বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

মুহতারাম খালিদ ভাই সমীপে

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৫ 

মুহতারাম খালিদ ভাই,

অধীনের মাসনূন সালাম রইল। আশা করছি, মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ রহম ও করমে আপনি ভালোই আছেন। দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে উত্তরোত্তর ভালো রাখুন এবং কওমী দায়িত্ব পালনে অধিকতর কামিয়াব করুন। অনস্বীকার্য যে, এ মুহূর্তে আপনি আমাদের একমাত্র কওমী ব্যক্তিত্ব হয়ে সরকারের ধর্ম-উপদেষ্টা হিসাবে বৃহত্তর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ আপনার কাজে অধিকতর বারাকাত দান করুন। আলহামদুল্লিাহ, আপনার ইজ্জত-ওয়াকার রক্ষা ও উন্নতিতে আপনার যেসব মুহিব্বীন দরবারে ইলাহীতে দোয়া করেছেন এবং এখনো করছেন তাঁদের মধ্যে এ গুনাহগারও অন্তর্ভুক্ত।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আপনার সাথে অধীনের সম্পর্ক সেই নব্বইয়ের দশক থেকে যা অনেকের কাছেই অজ্ঞাত। আপনার নিশ্চয় মনে থাকবার কথা: নব্বই দশকের দুই প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব ও মিল্লাত-এ চট্টগ্রামের কওমী অঙ্গন থেকে কেবল দু’জন লিখার সুযোগ পায়। আপনি লিখতেন উপসম্পাদকীয় আর আমি লিখতাম ফিচার। আজও সেসব কপি অধীনের কাছে সংরক্ষিত আছে। আপনি যখন পিএইচডি অর্জন করেন প্রথম দুয়েক জনের মধ্যে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। সেদিন প্রাণভরে দোয়া করেছি প্রথম একজন কওমিয়ান ডক্টরেটধারী হিসাবে আপনার অভিষেক হলো বলে। তবে বাস্তবতা হলো, আপনি বয়সে, শিক্ষায়, জ্ঞানে, বিচার-বুদ্ধিতে এবং সামাজিক ও জাতীয় মর্যাদায় অনেক উর্দ্ধের মানুষ। সেখানে অধীনের চলাচল অসম্ভব। তাই তুলনা করাকেও অধীন অপরাধ বিবেচনা করি। সেদিক থেকে আপনি অধীনের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রজন্ম এবং অবশ্যই সম্মাননীয়। তাই, আপনার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আমার নিচের বক্তব্যকে স্নেহশীল ও মূল্যায়নমূলক দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আবদার রাখি। মূল্যায়নের কথাটি এজন্য বললাম, ইসলামে মুহাব্বাত ও আইনের বিষয়টিকে সযত্নে একটি ন্যায্য দূরত্বে রাখা হয়েছে। আমি কাউকে মুহাব্বাত করবো; সম্মান করবো ঠিক আছে কিন্তু আইন বা ইন্তিযামের বিষয় যখন উপস্থিত হবে তখন মুহাব্বাত আর আইন মিশ্রিত হবে না; হতে পারে না। আইন মুহাব্বাতকে অতিক্রম করে প্রযুক্ত হবে। মুহাব্বাতের স্থান হবে পরে। সেজন্যই তো সর্বকনিষ্ঠ ও আদরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আবূ শাহমা রজি:কে আদল ও ইনসাফের বাদশাহ হযরত ফারুকে আযম রজি: আশি দিররার শাস্তি দিতে একটুও দ্বিধা করেননি। এমন কি হযরতের বিবি অর্থাৎ আবূ শাহমার মা দৌড়ে এসে হযরত ফারুকে আযমের পায়ে পড়ে ছেলের