শনিবার, ২৮ জুন, ২০২৫

শাপলার খলনায়কদের পুনর্বাসিত করছে কারা?

 ভাবনা-৫৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

শাপলাবাংলাদেশের কওমী জগতের এক অবিস্মরণীয় চেতনার নাম; অবিচ্ছেদ্য এক মর্যাদাবোধের নাম। এখান থেকে যারা সরে যাবে বা অস্বীকার করবে, তারা কওমী-ঘরানার আর কেউ নন। যেমনটা إنه ليس من أهلك বর্তমান প্রজন্ম হয়তো শাপলার সে ঘটনা থেকে দূরবর্তী কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। জনপরম্পরায় তারা জানে একটা গণহত্যা হয়েছিলো রাতের অন্ধকারে; আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আক্রমণে ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। যেহেতু আমার বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য ঘটনার বর্ণনা নয় তাই সেদিকে যাচ্ছি না। এটা সবার জানা দরকার, শাপলার ৬ই এপ্রিলের লংমার্চ এবং ৫ই মার্চের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে একটি গুপ্তমহল তাদের কায়েমী স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা গড়ে তোলে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা হেফাজতে ইসলামের প্রথম আমীর আল্লামা আহমদ শফী রহ.কে কেন্দ্র করে গড়ে তোলে অপ্রতিরোধ্য নেওয়ার্ক যেখানে মহাসচিব হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েন। অসহায়ত্বের এ বিষয়টি তিনি আমাকে তাঁর ইন্তিকালের বছরখানিক আগে নিজ বাড়িতে বসে বর্ণনা করেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম: হযরত, অবরোধ থেকে শাপলায় প্রবেশ কিভাবে সম্ভব হলো? সেটা কি কোন বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো? হয়ে থাকলে আপনার অবস্থান কি ছিলো? আমি এও বললাম, মাও. নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব তো একটি রেজুলুশানের কপি সংবাদ-মাধ্যমে দেখিয়েছেন। হযরত বাবুনগরী রহ. আমাকে কাছে বসিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন: প্রথম থেকেই আমাদের অবরোধের সিদ্ধান্ত ছিলোভেতরে ঢোকার কোন কথা হয়নি। এমন কি আমি ঢাকা পৌঁছার পরও আমাকে জানানো হয়নি। ভিতরে ঢোকার সিদ্ধান্তটি কোন সম্মিলিত বৈঠকেও হয়নি। অমুক-অমুক(নাম প্রকাশ করা হলো না) একটি রেজুলুশান তৈরি করে তাতে আমীর সাহেবের দস্তখত নিয়ে নেয়। সেটা দেখিয়ে সবার দস্তখত আদায় করে। এটাই সংবাদ-মাধ্যমে প্রদর্শিত রেজুলুশানের হাকীকত। হযরতের স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কতো বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী ছিলো।

সিন্ডিকেটের একটি ভীতিকর চিত্র ধরা পড়ে ৫ই মে দুপুরের পর। হেফাজতের প্রাক্তন নেতা ও লালখান বাজার মাদরাসার পরিচালক মুফতী ইজহারুল ইসলাম দা.বা. আমাকে বলেন: তিনি ৫ই মে দুপুরের পর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আশ্রয় নিতে দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে উঠে পড়েন। সেখানে তিনি সিন্ডিকেটের তিন জনকে (নামোল্লেখ করা হলো হলে না) বস্তাভর্তি টাকা গুনতে দেখেন। তাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাকাগুলো একটি রাজনীতিক দলের কাছ থেকে নেয়াবিষয়টি হেফাজতের অন্য একজন নেতাও মুফতী ইজহারুল ইসলাম সাহেবের কাছ থেকে শুনেছেন বলে আমাকে জানান। এ ছাড়া চট্টগ্রামেও অর্থের আদান-প্রদান হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তখনকার হেফাজতে ইসলামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি (নামোল্লেখ করা হলো না) মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা কোটি টাকার উপরে ফান্ডে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। এক সময় হাটহাজারী সদরে তার টাকায় নির্মিত বহুতল ভবন ছিলো যা সম্ভবত পরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। একদিকে এসব নেতা লেনদেনে নিমগ্ন ছিলেন অন্যদিকে নিজেদেরকে নেতা বলে জাহির করে প্রচার-মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতেন। ২০২০ সালে মুদিবিরোধী আন্দোলনে আসা যাক।  এ সময় আওয়ামী সরকার সারা দেশে অর্ধশত আলিম-ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কয়েক হাজার আলিম ও ছাত্রকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এখনও অনেক আলিম-ছাত্র কারাগারে অন্তরীণ। সেই দিনগুলোতে ঐ স্বার্থান্বেষী চক্র যারা শাপলার খলনায়ক হিসাবে পরিচিত, আলিম-উলামার গ্রেফতারে গোপনে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দাসংস্থার অফিসে গিয়ে, হাটহাজারী থানার ওসি রফিকের সাথে সখ্যতা সৃষ্টি করে আলিম-ছাত্রদের গ্রেফতার ও নির্যাতনে যেমন ভূমিকা রাখে তেমনি জামিন নিয়ে বের হতে না পারার জন্য অর্থ দিয়ে তদবীরও করে। তাদের এমন ন্যাক্কারজনক তৎপরতার কথা কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন। রিমান্ডেও এসব তথ্য গোয়েন্দাসংস্থার কোন কোন কর্মকর্তা জানিয়ে দেন। কেউ জামিনে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলে তাকে আবার গেটের বাইরে গ্রেফতার করতে ঐ সিন্ডিকেট থানা ও গোয়েন্দাসংস্থায় রাতদিন তদবীর করতো বলে জানা যায়এভাবে এরা হেফাজতের কারাবন্দীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। ঐ খলনায়কেরা এতোই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে চায়ের দাওয়াতও পায়। এদের একজন তো হাসিনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবে শাপলার খলনায়কেরা কওমী জগতে এক অরাজক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

