা হতো। এখন তো সব গেছে। অনেকেই জানে না; ভ্রান্ত আকীদাগুলো কি কি। যা জানেনভাসা ভাসা। হ্যা, কথা হলো একটি জায়গায় একটি তর্ক করা যায়। তা হলো, সময়জ্ঞানে কখনো-কখনো পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা, না বলা; বলার কৌশল ঠিক করা ইত্যাদিতে মুসলিহাহ্ থাকতে পারে। সেখানে যদি কোন ফাঁক থেকে থাকে সেটাকে আমরা মেরামত করবো; সে কথা বলবো। কিন্তু প্রতিপক্ষের ইলযামে নীরব থাকবো কেন? এটা কোন ধরনের পুরুষত্ব?

আমার মনে হয়, ফটিকছড়ির গুরুত্বপূর্ণ আলিমদের ডেকে এ বিষয়ে পরামর্শ নেয়া উচিৎ। এখন হযরত বাবুনগরী বলছেন, বাকিরা চুপ করে আছেন। বললে পরামর্শ করে সবাই বলবেন আর চুপ থাকলে পরামর্শ করে সবাই চুপ থাকবেন। বিভক্তি কেন? আল্লাহ হাফিয।

07.08.2025

 

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...