প্রাণভিক্ষা চান, তখন হযরত উমর ফারুক রজি: গর্জে উঠে বলেছিলেন, সরে যাও! তোমার মতো আরও অনেক মা এভাবে কেঁদেছে কিন্তু কেউই রেহাই পায়নি। তুমি পাবে কেন? সীরাতে সাহাবা সাক্ষী দিচ্ছে, আশি দিররার কিছু বাকি থাকতেই আবূ শাহমা রজি. আঘাতের চোটে বেহুঁশ হয়ে যান। বেহুঁশ হবার আগে হযরত আবূ শাহমা একটু পানি পান করতে চান। কিন্তু ফারুকে আযম রজি. কঠোরকণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তোমার আগে তোমার মতো আরও অনেক মায়ের সন্তান পানি চেয়েছে কিন্তু তাদের দেয়া হয়নি। ফারুকে আযম রজি: বজ্রকণ্ঠে হুকুম দিলেন, পরোয়া করার প্রয়োজন নেই, বাকি দিররা পুরণ করো! দিররা সম্পন্ন হলে দেখা গেলো আবূ শাহমা রজি.’র প্রাণবায়ু আর নেই। তখন হযরত ফারুকে আযম রজি. পুত্রস্নেহে সজোরে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে মাথায় হাত রেখে কাঁদতে থাকেন এবং মাটিতে বসে পড়েন। এই হলো ইসলামের আইন ও মুহাব্বাতের মূল্যায়ন। হযরতের খিদমাতে আরও একটি বিষয় উত্থাপন করার ইচ্ছাকে দমন করতে পারছি না। আল্লাহ’র হাবীব সা.কে আল্লাহ কতো ভালোবাসতেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রসূলে করীমের শানে সূরা দোহা নাজিল করে স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন আদর করে বলেন: والضحى ١ والليل إذا سجى  (কসম হে নবী আপনার দীপ্তিময়, পরমোজ্জ্বল চেহারার যার উজ্জ্বলতার কাছে সূর্যের উজ্জ্বলতাও শরমিন্দা হয়ে আলো ভিক্ষা চায়! কসম হে নবী আপনার কালো-কৃষ্ণ চুলের যার কৃষ্ণতার কাছে ঘনঘোর গভীর রাতের অন্ধকারও শরমিন্দা হয়ে কৃষ্ণরং ভিক্ষা চায়!) অথচ দেখুন, এমন দয়াময় রবও অনিচ্ছাকৃতভাবে শুধু একবার ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার কারণে কিছুদিনের জন্য ওহী বন্ধ করে রেখেছিলেন। এটাই তো ইসলামের মুহাব্বাত ও কানূনের মধ্যকার ন্যায্য দূরত্বের মহান চিত্র। হযরত, তাই বলছি, অধীনের বক্তব্যকে আপনি সেই মূল্যায়নে দেখবেন আশা করি যেখানে মুহাব্বাত ও কানূন তাদের ঐতিহ্যগত ন্যায্য দূরত্ব বজায় রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আপনার-আমার মাঝে এক নির্ভেজাল মুহাব্বাতের সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো এবং এখনো আছে। সেই সাথে এটাও মেনে নিতে হয় যে, এ সম্পর্ক কেবলমাত্র ‘ফিল্লাহ’র মাপকাঠির উপরেই স্থাপিত। সেখান থেকে একচুলও নড়বার সুযোগ নেই। তাই তো ‘লিল্লাহী’ মতভিন্নতার পরও পারস্পরিক ভালোবাসার অস্তিত্ব থাকা ঈমানের দাবি। অধীন ছাত্রজীবন থেকে হিফাজত করতে শিখেছি এক নীতিবাক্য“কানূন আপনি জাগাহ্ মুহাব্বাত আপনি জাগাহ্। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আজ আপনার মতো বিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠজনকে আপনার স্নেহধন্য হয়ে থাকবার নিশ্চয়তায় দু’চার কথা লিখতে হচ্ছে। দুঃখ পেলে ক্ষমাপ্রার্থী।   