২০২০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। আমীরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র শ্যালক মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের তৃতীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-৩ এ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অথচ একই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর আল্লামা আহমদ শফী রহ. চট্টগ্রামের একটি ক্লিনিকে স্বাভাবিকভাবে ইন্তিকাল করেন। এটা সবারই জানা। উক্ত মামলার নেপথ্যশক্তি কিন্তু ঐ খলনায়কেরা। মামলায় হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.সহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। কওমী মাদরাসার ইতিহাসে এমন ঘটনার কোন নযীর পাওয়া যায় না। এ ছিলো এক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা। হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীকে বশে নিতে না পেরে শাপলার ঐ খলনায়কদের সহযোগিতায় হাসিনা-সরকার এ মামলা রুজু করে ও অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিশেষ করে জুনায়েদ বাবুনগরীকে ফাঁসাতে শাপলার ধান্ধাবাজ খলনায়কেরা রাতের ঘুম হারাম করে উঠে পড়ে লাগে। এমন কি সরাসরি মিডিয়ায় বক্তব্যও দেয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, জুনায়েদ বাবুনগরী ও তাঁর সহযোগীদের হেনস্থা করা। এরাই মূলত আহমদ শফী রহ. ও জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী যারা দুদিকে দুধরনের কথা বলে পরিস্থিতি বিষময় করে তোলে।

২০২৪র আগস্টে এসব কুলাঙ্গার খলনায়কের দল আওয়ামী লীগের পতনে বিপদে পড়ে যায়। তাদের কেউ আত্মগোপনে চলে যায় আর কেউ নির্বাসিত জীবন গ্রহণ করে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, আগস্ট বিপ্লবের পর যেমন বিএনপি’র একটি বিশ্বাসঘাতক অংশ আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিএনপিতে পুনর্বাসিত করতে থাকে তেমনি কওমীদেরও একটি বিশ্বাসঘাতক অংশ শাপলার খলনায়কদের পুর্বাসনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এরা ঘাঁটি গাড়তে চাইছে ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে। বলাবাহুল্য, জামিয়া বাবুনগর বর্তমান আমীরে হেফাজত মাও. মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর পরিচালনাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এখানেই হযরত অবস্থান করেন। জানা গেছে খলনায়করা তাদের সাথে সম্পর্কিত একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমীরে হেফাজতের ঘনিষ্ট কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করে। এদের মাধ্যমে শাপলার খলনায়কদের কুখ্যাত একজন সবুজ-সংকেত পেয়ে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ করে। সে তার বিরুদ্ধে হাটহাজারীতে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারে আমীরের হস্তক্ষেপ কামনা করে। এমন কি এই খলনায়কের মেয়ের বিয়ের আকদ দেয়ার জন্য আমীরে হেফাজতের উপস্থিতির অনুরোধও করে বসেএ নিয়ে কারামুক্ত হেফাজত-কর্মীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা উক্ত খলনায়কদের বাবুনগরে আসার সবুজ-সংকেত দেয়? কাদের প্রশ্রয়ে ঐ খলনায়ক জামিয়া বাবুনগরে গিয়ে আমীরে হেফাজতকে মেয়ের বিয়েতে দা’ওয়াত দেয় এবং মামলা প্রত্যাহারের তদবীর করার সাহস পায়? প্রসাঙ্গিভাবে বলতে হয়, এ খলনায়ক শাপলার ঘটনার পর বেশ কিছুদিন গ্রেফতার এড়াতে জামিয়া বাবুনগরে আত্মগোপন করেছিলো। হযরত আমীরে হেফাজত একবার আমাকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন: ওকে বিপদের সময় আমিই জায়গা দিয়েছি। আমার ছেলে তার হাতখরচ দিয়েছে। আর সে গোপনে আওয়ামী লীগের সাথে যোগসাজশ করে। অনেকেই জানেন, জনাব আমীরে হেফাজত ২০১৮ সালের ৪ঠা অক্টোবর ইসলামী ঐক্যজোটের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। সেদিন থেকে ঐ খলনায়কেরা বিভিন্নভাবে হযরত মুহিব্বুল্লাহ সাহেবকে মত বদলানোর সমূহ চেষ্টা করে কিন্তু প্রতিবারই হযরত তা প্রত্যাখ্যান করেন। পদত্যাগের পরদিন সংবাদ-মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হযরত মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ঐ খলনায়কদের আওয়ামী এজেন্ট বলে তিরস্কার করেন। আর এখন এরাই বাবুনগরে আসার সাহস পায়! কাদের আস্কারায় এসব হচ্ছে?

আমরা আশ্চর্য হই, যে হয়রত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র সাথে চরম অভদ্র আচরণ করেছিলো সে আজ বাবুনগরে এসে মামলা থেকে বাঁচতে তদবীর করছে। এখানে আমি পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে একটি চিত্র তুলে ধরছি। ২০২০ সালের ১৬ই অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে শাহ আহমদ শফীর জীবনকর্ম, অবদান শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাঈনুদ্দীন রুহী জুনায়েদ বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

আপনি বহুরূপী। আপনি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আপনি একজন বড় প্রতারক। রুমের মধ্যে একরকম, রুমের বাইরে গেলে আরেকরকম। সরকারের কার সঙ্গে কোথায় গেছেন, কার পায়ে ধরেছেন জানা আছে। কার কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছেন, কোন জায়গায় গিয়ে টাকা নিয়েছেন- সব আমাদের জানা আছে। আমরা যদি মুখ খুলি মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারবেন না।বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ‘সাবধান হয়ে যান। মিথ্যা কথা বলবেন না। আপনাকে নিয়ে লোকজন ঠাট্টা করে, হাসাহাসি করে। আমাদের লজ্জা হয়।দেশে বহু নিষিদ্ধ-বিতর্কিত সংগঠনের সঙ্গে বাবুনগরী হাত মিলিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সময়মতো মুখ খুলব। তখন টিকে থাকতে পারবেন না।’ (১৭ই ডিসেম্বর, ২০২০; ডেইলি স্টার বাংলা) এই হলো বাবুনগরী রহ.’র সাথে শাপলার খলনায়কদের ব্যবহার।

আমি আগেই বলেছি, শাপলার ওসব খলনায়কদের কারা কালো থেকে সাদা করতে চাচ্ছে? কারা পুনর্বাসিত করতে চাচ্ছে? এরা আগে থেকেই সিন্ডিকেটের অনুসারী ছিলো। সর্বক্ষণ এরা খলনায়কদের সাথে যোগযোগ রক্ষা করে চলে। ফটিকছড়িতে এরা এখন ধীরেধীরে পাখা মেলতে চাইছে। কিছুদিন আগে এই চক্র জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণসভার আড়ালে মাঠে নামতে চেষ্টা করেছে। যারা তাদেরকে সহায়তা করেছে তারা মোটামুটি চিহ্নিত; সবাই চেনেন। কিন্তু তাদেরও জানা থাকা দরকার: সেরের উপর সোয়া সেরও আছে। কেউ না কেউ জেগে আছে। যারা এসব করছে তাদের আমরা চিনি। তারা বিরত না হলে জাতির সামনে তাদের মুখোশ খুলে দেয়া হবে। এ বিষয়ে জামিয়া বাবুনগর কর্তৃপক্ষেরও নযরদারি দরকার কেউ যেন আমীরে হেফাজত ও জামিয়াকে বিতর্কিত করতে না পারে। আমরা যেন ভুলে না যাই আহমদ শফী রহ.কে কিভাবে বিতর্কিত করা হয়েছিলো। শুধু ফটিকছড়ি নয়, বৃহত্তর চট্টলার তরুণ আলিম-সমাজেরও এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আওয়ায তোলা দরকার।

27.06.2025

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫

শাপলা কমিশন না হওয়া ও হেফাজতের দায়

ভাবনা-৫৮

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 

২০১৩ সালের মতিঝিলের শাপলা চত্বরের গণহত্যা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে কথা হয়নি কেবল যথার্থ করণীয় নিয়ে আমি দেখেছি, ২০১৩ সালের বছর দুয়েক পার না হতেই হেফাজত নেতৃবৃন্দগণহত্যাএবং গণগত্যার বিচারের দাবি থেকে দৃশ্যত সরে আসেন তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে এসব নিয়ে খুব একটা জোর নযরে আসেনি আমি তখন খবর নিয়ে জেনেছি, তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাথে সম্পর্ক মেরামতের কৌশলে এবং সরকারের আবদারে হেফাজত নেতৃত্বের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট গণহত্যা তার বিচারের দাবিকে অন্তরালে নিয়ে যায় আমার দাবির প্রমাণ পাওয়া যাবে শাপলা গণহত্যার বছর দুয়েক পরের জাতীয় দৈনিকগুলো ঘেঁটে দেখলে ২০১৮ সালের কলঙ্কিত শোকরানা মাহফিল তার স্পষ্ট দলিল সেখানে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তৎকালীন সামরিক সচিবের কণ্ঠে শাপলার ঘটনায় যখন কোন গুলি খরচ হয়নি; কেউ মারাও যায়নি ইত্যকার লোমহর্ষক মিথ্যা বয়ান দেয়া হচ্ছিলো, উপস্থিত হেফাজত নেতৃবৃন্দের কেউই টু-শব্দটিও করেননি সেটাই ছিলো হেফাজতে ইসলামের নৈতিক পরাজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ যা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বরঞ্চ উক্ত মাহফিলে এক দরবারী মোল্লা কর্তৃক শেখ হাসিনাকেকওমী জননীখেতাব দেয়ার পর তাকে হেফাজতের দুর্গে শরমনাক অভ্যর্থনাও দেয়া হয় সেদিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তারা আশা করি সে স্মৃতি ভুলে যাননিশাপলার মৌলিক দাবির প্রতি হেফাজতে ইসলামের অবজ্ঞার রেশ এখনো যে নেই, তা নয় তার এক নতুন সংস্করণ দেখতে পাই আগস্ট বিপ্লবের পর

আমি আমার বিভিন্ন লেখায় ২০১৬ সাল থেকে বলে আসছি, হেফাজতে ইসলাম ধীরেধীরে তার লক্ষ্য থেকে সরছে হেফাজতের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেটের কিছু সুবিধাবাদী চরিত্র আমার বক্তব্য নিয়ে তৎকালীন মহাসচিব পরবর্তীতে আমীর হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.কে ভুল বুঝায় সে খবর আমি যথাসময়ে পাই কিন্তু আমি আমার বক্তব্যের সততা নিয়ে কোন দ্বিধায় ছিলাম না বিধায় তোয়াজ করে কারও পদমর্দনে যাইনি আমার দৃঢ় আকীদা ছিলো: ব্যক্তির চেয়ে হেফাজত বড় হযরতের খাদিম মাও.এনাম বিষয়ে কিছু জানতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস কিভাবে হেফাজতে ইসলাম তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে এসেছে, সে বিষয়ে বলছি ২০১৩ সালের গণহত্যা হলো কিন্তু হেফাজতে ইসলামের মতো একটি জাতীয় প্রভাবশালী সংগঠনের নিজস্ব কোন তদন্ত কমিটি হয়নি কথা ছিলো, ঢাকা অবরোধ হবে; কর্মী-সমর্থকদেরকেও তাই জানানো হয়েছিলো কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আবরোধকে পরিরব্তন করা হলো জমায়েতেকথা ছিলো, অবরোধ শেষ করে সবাই ফিরে আসবে কিন্তু অর্ধবেলায় মতিঝিলে সবাইকে ঢোকানো হলো কিভাবে পরিবর্তন এলো? কোন্ কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নিলো? যে সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি গণহত্যার পথ প্রশস্ত হলোসে সিদ্ধান্ত কারা নিলো? হেফাজতের ভেতর থেকে কারা সেদিন সেনা গোয়েন্দাসংস্থার সাথে যোগোযোগ করে নেতৃবৃন্দের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করেছিলো? কারা সেদিন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সরকার পতনের ছক কষেছিলো? কারা সেদিন শহীদদের রক্তকে পুঁজি করে গোপনে কিছু রাজনীতিক দলের সাথে আঁতাত করে বস্তাভর্তি টাকা গুনতে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলো? কারা সেদিন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.কে না জানিয়ে কল্পিত রেজুলুশান তৈরি করে অবরোধকে শাপলা জমায়েতে রূপ দিয়েছিলো? কারা আমীরে হেফাজতকে রাতে শাপলায় আসতে না দেয়ার ছক কষেছিলো? কারা সেদিন মঞ্চে উগ্র বক্তব্য দিয়ে পরদিন বিদেশের ফ্লাইট ধরেছিলেন? এসব প্রশ্নের কি কোন উত্তর পাওয়া গেছে? কেন পাওয়া যায়নি? কারণ, হেফাজত নিজস্ব কোন তদন্ত করেনি এটাই হেফাজতের বৃহৎ ব্যর্থতা শুধু ব্যর্থতা বলবো না, বলবো সিন্ডিকেটের দুরভীসন্ধিও হেফাজতের ব্যর্থতার পেছনে আওয়ামী সরকারের কোন যোগসাজশ ছিলো কি না জানা নেই কিন্তু সন্দেহ আছে

