শুক্রবার, ৫ মে, ২০২৩

আজ শাপলার নির্মম স্মৃতির ১০ বছর

ভাবনা-৪১

স্মৃতিকে বিস্মৃত করার পুরনো অভ্যাসে আমরা হয়তো ভুলে গেছি: আজ ২০১৩ সালের নির্মম স্মৃতির ১০ বছর পূর্ণ হলো। সে দিবাগত রাতে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা-অবরোধকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনা। অজানাসংখ্যক হেফাজত কর্মী-সমর্থকের আহত-নিহত হবার ঘটনা ঘটে সে রাতে। আজও সে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি না হেফাজতের পক্ষ থেকে, না সরকারের কাছ থেকে। কি হলো, কেন হলোইত্যকার প্রশ্নে আজও মানুষের কৌতুহলের অভাব নেই। মূলপ্রশ্ন, পূর্বঘোষিত অবরোধ থেকে মধ্যবেলার পর আকস্মিক শাপলা-চত্বরে ঢোকার সিদ্ধান্ত এবং মাত্র আধ-ঘণ্টার ব্যবধানে সরকারের অনুমোদন পাবার রহস্যের আজও কূলকিনারা হয়নি। ঘটনার পর দায়িত্বশীল কারওকারও কাছে জানতে চেয়েছি বিষয়টি নিয়ে, কেউ মুখ খোলেননি। রাতেই শাপলা-চত্বর ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত হলেও শাপলা-চত্বরে তৎকালীন আমীর মরহুম আহমদ শফীকে আসতে না দিয়ে রাত যাপন করার রহস্যজনক সিদ্ধান্তের জট খোলা যায়নি এখনও। সেদিন রাতে যাঁরা হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর পাশে ছিলেন তাদের সাথে কথা বলেছি, তারা অকপটে জানিয়েছেন: হামলার আগে অর্থাৎ, আহমদ শফী সাহেব শাপলায় যাত্রা করার পূর্বে হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী বারবার চেষ্টা করেছেন আমীরের সাথে কথা বলতে, রাতেই শাপলা-চত্বর ত্যাগ করে অনাকাঙ্খিক ঘটনা এড়িয়ে যেতে। কিন্তু তথ্যদানকারীদের মতে আমীরের পুত্র আনাসের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে আনাসের আড়ালে ছিলো: একটি শক্তিশালী চক্র, যারা যে কোনভাবেই শাপলাতে রাত যাপনের পক্ষে ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় অনেক আলোচনা হয়েছে; দায়িত্বশীলদের কেউ মুখ খোলেননি। প্রশ্ন উঠেছে, শহরের বাইরে অবরোধের পূর্বসিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত হলো কেমন করে? সন্দেহের তীর যাদের দিকে, তারা ব্যাখ্যা দিয়েছেন: বিষয়টি পরিস্থিতির নিরিখে আল্লামা আহমদ শফী রহ.-র নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অনুমোদিত হয়। কিন্তু কেউ-কেউ বৈঠকের বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ইন্তিকালের আনুমানিক বছরখানিক আগে গ্রামের বাড়িতে আসলে আমি গিয়ে সরাসরি তাঁর কাছে বিষয়টি জানতে চাই। প্রশ্নটি করার আগে আমি হযরতের খাদিমকেও সরিয়ে দেই। কারণ, হযরত বাবুনগরী ইতঃস্তত করছিলেন। তিনি আমাকে একান্তে বললেন, বিষয়টি যেন তৎক্ষণাৎ প্রকাশ করা না হয়। বুঝলাম, হযরত তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ না করতে বলছেন। তাঁর কথায়, আসলে কোন সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়নি। যারা কুশীলব বলে খ্যাত (হযরত নামও উল্লেখ করলেন যা এখানে প্রকাশ করছি না), তারা প্রথমেই পরিকল্পিতভাবে আমীর আহমদ শফী সাহেবের কাছ থেকে শাপলা-চত্বরে প্রবেশ করে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত লিখে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। পরে অন্যদের তা দেখিয়ে দস্তখত আদায় করে। হযরতের বাকি কথাগুলো আর লিখলাম না।

আজ ১০টি বছর হারিয়ে গেলো শাপলা থেকে। এ দশ বছরে হেফাজত অনেকটা ভুলে যেতে বসেছে শাপলার স্মৃতি। পরের বছর ২০১৪ সালে কেউ পালন করেনি শাপলার মর্মান্তিক ঘটনার বর্ষপূর্তি। এমন ঘটনা বিরল। পঞ্চাশ বছর আগের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির স্মরণ চলে ফীবছর কিন্তু শাপলার হয় না কখনও। এ আমাদের উদারতা(!) না কি বিশ্বাসঘাতকতাজানবার উপায় নেই। সে-সময় যারা কলকাঠি নেড়েছে, সওদাবাজি করেছে, তারা তো দিব্যি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অপরাধ কেবল তাঁদের, যারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন। কওমীদের পক্ষ থেকে নানা বই-পুস্তক লেখা হয় কিন্তু শাপলার ইতিহাসটা লেখা হয় না। সবার কথা বলছি না, কেউ আছেন আতঙ্কে। তবে আমি নিরাশ হতে পারি না। আমার আশা এ মজলুম ঘটনার ইতিহাস একদিন লেখা হবে, কুশীলব আর সওদাবাজিকরদের পরিচয় প্রকাশ পাবে। তা না হলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পূ্বসূরীরা সমালোচিত হবেন, আল্লাহর কাছে তো দায়ি হবেন-ই। শাপলার ঘটনার পর আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন ছিলো; প্রয়োজন ছিলো নিজেদের দুর্বলতাগুলো সারিয়ে নেবার। কিন্তু তাতে কতোটুকু কি হয়েছেসেটা ফলেই বৃক্ষের পরিচয়। ২০২০ সালের মুদি ও মূর্তীবিরোধী প্রতিবাদ থেকে সে ধারণা পাওয়া যাবে। ইসলামের ইতিহাস তো সওদাবাজিকরদের মুনাফেকির ইতিহাস। সে-কথা কে না জানে? তবুও আমরা ঘরের দরোজা মেলে ঘুমাই; চোর আসে, মালামাল নিয়ে যায়; আমরা কেবল তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখি। মামলাও করি না।