মুহতারাম খালিদ ভাই,

গত ১৫ই জুলাই ২০২৫, রোজ মঙ্গলবার আপনি সরকারি সফরের অংশ হিসাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শন করেছেন। সংবাদ-মাধ্যমে জেনেছি, সংস্কারমূলক কর্মসূচীর অংশ হিসাবে আপনি সফরটি করেছেন। একটি ভিডিও বক্তব্যে আপনার কথাও শুনলাম। সে সময় আমি ফেসবুকে খবরটি প্রথম পাই। তখনো আপনার ভিডিও আমাদের সামনে আসেনি। কেবল একটি ছবিই দেখি যেখানে আপনার হাতের বাম পাশে কুখ্যাত ওসি রফিক ও ফ্যাসিবাদের দু’জন জঘন্য ও বর্বর দোসরকে দেখি। আমি সাথেসাথে হাকীকত জানার জন্য হেফাজত ও ধর্ম উপদেষ্টা হিসাবে আপনার বক্তব্য দাবি করি আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে। ক’দিন আগে আমার এক সুহৃদ আমাকে ফোনে জানালেন, আমার স্ট্যাটাস দেখে আপনি নাকি মনক্ষুণ্ন হয়েছেন এবং বলেছেন, রব্বানী ভাই তো আমার মুহাব্বাতের মানুষ। তিনি তো এভাবে স্ট্যাটাস না দিয়ে বা শেয়ার না করে আমাকে সরাসরি বলতে পারতেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

প্রথমেই অধীন একটি বাস্তবতা আপনার সামনে পেশ করতে চাই। তা হলো, ২০২০ সালের মুদিবিরোধী আন্দোলনে শতশত কওমী আলিম-ছাত্র ও হেফাজত সমর্থক দেশব্যাপী গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও কারাবরণের শিকার হন। এটা অনস্বীকার্য যে, যাঁরা সেদিন নানাভাবে ফ্যাসিবাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন তাঁদের মনোব্যথা ও আহাজারির উপলব্ধি বাইরের কারও পক্ষে সঠিকভাবে সম্ভব নয়। নিগৃহীতদের পেশা, সংসার সব এক অনাহূত আঘাতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন তাঁদের মননে যে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয়সে ব্যথা কি বাইরের কেউ বুঝবে? তাই নির্যাতিদের মানসিক ও শারীরিক নির্মমতা, স্বজনদের মনোকষ্টের আবেদন এক ভিন্ন জগৎকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে জগৎ বাইরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আপনি যেহেতু বাইরে ছিলেন, সঙ্গতকারণে, আপনার কাছে কিছু চিত্র তুলে ধরা ও আপনার জানার দুয়ারে উপস্থাপন করা অনিবার্য মনে করি। ফ্যাসিবাদের চরম নির্যাতনের স্টীমরোলার বয়ে যায় বিশেষত হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। অধীন যেহেতু সে পরিস্থিতির অন্যতম শিকার তাই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তুলে ধরছি। হাটহাজারী