মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৮২
সম্প্রতি জুলাই জাদুঘরে হেফাজতে ইসলামের ৫ই মে’র একটি হৃদয়বিদারক চিত্রকে অবলম্বন করে নির্মিত ভাষ্কর্যকে কেন্দ্র করে কওমীদের মাঝে সজোর আলোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হেফাজতের পক্ষ থেকে ঐ ভাষ্কর্যের অপসারণ চেয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও হেফাজত নেতা মাও.মামুনুল হক কিন্তু পুরো অপসারণের পরিবর্তে কেবল মুখাবয়ব মুছে দেয়ার দাবি করেছেন বলে খবরে দেখেছি। যেহেতু কোন প্রাণীর ভাষ্কর্য যা মুর্তির সম্পূরক ইসলামে নিষেধ, তাই পুরো ভাষ্কর্য অপসারণ হেফাজতের দাবি।
হেফাজতের ভাষ্কর্যকে কওমীরা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন নির্মাণশৈলী বলে বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু অন্য প্রাণীয় ভাষ্কর্যগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু বলেছেন কি না, জানা নেই। আজকের আলোচনা অবশ্য সে-কেন্দ্রিক নয়। এখানে আমি যে প্রশ্নটি তুলতে চাচ্ছি, তা হলো, যারা ভাষ্কর্যটি নির্মাণ করেছে তারা কি জানতো না যে, এটাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ হবে বা হতে পারে? কারণ, কওমীরা আর তাঁদের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে খুব বেশি এখন আর কিছু গোপন নয়। আমরা যেমন জানি আমাদের কাছের জানাশোনা মানুষ কি চায় বা চাইতে পারে—এসব আর কি। কওমীদের বিষয়েও এখন তেমন ধারণা বা আন্দাজ প্রশাসনে আছে বলে আমার বিশ্বাস। মূলত সে ধারণা থেকে প্রশাসনের কোন অংশ প্রতিবাদ বা অসন্তোষ উত্থিত হবে না ভেবে হেফাজতের ভাষ্কর্যটি নির্মাণ করে থাকতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমি কেন তেমন সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই?
দেখুন, এ দুনিয়ার অনেক কিছু বিষয় চিরায়ত স্বভাব বা ফিৎরাতের উপর নির্ভর করে চলে। এ ফিৎরাত চলমান বা স্থির দুটোই হতে পারে। তাই ফিৎরাতের গতি-প্রকৃতির উপর নির্ভর করে অনুমান, আন্দাজ বা ধারণা—যাই বলুন না কেন, সময় ও চরিত্রের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হতে পারে। আরও বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে যখন কওমী ছাত্র বা আলিমদের হাতে স্মার্টফোন ছিলো না তখন তাঁদের চাওয়া-পাওয়া কেমন ছিলো? বলতে অসুবিধা হবার কথা নয়, তাঁরা ছবি তোলাকে; ভিডিও করাকে গুনাহ মনে করতেন এবং সে-সবকে এড়িয়ে যেতেন। তাই তো? সঙ্গতকারণে, আশে-পাশের মানুষজন এ অনাকাঙ্খিত পরিবেশে কওমীদেরকে জড়াতে চাইতেন না। কিন্তু এখন কওমীদের হাতেহাতে যখন স্মার্টফোন এবং যত্রতত্র নিজেদের ভিডিও করা ও সেলফি তোলার সংস্কৃতি দৃশ্যমান সেখানে আশেপাশের পরিবেশ কি বিশ-পঁচিশ বছর আগের ধারণা নিয়ে বসে থাকবে না কি পরিবর্তিত ধারণা পোষণ করবে? ভাবুন তো একবার? ঠিক তেমনি আগে হুযূরদের সামনে গানবাজনা, ছবি তোলা ইত্যাদিকে সমাজের সাধারণ অংশ পরিহার করতো। এখন হুযূররা গজলের নামে; তথাকথিত ইসলামী সঙ্গীতের নামে মিউজিক শুনছে, তাতে অংশ নিচ্ছে। তাই পরিবেশও এখন আর হুযূরদের সামনে লজ্জাবোধ বা সংকোচ করছে না। বরঞ্চ গর্হিত মনে না করে হুযূরদের সামনেই গান-বাজনা, সঙ্গীত ইত্যাদি করার সাহস পাচ্ছে। একশ্রেণীর হুযূররা তাতে অংশও নিচ্ছে। ফলে, ওসব গর্হিত কাজ এখন হুযূরদের বদৌলতে হালাল বলে লাইসেন্স পাচ্ছে। এমন কি মাদরাসা-মসজিদেও দেদার ছবি-ভিডিও তোলা হচ্ছে। কেউ মানা করছে না।