১৮৫৭’র আজাদী আন্দোলন থেকে আমরা যদি নিজেদের রক্ষার কোন শিক্ষা না নিতাম, ১৮৬৭ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা হতো না। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের পেছনে সওদাবাজিকর আর কুশীলবদের কি ভূমিকা ছিলো, তা কারও অজানা নয়। আজও মির্জাফরের বংশধরেরা লজ্জায় রাস্তায় বের হতে সাহস পায় না। জানি না, শাপলার মির্জাফরদের বংশধরের কী পরিণতি হবে। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের শোকাহত পরিবারের বেদনার্ত স্মৃতির মিনারে দাঁড়িয়ে একটু অনুভব করলে আমার প্রশ্ন আর আপত্তির জায়গাগুলো আশ্রয় পাবে মনে করি। আল্লাহ সকল শহীদ ও মজলুমদের রহম করুন।

০৫.০৪.২০২৩ 

   

বৃহস্পতিবার, ৪ মে, ২০২৩

কওমীদের প্রতিভাবান প্রজন্ম কোথায়?

ভাবনা-৪০

প্রতিভা আর মেধার ফরখটা কি? শব্দগুলো আমরা যখন পাইকারিভাবে ব্যবহার করি, মনে কি হয় মানেটা কি? এমন অনেক শব্দ আমাদের লেখাপড়ায় আসে আর যায়, যাদের সঠিক পরিচয় জানা থাকে না। বাংলায় বলে নয়, আরবী, ফারসী, ইংরেজি ইত্যাদিতেও এমন ঘটনা ঘটে। যেমন ধরুন, ‘গণতন্ত্র’। উর্দূতে ‘জমহুরিয়াহ’ বলা হলেও আরবীতে কিন্তু ‘দীমোক্রাতিয়াহ’ (ديمقراطية )। অথচ ‘জমহূর’ আরবী শব্দ। তবে তো ‘দীমোক্রাতিয়াহ’ না বলে ‘জমহুরিয়াহ’ বললে দোষ কোথায়? এ প্রশ্ন আমার। আসলে ভাষার শব্দ-প্রচলনে লোকমুখে ও পরিবেশে ভাবের গভীরতার পরিমাপ প্রামান্য। ধরুন, পানি ও জল। আমাদের এখানে লোকমুখে ও পরিবেশে ‘পানি’র ভাব যতোটা আপন ও গভীর পশ্চিমবঙ্গে ততোটা নয়। আবার পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত হিন্দু-সমাজে ‘জল’র ভাব যতোটা কাছের আমাদের এখানে ততোটা নয়। তাই দু’জায়গায় দু’রকমের প্রয়োগ আর বোঝাবুঝি। আবার ‘জল’ পশ্চিমবঙ্গে যতো কাছের হোক ওখানেও পানি আক্রমন করে প্রকাশ্যে। তাই, সেখানে ‘পান্তাভাত’ জলভাত হতে পারেনি; সরবত ‘পানসে’ লাগলেও ‘জলসে’ হবার সাহস দেখায়নি। এ হচ্ছে ভাষার শব্দ-ব্যবহার বা প্রচলনের মারপ্যাঁচ। এগুলো মাথায় না থাকলে আপনার লেখা বা বলা পানসে না হয়ে জলসে হয়ে বসে থাকবে। সূতরাং শব্দ-প্রচলনে ভাবের তারতম্য নখদর্পণে রাখতে না পারলে ব্যবহার ব্যর্থ হবে।

