শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫

সোহাগের রক্তে বাংলাদেশের অধঃপতিত ছবি

       মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬১

গত ৯ই জুলাই, বুধবার বাংলাদেশে ঘটলো এক হৃদয়বিদারক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। এদিন ঢাকার মিটফোর্ডে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ নামে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদলের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। জানা গেছে, নিহত ব্যক্তি ও তাঁর হত্যাকারীরা মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সাথে জড়িত। প্রধানত ব্যবসায়িক আধিপত্য নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও চাঁদার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট ছিলো বলে জানা গেছে। স্থানীয় এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্যানুযায়ী সোহাগ ও তার হত্যাকারীরা দুই সিন্ডিকেটের অংশ। ঘটনার দিন হত্যাকারীরা জনসমক্ষে পাথর ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বর্বরোচিত কায়দায় সোহাগকে হত্যা করে। হত্যার পর তার লাশের উপর হত্যাকারীদেকে নৃত্য করতেও দেখা যায় সংবাদ-মাধ্যমে। এ ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। এতে রাজনীতিক, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ ঘটনা বাংলাদেশে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন বিষয় নয়। বরঞ্চ অতীতের কিছু ঘটনার ধারাবাহিকতা মাত্র। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন নেতিবাচক কোন বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় বা নীরবে মেনে নেয় তখন সে নেতিবাচক কর্ম এক ধরনের বৈধতা পায়। এ সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। নব্বইয়ের দশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের একজন কর্মী আলম ও তার সঙ্গীদের হাতে একজন সচিবের সচিবালয়ে যাওয়ার সময় প্রকাশ্য রাজপথে দিগম্বর হবার ঘটনা ইতিহাসের অমোচনীয় অধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা সেই প্রথম। আজকের পারিপার্শ্বিকতায় সে ঘটনাটি হালকা মনে হলেও সে সময়ের বাস্তবতায় ঘটনাটি ছিলো জাতিকে স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিক অসভ্যতার গোড়াপত্তন এখানেই। কিন্তু সে বর্বরোচিত ঘটনার কোন বিচার রাষ্ট্র ও সমাজ করতে পারেনি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের ‘লগি-বৈঠা’ আন্দোলনের সময় সভাপতি শেখ হাসিনার আহ্বানে সারা দেশ থেকে কর্মী-সমর্থকেরা লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীতে এসে হাজির হয় এবং পাঁচ থেকে ছয় জন মানুষকে রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করে বর্বরোচিত কায়দায় লাশের উপর উঠে নৃত্য পর্যন্ত করে। বাংলাদেশের রাজনীতিক ইতিহাসে একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার প্রকাশ্যে হত্যার উস্কানি দেয়ার সে ঘটনা ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। কৈ, রাষ্ট্র ও সমাজ কি তার বিচার করতে পেরেছে? আজ ২০২৫-এ এসে জাতি দেখলো প্রকাশ্যে পাথর দিয়ে প্রতিপক্ষকে মাথা থেতলে হত্যা করতে এবং সেই আগের মতো লাশের উপর নৃত্য করে উল্লাস করতে। এগুলো কেন? একটাই উত্তররাষ্ট্র ও সমাজের নীরবতা ও বিচারহীনতা। এ ঘটনার পর এক ভিডিওতে দেখলাম, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে নিয়ে অশ্লীল স্লোগান দিতে। এগুলো কি সভ্যতা? যারা করেছে তারা তো রাস্তার অশিক্ষিত কেউ নয়; সবাই ছাত্র। সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান রক্ষাও তো রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই যদি না হবে, সমাজ সভ্য হবে কি করে? এসবকে তো আইনের আওতায় আনা দরকার। ইংরেজিতে একটি কথা আছে: Juctice delayed justice denied । অর্থাৎ, বিচারে বিলম্ব করা বিচার অস্বীকারের নামান্তর।

ইসলামে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক হাদীসে বলা হয়েছে: কিয়ামাতের কঠিন দিনে সাত প্রকারের লোক আল্লাহ’র আর্শের নিচে স্থান পাবে। বাইরের কঠিন পরিবেশ থেকে তাঁরা আল্লাহ’র ইচ্ছায় মুক্ত থাকবেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম নম্বর হলো: ন্যায়পরায়ন বাদশাহ বা শাসক (الإمام العادل هو الحاكم المسلم الذي يحكم بالعدل ويطبق شرع الله في رعيته)। এর পরে অন্যেরা। এখন প্রশ্ন হলো, কেন ন্যায়পরায়ন বাদশাহ বা শাসককে এক নম্বরে আনা হলো? এর মূল কারণ হলো: ব্যক্তিগত ইবাদাতে ব্যক্তি ও তার আশপাশের কেউ উপকৃত হতে পারেন কিন্তু একজন ন্যায়পরায়ন শাসকের কারণে সমগ্র দেশ বা গোষ্ঠী উপকৃত হয়। এটাই ইনসাফের মৌলিক সৌন্দর্য। ইনসাফের বিপরীতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আজকের নৈরাজ্য ও ফাসাদ। আজ বাংলাদেশে মা-বাবার হাতে সন্তান খুন, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, ভাইয়ের হাতে ভাই খুন ইত্যকার দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সবকিছুর প্রধান কারণ, ন্যায়বিচারের অভাব। আরেকটি বিষয় আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তা হলো, বর্তমান বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে মূলত এলিট বা ধনাঢ্যশ্রেণীর উপযোগী করে। দরিদ্র ও আপমর মেহনতি মানুষের এখানে সুযোগ নেই। তাঁদের সে সামর্থ্যও নেই। সঙ্গতকারণে, দেশের বিশাল অংশ বিচার প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। নিরপেক্ষ বিচারের আরেক বাধা আমাদের রাজনীতিক সংস্কৃতি। নিজ দলের কেউ অপরাধে জড়িত হলে শরম ফেলে তাকে ছাড়িয়ে আনতে তারা উম্মাদ হয়ে যান। প্রয়োজনে দাবি জানান, হুমকি-ধমকি দেন। এ সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাব খলীল সাহেবকে একটি দল কর্তৃক অপসারণের দাবি দেয়ার পেছনেও নাকি ছিলো তেমন রাজনীতিক অসততা। এ হলে কিভাবে সমাজ সুস্থ হবে?

সোহাগ হত্যার পেছন থেকে এ সমাজের অধঃপতনের এক বিভৎস চিত্র এখন পরিস্ফুটিত। এর জন্য কেবল সমাজের একটি অংশ দায়ী নয়। মূলধারার মিডিয়াগুলোও দায়ী। কারণ, সমাজের মন্দ অংশের পাশাপাশি বেশ কিছু ভালোও ঘটে। বিশেষ করে মানবিক ও সততার দিক। ঘটে যাওয়া সেসব ইতিবাচক দিকগুলো মিডিয়াতে কভারেজ পায় কম। মিডিয়া কভারেজ দেয় সংঘর্ষ, মারামারি, খুনোখুনি, বিনোদনের নামে যৌন উস্কানি, লোমহর্ষক সংঘাতএসব বিষয়কে। ফলে সমাজে সেগুলোর প্রভাব পড়ে বেশি। এতে সমাজের বিশেষ কোন অংশ প্রভাবিত হয়ে নানা অপতৎপরতায় জড়িত হয়। মিডিয়া ‍যদি মানবিক ও সততাসংশ্লিষ্ট খবরকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে তাতে সমাজে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। অন্তত কিছু না কিছু অংশে সামান্য হলেও প্রভাব পড়বে। আর সামান্য একদিন অসামান্য হবে। টকশোগুলোও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। একজন বিশিষ্ট ইউটিউবার বলেছেন, মিটফোর্ডের ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং একটি গোয়েন্দাসংস্থার পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত। তিনি বিষয়টিতে নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানান। তাঁর কথায়: বিএনপিকে বিতর্কিত করতে ও তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বাধা দিতে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের দাবিকে ফেলনা মনে করে অগ্রাহ্য করা উচিৎ নয়। কারণ, বিগত সতের বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনে আমরা ঐ ধরনের কৌশল বহুবার দেখেছি। প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হতে পারে। এদিকে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানা যায়, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর একটি রহস্যজনক মিছিল থেকে  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধেও আপত্তিকর স্লোগান দেয়া হয়। খবরে আরও বলা হয়, কিছু কিশোরকে নাকি প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছবি অবমাননা করতেও দেখা যায়। এগুলোর পেছনে কারা? তাহলে কি মনে করা অনুচিৎ হবে যে, বিএনপিকে সুনির্দিষ্টভাবে বিতর্কিত করতে ফ্যসিস্টদের দোসররা এসব করছে? মনে রাখতে হবে, এখনও ওরা বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অভাবও সমাজের এ ধরনের অবক্ষয়ের প্রধান কারণ। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষা-ব্যবস্থাকে সেক্যুলার করতে গিয়ে আমাদের প্রজন্মগুলোকে একেবারে ধর্মহীনতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষায় থাকেনি, ধর্মীয় মানবিক শিক্ষা, মহাপুরুষদের জীবনী ইত্যাদি। ফলে, এক কথায় সেক্যুলার শিক্ষার করাল গ্রাসে সমাজে নৈতিকতার পরিবর্তে অনৈতিকতার আবহ সৃষ্টি হয়। হিতাহিত জ্ঞাননশূণ্য হয়ে একটি অংশ একের পর এক বিভিন্ন আত্মঘাতী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর উপর রাজনীতিক পৃষ্ঠপোষকতা ঘায়ের উপর নুনের ছিটা হয়ে বসে। সোহাগ হত্যার ভেতরে এসব উপাদানকে অস্বীকার করা যায় না।

আমার মনে হয়, এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বয়কট আন্দোলনের সূচনা করা যেতে পারে। এতে যারা এসব ঘটনায় জড়িত থাকবে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং তাদেরকে বিচারের হাতে সমর্পণ করার সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। কারণ, সমাজ যদি সোচ্চার হয় তবে কেউ অপরাধ করার সাহস পাবে না আর করলেও কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না। পাশাপাশি রাজনীতিবিদদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নিজনিজ সাংগঠনিক বলয়ে মানসিক ও সাংগঠনিক সংস্কার পরিচালনা করে কর্মসূচী পালন করতে হবে। ধরে নিতে হবে, এটি একটি জনযুদ্ধ। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে যদি বর্তমান অধঃপতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো না যায় তবে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

15.07.2025

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...