পাঠকরা দেখেছেন, বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর থেকে আধুনিক বিপ্লবী সাজতে এক ধরনের কওমী ঢাকা ভার্সিটির ভাষ্কর্যের নামে বিশাল মূর্তির পাদদেশে লাইন ধরে ছবি তুলেছে। কেউকেউ নানা ভঙ্গীতে সেলফি তুলেছে। কেউ আবার শহীদ মিনারে গিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করছে; বসে ছবি তুলছে। ক’দিন আগে দেখলাম, ঢাকার কিছু কওমী মাদরাসার ছাত্র দল বেঁধে সবক বাদ দিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারীতে খেলা দেখছে। এসব দেখে চারপাশের পরিবেশ ভেবে নিয়েছে এখন আগের হারামের সীমানা ছোট হয়ে এসেছে। তাই ‘লেকিন মু’মিনো পর খুলি হ্যায় সব রাহে’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অতএব, ভাষ্কর্য এখন আর হারাম নয়; মাকরূহও নয়। তাই যদি না হতো, হুযূররা কি করে মূর্তির পাদদেশে ছবি তোলেন, মূর্তিকে নিজেদের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে উপস্থাপন করেন? সুতরাং জুলাই জাদুঘরে হেফাজতের ভাষ্কর্য রাখলে আপত্তি থাকবে কেন? ঢাকা ভার্সিটিতে ভাষ্কর্য বা মূর্তি ছবির উপাদান হতে পারলে জুলাই জাদুঘরে কেন উপাদান হতে পারবে না? আপত্তিটি কি অযৌক্তিক?জুলাই জাদুঘরে ভাষ্কর্যের নামে মূর্তির প্রতিষ্ঠায়ন তো ইউনুস সরকারের আমলে। তখন তো আমাদের নেতৃবৃন্দ আপত্তি তোলেননি অথবা রাজনীতিক আলাপের জটলায় তোলার সুযোগ পাননি। এগুলো আসলে এক ধরনের উপেক্ষা বা অবজ্ঞার ফল। মাদরাসায় ছাত্ররা যখন দেখে একশ্রেণীর বয়োজ্যেষ্ঠ স্বতঃস্ফুর্তভাবে ছবি তুলছে; ভিডিও করছে তাতে তারা স্বভাবতই উৎসাহিত বোধ করে। মাদরাসার অন্দরমহলে এসব নিয়ে খুব মনোযোগ দেয়া হয় বলে মনে হয় না। ধীরেধীরে এগুলো রোগ আকারে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিবেশও ভাবে আগের হারামগুলো এখন বিনা আপত্তিতে হালাল। তাই, তারা জুলাই জাদুঘরে হেফাজতের ভাষ্কর্য স্থাপনে কোন প্রকার সংকোচ বা দ্বিধা বোধ করেনি। সামনে হয়তো কোন চৌরাস্তার মোড়ে নির্মিত হতে পারে আল্লামা আহমদ শফী রহ. বা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র ভাষ্কর্য। তখন কওমীদের অতীতই ভাষ্কর্য অপসারণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। খোদা না করুন, তেমন যদি হয় তবে এসবের দায় কাদের গর্দানে চড়বে তা কওমীরাই ঠিক করবেন। সেদিন দেখেননি: গত ৯ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া বাবুনগর থেকে যাওয়ার পথে হাটহাজারী মাদরাসায় সাময়িক অবস্থানকালে এক মাদরাসার মুহতামিম আর এক মাদরাসার শিক্ষক অবাঞ্ছিতভাবে রুমে ঢুকে প্রধানমন্ত্রীর মতো মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে সেলফি তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে কি ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতির জন্ম দিলেন! এগুলো কি আলিমশ্রেণীর কলঙ্ক নয়? এদের কারণেই তো আজ কওমীদের এ দুরবস্থা। তাই বলবো, জুলাই ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে বলার আগে আমাদের ভেতরের অগণিত ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন; প্রতিরোধ গড়ুন। তবেই দেখা যাবে, হেফাজতের ভাষ্কর্য ভেঙ্গে পড়বে সমূলে।11.08.2026


_original_1753104028.jpg)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন