বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

মুহতারাম খালিদ ভাই সমীপে

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৫ 

মুহতারাম খালিদ ভাই,

অধীনের মাসনূন সালাম রইল। আশা করছি, মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ রহম ও করমে আপনি ভালোই আছেন। দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে উত্তরোত্তর ভালো রাখুন এবং কওমী দায়িত্ব পালনে অধিকতর কামিয়াব করুন। অনস্বীকার্য যে, এ মুহূর্তে আপনি আমাদের একমাত্র কওমী ব্যক্তিত্ব হয়ে সরকারের ধর্ম-উপদেষ্টা হিসাবে বৃহত্তর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ আপনার কাজে অধিকতর বারাকাত দান করুন। আলহামদুল্লিাহ, আপনার ইজ্জত-ওয়াকার রক্ষা ও উন্নতিতে আপনার যেসব মুহিব্বীন দরবারে ইলাহীতে দোয়া করেছেন এবং এখনো করছেন তাঁদের মধ্যে এ গুনাহগারও অন্তর্ভুক্ত।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আপনার সাথে অধীনের সম্পর্ক সেই নব্বইয়ের দশক থেকে যা অনেকের কাছেই অজ্ঞাত। আপনার নিশ্চয় মনে থাকবার কথা: নব্বই দশকের দুই প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব ও মিল্লাত-এ চট্টগ্রামের কওমী অঙ্গন থেকে কেবল দু’জন লিখার সুযোগ পায়। আপনি লিখতেন উপসম্পাদকীয় আর আমি লিখতাম ফিচার। আজও সেসব কপি অধীনের কাছে সংরক্ষিত আছে। আপনি যখন পিএইচডি অর্জন করেন প্রথম দুয়েক জনের মধ্যে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। সেদিন প্রাণভরে দোয়া করেছি প্রথম একজন কওমিয়ান ডক্টরেটধারী হিসাবে আপনার অভিষেক হলো বলে। তবে বাস্তবতা হলো, আপনি বয়সে, শিক্ষায়, জ্ঞানে, বিচার-বুদ্ধিতে এবং সামাজিক ও জাতীয় মর্যাদায় অনেক উর্দ্ধের মানুষ। সেখানে অধীনের চলাচল অসম্ভব। তাই তুলনা করাকেও অধীন অপরাধ বিবেচনা করি। সেদিক থেকে আপনি অধীনের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রজন্ম এবং অবশ্যই সম্মাননীয়। তাই, আপনার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আমার নিচের বক্তব্যকে স্নেহশীল ও মূল্যায়নমূলক দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আবদার রাখি। মূল্যায়নের কথাটি এজন্য বললাম, ইসলামে মুহাব্বাত ও আইনের বিষয়টিকে সযত্নে একটি ন্যায্য দূরত্বে রাখা হয়েছে। আমি কাউকে মুহাব্বাত করবো; সম্মান করবো ঠিক আছে কিন্তু আইন বা ইন্তিযামের বিষয় যখন উপস্থিত হবে তখন মুহাব্বাত আর আইন মিশ্রিত হবে না; হতে পারে না। আইন মুহাব্বাতকে অতিক্রম করে প্রযুক্ত হবে। মুহাব্বাতের স্থান হবে পরে। সেজন্যই তো সর্বকনিষ্ঠ ও আদরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আবূ শাহমা রজি:কে আদল ও ইনসাফের বাদশাহ হযরত ফারুকে আযম রজি: আশি দিররার শাস্তি দিতে একটুও দ্বিধা করেননি। এমন কি হযরতের বিবি অর্থাৎ আবূ শাহমার মা দৌড়ে এসে হযরত ফারুকে আযমের পায়ে পড়ে ছেলের প্রাণভিক্ষা চান, তখন হযরত উমর ফারুক রজি: গর্জে উঠে বলেছিলেন, সরে যাও! তোমার মতো আরও অনেক মা এভাবে কেঁদেছে কিন্তু কেউই রেহাই পায়নি। তুমি পাবে কেন? সীরাতে সাহাবা সাক্ষী দিচ্ছে, আশি দিররার কিছু বাকি থাকতেই আবূ শাহমা রজি. আঘাতের চোটে বেহুঁশ হয়ে যান। বেহুঁশ হবার আগে হযরত আবূ শাহমা একটু পানি পান করতে চান। কিন্তু ফারুকে আযম রজি. কঠোরকণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তোমার আগে তোমার মতো আরও অনেক মায়ের সন্তান পানি চেয়েছে কিন্তু তাদের দেয়া হয়নি। ফারুকে আযম রজি: বজ্রকণ্ঠে হুকুম দিলেন, পরোয়া করার প্রয়োজন নেই, বাকি দিররা পুরণ করো! দিররা সম্পন্ন হলে দেখা গেলো আবূ শাহমা রজি.’র প্রাণবায়ু আর নেই। তখন হযরত ফারুকে আযম রজি. পুত্রস্নেহে সজোরে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে মাথায় হাত রেখে কাঁদতে থাকেন এবং মাটিতে বসে পড়েন। এই হলো ইসলামের আইন ও মুহাব্বাতের মূল্যায়ন। হযরতের খিদমাতে আরও একটি বিষয় উত্থাপন করার ইচ্ছাকে দমন করতে পারছি না। আল্লাহ’র হাবীব সা.কে আল্লাহ কতো ভালোবাসতেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রসূলে করীমের শানে সূরা দোহা নাজিল করে স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন আদর করে বলেন: والضحى ١ والليل إذا سجى  (কসম হে নবী আপনার দীপ্তিময়, পরমোজ্জ্বল চেহারার যার উজ্জ্বলতার কাছে সূর্যের উজ্জ্বলতাও শরমিন্দা হয়ে আলো ভিক্ষা চায়! কসম হে নবী আপনার কালো-কৃষ্ণ চুলের যার কৃষ্ণতার কাছে ঘনঘোর গভীর রাতের অন্ধকারও শরমিন্দা হয়ে কৃষ্ণরং ভিক্ষা চায়!) অথচ দেখুন, এমন দয়াময় রবও অনিচ্ছাকৃতভাবে শুধু একবার ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার কারণে কিছুদিনের জন্য ওহী বন্ধ করে রেখেছিলেন। এটাই তো ইসলামের মুহাব্বাত ও কানূনের মধ্যকার ন্যায্য দূরত্বের মহান চিত্র। হযরত, তাই বলছি, অধীনের বক্তব্যকে আপনি সেই মূল্যায়নে দেখবেন আশা করি যেখানে মুহাব্বাত ও কানূন তাদের ঐতিহ্যগত ন্যায্য দূরত্ব বজায় রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আপনার-আমার মাঝে এক নির্ভেজাল মুহাব্বাতের সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো এবং এখনো আছে। সেই সাথে এটাও মেনে নিতে হয় যে, এ সম্পর্ক কেবলমাত্র ‘ফিল্লাহ’র মাপকাঠির উপরেই স্থাপিত। সেখান থেকে একচুলও নড়বার সুযোগ নেই। তাই তো ‘লিল্লাহী’ মতভিন্নতার পরও পারস্পরিক ভালোবাসার অস্তিত্ব থাকা ঈমানের দাবি। অধীন ছাত্রজীবন থেকে হিফাজত করতে শিখেছি এক নীতিবাক্য“কানূন আপনি জাগাহ্ মুহাব্বাত আপনি জাগাহ্। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আজ আপনার মতো বিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠজনকে আপনার স্নেহধন্য হয়ে থাকবার নিশ্চয়তায় দু’চার কথা লিখতে হচ্ছে। দুঃখ পেলে ক্ষমাপ্রার্থী।   

মুহতারাম খালিদ ভাই,

গত ১৫ই জুলাই ২০২৫, রোজ মঙ্গলবার আপনি সরকারি সফরের অংশ হিসাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শন করেছেন। সংবাদ-মাধ্যমে জেনেছি, সংস্কারমূলক কর্মসূচীর অংশ হিসাবে আপনি সফরটি করেছেন। একটি ভিডিও বক্তব্যে আপনার কথাও শুনলাম। সে সময় আমি ফেসবুকে খবরটি প্রথম পাই। তখনো আপনার ভিডিও আমাদের সামনে আসেনি। কেবল একটি ছবিই দেখি যেখানে আপনার হাতের বাম পাশে কুখ্যাত ওসি রফিক ও ফ্যাসিবাদের দু’জন জঘন্য ও বর্বর দোসরকে দেখি। আমি সাথেসাথে হাকীকত জানার জন্য হেফাজত ও ধর্ম উপদেষ্টা হিসাবে আপনার বক্তব্য দাবি করি আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে। ক’দিন আগে আমার এক সুহৃদ আমাকে ফোনে জানালেন, আমার স্ট্যাটাস দেখে আপনি নাকি মনক্ষুণ্ন হয়েছেন এবং বলেছেন, রব্বানী ভাই তো আমার মুহাব্বাতের মানুষ। তিনি তো এভাবে স্ট্যাটাস না দিয়ে বা শেয়ার না করে আমাকে সরাসরি বলতে পারতেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