২০২০ সালের মুদিবিরোধী আন্দোলনের কথাই ধরা যাক এতোগুলো মানুষকে অন্যায়ভাবে মারা হলো; জেলে পুরা হলো, কৈ কোন তদন্ত কমিটি কি হয়েছিলো? ঘটনার আসল কারণ জানতে কোন চেষ্টা হয়নি কেন? এতো বড়ো ঘটনার পর রিসোর্ট কেলেঙ্কারী হলো, কৈ, তদন্ত কি হয়েছিলো? কিছুই হয়নি ফলে সামনে আসেনি এমন দুটো মর্মান্তিক ঘটনার রহস্য উদঘাটন আগস্ট বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতন হলো আমরা ভেবেছিলাম, এবার শাপলার শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত হবে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মতো শাপলার একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন হবে কিন্তু কি দেখলাম? বিপ্লবে আহত-নিহত সাধারণ ছাত্রদের তালিকা প্রকাশিত হলো কিন্তু শাপলার শহীদদের তালিকা প্রকাশিত হলো না বেশ পরে অবশ্য আংশিক তালিকা পেলাম এখনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা আসেনি তাহলে কি দাঁড়ালো? প্রশ্ন উঠলো: ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নেতারা কি করলেন? কেবলই মঞ্চ গরম করার কসরৎ? কেন হেফাজত কমিশন গঠনের কোন দাবি তুলতে পারেনি? এর কি কোন জবাব আছে? বিপ্লেবের কতোদিন পর হেফাজতের মামলা হলো? আসলে হেফাজত আগের মতোই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে তারা যতোই অস্বীকার করুক হেফাজত এখনও সিন্ডিকেটের দখলে ওদের সাথে বাইরের হট লাইন একটি স্বঘোষিত অরাজনীতিক সংগঠন হবার পরও হেফাজতে সিন্ডিকেট সক্রিয় কখনো জামায়াতের সাথে ঐক্য গড়ার লাইনে আবার কখনো বিএনপি সাথে সম্পর্ক গড়ার অভিপ্রায়ে তাইতো এক নেতা বলেন: ৩০শে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হেফাজতও চায় এই হলো হেফাজতের অরাজনীতিক চরিত্র

শাপলার কমিশন হলে আজ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতো বেরিয়ে আসতো অনেক রহেস্যের খেলা ইদানিং বিভিন্ন আলোচকের কাছে শুনতে পাচ্ছি, শাপলার ঘটনায় বিএনপি মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস এবং আমীর খসরু মাহমূদের ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথে যোগসাজশ ছিলো তারাও ইন্ধন যুগিয়েছেন বিষয়গুলোর তদন্ত হওয়া দরকার তদন্ত কমিশন হলে এগুলোর সত্যাসত্য আমরা জানতে পারতাম এখনো সময় আছে, আমার মনে হয়, অতিশীঘ্র তদন্ত কমিশনের দাবি তুলে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করা উচিৎ অন্যথায় হেফাজতে ইসলাম জাতি ইতিহাসের কাছে তার দায় এড়াতে পারবে না

26.06.2025        

 

  

Featured Post

১১ দল ও ৭ দলের যোগবিয়োগ

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮১  গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ১১ দলের শরীক ৭টি কওমী দলের আলাদা জোটের ভবিষ্...