নির্যাতনের মূল হোতা কুখ্যাত ওসি রফিক, যে কারাগার পরিদর্শনের সময় আপনার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। মনে হয়, ওসি রফিকের উৎপীড়নের ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা গেলে বিষাদ সিন্ধুকেও হার মানাবে। উদাহরণ হিসাবে আসাদুল্লাহ আসাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁদের তিন ভাইকে পরপর গ্রেফতার করে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়। তাঁদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের খবরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন আসাদের মা ও বাবা। সংসার হয়ে যায় বিধ্বস্ত। অসুস্থ আসাদের বাবা রুগ্ন শরীরে আপন সন্তানদের মুখ চেয়ে আদালতের দহলিজে ঘুরপাঁক খেতে থাকেন। এক সময় তাঁদের মুক্তি অবশ্য হয়েছিলো কিন্তু আসাদের মা-বাবার রোগমুক্তি আর হয়নি। সে রোগেই গত ২৮শে জুলাই সোমবার আসাদের বাবা মাওলানা ইউনুস সাহেব চলে গেলেন দরবারে ইলাহীতে; জানাযা উঠলো হাটহাজারী মাদরাসা মাঠে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে যখন আসাদের ভাই আমিন আমাকে দেখে দূর থেকে হাত নাড়তো, বোঝানো দায় সে করুণ চাহনির গুরুভার। চোখের জলও পরাজিত হতো সে নির্মমতার কাছে। হাটহাজারী থানায় রাতের অন্ধকারে ওসি রফিকের নির্দেশে তার দোসর রাজিব শর্মা বিনাদোষে কতো নিরীহ মাদরাসা ছাত্রের হাত-পায়ের নোখ তুলে জীবন্ত জাহান্নামকে হাজির করতো তার খবর কি কেউ নিয়েছে? আদালতের বারান্দায় মাও. রিজওয়ান আরমানের অবুঝ শিশুদের বাবা-খোঁজার কাহিনী কি কেউ লিপিবদ্ধ করেছে? আমার গ্রেফতারের পরের দিন আমার একমাত্র ছেলে থানায় আমাকে দেখতে গেলে তাকেও গ্রেফতার করে আমার পাশের হাজতে আটকে রাখে ওসি রফিক। সেদিন একজন পিতা হিসাবে নিজ সন্তানকে পাশের হাজতে বন্দী থাকার নির্মম অভিজ্ঞতা কি কেউ অনুভব করতে সক্ষম হয়েছে? মাদরাসার গেট থেকে যে নিঃস্ব খেজুর বিক্রেতাকে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় তাঁর আর্তচিৎকারের ধ্বনি কয়জনের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছে? এগুলো আমরা নির্যাতিদের মর্মবিদারী ইতিহাসের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা মাত্র। পুরো আখ্যান লিপিবদ্ধ হলে কতো সাগর যে শুকিয়ে যাবে তা এক খোদাতায়ালাই জানেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