প্রথমেই অধীন একটি বাস্তবতা আপনার সামনে পেশ করতে চাই। তা হলো, ২০২০ সালের মুদিবিরোধী আন্দোলনে শতশত কওমী আলিম-ছাত্র ও হেফাজত সমর্থক দেশব্যাপী গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও কারাবরণের শিকার হন। এটা অনস্বীকার্য যে, যাঁরা সেদিন নানাভাবে ফ্যাসিবাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন তাঁদের মনোব্যথা ও আহাজারির উপলব্ধি বাইরের কারও পক্ষে সঠিকভাবে সম্ভব নয়। নিগৃহীতদের পেশা, সংসার সব এক অনাহূত আঘাতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন তাঁদের মননে যে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয়সে ব্যথা কি বাইরের কেউ বুঝবে? তাই নির্যাতিদের মানসিক ও শারীরিক নির্মমতা, স্বজনদের মনোকষ্টের আবেদন এক ভিন্ন জগৎকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে জগৎ বাইরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আপনি যেহেতু বাইরে ছিলেন, সঙ্গতকারণে, আপনার কাছে কিছু চিত্র তুলে ধরা ও আপনার জানার দুয়ারে উপস্থাপন করা অনিবার্য মনে করি। ফ্যাসিবাদের চরম নির্যাতনের স্টীমরোলার বয়ে যায় বিশেষত হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। অধীন যেহেতু সে পরিস্থিতির অন্যতম শিকার তাই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তুলে ধরছি। হাটহাজারী নির্যাতনের মূল হোতা কুখ্যাত ওসি রফিক, যে কারাগার পরিদর্শনের সময় আপনার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। মনে হয়, ওসি রফিকের উৎপীড়নের ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা গেলে বিষাদ সিন্ধুকেও হার মানাবে। উদাহরণ হিসাবে আসাদুল্লাহ আসাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁদের তিন ভাইকে পরপর গ্রেফতার করে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়। তাঁদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের খবরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন আসাদের মা ও বাবা। সংসার হয়ে যায় বিধ্বস্ত। অসুস্থ আসাদের বাবা রুগ্ন শরীরে আপন সন্তানদের মুখ চেয়ে আদালতের দহলিজে ঘুরপাঁক খেতে থাকেন। এক সময় তাঁদের মুক্তি অবশ্য হয়েছিলো কিন্তু আসাদের মা-বাবার রোগমুক্তি আর হয়নি। সে রোগেই গত ২৮শে জুলাই সোমবার আসাদের বাবা মাওলানা ইউনুস সাহেব চলে গেলেন দরবারে ইলাহীতে; জানাযা উঠলো হাটহাজারী মাদরাসা মাঠে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে যখন আসাদের ভাই আমিন আমাকে দেখে দূর থেকে হাত নাড়তো, বোঝানো দায় সে করুণ চাহনির গুরুভার। চোখের জলও পরাজিত হতো সে নির্মমতার কাছে। হাটহাজারী থানায় রাতের অন্ধকারে ওসি রফিকের নির্দেশে তার দোসর রাজিব শর্মা বিনাদোষে কতো নিরীহ মাদরাসা ছাত্রের হাত-পায়ের নোখ তুলে জীবন্ত জাহান্নামকে হাজির করতো তার খবর কি কেউ নিয়েছে? আদালতের বারান্দায় মাও. রিজওয়ান আরমানের অবুঝ শিশুদের বাবা-খোঁজার কাহিনী কি কেউ লিপিবদ্ধ করেছে? আমার গ্রেফতারের পরের দিন আমার একমাত্র ছেলে থানায় আমাকে দেখতে গেলে তাকেও গ্রেফতার করে আমার পাশের হাজতে আটকে রাখে ওসি রফিক। সেদিন একজন পিতা হিসাবে নিজ সন্তানকে পাশের হাজতে বন্দী থাকার নির্মম অভিজ্ঞতা কি কেউ অনুভব করতে সক্ষম হয়েছে? মাদরাসার গেট থেকে যে নিঃস্ব খেজুর বিক্রেতাকে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় তাঁর আর্তচিৎকারের ধ্বনি কয়জনের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছে? এগুলো আমরা নির্যাতিদের মর্মবিদারী ইতিহাসের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা মাত্র। পুরো আখ্যান লিপিবদ্ধ হলে কতো সাগর যে শুকিয়ে যাবে তা এক খোদাতায়ালাই জানেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

কারাগার পরিদর্শনের ছবি যখন সামনে এলো, আপনার মুখাবয়বে আমরা প্রীত হই নিশ্চয়। কিন্তু আপনার আশেপাশে সেই কুখ্যাত ওসি রফিক ও দুই ফ্যাসিবাদের দোসরকে দেখে বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ আপনার অস্ত্বিকে সুনামির ঢেউয়ের মতো মুছে দেয়। ভেবেছিলাম, কেউ বুঝি আপনার অপমানে অডিট করা ছবি ছেড়েছে। কিন্তু আমাদের সব সন্দেহকে মাটি করে দিয়ে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো যখন খবর ছাপলো, বুঝতে কষ্ট হলো সেই আপনি এই আপনি। ২০২০’র নির্যাতিতদের সে দৃশ্য সহ্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। ক্ষু্ব্ধ হৃদয়ের জমে থাকা সব ঢেউ আছড়ে পড়লো আপনার প্রিয় চেহারার উপরব্যক্তিত্বের উপর। একে আপনি অপরাধ বা দোষ বিবেচনা করবেন না অনুগ্রহ করে। এখানে বশরিয়্যাতের স্বাভাবিক আবেগে আছড়ে পড়ে প্রবল ঘুর্ণিঝড়, যা কেউ সামলাতে পারতো না। এরপর আপনার বক্তব্য এলো। আপনি বললেন, ‘পরাজিত শক্তির অপপ্রচার’। মাজলূমদের আহত হৃদয় এ বক্তব্যকে স্বাভাবিক অনুভূতি প্রকাশের পরিবর্তে একটি একপেশে রাজনীতিক বক্তব্য বলে মনে করতে বাধ্য হলো। স্বীকার করি, হাতের সব ক’টি আঙ্গুল সমান নয়। তেমনি সবাই তো আর ষড়যন্ত্রকারী নয়। শেষ রাতের মসজিদ থেকে বের হওয়া সব মুসল্লীই তো চোর নয়, অধিকাংশ মু’মিন বটে। আপনি যখন একলা বসে থাকবেন, আরজ করি, ছবিটা একটু হাতে নিয়ে নিরপেক্ষ চোখে দেখুন! ছবি কি বলে? আমরাও কয়েদী ছিলাম। যখন সেলে (জেলের ভেতর জেল) চব্বিশ ঘণ্টা বন্দী ছিলাম পরিদর্শকরা আসতেন, শুধু বারান্দা দিয়ে হেঁটে প্রতীকি দায়িত্ব পালন করে যেতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করেনি: কেমন আছি? কিন্তু মানবতার আসামীদের যখন ছবিতে দেখা গেলো আপনার সামনে স্বস্তিতে সেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে তখন আমরা অবাক না হয়ে পারিনি। কারণ, আপনি জানেন, তারা কতো বর্বর অপরাধী। তা সত্ত্বেও জেলকোড ভেঙ্গে আপনাকে তাদের কুশল জানতে চাওয়ার দৃশ্য সবাইকে হতবাক করেছে। এখন যদি আমরা সবিনয়ে আপনাকে প্রশ্ন করি: আপনি ধর্ম উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা নির্যাতিতদের কুশল জানতে আপনার মূল্যবান তহবিল থেকে একটু সময় বের করা কি অপচয় হতো? আমরা কি আপনার মতো মহৎজনের জন্য বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর গণ্য হতাম? আপনার কাছে সবিনয়ে জানতে ইচ্ছে করে, আপনি রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। আপনার কারাগারে আসার আগে নিশ্চয় কারাগারের কোন-কোন জায়গা পরিদর্শন করবেন এবং সেখানে কারা থাকেনসে বিষয়ে তো আপনাকে আগেই জানানো হয়েছে, তাই না! এটাই তো সরকারি প্রটোকল। তখন কি হযরতের নযরে বিষয়টি আসেনি যে অমুক-অমুক সেখানে থাকবে। তাহলে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে সম্ভাব্য কথা বলাকে এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব হতো না? কিন্তু কেন সেটা হয়নি আল্লাহই ভালো জানেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

কথাগুলো বললাম আপনাকে, আপনার ব্যক্তিত্বকে ছোট করতে বা আহত করতে নয় বরং মানুষ হিসাবে আপনাকে না-ওয়াকিফ বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করতে। একজন মানুষ হিসাবে অনেক কিছু আপনার অজানা থাকতে পারে। সে কিন্তু দোষের নয়। আল্লাহ’র রসূল সা.কেও তো আল্লাহ তায়ালা অজানা বিষয়ে জ্ঞাত করেছেন। সেদিক থেকে আপনার খালিস মুহিব্বীনের একজন হিসাবে নির্যাতিতদের আবেগ ও ভেতরের কথাগুলোকে আপনার কাছে পৌঁছে দিতে আজকের লেখার অবতারণা। আমি বিশ্বাস করি, আমার আর্জি আপনার হাতে যাবার পর আপনার সহজাত উদার মননে মনক্ষুণ্ন হবার সকল কারণকে দূরীভূত করবে। আপনি এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সমাসীন। ব্যস্ততার ওপর ব্যস্ততা আপনার নিত্যসঙ্গী। তাই সরাসরি যোগাযোগ অধীনের পক্ষে যেমন সম্ভব নয় তেমনি সংযতও নয়। তা’ছাড়া বিষয়টি আমার একক সত্ত্বার সাথে সংশ্লিষ্টও নয়। এখানে মিশে আছে জানা-অজানা হাজারও ভুক্তভোগী মানুষের না বলা উপাখ্যান। মনে করি, এককভাবে কথা বলে বিক্ষুব্ধদের ব্যথাকে প্রশমিত করা যেতো না। তাই আপনার ব্যক্তিত্বকে মহান করার প্রয়াসে আজকের উপস্থাপনা।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আজ এক আর্জি নিয়ে আপনাকে অলঙ্কৃত করবো বলে ভেবেছি। আমি জানি, এ আর্জি গ্রহণে হাজারও মাজলূমদের সাথে আপনার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সৃষ্টি হবে যাঁরা অন্যতম উপদেষ্টা হিসাবে আপনাকে দেখতে অনলাইনে বিশাল মিছিলের আয়োজন করে আওয়ায তুলেছিলো: আফম খালিদ সাহেবই হবেন কওমী-জগতের প্রতিনিধি; উপদেষ্টা। তাঁরাই হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আলিম প্রতিনিধি হিসাবে আপনাকে তুলে ধরে। সেদিক থেকে আপনার উপদেষ্টাকালীন মেয়াদের মধ্যে আপনি ২০২০ সালের নির্যাতিতদের সাথে একটু সময় করে বসুন; তাঁদের কথাগুলো শুনুন; তাঁদের বিধ্বস্ত পরিবারের উপাখ্যানকে উপলব্ধি করুন। তাঁদেরও কুশল জানুন। নিঃসন্দেহে এতে আপনার ব্যক্তিত্ব আরও প্রসারিত হবে; সমৃদ্ধ হবে।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আপনি এখন সরকারে আছেন। বহুদিন ধরে কওমী-জগতের একটি বড় সমস্যার সমাধান হয়নি। সে হলো, দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার বা ফুনূনাতের শিক্ষার পর অধিকতর জ্ঞান ও পরিপক্কতার জন্য একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তন। বর্তমানে আমাদের মাদারিসে কওমিয়ার নিসাব ও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে। বর্তমান দাওরায়ে হাদীসের শিক্ষার পর কওমী ছাত্ররা অনেক ক্ষেত্রে আর শিক্ষার প্রয়োজন মনে করেন না বা প্রয়োজন বোধ করলেও আর্থনীতিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে সামর্থ্য হন না। ফলে অন্যসব প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হতে হয়। মনে করি, দীর্ঘদিনের সে সমস্যা নিরসনে এক সুবর্ণ সুযোগ আজ আমাদের দ্বারে উপস্থিত। আপনার সুচিন্তিত নেতৃত্বে এ সমস্যার সমাধানের দিকে যাত্রা শুরু হোক। আপনার প্রচেষ্টায় প্রধান উপদেষ্টার সাথে আলোচনাক্রমে একটি সমন্বিত কওমী ভার্সিটির বুনিয়াদ যদি রাখা যায়, তবে সে হবে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ যা জাতীয় ও কওমী জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আপনি পদক্ষেপ নিন, কওমী-জগৎ আপনার পেছনে কাতারবদ্ধ থাকবে। এখন যে কওমী সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি উঠছে সেটি ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হবে একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তনের মাধ্যমে। দোয়া করি, আপনার প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বে একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে আপনার সঠিক স্থানটি চিহ্নিত হোক। আল্লাহ কবূল করুন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আজকের এ অবতারণার মাধ্যমে আশা করি আপনার মনক্ষুণ্ন হবার উপদানগুলো আপনার সদয় অনুগ্রহে বিদূরিত হবে। কারণ, অধীন মনে করি, নানা মতভিন্নতা সত্ত্বেও মু’মিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সৌহার্দ্য অক্ষুণ্ন থাকা উচিৎ। ইতিহাসের জঙ্গে জামাল ও সিফ্ফীন এর উৎকৃষ্ট দলীল। পরিশেষে, আপনার স্নেহপূর্ণ দোয়া ও শুভাকাঙ্খা চেয়ে এবং আপনার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও কামিয়াবী কামনা করে এখানেই ইতি টানছি। তাম্মাৎ বিল খাঈর।

আপনারই স্নেহধন্য

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

চট্টগ্রাম।

31.07.2025

রবিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৫

সেই পুরনো স্বভাব রয়েই গেল

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 ভাবনা-৬৪

আমাদের ইসলামী আন্দোলন বিশেষত হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে দেখে আসছি, আমাদের বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ অকারণে অতিমাত্রায় অগ্নিগর্ভ ও কঠোর। যেমন ধরুন, প্রতিটি ইট খুলে ফেলবো, টেনে নামিয়ে ফেলবো, এ দেশে থাকতে দেয়া হবে না ইত্যাদি। বলতে পারেন, সেগুলো তো রাজনীতিক নেতা বা বামপন্থীরা হারহামেশা বলে আসছে। আমরা করলে দোষের কি? আসছি সে কথায়। একই কাজ যদি কোন শিক্ষিত ও অশিক্ষিত করেন তাহলে কি উভয়ই একই পরিমাপের? মনে করুন, গালি। কেউ শিক্ষিত হয়ে বা মাদরাসায় পড়ে গালি দিল আর সাধারণ অশিক্ষিত একজন গালি দিলউভয় কি একই ওজনের? নিশ্চয় বলবেন: তা কেন হবে? অশিক্ষিত-অভদ্রেরা গালি দিতে পারে কিন্তু শিক্ষিত বা মাদরাসাপড়ুয়া কি করে গালি দেবে? এখানেও ঠিক একই কথা। সাধারণ রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের সাথে যাঁরা কুরআন-হাদীস পড়েন তাঁদের তুলনা কি করে করবেন? ওরা তো কুরআন-হাদীসের নীতিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই তাঁদের গর্হিত কাজও মাদরাসাপড়ুয়াদের তুলনায় হালকা হতে বাধ্য। মাদরাসাওয়ালারা রাজনীতি করবেন, বক্তব্য দেবেন, দিতেই পারেন। কিন্তু এমন কি বলবেন, যা তাঁদের পঠিত নীতি-নৈতিকতার সাথে মিলে না? তাঁদের আদর্শের সাথে খাপ খায় না? আচ্ছা এই যে বললেন: গদি থেকে নামিয়ে ফেলবেন, জেলের প্রতিটি ইট খুলে ফেলা হবে। কৈ, কোন দিন কি পেরেছেন ইট খোলা তো দূরের কথা, কাছেও যেতে? ক’জনকে গদি থেকে নামিয়েছেন? কেন জানি আমরা আজও সেই গতানুগতিক মেজাজ থেকে বেরুতে পারিনি। সে অনুভব বা চেষ্টা আছে বলে মনেও হয় না। পরিবর্তনের কোন আহ্বানই আমাদেরকে পরিবর্তিত করতে পারছে না। আমার এখনো মনে আছে, মুদিবিরোধী আন্দোলনের সময় হেফাজতের কিছু নেতার মুখে এমনসব ভাষা উচ্চারিত হয় যা কোন ক্রমেই কোন নায়েবে রসূলের বলে মনে হয়নি। সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন: আমরা আলিম-উলামার কাছে এমন ভাষা শুনতে চাই যা তাঁদের লেখাপড়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কথাটি আমাদের জন্য ছিলো গভীরভাবে অপমানজনক। রসূলুল্লাহ সা. মক্কার কাফিরদের অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন কিন্তু কখনো এমন কোন ভাষা বা শব্দ উচ্চারণ করেননি বা সাহাবীদের (রজি.আনহুম) বলতে বলেননি যা থেকে কাফিররা এমন বলতে পারে যে, আপনাদের বক্তব্যে আমরা এমন আহত হয়েছি যে, দ্বীন গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমরা ইসলামী নেতৃত্বের পাশাপাশি নবীজী সা.’র আদর্শেরও সৈনিক; প্রত্যেকেই দা-য়ী।। তাই সাধারণ যা বলে তা আমরা বাছবিচার ছাড়া বলতে পারি না।

আমি মাঝেমাঝে আশ্চর্য হই। আমরা মাদরাসাওয়ালারা কি নিজেদের পরিভাষা ব্যবহার করে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারি না? বামপন্থীদের স্লোগান কেন আমরা মুখেমুখে বয়ে বেড়াবো? গণতন্ত্রীদের ভাষা কেন আমরা মুখে আওড়াবো? এতো পরনির্ভর হলাম কেন আমরা? ধরুন, মানববন্ধনের কালচার। দেশে এটা কারা এনেছে? জানেন? মানববন্ধনের আবিস্কারক হলো বামপন্থীরা আর তাদের সহযোগী এনজিও। আর এখন ইসলামী আন্দালনকারীরাও দেখি মানববন্ধনের জন্য দিওয়ানা। এ স্বরোধিতা কেন? বামপন্থীদের দেশ ছেড়ে যেতে বলবেন, ইসলামবিরোধী বলবেন আবার তাদের কৃষ্টি-কালচারকে বগলতলে করে ঘুরে বেড়াবেনএ কেন? পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

ياأيها الذين آمنوا لا تقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكافرين عذاب أليم

হে মু’মিনগণ, তোমরা ‘রায়িনা’(আরবীতে এর অর্থ: আমাদের দিকে লক্ষ করুন। আর হিব্রু ভাষায় শব্দটি বদদোয়া হিসাবে ব্যবহৃত হতো। তাই ইহুদীরা রসূলুল্লাহ সা.কে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ‘রায়িনা” বলতো। ‘উনযুরনা’ শব্দের অর্থও: আমাদের দিকে লক্ষ করুন।) বলো না—‘উনযুরনা’ বলো এবং শুনতে থাকো কাফিরদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (সূরাহ্ বাকারাহ, ১০৪)

বলাবাহুল্য, আরবীতে ‘উনযুরনা’ ও ‘রায়িনা’ সমার্থক। অথচ আল্লাহ তায়ালা শব্দ দু’টি সমার্থক হওয়া সত্ত্বেও কাফিরদের কণ্ঠে অধিকতর প্রচলিত ও দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ব্যবহৃত হতো বিধায় ‘রায়িনা’ বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে মুসলিমদের জন্য ‘উনযুরনা’কে পছন্দ করেছেন। এখানে স্পষ্টতঃ মু’মিনদের জন্য স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও আচার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কাফিরদের সংস্কৃতিকে অগ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। 

আমি বলতে চাচ্ছি, মাদরাসাপড়ুয়া হিসাবে; দা-য়ী হিসাবে; মানুষকে আল্লাহর রাসূল সা. প্রদত্ত হিদায়াতের আহ্বানকারী হিসাবে আমরা সাধারণের মতো হওয়া চলবে না। আমাদের কদম-কদম আচরণ থেকে মানুষ যেনো শিক্ষা নিতে পারেসে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ না থাকলে আমরা পাগড়ি-জুব্বা পরিধান করে আর নেতা হয়েও ব্যর্থ। নাম যখন দিচ্ছি: ইসলামী রাজনীতি, তো ইসলামসম্মত হতে হবে না? পশ্চিমারা আর দেশের উগ্র সেক্যুলার গোষ্ঠীগুলো চায় আমরা উগ্রবাদী হই, চরমপন্থী হই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি বক্তব্যে, আচরণে সংযত না হয়ে উগ্রপন্থী হই তাতে তো শত্রুপক্ষেরই লাভ। তাই না? ওরাও তো চায় আমরা রাস্তার গাছ উপড়ে ফেলি; সরকারী সম্পদে হামলা করি। এমন করলে কাদের লাভ? একটু উপলব্ধি করুন, আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন কথাবার্তায় শাপলা ও মুদিবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের কি ক্ষতি করেছি। আমরাই তো সরকারকে চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে নিজেদের অরাজনীতিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলাম। বিনিময়ে অসংখ্য আলিম-ছাত্র শহীদ হন; বেঁচে থাকাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়; অনেকের সংসার ধ্বংস হয়ে যায়। কৈ, যারা উগ্র কথা বলে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন তারা তো আড়ালে চলে গিয়েছিলেন আর অসহায় হয়ে পড়েন অসংখ্য নিরীহ আলিম। তাঁদের খোঁজ কি ভাষণওয়ালারা নিয়েছিলেন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আজও সে বলয় থেকে বের হতে পারিনি। আজ কিছু ডানপন্থী রাজনীতিক দলও ধর্মীয় উগ্রপন্থার আশঙ্কা প্রকাশ করছে। কেন? তা কি আজও আমাদের উপলব্ধিতে আসে না? জানি না আমাদের কবে বোধোদয় হবে। সংশোধিত না হলে আমাদের ভাবিষ্যৎ অন্ধকার।

27.07.2025

সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫

মানবাধিকার অফিস ও জিজ্ঞাস্য বিষয়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী 

ভাবনা-৬৩  

সম্প্রতি ঢাকায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের তিন বছর মেয়াদী হাইকমিশন অফিস খুলতে জাতিসঙ্ঘের সাথে অন্তবর্তী সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক(এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ১০ই জুলাই উপদেষ্টা পরিষদে এ সংক্রান্ত খসড়া অনুমোদিত হয়। বিষয়টি খবরে আসার পর দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যতোদূর জানা যায়, মানবাধিকার অফিসের কার্যক্রমও শুরু হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে জাতিসঙ্ঘের প্রতিনিধি ফলকার টুর্ক বলেন, বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের এই সময়ে মানবাধিকারের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি যে ‘অন্যতম ভিত্তি’ হিসাবে রয়েছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠাচ্ছে এই সমঝোতা স্মারক। তিনি আরও বলেন, “তথ্যানুসন্ধানের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সহায়তা যাতে আরও ভালোভাবে দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে এই এমওইউ। পাশাপাশি মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা ও সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারব।” বাংলাদেশের তরফে এ নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন এ মিশন বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেবে। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করবে।

ঢাকায় মানবাধিকার অফিস খোলার খবরে দেশের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সমালোচনা ও আপত্তি আসতে থাকে। আমি এখানে সরাসরি সংবাদ পত্র থেকে আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরছি: অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবাধিকারের নামে ইসলামী শরিয়াহ, পারিবারিক আইন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছে। তারা মনে করে, এই ধরনের কার্যালয় স্থাপন করলে তা সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত আসতে পারে। বিশেষ করে এলজিবিটি অধিকারের ইস্যুটি বারবার সামনে এসেছে। হেফাজতে ইসলাম সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, অতীতেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবাধিকারের অজুহাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছে। তাই, তারা এই ধরনের কার্যালয় স্থাপনে রাজি নয়। এ ছাড়া এনসিপির নেতা সারজিস আলমও আপত্তির কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাশক্তির অন্যায় আগ্রাসন, হত্যা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে ওএইচসিএইচআর’র কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়া এবং তাঁর ভাষায় পশ্চিমের দাবি অনুযায়ী, মুসলিমদের জঙ্গি-সন্ত্রাসী তকমা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। সমালোচকেরা মনে করেন, এই ধরনের কার্যালয় স্থাপন করা হলে তা দেশের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি করবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।(আজকের পত্রিকা, ১৯শে জুলাই ২০২৫) সরকারের তরফে অবশ্য আপত্তির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়: ‘ওএইচসিএইচআর মিশন কেবল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা, যেমনপূর্ববর্তী সরকারের সময় সংঘটিত অপরাধপ্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই কাজ করবে। এটি কোনো সামাজিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের প্ল্যাটফর্ম হবে না, যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে যায়।’ এ ছাড়া, সরকারের পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার থাকবে এ চুক্তি থেকে সরে আসার, যদি মনে করে যে এই অংশীদারত্ব আর দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়: সরকার মনে করে, এই ধরনের একটি কার্যালয় আগের সরকারগুলোর সময় যদি থাকত, যখন বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গণহত্যার মতো অপরাধ দায়মুক্তির সঙ্গে সংঘটিত হতো, তাহলে হয়তো অনেক অপরাধের তদন্ত, নথিভুক্ত ও বিচার হতো।(প্রাগুক্ত)

আগেই বলেছি, মানবাধিকার অফিস খোলার বিষয়ে আপত্তির কথা। সরকারের ভাষ্য এবং আপত্তিকারীদের বক্তব্যকে সামনে রেখে এখানে কিছু বিষয় জিজ্ঞাস্য:

প্রথমত: এ সরকার প্রচলিত অর্থে নির্বাচিত সরকার নয়; সুপ্রীম কোর্টের অনুমোদনে নির্বাহী কার্য সম্পাদনের নিমিত্ত একটি অন্তবর্তী সরকার। এ সরকার কিন্তু কোন অবস্থাতেই তত্ত্ববধায়ক সরকারও নয়। তবে এ সরকারের কার্যপরিধি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। সে ভিন্ন আলোচনা। মনে রাখতে হবে, এ সরকার জুলাই-আগস্ট বিপ্লবপরবর্তী একটি সরকার যার পেছনে দেশের জনগণের শারীরিক ও মানসিক সমর্থন ছিলো, এখনো আছে। সমর্থনের শক্তিশালী দলীল হলো, বিগত সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শক্তির গণহত্যা ও বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি এবং দেশের প্রয়োজনীয় সংস্কারের দায়িত্ব অর্পণে দেশব্যাপী জনগণের শারীরিক ও মানসিক ম্যান্ডেট যা বিপ্লবের মাধ্যমে প্রমাণীত। এ সমর্থন বলা চলে, ব্যালটহীন তবে রাজপথের রক্তাক্ত সংগ্রামে দু’হাজারের মতো ছাত্র ও সাধারণ মানুষের কুরবানী ও কয়েক হাজার আহতের আর্তনাদের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত। তাই কোন ক্রমেই এ বিপ্লব বা এ সরকারকে ম্যান্ডেটহীন বলা যাবে না। বরং এ সরকারের ম্যান্ডেট একটি নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেটের চেয়ে হাজারগুণ শক্তিশালী এবং অমোচনীয়। কিন্তু কোন ক্রমেই এমন ম্যান্ডেট নয় যে, যা খুশি, যা ইচ্ছা তাই করতে সক্ষম; কারও তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই। সেদিক থেকে একটি প্রশ্ন করতে হয়: ড. ইউনুস ও তাঁর উপদেষ্টাবর্গ বিলক্ষণ জানেন, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ মুসলিম এবং ধর্মাবেগী। চলমান বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম নির্যাতন ও বৈষম্যে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের নিস্ক্রিয়তায় এ দেশের মুসলিম জনসাধারণ ভীষণ ক্ষুব্ধ। তাই বাংলাদেশের মতো সংবেদনশীল একটি দেশে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিস খোলা নিয়ে জনগণের বিশিষ্ট অংশীজন ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের আমন্ত্রিত করে বিষয়টিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের দায় অন্তর্বর্তী সরকার অস্বীকার করতে করতে পারেন না। যেহেতু উপদেষ্টাবর্গের মধ্যে ধর্ম উপদেষ্টা পদে একজন আলিম প্রতিনিধি আছেন, তাঁর মাধ্যমে হলেও বিষয়টিতে আলিম-ঊলামা ডেকে মতবিনিময়  করা যেতো। তা হলো না কেন?

দ্বিতীয়ত: জাতিসঙ্ঘ মোটেও কোন একটি রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রের সমষ্টি রাষ্ট্রপুঞ্জ বা রাষ্ট্রসঙ্ঘ। যেহেতু এটি রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি অফিস সঙ্গতকারণে এর একক রাষ্ট্রের চরিত্র থাকবে না সত্য, বহু রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র তো অবশ্যই থাকবে। অর্থাৎ এর উপর কোন আঘাত এলে সেটা সব দেশের উপর আঘাত বা হস্তক্ষেপ বলে ধরে নেয়া হতে পারে। এ যুক্তি কি অনস্বীকার্য? এ যুক্তি মেনে নিলে, ভবিষ্যতে এ কার্যালয় তো আক্ষরিকার্থে না হলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে সব দেশের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হতে পারে বা হবে। আমরা বলবো, এটাই অধিকতর সম্ভব। আমাদের চট্টগ্রামে আঞ্চলিক রীতিতে একটি প্রবাদ আছে: গা-রা সোজা হা-রা সোজা ন। অর্থাৎ কোন জিনিসকে গেড়ে দেয়া বা ভিত্তি করে দেয়া সহজ কিন্তু প্রত্যাহার করা বা তুলে ফেলা অতো সহজ নয়। এখানেও ঠিক একই কথা। যে মেয়াদের চুক্তিই হোক না কেন আপনি বসাতে পারবেন কিন্তু তুলতে সমস্যা আছে। ঐ যে বললাম, এটি একটি রাষ্ট্রের বিষয় নয়, বহু রাষ্ট্রের বিষয়। এটি নিয়ে সব রাজনীতিক দল ও অংশীজনদের সাথে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন ছিলো। সেটি করা হলো না কেন? খোদা না করুন, পরে তা নিয়ে বড় কোন সমস্যা তৈরি হলে সে দায়িত্ব কে নেবে? তখন তো ড. ইউনুস ও তাঁর উপদেষ্টাবৃন্দ কবরে থাকতে পারেন।

তৃতীয়ত: হেফাজতে ইসলাম ও ধর্মীয় দলগুলো এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধিতা করেছে। এখানে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে উলামায়ে কেরামের কথায় আসি। তাঁরাও ঢাকায় জাতিসঙ্ঘ অফিসের বিরোধিতা করেছেন। এখানে একটি কথা বলা দরকার। আমাদের আলিম-সমাজের অতীতের আন্দোলনের দিকে তাকালে একটি বিষয় নযরে আসে। তা হলো, কর্মসূচী বা ঘোষণা দেয়ার আগে আলোচিত বিষয়বস্তুর উপর পর্যাপ্ত গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয় না। ফলে কখনও দেখা গেছে তাঁদের গৃহীত সিদ্ধান্ত বা কৃত মন্তব্যের সাথে হাকীকত বা আসলের সম্পর্ক দুর্বল বা একবারেই নেই। ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতের আন্দোলনের কথা অনেকেরই মনে থাকবার কথা। অগ্নিঝরা বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত দেয়ার পর দেখা গেলো সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে হেফাজত নেতৃবৃন্দ সঠিক জবাব দিতে পারছেন না। প্রশ্ন করা হলো: ব্লগার বলতে আপনারা কাদেরকে বোঝাচ্ছেন? ব্লগ কি? আপনি কি নিজে পড়েছেন? এসবের উত্তর ছিলো একেবারেই হতাশাব্যঞ্জক। সেদিকে বিস্তারিত আর গেলাম না। এখানেও কি ঠিক অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে? একটু ভাবা দরকার। কৈ, আমরা তো দেখলাম না, উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে জাতিসঙ্ঘ অফিস নিয়ে কোন আলোচনাসভার আয়োজন করতে, মতবিনিময়সভার আয়োজন করতে বা কোন কমিটি করে দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। কওমী সনদের স্বীকৃতি নিয়েও এক-ই কাণ্ড ঘটেছে। আমরা বুঝলাম না, পর্যাপ্ত সময় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে আমাদের এতো অনীহা কেন? চট করে একটা কিছু বলে দেয়ার বাসনা আমাদের ভেতরে এতো জন্মায় কেন?

বলাবাহুল্য, উপদেষ্টা পরিষদে আলিম প্রতিনিধি জনাব খালিদ হোসেন সাহেবও তো আছেন। তাঁর সাথে কি কোন আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে? মতবিনিময় হয়েছে? খবরে তেমন কিছু তো দেখা গেলো না। আচ্ছা, মানবাধিকার অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে উপদেষ্টা পরিষদে যে খসড়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সেখানে তো খালিদ সাহেবও দস্তখত করেছেন বলে মনে হয়। তখন তাঁর সাথে কেন আলোচনা করে আলিম-সমাজের অনুভূতির কথা জানিয়ে দেয়া হলো না? আলোচনার পরও যদি আলিম-সমাজ মনে করতেন যে, সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁদের আপত্তি আছে তাহলে সেটা তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্তি উত্থাপনের মাধ্যমে জাতিকে জানাতে পারতেন। এতে বিরোধিতার যৌক্তিক দিক প্রকাশিত হতে পারতো। কিন্তু তা তো করা হয়নি। মিডিয়াতে হেফাজতের বিবৃতি নিয়ে বলা হচ্ছে: এরা সবকিছুতেই বিরোধিতা করে। এগুলো তো এক ধরনের অপমান। হেফাজতের সবকিছু যিনি সামলাচ্ছেন সেই আজিজুল হক ইসলামাবাদী, তিনি তো ধর্ম উপদেষ্টার ঘনিষ্টজন ও ছাত্র। তিনি কেন তাঁর শিক্ষকের সাথে বিষয়টি তুললেন না? কিন্তু হুংকার তো ছাড়ছেন; অবিরত হেফাজতের আমীর কর্তৃক স্বাক্ষরিত বিবৃতি পাঠাচ্ছেন। এগুলো আসলে আমাদের দূরদর্শীতার অভাবকেই নির্দেশ করে। গত ২০শে জুলাই ২০২৫ তারিখ রবিবার বেলা ৩টায় আল-হাইআতুল উলয়ার প্রতিনিধিদল কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় ধর্ম উপদেষ্টা ও মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সেখানেও তো বিষয়টি তোলা যেতো। হয়েছে কি?

আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমাদের উলামায়ে কেরামের যে অংশটি রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট তাঁরা আসন্ন নির্বাচন ও আসন ভাগাভাগি নিয়ে যতোটুকু আন্তরিক জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিস নিয়ে ততোটা আন্তরিক নন। এ যেনো নেহায়েত কিছু বিবৃতি দিয়ে, আন্দোলনের হুমকি-ধমকি দিয়ে দায় সারানো মাত্র। ড. ইউনুসের সাথেও তো হেফাজত বা উলামায়ে কেরাম নেতৃবৃন্দ সাক্ষাৎ করে কথাগুলো তুলতে পারতেন। এতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীও জানা যেতো। তাও হয়নি। ইতোপূর্বে তাঁরা তো কাতারে-কাতারে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সাথে ছবি তুলেছেন, শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এখন সে রাস্তা বন্ধ কেন? আসলে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে; সংলাপ করে সমস্যা সমাধানে আমাদের ইতিহাস বড়ো সুখের নয়। অগ্নিঝরা বক্তব্য, আন্দোলনের হুমকি, সব অচল করে দেয়ার ধমকি ইত্যাদি আমাদের সম্বল। এর বাইরে গিয়ে ক’কদম দেয়ার যোগ্যতা আমাদের নেই। জানি না আমাদের সম্বিৎ কবে ফিরবে।

21.07.2025

শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫

নেতাবিহীন ফটিকছড়ির নেতা আর হলো না

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী 

ভাবনা-৬২ 

ফটিকছড়ির মাহাত্ম্য বর্ণনা আমরা সবাই করি। কিন্তু আসল জায়গায় আমাদের হাত দেয়া হয় না। আমাদের কোন উল্লেখযোগ্য নেতা নেই। ফটিকছড়ির এ দুর্ভাগ্য পিছু নিয়েছে প্রায় তিন-চার দশক ধরে। এখন সবাই বলবেন, অমুক সালে অমুক এখান থেকে সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেনতিনি কি নেতা নন? আপনি কি তাই মনে করেন? কে নেতা? কী তাঁর বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী আছে। সোজা কথায় বলতে গেলে নেতা তিনি যিনি একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীকে কল্যাণ সাধনে সচেতন করে তোলেন, আদর্শ কর্তব্য নির্দ্ধারণে যোগ্য করে তোলেন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলেন। যাঁর নেতৃত্বে সমাজ বুঝতে শিখবে কি করতে হবে বা হবে না, তাঁকেই তো মানায় নেতৃত্বে। এর বাইরে গিয়ে পদাশ্রিত চিন্তাধারার প্রভাবে মানুষের ভোট আদায়ের স্বভাবকে কখনোই নেতৃত্ব বলা যাবে না বা এমন কর্মের কর্তাকে নেতা বলা যায় না। সে হিসাবে নিছক নৈর্বাচনিক কলাকৌশল রপ্ত করে সংসদে গেলেই তিনি নেতা হবেনএমন ধারণা ভুল। 

আমাদের এখানে একটি কথা প্রচলিত আছে: যা হবার ন’বছরেই হয় আর যা হয় না নব্বই বছরেও হয় না। আজকের ফটিকছড়ির অবস্থা দেখে আমার কাছে তেমনই মনে হচ্ছে। আমাদের ফটিকছড়ির মানুষের একটি স্বভাব আছে। জানি না অন্য কোথায় কেমন। স্বভাবটি হলো, তারা এক লাফে গাছে উঠতে চায়। এক রাতেই বড় হতে চায়। এই হচ্ছে আমাদের বড়ে দোষ। আমার বাবা মরহুম প্রায়ই বলতেন: ফকীর হবার আগে ঝোলা সেলাই করো না। এখানেও ব্যাপারটি তেমন। কেউই সময় দিতে চায় না; ধৈর্যের বড় অভাব। খেজুর গাছ তো সবাই দেখেছেন। তাই না! খেজুর গাছের স্বভাব হলো, তার বাড়ন্ত অতি ধীরে কিন্তু গোড়া ভীষণ মজবুত। তাই বড়বড় তুফানে অশ্বৎ-বট গাছ পড়ে গেলেও খেজুর গাছকে কেউ পড়তে দেখেনি। আমাদেরও তাই হওয়া উচিৎ। ধীরে বড়ো হোন, মজবুত হয়ে বড়ো হোন। এটাই নিয়ম। এর বাইরে গিয়ে কার্যসিদ্ধি অসম্ভব। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কথা বলেছিলেন: যে বৃক্ষ লকলক করিয়া বাড়ে তাহার ডগা অমনিতেই ভাঙ্গিয়া পড়ে। আমাদের ফটিকছড়ির মানুষও অনেকটা তেমন। ইল্লা মাশাআল্লাহ। কেউ ভেবে দেখেন না, হঠাৎ বড়ো হতে যাবার মধ্যে অনেক ঝুঁকি; অনেক বিপদ।

ফটিকছড়িতে রাজনীতিক নেতৃত্ব গড়ে না ওঠার আরেক বড়ো কারণ লেখাপড়াবিহীন রাজনীতি। পত্রিকা পড়েই এখানে রাজনীতির দীক্ষা নেয়া হয়। অনেকে তো পেপার-পত্রিকা দেখেই নিজেকে রাজনীতিক ভাষ্যকার মনে করেন। রাজনীতি এসেছে মূলত মেধাবী, শিক্ষানুরাগী ও সচ্চরিত্রের মানুষের জন্য। এক সময়কার রাজনীতিবিদদেরকে মানুষ দেখতো ভ্রমণের সময়ও বই পড়তে। যথেষ্ট শিক্ষার উপকরণ না থাকলে, বড়দের সাহচর্যে অভিজ্ঞ না হলে কেউ রাজনীতির মাঠে নেতৃত্ব দিতে সাহস করতেন না। ফটিকছড়িতে বড়োবড়ো ব্যক্তি জন্মেছেন সত্য কিন্তু নেতার জন্ম কতো? এর আরেকটি কারণ হলো, যাঁরা রাজনীতিতে বড়ো হয়েছেন তারা তরুণ-নেতৃত্ব গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দেননি। তাঁরা চেয়েছেন কেবল তরুণদের ব্যবহার করে আসন জিততে, এমপি-মন্ত্রী হতে। তরুণদের পৃষ্ঠপোষকতা কেউ দেয়নি। জেতার পর কালেভদ্রে দেখা হলে এসব তরুণদের না চেনার ভান ধরেছেন আসনজয়ীরা। দিনশেষে দেখা গেছে, সেই নিরলস তরুণ কর্মীরা শূণ্য হাতে ঘরে ফেরৎ। এটাকে একটা শোষণও বলা যায়। তাঁরা চাননি তাঁদের জায়গায় একজন যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি হোক। এ আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহ পরিণাম আজ আমরা ভোগ করছি। আমি নিজে দেখেছি, এক সময়ের তরুণ কর্মীরা হতাশ হয়ে নেতৃত্ববিমূখ হয়ে ব্যবসা-পাতি নিয়ে বসে আছে। এতে সমাজে শূণ্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর আমাদের তরুণদেরও একটি হতাশার দিক হলো, তারা অতিমাত্রায় নৈরাশ্যবাদী। একটু এদিক-ওদিক হলেই তাদের রক্তচাপ নেমে যায়। আমরা বাল্যকালে পড়েছিলাম: একবার না পারিলে দেখ শতবার, পারিব না এ কথাটি বলিও না আর। তখন দেখতাম ছোট-ছোট ছেলেদের মাঝেও জেদ আর প্রতিযোগিতার কি ভাব! এখন তেমন আর দেখা যায় না।

আজ এখানে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯১ সাল। এমপি নির্বাচন। আমাদের ফটিকছড়ি থেকে প্রার্থী হলেন মিনার মার্কায় এখানকার এক কৃতি সন্তান হাফেজ মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.। ঢাকা থেকে এসে আমিসহ আরও কয়েকজনকে ডেকে পাঠালেন বাড়ি থেকে। আমরা তখন টগবগে যুবক। তাঁর কথা শুনে যেন মাছ পানি পেলো। শতশত গুণ জোশ নিয়ে আমরা সেদিনকার ফটিকছড়ির তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম মিনার মার্কার সমর্থনে। আব্দুল্লাহপুর থেকে রামগড়সবখানে সাড়া পড়ে গেলো। কারণ, সে-সময় আলিম প্রার্থী হওয়া ফটিকছড়িতে বিরল ঘটনা ছিলো। শুনেছি, এর আগে চল্লিশের দশকে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে হযরত হারুন বাবুনগরী রহ. নেযামে ইসলামের পক্ষ থেকে এ আসনে কিতাব মার্কায় নির্বাচন করেছিলেন। আজ মিনার মার্কা নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। সব তুচ্ছ করে শুরু হলো নির্বাচনী সংগ্রাম। আমাদের নেতা মাও. নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.। তাঁর সম্পর্কে এখানে কিছু বিষয় তুলে না ধরলে অবিচার হবে বলে মনে করি। মাও. জিহাদী সাহেব রহ. একজন ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমি হাতে গোনা যে ক’জন নেতৃত্বগুণসম্পন্ন কওমী আলিম দেখেছি তিনি তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বলতম। নেতা হবার মতো প্রায় সব গুণ তাঁর ছিলো। আমাদের মতো তরুণদের তিনি যে মূল্যায়ণ করেছিলেন তা কখনও বিস্মৃত হবার নয়। অনেকের মতো তিনি কোন বিষয়ে আমাদেরকে বাদ দিয়ে কোন সুযোগ গ্রহণ করেননি বা সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর বন্ধুসুলভ ও ত্যাগী ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ ছিলাম। তাঁর যে কোন সময় যে কোন ডাকে আমরা ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়তাম। আমার এখনও মনে আছে, তিনি পায়ে হেঁটে পথসভা করতে করতে সকালে একটি মাত্র বাটারবন খেয়ে মোহাম্মদ তকীর হাট থেকে নাজিরহাটে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। আলিমদের বিশাল অংশ তাঁর পক্ষে ছিলো। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ফটিকছড়ি আগে থেকে বিএনপি’র শক্ত ঘাঁটি। এমন জায়গায় তিনি তাঁর কঠোর নেতৃত্ব ও ত্যাগের মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হন। মধ্যখানে অপ্রত্যাশিতভাবে একজন বহুল পরিচিত আলিমের দুর্ভাগ্যজনক ভূমিকা ও হস্তক্ষেপে মাও. নুরুল ইসলাম জিহাদীর সমর্থনে ভাঙ্গন সৃষ্টি না হলে ফটিকছড়ির ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সে বছর জামিয়া বাবুনগরের সালানা জলসায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি যে মর্মস্পর্শী বয়ান করেছিলেন তা কখনোই ভোলার নয়। যা হোক, সেবারের নির্বাচনে মাও. জিহাদী রহ. এতো প্রতিকূলতার মাঝেও তৃতীয় স্থান দখল করেছিলেন। এরপর তিনি যদি তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেন, মনে হয়, তিনি অবশ্যই ফটিকছড়ি আসন থেকে এমপি হতে পারতেন। কিন্তু এখানকার উলামায়ে কেরামের বিভক্ত অবস্থা দেখে তিনি প্রবল দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মাঠ ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। আর কখনোই তিনি এখানকার রাজনীতিতে ফিরে আসেননি। সেই ঘটনাকে আমি শুধু তাঁর জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলবো না বরঞ্চ ফটিকছড়ির উলামায়ে কেরামের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক বলবো। আমি এখনো মনে করি, সেদিনকার দুর্ঘটনা বিএনপি’র জয়কে সহজ করার জন্য সংঘটিত করা হয়েছিলো। সেখানে ফটিকছড়ির বৃহত্তর আলিম-সমাজের রাজনীতিক সম্ভাবনাকে কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

ফটিকছড়ি থেকে মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.’র বিদায় আমাদের মতো তরুণদের জন্য অভিভাবকহারা হবার এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। কারণ, মাও. জিহাদী রহ. ঢাকা চলে যাবার পর এক অজানা কারণে তাঁর তরুণ কর্মীদের সাথে আর কোন সম্পর্কই রাখেননি। কোন খোঁজ-খবরও নেননি। ফলে, দিগ্বিদিকশূণ্য হয়ে কিছু সম্ভাবনাময় তরুণের নেতৃত্ব সৃষ্টি হবার ভবিষ্যৎ সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। এর রেশ আজও শেষ হয়নি বলে মনে হয়। ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে মাও. আবু তালেব সাহেবকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে সম্মিলিত উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে দাঁড় করানো হলেও মাঠে নিরঙ্কুশ একতা উপস্থিত ছিলো না। ফলে, তিনি কামিয়াব হননি। আমার আজও মনে হয়, ৯১’র সে সময়ে যদি মাও. জিহাদী রহ.কে ব্যর্থ করা না হতো এবং তিনিও যদি কর্মীদের সাথে বিচ্ছিন্ন না হতেন তবে আজ এক ঝাঁক নেতৃত্বসম্পন্ন আলিমকে মাঠে দেখা যেতো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তা আর হলো না।

বলতে দ্বিধা নেই, এখন যারা ফটিকছড়িতে নেতৃত্ব দেবার চেষ্টা করছেন তাদের নেতৃত্বগুণ নেই বললে চলে। এগুলো অনেকটা বাচ্চা ছেলের তলোয়ার নিয়ে খেলা করার মতো ব্যাপার। তারা ঠিক মতো গড়ে ওঠেননি। তাদের নেই প্রয়োজনীয় পড়াশোনা; নেই অভিজ্ঞতা। প্রশ্ন হলো, তাই বলে কি তারা হারিয়ে যাবে? আমি তা বলছি না। তারা আগে সমাজে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করুক; সমাজ তাদেরকে কতোটা চায় সেটা পরখ করে দেখা হোক। তবেই না পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন। আমার পারামর্শ হলো, তারা আগে স্থানীয় নির্বাচন করুক; কাউন্সিলর-মেম্বার হোক। সেখানে উৎরাতে পারলে জনগণ ও সমাজ তাদেরকে মেয়র-চেয়ারম্যান করবে। সেখানে সফল হলে এমপিতে আসবেন। নিজ থেকে অযথা নিজেকে নেতা জাহির করার খাহেশ কেন? আগে ফকীর হোন পরে ঝোলা সেলাই করুন। আল্লাহ হাফিয।

16.07.25        

সোহাগের রক্তে বাংলাদেশের অধঃপতিত ছবি

       মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬১

গত ৯ই জুলাই, বুধবার বাংলাদেশে ঘটলো এক হৃদয়বিদারক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। এদিন ঢাকার মিটফোর্ডে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ নামে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। জানা গেছে, নিহত ব্যক্তি ও তাঁর হত্যাকারীরা মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সাথে জড়িত। প্রধানত ব্যবসায়িক আধিপত্য নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও চাঁদার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট ছিলো বলে জানা গেছে। স্থানীয় এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্যানুযায়ী সোহাগ ও তার হত্যাকারীরা দুই সিন্ডিকেটের অংশ। ঘটনার দিন হত্যাকারীরা জনসমক্ষে পাথর ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বর্বরোচিত কায়দায় সোহাগকে হত্যা করে। হত্যার পর তার লাশের উপর হত্যাকারীদেকে নৃত্য করতেও দেখা যায় সংবাদ-মাধ্যমে। এ ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। এতে রাজনীতিক, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ ঘটনা বাংলাদেশে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন বিষয় নয়। বরঞ্চ অতীতের কিছু ঘটনার ধারাবাহিকতা মাত্র। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন নেতিবাচক কোন বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় বা নীরবে মেনে নেয় তখন সে নেতিবাচক কর্ম এক ধরনের বৈধতা পায়। এ সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। নব্বইয়ের দশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের একজন কর্মী আলম ও তার সঙ্গীদের হাতে একজন সচিবের সচিবালয়ে যাওয়ার সময় প্রকাশ্য রাজপথে দিগম্বর হবার ঘটনা ইতিহাসের অমোচনীয় অধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা সেই প্রথম। আজকের পারিপার্শ্বিকতায় সে ঘটনাটি হালকা মনে হলেও সে সময়ের বাস্তবতায় ঘটনাটি ছিলো জাতিকে স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিক অসভ্যতার গোড়াপত্তন এখানেই। কিন্তু সে বর্বরোচিত ঘটনার কোন বিচার রাষ্ট্র ও সমাজ করতে পারেনি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের ‘লগি-বৈঠা’ আন্দোলনের সময় সভাপতি শেখ হাসিনার আহ্বানে সারা দেশ থেকে কর্মী-সমর্থকেরা লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীতে এসে হাজির হয় এবং পাঁচ থেকে ছয় জন মানুষকে রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করে বর্বরোচিত কায়দায় লাশের উপর উঠে নৃত্য পর্যন্ত করে। বাংলাদেশের রাজনীতিক ইতিহাসে একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার প্রকাশ্যে হত্যার উস্কানি দেয়ার সে ঘটনা ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। কৈ, রাষ্ট্র ও সমাজ কি তার বিচার করতে পেরেছে? আজ ২০২৫-এ এসে জাতি দেখলো প্রকাশ্যে পাথর দিয়ে প্রতিপক্ষকে মাথা থেতলে হত্যা করতে এবং সেই আগের মতো লাশের উপর নৃত্য করে উল্লাস করতে। এগুলো কেন? একটাই উত্তররাষ্ট্র ও সমাজের নীরবতা ও বিচারহীনতা। এ ঘটনার পর এক ভিডিওতে দেখলাম, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে নিয়ে অশ্লীল স্লোগান দিতে। এগুলো কি সভ্যতা? যারা করেছে তারা তো রাস্তার অশিক্ষিত কেউ নয়; সবাই ছাত্র। সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান রক্ষাও তো রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই যদি না হবে, সমাজ সভ্য হবে কি করে? এসবকে তো আইনের আওতায় আনা দরকার। ইংরেজিতে একটি কথা আছে: Juctice delayed justice denied । অর্থাৎ, বিচারে বিলম্ব করা বিচার অস্বীকারের নামান্তর।

ইসলামে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক হাদীসে বলা হয়েছে: কিয়ামাতের কঠিন দিনে সাত প্রকারের লোক আল্লাহ’র আর্শের নিচে স্থান পাবে। বাইরের কঠিন পরিবেশ থেকে তাঁরা আল্লাহ’র ইচ্ছায় মুক্ত থাকবেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম নম্বর হলো: ন্যায়পরায়ন বাদশাহ বা শাসক (الإمام العادل هو الحاكم المسلم الذي يحكم بالعدل ويطبق شرع الله في رعيته)। এর পরে অন্যেরা। এখন প্রশ্ন হলো, কেন ন্যায়পরায়ন বাদশাহ বা শাসককে এক নম্বরে আনা হলো? এর মূল কারণ হলো: ব্যক্তিগত ইবাদাতে ব্যক্তি ও তার আশপাশের কেউ উপকৃত হতে পারেন কিন্তু একজন ন্যায়পরায়ন শাসকের কারণে সমগ্র দেশ বা গোষ্ঠী উপকৃত হয়। এটাই ইনসাফের মৌলিক সৌন্দর্য। ইনসাফের বিপরীতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আজকের নৈরাজ্য ও ফাসাদ। আজ বাংলাদেশে মা-বাবার হাতে সন্তান খুন, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, ভাইয়ের হাতে ভাই খুন ইত্যকার দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সবকিছুর প্রধান কারণ, ন্যায়বিচারের অভাব। আরেকটি বিষয় আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তা হলো, বর্তমান বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে মূলত এলিট বা ধনাঢ্যশ্রেণীর উপযোগী করে। দরিদ্র ও আপমর মেহনতি মানুষের এখানে সুযোগ নেই। তাঁদের সে সামর্থ্যও নেই। সঙ্গতকারণে, দেশের বিশাল অংশ বিচার প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। নিরপেক্ষ বিচারের আরেক বাধা আমাদের রাজনীতিক সংস্কৃতি। নিজ দলের কেউ অপরাধে জড়িত হলে শরম ফেলে তাকে ছাড়িয়ে আনতে তারা উম্মাদ হয়ে যান। প্রয়োজনে দাবি জানান, হুমকি-ধমকি দেন। এ সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাব খলীল সাহেবকে একটি দল কর্তৃক অপসারণের দাবি দেয়ার পেছনেও নাকি ছিলো তেমন রাজনীতিক অসততা। এ হলে কিভাবে সমাজ সুস্থ হবে?

সোহাগ হত্যার পেছন থেকে এ সমাজের অধঃপতনের এক বিভৎস চিত্র এখন পরিস্ফুটিত। এর জন্য কেবল সমাজের একটি অংশ দায়ী নয়। মূলধারার মিডিয়াগুলোও দায়ী। কারণ, সমাজের মন্দ অংশের পাশাপাশি বেশ কিছু ভালোও ঘটে। বিশেষ করে মানবিক ও সততার দিক। ঘটে যাওয়া সেসব ইতিবাচক দিকগুলো মিডিয়াতে কভারেজ পায় কম। মিডিয়া কভারেজ দেয় সংঘর্ষ, মারামারি, খুনোখুনি, বিনোদনের নামে যৌন উস্কানি, লোমহর্ষক সংঘাতএসব বিষয়কে। ফলে সমাজে সেগুলোর প্রভাব পড়ে বেশি। এতে সমাজের বিশেষ কোন অংশ প্রভাবিত হয়ে নানা অপতৎপরতায় জড়িত হয়। মিডিয়া ‍যদি মানবিক ও সততাসংশ্লিষ্ট খবরকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে তাতে সমাজে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। অন্তত কিছু না কিছু অংশে সামান্য হলেও প্রভাব পড়বে। আর সামান্য একদিন অসামান্য হবে। টকশোগুলোও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। একজন বিশিষ্ট ইউটিউবার বলেছেন, মিটফোর্ডের ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং একটি গোয়েন্দাসংস্থার পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত। তিনি বিষয়টিতে নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানান। তাঁর কথায়: বিএনপিকে বিতর্কিত করতে ও তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বাধা দিতে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের দাবিকে ফেলনা মনে করে অগ্রাহ্য করা উচিৎ নয়। কারণ, বিগত সতের বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনে আমরা ঐ ধরনের কৌশল বহুবার দেখেছি। প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হতে পারে। এদিকে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানা যায়, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর একটি রহস্যজনক মিছিল থেকে  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধেও আপত্তিকর স্লোগান দেয়া হয়। খবরে আরও বলা হয়, কিছু কিশোরকে নাকি প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছবি অবমাননা করতেও দেখা যায়। এগুলোর পেছনে কারা? তাহলে কি মনে করা অনুচিৎ হবে যে, বিএনপিকে সুনির্দিষ্টভাবে বিতর্কিত করতে ফ্যসিস্টদের দোসররা এসব করছে? মনে রাখতে হবে, এখনও ওরা বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অভাবও সমাজের এ ধরনের অবক্ষয়ের প্রধান কারণ। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষা-ব্যবস্থাকে সেক্যুলার করতে গিয়ে আমাদের প্রজন্মগুলোকে একেবারে ধর্মহীনতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষায় থাকেনি, ধর্মীয় মানবিক শিক্ষা, মহাপুরুষদের জীবনী ইত্যাদি। ফলে, এক কথায় সেক্যুলার শিক্ষার করাল গ্রাসে সমাজে নৈতিকতার পরিবর্তে অনৈতিকতার আবহ সৃষ্টি হয়। হিতাহিত জ্ঞাননশূণ্য হয়ে একটি অংশ একের পর এক বিভিন্ন আত্মঘাতী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর উপর রাজনীতিক পৃষ্ঠপোষকতা ঘায়ের উপর নুনের ছিটা হয়ে বসে। সোহাগ হত্যার ভেতরে এসব উপাদানকে অস্বীকার করা যায় না।

আমার মনে হয়, এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বয়কট আন্দোলনের সূচনা করা যেতে পারে। এতে যারা এসব ঘটনায় জড়িত থাকবে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং তাদেরকে বিচারের হাতে সমর্পণ করার সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। কারণ, সমাজ যদি সোচ্চার হয় তবে কেউ অপরাধ করার সাহস পাবে না আর করলেও কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না। পাশাপাশি রাজনীতিবিদদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নিজনিজ সাংগঠনিক বলয়ে মানসিক ও সাংগঠনিক সংস্কার পরিচালনা করে কর্মসূচী পালন করতে হবে। ধরে নিতে হবে, এটি একটি জনযুদ্ধ। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে যদি বর্তমান অধঃপতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো না যায় তবে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

15.07.2025