তাহলে ফিরে আসি মেধা আর প্রতিভার আলোচনায়। মেধার আভিধানিক অর্থ: বুদ্ধি, ধীশক্তি, বোধশক্তি, স্মৃতিশক্তি আর প্রতিভার আভিধানিক অর্থ হলো: ব্যক্তির সৃজনীশক্তি, ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট গুণাবলী বিশেষ। অর্থের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি, কোন্ শব্দের ভাব ও গভীরতা কেমন। মূলত মেধা কেন্দ্র আর প্রতিভা কেন্দ্রের বিস্তার-ক্ষমতা। বুঝিয়ে বলি। মেধা হলো মূলধন আর সে মূলধনকে ব্যবহার করে আপনি ব্যবসাকে কতোটা বিস্তৃত করতে পারেন বা নতুন-নতুন ব্যবসা উদ্ভাবন করতে পারেন, সে-ক্ষমতা হলো প্রতিভা বা সৃষ্টিশীলতা। ধরুন, আপনি কলম নিয়ে বসলেন দু’কলম লিখবেন বলে। আপনার প্রচণ্ড স্মৃতিশক্তি আছে; প্রচুর তথ্যসূত্র বা রেফারেন্স আপনি অনর্গল দিতে পারেন অথবা আহামরি না হলেও মোটামুটি স্মৃতিশক্তি আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আপনার স্মৃতিশক্তি কমবেশি যাই থাকুক, সেটাকে ব্যবহার করে নতুন কি কি সৃষ্টি করতে পারলেন? জাতিকে কী নির্দেশনা বা প্রস্তাবনা দিতে পারলেন যা আপনার পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট? আপনার উপসংহার কতোটা সমৃদ্ধ হলো? তথ্যভর্তি লেখা দিয়ে আপনি প্রশংসিত কিন্তু শেষফল কী বের হলো? পাঠক আপনার কাছ থেকে নতুন কী পেলো? এখানে ব্যর্থ হলে লেখক হিসাবে আপনি পরিচিতি পেতে পারেন, সফল হতে পারেন না। মনে রাখতে হবে, যে কলম সংস্কার বা নির্দেশনার পথ প্রদর্শন করে না, সেটা যতো দামিই হোক মোটাতাজা দুগ্ধবিহীন গাভীর তুল্য। বাংলা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অনেক অবদান আছে কিন্তু নজরুল যেভাবে কষে লাঙ্গল চালিয়ে মাটি ওলটপালট করে জমিকে নতুন চাষের উপযোগী করে তুলেছিলেনসে কি রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন? এখানেই নজরুলের প্রতিভা আর সৃষ্টিশীলতার পারদর্শিতা যা আজও অম্লান। তাই নজরুল বলতে পেরেছিলেন, “আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে চোখ হাসে মোর বুক হাসে!” নজরুল তৃণমূল থেকে উঠে আসা পোড়খাওয়া এক মহান সাহিত্য-সৈনিক। নজরুল-সাহিত্যের বড়ো সম্পদ সৃজনশীলতা যা ফররুখদের মতো বিখ্যাত কবিদের প্রভাবিত করে গেছে। আশা করি এবার বুঝতে পেরেছেন মেধা আর প্রতিভার পরিচয়।

আজ আমি কওমীদের মধ্যে সে প্রতিভাবান-প্রজন্মকে খুঁজছি যাঁরা মেধার পুঁজি নিয়ে সৃষ্টিশীলতাকে বিশ্বের দরবারে পথ দেখাবে। আক্ষেপ করে বলতে হয়, আমাদের কওমী-জগতে নতুন-নতুন ডিগ্রীধারীদের সংখ্যা কম নয়। কেউ আজহারী, কেউ নদভী, কেউ মাদানী আবার কেউ দেওবন্দ থেকে আসা কাসেমী। তাঁদের প্রচুর মেধা আছে বলে জানি, সম্মান করি। কিন্তু ঐ একটা জায়গায় আমাদের হায়-হায় রব তুলতে হয়। সৃজনশীলতার মাপকাঠিতে কারও সনদ চোখে পড়ে না। উস্তাযুল আসাতিযা মাওলানা ইসহাক আল গাযী রহ. বলেছিলেন: এ দেশের মাটিটাই এমন যে, এখানে স্বর্ণ পড়লেও কয়লা হয়ে যায় আর বিদেশের মাটিতে কয়লা পড়লেও স্বর্ণ হয়ে যায়। এ নির্মম বাক্যের মধ্যে হযরতের তিক্ত অতীতের যে মর্মান্তনা ফুটে উঠেসে ব্যথা বুঝবে ক’জন? এও সত্য, প্রতিভার অধীকারী হয়েও আমাদের সন্তানদের কেউ কেউ পরিস্থিতির কারণে, সঠিক মূল্যায়নের অভাবে, কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা-অবহেলায়, অর্থনৈতিক শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে হয়তো কক্ষবাসী হয়ে পড়ে নতুবা আপনক্ষেত্র ত্যাগ করে ভিন্ন পেশায় আশ্রয় গ্রহণ করে হারিয়ে যায়। তাই বলে কি আমাদের জমিটা অনাবাদযোগ্য হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে? কেউ কি এগিয়ে আসবে না ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে? ইতিহাস কি বলে? চরম ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশের লালচক্ষুকে এড়িয়ে তুরষ্কের রিচেপ তৈয়ব এরদোগান কি মঞ্চে উঠে আসেননি? আজ একজন এরদোগানই কি বিশ্বকে প্রভাবিত করছেন না? আমরা কি পারি না সে দৃষ্টান্তকে কওমী জামা পরিয়ে মঞ্চে তুলে ধরতে? বিশ বছরের সশস্ত্র জিহাদ শেষ করে তালিবান কি আজ তাঁর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে আফগানিস্তানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না? বিশ্বব্যাংক রিপোর্টে তালিবানের অর্থনৈতিক রিপোর্ট কি প্রশংসিত হয়নি? একজন মুফতী তাকী উসমানীর কথাই ধরুন। পাকিস্তানে কি বিজ্ঞ আলিম-উলামার অভাব আছে? কিন্তু একজন তাকী উসমানী দাঁড়িয়ে গেছেন; ইসলামী ফিকাহকে যুগের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে জন্ম দিলেনইসলামী ব্যাংকিং সিস্টেম যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস-পর্যালোচনা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পৌরনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিচারব্যবস্থাপনা: কোথায় নেই মাওলানা তাকী উসমানীর পথনির্দেশনা? পাকিস্তানের শরীয়া আদালতের আপিল বিভাগের চেয়ারে বসে বিচারকের দায়িত্ব পালন করে এ কওমী সন্তান অন্যান্য মেগাবিচারকদের শিখিয়েছেন কি করে আইন বুঝতে হয়; ফয়সালা করতে হয়।

তাহলে আমাদের আজহারী, নদভী, কাসেমী, মাদানী ভাইয়েরা কোথায়? তাঁরা কি পারেন না কওমী জগতকে সৃজনশীলতা দিয়ে সাজাতে; তাঁরা কি পারেন না তাঁদের গবেষণা দিয়ে বিশ্বকে পথ দেখাতে? তাঁরা কি পারেন না তাঁদের দেখা জামিয়া আজহার, দারুল উলূম দেওবন্দ, জামিয়া মদীনা, জামিয়া নাদওয়ার ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে কওমী-জগতকে সমৃদ্ধ করতে? বাইরে থেকে বড়োবড়ো গাভী এনে যদি দুগ্ধদোহন সম্ভব না হয় তবে কি সব মাঠে মারা গেলো না? আমাদের এতোএতো মেধাবী সন্তান আছে বলে দাবি করি, তবে কেন হেফাজত আন্দোলন তাঁদের কাছ থেকে কোন পথনির্দেশনা পায়নি? পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজন ছিলো তাঁদের উপস্থিতি। তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, গবেষণা হেফাজতের পদযাত্রায় কেন কাজে লাগানো যায়নি? এ দায় কি তাঁদের একার? আমি তো মনে করি, রাজনৈতিক হোমরা-চোমরাদের গদিতে না বসিয়ে ওঁসব প্রতিভাবানদের সামনে আনা গেলে হেফাজতের আজকে এ দশা হতো না। গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতায় কওমীদের অবস্থান কতোটা হতাশাব্যঞ্জক তা বুঝতেও আমরা অক্ষম। দুর্ভাগ্য, আমাদের এখানে কারীর চেয়ে ক্যাসেটের দাম বেশি। এটাই হযরত গাযী সাহেব রহ-র মন্তব্যের এক সার। আসলে আমাদের এখানে দক্ষ ব্যক্তির মূল্যায়ন নেই; আছে জ্বী হুযুরমার্কা অদক্ষ মানুষের মূল্যায়ন। তাই, আমাদের বাগানের নাম গুলশান কিন্তু কাজেকর্মে সুনশান। বিখ্যাত দার্শনিক ও আলিম হাকীমুল ইসলাম কারী তয়্যিব সাহেব রহ. লিখে গেছেন:

صرف درس نظامی کے کتابے پڑھنے اور پڑھانے کانام دیوبندیت نہیں ہے

আজ আমরা প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছি, একটি প্রবল জোয়ারের যার নিখিল প্রবাহে ভেসে যাবে সব প্রথাগত খড়খুটো; পড়বে নতুন পলিমাটি; শুরু হবে ‍পুরনো জমিতে সৃজনশীলতার নতুন চাষ; ফলবে এ যুগের মুজাদ্দিদদের সরব জন্মোৎসব; মিল্লাত পাবে পথপ্রদর্শক, দেশ পাবে ফসল ফলানো অভিভাবক; সমাজ পাবে সংস্কারের কারিগর আর মানুষ পাবে “নয়া জামানার ডাক”। আমরা কোনভাবেই পারবো না আমাদের নতুন প্রতিভাবান প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলতে। যদি পরিবেশ-প্রতিষ্ঠানের প্রতিকূলতায় সে সম্ভব না হয়, তবে ভদ্রতার সাথে; বিনয়ের সাথে প্রতিভাবান প্রজন্মের হাত ধরে ব্যতিক্রমধর্মী কোন প্রতিষ্ঠানের জন্ম হলে জাতি তাকে অভ্যর্থনা জানাবে। আল্লাহ হা-ফিয।

০৪.০৪.২০২৩ 

 

বুধবার, ৩ মে, ২০২৩

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আলিম-উলামার করণীয়

ভাবনা-৩৯

স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। এ স্বাধীনতা তার মৌলিক চাহিদাকে আবর্তিত করে নিত্য। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান ছাড়াও তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিয়েছেন খোদ আল্লাহ। তবে মনে করার কারণ নেই: স্বাধীনতা মানে যাচ্ছেতাই করার অধিকার। মানুষকে সৃষ্টি করার সাথেসাথে ভালোমন্দ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা আল্লাহ দিয়েছেন। স্বাধীনতার ধাপ-উপধাপ চিন্তা করলে পাওয়া যায় স্তরভিত্তিক স্বাধীনতার অস্তিত্ব। যেমন: ব্যক্তি-স্বাধীনতা, পারিবারিক স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি। এগুলো সর্বআইনে, সর্বক্ষেত্রে স্বীকৃত। তেমনি এক স্বাধীনতা: রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা। আজ সে বিষয়েই আলাপ। একটি বা কয়েকটি জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ডকে তাদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত করে ব্যবস্থাপনার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলে, সেই ভূখণ্ড ঐ জনগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠীসমূহের জন্য একটি স্বাধীন দেশ বা ভূখণ্ড বলে বিবেচিত হয়। উক্ত ব্যবস্থাপনার আলোকে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি বসবাসকারী মানুষ যে শর্তসাপেক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও অধিকার পাবার নিশ্চয়তা প্রাপ্ত হয় সেটাই নাগরিক শর্ত। এ শর্তের কারণেই, নাগরিক বা জনগণ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে, প্রাণ দেয়। আমরা যে আজ বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বসবাস করছি, সেখানেও উক্ত শর্ত প্রযোজ্য। দেশের সকল নাগরিক, আলিম-উলামা, আপমর মেহনতি জনতাসবাই উক্ত শর্তে আইনগত ও নৈতিকভাবে বন্দী।