কারাগার পরিদর্শনের ছবি যখন সামনে এলো, আপনার মুখাবয়বে আমরা প্রীত হই নিশ্চয়। কিন্তু আপনার আশেপাশে সেই কুখ্যাত ওসি রফিক ও দুই ফ্যাসিবাদের দোসরকে দেখে বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ আপনার অস্ত্বিকে সুনামির ঢেউয়ের মতো মুছে দেয়। ভেবেছিলাম, কেউ বুঝি আপনার অপমানে অডিট করা ছবি ছেড়েছে। কিন্তু আমাদের সব সন্দেহকে মাটি করে দিয়ে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো যখন খবর ছাপলো, বুঝতে কষ্ট হলো সেই আপনি এই আপনি। ২০২০’র নির্যাতিতদের সে দৃশ্য সহ্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। ক্ষু্ব্ধ হৃদয়ের জমে থাকা সব ঢেউ আছড়ে পড়লো আপনার প্রিয় চেহারার উপরব্যক্তিত্বের উপর। একে আপনি অপরাধ বা দোষ বিবেচনা করবেন না অনুগ্রহ করে। এখানে বশরিয়্যাতের স্বাভাবিক আবেগে আছড়ে পড়ে প্রবল ঘুর্ণিঝড়, যা কেউ সামলাতে পারতো না। এরপর আপনার বক্তব্য এলো। আপনি বললেন, ‘পরাজিত শক্তির অপপ্রচার’। মাজলূমদের আহত হৃদয় এ বক্তব্যকে স্বাভাবিক অনুভূতি প্রকাশের পরিবর্তে একটি একপেশে রাজনীতিক বক্তব্য বলে মনে করতে বাধ্য হলো। স্বীকার করি, হাতের সব ক’টি আঙ্গুল সমান নয়। তেমনি সবাই তো আর ষড়যন্ত্রকারী নয়। শেষ রাতের মসজিদ থেকে বের হওয়া সব মুসল্লীই তো চোর নয়, অধিকাংশ মু’মিন বটে। আপনি যখন একলা বসে থাকবেন, আরজ করি, ছবিটা একটু হাতে নিয়ে নিরপেক্ষ চোখে দেখুন! ছবি কি বলে? আমরাও কয়েদী ছিলাম। যখন সেলে (জেলের ভেতর জেল) চব্বিশ ঘণ্টা বন্দী ছিলাম পরিদর্শকরা আসতেন, শুধু বারান্দা দিয়ে হেঁটে প্রতীকি দায়িত্ব পালন করে যেতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করেনি: কেমন আছি? কিন্তু মানবতার আসামীদের যখন ছবিতে দেখা গেলো আপনার সামনে স্বস্তিতে সেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে তখন আমরা অবাক না হয়ে পারিনি। কারণ, আপনি জানেন, তারা কতো বর্বর অপরাধী। তা সত্ত্বেও জেলকোড ভেঙ্গে আপনাকে তাদের কুশল জানতে চাওয়ার দৃশ্য সবাইকে হতবাক করেছে। এখন যদি আমরা সবিনয়ে আপনাকে প্রশ্ন করি: আপনি ধর্ম উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা নির্যাতিতদের কুশল জানতে আপনার মূল্যবান তহবিল থেকে একটু সময় বের করা কি অপচয় হতো? আমরা কি আপনার মতো মহৎজনের জন্য বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর গণ্য হতাম? আপনার কাছে সবিনয়ে জানতে ইচ্ছে করে, আপনি রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। আপনার কারাগারে আসার আগে নিশ্চয় কারাগারের কোন-কোন জায়গা পরিদর্শন করবেন এবং সেখানে কারা থাকেনসে বিষয়ে তো আপনাকে আগেই জানানো হয়েছে, তাই না! এটাই তো সরকারি প্রটোকল। তখন কি হযরতের নযরে বিষয়টি আসেনি যে অমুক-অমুক সেখানে থাকবে। তাহলে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে সম্ভাব্য কথা বলাকে এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব হতো না? কিন্তু কেন সেটা হয়নি আল্লাহই ভালো জানেন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