আমাদের বাংলাদেশে ‘আলিম-উলামা’ নামে যে ধর্মীয় গোষ্ঠী অস্তিত্বশীল তাঁরা মূলত ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী বলে পরিচিত। পারিভাষিকভাবে এবং অভিজ্ঞতার আলোকে এই শ্রেণী জাগতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে অনুপস্থিত বলে মনে করেন অনেকে। আলিম-উলামার মধ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন, তাঁদের ওসবে অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। ফলে, দেশে বসবাস করেও তাঁরা নিজদেশে পরবাসী বলে অনেকে মনে করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, উপরের আলোচনার নিরিখে একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে নাগরিকশর্ত ভঙ্গ করা বা তাতে অনীহা প্রকাশ করার আইনত ও নৈতিক যুক্তি আছে কি না? যেহেতু রাষ্ট্র আমাদেরকে নিরাপত্তা ও অধিকার প্রদানে বাধ্য সেহেতু দেশের আলিম-উলামা নাগরিকশর্তকে ভঙ্গ করার অধিকার রাখেন কি না?  প্রশ্নটি এ জন্যই তুললাম, দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় কর্তব্যে আলিম-উলামার দৃশ্যত দূরত্ব বজায় রাখার একটি অভিযোগ প্রচলিত। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সম্মানিত আলিম-উলামা কোন বক্তব্য রেখেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে ২০১৭ সালে আমি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত “কওমী-জগৎ এবং সামাজিক শক্তির খতিয়ান” শীর্ষক গবেষণা-প্রবন্ধে বিষয়টি নিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছি, জাতীয় উন্নয়নে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভূমিকায় কওমী-জগতের বিশাল অবদান রয়েছে। প্রবন্ধটি এ সাইটের ‘মাদারিস’ পৃষ্ঠায় দেয়া আছে। সেখানে দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, মানবিক সাহায্য প্রদান ও সমাজ-সংস্কারের মতো জায়গাগুলোতে কওমী আলিম-উলামার নীরব ও ঈর্ষণীয় অবদান রয়েছে। ব্যাপার হলো, কওমী আলিম-উলামা এসব অবদানের কথা প্রচার করে বেড়ান না। তাই, জাতি সে সম্পর্কে অজ্ঞাত। এমন প্রেক্ষাপটে কেউকেউ আলিম-উলামাকে কথিত মূলস্রোতে সম্পৃক্ত করার দাবি তোলেন। মূলত, এ দাবি সম্পূর্ণ অসার ও ভিত্তিহীন। আদর্শিকভাবে তাঁরা আগে থেকেই মূলস্রোতে আছেন। সমালোচকেরা যদি নিজেদের অবস্থানকে ‘মূলস্রোত’ বলে দাবি করেন, তবে এক-ই যুক্তিতে আলিম-উলামা নিজেদের ধর্মীয় অবস্থানকে মূলস্রোত দাবি করার অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা রাখেন। ভূমিকা নীরব বলে জাতীয় অবদানে তাঁদের মূল্যায়ন করা হয় না।

এবার আসি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথায়। এখানে আলিম-উলামার ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা শোনার ও বলার আছে। শোনার কথা মোটাদাগে সবাই কমবেশি জানেন। সত্যিকথা হলো, অন্তত এ বিষয়ে আলিম-উলামার ভূমিকা দৃশ্যত প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হবার আশঙ্কা তৈরি হলে দেশের রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল যেমন ব্ক্তব্য রাখেন, প্রশ্ন তোলেন; আলিম-উলামা সে অবস্থান থেকে সরব হন না। এ দেশের সুযোগ-সুবিধা কি তাঁরা নিচ্ছেন না? তবে তাঁরা কেন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপ্রশ্নে দূরত্ব বজায় রাখেন? নীতিগতভাবে আপত্তির জায়গাটি ন্যায্য। বলার হলো, এ বিষয়ে কিছু শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দল এবং তাদের সমমনা মিডিয়া স্বাধীনতার পর থেকে আলিম-উলামাকে তির্যকদৃষ্টিতে দেখে ও অপপ্রচার করে এসেছে। এরা প্রচার করে এসেছে, আলিম-উলামা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এঁরা রাজনীতি করলে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়; দেশের হয়ে কোন কথা বললে সরকারবিরোধিতার তকমা লাগিয়ে দেয়া হয়; কারও-কারও সম্পর্কে ভিত্তিহীন অপবাদ দেয়া হয় ইত্যাদি। এসব প্রতিকূলতার কারণে আলিম-উলামা বিতর্ক ও বিভক্তি এড়াতে কিছু বলা ও করা থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। এ দায় সম্পূর্ণ তাঁদের নয়। বলাবাহুল্য, তাঁদের মূলদায়িত্ব দেশের সার্বভৌমত্বরক্ষা নয়; ইসলামী বিশ্বাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরক্ষা। স্বাধীনতার দায়িত্ব মূলত সরকারের ও রাজনৈতিক দলের। তবে হ্যা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপদে পড়লে জাতীয় প্রয়োজনে তাঁরা যে ঘরে বসে থাকবেন না, সে তো কসম করে বলা যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপ্রশ্নে আলিম-উলামার কি কোন করণীয় নেই? আলবৎ আছে। আমি আগেই বলেছি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অধিকার পাবার শর্তে রাষ্ট্রের প্রতি আলিম-উলামার করণীয় শর্তাবদ্ধ। এখান থেকে নিষ্কৃতি পাবার কোন পথ নেই। আমি বলছি না, তাঁরা মূলদায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের মতো মিছিল-মিটিং করুক, বিক্ষোভ করুক। তাঁরা যা পারেন তা হলো:

১. সম্মিলিত একটি সুপ্রীম কাউন্সিল বা পরিষদ গঠন করা।

২. পরিষদের মাধ্যমে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সাথে মতবিনিময় ও প্রস্তাব পেশ করা।

৩. পরিস্থিতির নির্মোহ পর্যবেক্ষণ করে জাতির কাছে বক্তব্য তুলে ধরা।

৪. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপ্রশ্নে জাতিকে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে পরামর্শ দেয়া।

৫. পরিস্থিতি নিয়ে আপন-আপন এলাকায় জনগণকে সচেতন করে তোলা।

৬. শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা।

এ ধরনের পদক্ষেপ আমলে নিয়ে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখার প্রয়াস হলে জাতি ও রাষ্ট্র ভালো কিছু পাবে বলে আশা করা যায়। অপরপক্ষে আলিম-উলামার বিরুদ্ধে অহেতুক অপপ্রচার বন্ধে সর্বমহলে চেষ্টা থাকার বিকল্প নেই। কারণ,জাতি বিভক্ত থাকলে বহিঃশত্রুর কাজ সহজ হয়ে যায়। আজ জাতি বিভক্ত বলে রাষ্ট্র ভেতরে-বাইরে নানাবিধ ষড়যন্ত্রের শিকার। এখানে আলিম-উলামার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জায়গা আছে। জায়গা নিরাপদ হলে ঘর বাঁধতে অসুবিধা কোথায়?

০৩.০৪.২০২৩

মঙ্গলবার, ২ মে, ২০২৩

আগামী জাতীয় নির্বাচনে কওমীদের ভূমিকা

ভাবনা-৩৮

ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন ২০২৪। এ অবশ্য বিধিবদ্ধ কথা। বাস্তবে আদৌ নির্বাচন হবে কি না, হলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না কি চলমান সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন হবেইত্যকার বিষয় হিসাবে রাখা অনিবার্য। এখন রাজনীতিক দোলাচল যে চরিত্র বহন করছে তাতে আগাম কিছু বলা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, পর্দা নামের যে বাস্তবতা রাজনীতিতে সারাক্ষণ রাজত্ব করে সেটার এপাশে-ওপাশে কি চলছে, তা সাধারণের কাছে বোধগম্য নয়। এপাশের নাটক না হয় আমরা দেখলাম, ওপাশের দৃশ্য তো দেখা অসম্ভব। উপরে তো সবাই শেখ ফরিদ ভেতরে যদি ‘বোগল মে ইট’ থাকে, তা কি আমরা দেখি? তাই প্রচলিত রাজনীতি মানেই ছলনা, আলো নয় আলেয়া। সঙ্গতকারণে, এ জগতের জ্ঞান না থাকলে; ধূর্ত প্রাণীগুলোর গতিবিধি সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে স্বর্ণ খুঁজতে গিয়ে ছাই হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে প্রবল। মিথ্যার জঞ্জাল, প্রতারণার সমূদ্র আর প্রতিশোধের কুমতলবকে ডিঙ্গিয়ে তীরে পৌঁছানো দুষ্কর। তাই, আজ রাজনীতিতে সৎ, সাহসী ও নীতিবান মানুষের বড়ো অভাব। এখন নেই মাওলানা ভাসানী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রমূখদের অনুসারী। এখন দেশ বড়ো নয়, দল বড়ো। দেশের স্বার্থে দলকে গৌণ করার নযীর বিরল। দেশের মানুষ কি ভাবলো আর কি ভাবলো নাতা নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। এ চিত্র অস্বীকার করা যায় না।

বলছিলাম, নির্বাচনে কওমীদের ভূমিকা ‍নিয়ে। বিধিবদ্ধভাবে পাঁচ বছরের রাজনীতির নির্যাস নির্বাচন, যদি তাতে মানুষের স্বাধীন মতামত রক্ষার গ্যারন্টি থাকে। আজ দেড় যুগ হয়ে গেলো দেশের মানুষের সাথে সঙ্গী হয়ে আছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রতারণা। তাই, মানুষ এখন আর ভোট দিতে চায় না। এ হলো বিগত দেড়যুগের রাজনীতির নির্যাস। এমন পরিস্থিতিতে কী হতে পারে কওমীদের ভূমিকা? তাঁরা কি নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন? আমার মনে হয়, এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা জরুরী। ভয় হলো, কওমীদের তো আবার আবেগ নামের এক ভয়ানক অস্ত্র আছে, একতরফা সিদ্ধান্ত নেবার শক্তিশালী স্বভাব আছে। তাই আমার বলা যে কার গায়ে কতোটা লাগবে, জানি না। প্রশ্ন তুলতে পারেন: কওমীদের কি ঐক্যবদ্ধ কোন রাজনীতিক ছাউনি আছে? যৌক্তিক প্রশ্ন। নেই, তবে বিক্ষিপ্ত হলেও একটি বিশাল শক্তি আছে যা কালের সন্ধিক্ষণে মিলিত হলে জাতীয় গতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। এর অন্যতম নযীর ১৯৯১ সালে ৫ম ও ২০০২ সালে ৮ম জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে চার দলীয় জোটের ধসনামানো বিজয়। অতএব, কওমীদের শক্তি আছে কিন্তু সর্বক্ষণ নিয়ন্ত্রিত নয়। বিক্ষিপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে যায়, তবে আদর্শবিরোধী শিবিরে যোগ দেয় না কখনও। এমন অবস্থায় আগামী নির্বাচন কওমীদের জন্য আদর্শিক ও কৌশলতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাজনীতিতে ডানপন্থী বলে পরিচিত, তারা কওমীদের কাছে রাখতে চায় নিঃস্বার্থে নয়, নিজস্বার্থে। এটা কওমীদের বুঝতে সময় লাগে যতক্ষণ না ধোঁকা খায়। প্রচলিত রাজনীতিক দলগুলোর কওমী-শক্তির রস চিবিয়ে পান করার বাসনা গোপন নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত স্বীকৃতি ও আশ্বাস কওমীরা যখন প্রথমবারের মতো বিবেচনার চিন্তা করে, সে প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায় ২০২০ সালের মুদীবিরোধী প্রতিবাদে সরকারের অবিবেচকসূলভ সিদ্ধান্তে। অবশ্য এতে কওমীদের অভ্যন্তরীণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সবকিছুর পরে বলা যায়, কওমীরা এখন ভীষণভাবে সরকারবিরোধী।

এখন প্রশ্ন হলো, আগামী জাতীয় নির্বাচনে কওমীরা কি করতে পারে? কওমীরা যা করতে পারে তা হলো:

১. দেশের সকল কওমী আলিমদের একটি সম্মেলন আহ্বান করে মতামত নেয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সেটা অবশ্য দু’ভাবে হতে পারে: প্রথমত, বিভাগীয় সম্মেলন ও দ্বিতীয়ত, হাটহাজারীতে জাতীয় সম্মেলন।

২. নির্বাচন যদি বর্তমান সরকারের অধীনে হয় তবে ভোটদান থেকে বিরত থাকা উচিৎ কি না, ভেবে দেখা।

৩. নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কোন দলের লেজুড়বৃত্তি না করে স্বতন্ত্র কোন অবস্থান নেয়া যায় কি না, ভেবে দেখা।

৪. স্বতন্ত্র অবস্থান নিতে ব্যর্থ হলে বিকল্প অবস্থান ঠিক করা।

৫. একটি ইশতেহার প্রকাশ করে নিজেদের অবস্থান ও কারণ সম্পর্কে জাতিকে অবহিত করা।

পরিশেষে বলতে হয়, দেশের কওমী আলিম ও ছাত্রসমাজ মূলত কওমী মাদরাসাভিত্তিক । এরাই দেশের একমাত্র সামাজিক শক্তি যাঁদের শেকড় মাটি ও মানুষের গভীরে বিস্তৃত। এরা যতোই বিক্ষিপ্ত থাকুক, দুই কোটির কাছাকাছি ভোটব্যাংক জাতীয় নির্বাচনে কওমী-জগতের প্রধানশক্তি। বিক্ষিপ্ত  থেকেও আদর্শিক বন্ধনের জোরে এ শক্তি কাজে আসে অলৌকিকভাবে কালের প্রয়োজনে। এটা নিষ্ঠুর এক বাস্তব। তাই ভোটের আগে সবাই কওমীদের কাছে টানতে চায়। ইসলামবিরেরাধী পরিচিতি নিয়েও ইসলামপ্রীতি দেখাতে হজ্ব করতে  যায়। জানি না বিষয়গুলো আমাদের কওমীরা কতোটুকু অনুধাবন করেন। আমার মনে হয়, হাতি যেমন দুই কানের কারণে তার শরীর দেখতে অক্ষম তেমনি কওমীরাও অসতেনতার পর্দার কারণে আপন শক্তি অনুধাবনে অক্ষম। কিন্তু প্রতিপক্ষরা কওমীদের শক্তি সম্পর্কে সজাগ। সজাগ বলেই লোভ-লালসা দেখিয়ে এ শক্তিকে বাগে আনতে চায়, বিভক্ত করে দুর্বল করতে চায়। এমতাবস্তায় কওমীরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় তাতে জাতির কাছে লজ্জিত হতে হবে। আল্লাহ মাফ করুন।