কথাগুলো বললাম আপনাকে, আপনার ব্যক্তিত্বকে ছোট করতে বা আহত করতে নয় বরং মানুষ হিসাবে আপনাকে না-ওয়াকিফ বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করতে। একজন মানুষ হিসাবে অনেক কিছু আপনার অজানা থাকতে পারে। সে কিন্তু দোষের নয়। আল্লাহ’র রসূল সা.কেও তো আল্লাহ তায়ালা অজানা বিষয়ে জ্ঞাত করেছেন। সেদিক থেকে আপনার খালিস মুহিব্বীনের একজন হিসাবে নির্যাতিতদের আবেগ ও ভেতরের কথাগুলোকে আপনার কাছে পৌঁছে দিতে আজকের লেখার অবতারণা। আমি বিশ্বাস করি, আমার আর্জি আপনার হাতে যাবার পর আপনার সহজাত উদার মননে মনক্ষুণ্ন হবার সকল কারণকে দূরীভূত করবে। আপনি এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সমাসীন। ব্যস্ততার ওপর ব্যস্ততা আপনার নিত্যসঙ্গী। তাই সরাসরি যোগাযোগ অধীনের পক্ষে যেমন সম্ভব নয় তেমনি সংযতও নয়। তা’ছাড়া বিষয়টি আমার একক সত্ত্বার সাথে সংশ্লিষ্টও নয়। এখানে মিশে আছে জানা-অজানা হাজারও ভুক্তভোগী মানুষের না বলা উপাখ্যান। মনে করি, এককভাবে কথা বলে বিক্ষুব্ধদের ব্যথাকে প্রশমিত করা যেতো না। তাই আপনার ব্যক্তিত্বকে মহান করার প্রয়াসে আজকের উপস্থাপনা।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আজ এক আর্জি নিয়ে আপনাকে অলঙ্কৃত করবো বলে ভেবেছি। আমি জানি, এ আর্জি গ্রহণে হাজারও মাজলূমদের সাথে আপনার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সৃষ্টি হবে যাঁরা অন্যতম উপদেষ্টা হিসাবে আপনাকে দেখতে অনলাইনে বিশাল মিছিলের আয়োজন করে আওয়ায তুলেছিলো: আফম খালিদ সাহেবই হবেন কওমী-জগতের প্রতিনিধি; উপদেষ্টা। তাঁরাই হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আলিম প্রতিনিধি হিসাবে আপনাকে তুলে ধরে। সেদিক থেকে আপনার উপদেষ্টাকালীন মেয়াদের মধ্যে আপনি ২০২০ সালের নির্যাতিতদের সাথে একটু সময় করে বসুন; তাঁদের কথাগুলো শুনুন; তাঁদের বিধ্বস্ত পরিবারের উপাখ্যানকে উপলব্ধি করুন। তাঁদেরও কুশল জানুন। নিঃসন্দেহে এতে আপনার ব্যক্তিত্ব আরও প্রসারিত হবে; সমৃদ্ধ হবে।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আপনি এখন সরকারে আছেন। বহুদিন ধরে কওমী-জগতের একটি বড় সমস্যার সমাধান হয়নি। সে হলো, দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার বা ফুনূনাতের শিক্ষার পর অধিকতর জ্ঞান ও পরিপক্কতার জন্য একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তন। বর্তমানে আমাদের মাদারিসে কওমিয়ার নিসাব ও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে। বর্তমান দাওরায়ে হাদীসের শিক্ষার পর কওমী ছাত্ররা অনেক ক্ষেত্রে আর শিক্ষার প্রয়োজন মনে করেন না বা প্রয়োজন বোধ করলেও আর্থনীতিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে সামর্থ্য হন না। ফলে অন্যসব প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হতে হয়। মনে করি, দীর্ঘদিনের সে সমস্যা নিরসনে এক সুবর্ণ সুযোগ আজ আমাদের দ্বারে উপস্থিত। আপনার সুচিন্তিত নেতৃত্বে এ সমস্যার সমাধানের দিকে যাত্রা শুরু হোক। আপনার প্রচেষ্টায় প্রধান উপদেষ্টার সাথে আলোচনাক্রমে একটি সমন্বিত কওমী ভার্সিটির বুনিয়াদ যদি রাখা যায়, তবে সে হবে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ যা জাতীয় ও কওমী জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আপনি পদক্ষেপ নিন, কওমী-জগৎ আপনার পেছনে কাতারবদ্ধ থাকবে। এখন যে কওমী সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি উঠছে সেটি ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হবে একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তনের মাধ্যমে। দোয়া করি, আপনার প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বে একটি কওমী ভার্সিটির গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে আপনার সঠিক স্থানটি চিহ্নিত হোক। আল্লাহ কবূল করুন।

মুহতারাম খালিদ ভাই,

আজকের এ অবতারণার মাধ্যমে আশা করি আপনার মনক্ষুণ্ন হবার উপদানগুলো আপনার সদয় অনুগ্রহে বিদূরিত হবে। কারণ, অধীন মনে করি, নানা মতভিন্নতা সত্ত্বেও মু’মিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সৌহার্দ্য অক্ষুণ্ন থাকা উচিৎ। ইতিহাসের জঙ্গে জামাল ও সিফ্ফীন এর উৎকৃষ্ট দলীল। পরিশেষে, আপনার স্নেহপূর্ণ দোয়া ও শুভাকাঙ্খা চেয়ে এবং আপনার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও কামিয়াবী কামনা করে এখানেই ইতি টানছি। তাম্মাৎ বিল খাঈর।

আপনারই স্নেহধন্য

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

চট্টগ্রাম।

31.07.2025

কোন মন্তব্য নেই:

Featured Post

মার্কিন-জামায়াত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৭৭  সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন-জামায়াতের দৃশ্যম...