০২.০৪.২০২৩

রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৩

মরহুম ডা. জাফরুল্লাহ’র কুরআন শিখা ও পরিত্যক্ত সেক্যুলারিজম

ভাবনা-৩৭

সাম্প্রতিক অতীতে ইন্তিকাল করা মরহুম ডা. জাফরুল্লা’র একেবারে শেষ বয়সে এসে কুরআন শিখার একটি ভিডিও চোখে পড়ায় আজকের লেখার অবতারণা। কে এই জাফরুল্লাহ চৌধুরী? জাফরুল্লাহ চৌধুরী চট্টগ্রামের এক সৌভাগ্যবান সন্তান। তাঁর জন্ম ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে। মূলত বাংলাদেশের চিকিৎসা-জগতের এক প্রতিকৃৎ মরহুম ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সক্রিয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা। তা’ছাড়া তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামক স্বাস্থ্য বিষয়ক এনজিওর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের জাতীয় ঔষধ নীতিপ্রণয়ন ও ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা যায়, তিনি বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস-এ এফআরসিএস পড়াকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে চূড়ান্ত পর্ব শেষ না-করে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার নিমিত্ত আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং এরপরে ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালপ্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যজ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তারা রোগীদের সেবা করতেন এবং তাঁর এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়।

ডা. জাফরুল্লাহর বিশ্বাস ও জীবনাচার নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। তবে কোন কোন পত্রিকায় তাঁকে সাম্যবাদী বা বামপন্থী বলে প্রচার করা হয়েছে। জন্মগতভাবে তিনি একজন মুসলিম পরিবারের সদস্য। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়ে এমন অনেকেই বামপন্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেনএম নযীর কম নয়। সেদিক থেকে মরহুম জাফরুল্লাহ চৌধুরী আক্ষরিক অর্থেই বামপন্থার সাথেসাথে সেক্যুলার জগতের একজন বাসিন্দা ছিলেনতা বলা যায়। যেমন ছিলেন শিক্ষাবিধ মরহুম অধ্যাপক আবুল ফজল। তিনি অবশ্য সেক্যুলারিজম নিয়ে অতিসরব ছিলেন। সে অর্থে ডা. জাফরুল্লাহ সরব ছিলেন না; নীরব ছিলেন। মরহুম আবুল ফজলের সাথে একটি বিষয় মরহুম জাফরুল্লাহ’র সাথে মিলে যায়। তা হলো, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ইসলামের দিকে স্বতঃস্ফুর্ত প্রত্যাবর্তন। তাঁর জীবনের শেষপ্রান্তে এসে কুরআন শিখার ভিডিওটি দেখলে অনেক কিছু অনুভূত হয়। বোঝা যায়, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কখনও “আলিফ-বা-তা”শিখায় ব্রতী হননি। তাঁর ছাত্র জীবন, কর্মজীবনের কোথাও তাঁর পারিবারিক বিশ্বাস ইসলামের উপস্থিতি ও আচরণ ধরা দেয়নি। মোটাদাগে বলা যায়, জাফরুল্লাহর জীবন ছিলো প্রধানত সেক্যুলারধর্মী। কিন্তু কেবল আল্লাহর রহমতে তিনি তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে আপন গৃহে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যখন একজন আলিমের মুখেমুখে “আলিফ-বা-তা” আরবী হরফগুলো পড়ছিলেন, মনে হচ্ছিলো, তাঁর মধ্যে কোন কপটতা বা লৌকিকতা  নেই। তাঁর চোখেমুখে ছিলো, ঘরে ফেরার অদম্য আনন্দ ও মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের নির্ভেজাল প্রত্যয়। আমার মনে হয়েছে, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছেন। মরহুম অধ্যাপক আবুল ফজলের মতোই তিনি তথাকথিত সেক্যুলারিজমকে ছুঁড়ে ফেলে রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।

আমাদের দেশের সেক্যুলাররা যেভাবে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করতে নানা কৌশল অবলম্বন করে ঈমান নষ্টে দিনরাত সচেষ্ট, তাদের জাল ছিন্ন করে ইসলাম-ঈমান রক্ষায় মরহুম আবুল ফজল ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী যে নযীর দেখিয়েছেন তা বর্তমান অবুঝ সেক্যুলারদের পথ দেখাতে পারে বলে বিশ্বাস। কথায় বলে না: শেষ ভালো যার সব ভালো তার! আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন: তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মতো ভয় করো, মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। এখানে সেক্যুলার হওয়ার কোন পথ খোলা নেই। দেশের মিডিয়াগুলো মরহুম ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অনেক গূণের বয়ান দিয়েছে কিন্তু এড়িয়ে গেছে তাঁর কুরআন শিখার ব্যাপারটি। কারণ তাতে যদি সেক্যুলারিজমের গোমর ফাঁস হয়ে যায়? আলোচকেরাও তাঁদের টকশোতে সে-কথা বেমালুম চেপে গেছেন সজ্ঞানে।তাতে কি পরিত্যক্ত সেক্যুলারিজমকে রক্ষা করা যাবে? আমরা আশা করবো, মরহুম আবুল ফজল ও ডা. জাফরুল্লাহ’র মতো সন্তানদের দেখানো পথে অবুঝ সেক্যুলাররা শেষজীবনে হলেও ইসলামের আহ্বানে সাড়া দেবে।

৩০.০৪.২০২৩  

Featured Post

১১ দল ও ৭ দলের যোগবিয়োগ

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮১  গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ১১ দলের শরীক ৭টি কওমী দলের আলাদা জোটের ভবিষ্...