মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৬৪
আমাদের ইসলামী আন্দোলন বিশেষত হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে দেখে আসছি, আমাদের বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ অকারণে অতিমাত্রায় অগ্নিগর্ভ ও কঠোর। যেমন ধরুন, প্রতিটি ইট খুলে ফেলবো, টেনে নামিয়ে ফেলবো, এ দেশে থাকতে দেয়া হবে না ইত্যাদি। বলতে পারেন, সেগুলো তো রাজনীতিক নেতা বা বামপন্থীরা হারহামেশা বলে আসছে। আমরা করলে দোষের কি? আসছি সে কথায়। একই কাজ যদি কোন শিক্ষিত ও অশিক্ষিত করেন তাহলে কি উভয়ই একই পরিমাপের? মনে করুন, গালি। কেউ শিক্ষিত হয়ে বা মাদরাসায় পড়ে গালি দিল আর সাধারণ অশিক্ষিত একজন গালি দিল—উভয় কি একই ওজনের? নিশ্চয় বলবেন: তা কেন হবে? অশিক্ষিত-অভদ্রেরা গালি দিতে পারে কিন্তু শিক্ষিত বা মাদরাসাপড়ুয়া কি করে গালি দেবে? এখানেও ঠিক একই কথা। সাধারণ রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের সাথে যাঁরা কুরআন-হাদীস পড়েন তাঁদের তুলনা কি করে করবেন? ওরা তো কুরআন-হাদীসের নীতিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই তাঁদের গর্হিত কাজও মাদরাসাপড়ুয়াদের তুলনায় হালকা হতে বাধ্য। মাদরাসাওয়ালারা রাজনীতি করবেন, বক্তব্য দেবেন, দিতেই পারেন। কিন্তু এমন কি বলবেন, যা তাঁদের পঠিত নীতি-নৈতিকতার সাথে মিলে না? তাঁদের আদর্শের সাথে খাপ খায় না? আচ্ছা এই যে বললেন: গদি থেকে নামিয়ে ফেলবেন, জেলের প্রতিটি ইট খুলে ফেলা হবে। কৈ, কোন দিন কি পেরেছেন ইট খোলা তো দূরের কথা, কাছেও যেতে? ক’জনকে গদি থেকে নামিয়েছেন? কেন জানি আমরা আজও সেই গতানুগতিক মেজাজ থেকে বেরুতে পারিনি। সে অনুভব বা চেষ্টা আছে বলে মনেও হয় না। পরিবর্তনের কোন আহ্বানই আমাদেরকে পরিবর্তিত করতে পারছে না। আমার এখনো মনে আছে, মুদিবিরোধী আন্দোলনের সময় হেফাজতের কিছু নেতার মুখে এমনসব ভাষা উচ্চারিত হয় যা কোন ক্রমেই কোন নায়েবে রসূলের বলে মনে হয়নি। সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন: আমরা আলিম-উলামার কাছে এমন ভাষা শুনতে চাই যা তাঁদের লেখাপড়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কথাটি আমাদের জন্য ছিলো গভীরভাবে অপমানজনক। রসূলুল্লাহ সা. মক্কার কাফিরদের অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন কিন্তু কখনো এমন কোন ভাষা বা শব্দ উচ্চারণ করেননি বা সাহাবীদের (রজি.আনহুম) বলতে বলেননি যা থেকে কাফিররা এমন বলতে পারে যে, আপনাদের বক্তব্যে আমরা এমন আহত হয়েছি যে, দ্বীন গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমরা ইসলামী নেতৃত্বের পাশাপাশি নবীজী সা.’র আদর্শেরও সৈনিক; প্রত্যেকেই দা-য়ী।। তাই সাধারণ যা বলে তা আমরা বাছবিচার ছাড়া বলতে পারি না।আমি মাঝেমাঝে আশ্চর্য হই। আমরা মাদরাসাওয়ালারা কি নিজেদের পরিভাষা ব্যবহার করে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারি না? বামপন্থীদের স্লোগান কেন আমরা মুখেমুখে বয়ে বেড়াবো? গণতন্ত্রীদের ভাষা কেন আমরা মুখে আওড়াবো? এতো পরনির্ভর হলাম কেন আমরা? ধরুন, মানববন্ধনের কালচার। দেশে এটা কারা এনেছে? জানেন? মানববন্ধনের আবিস্কারক হলো বামপন্থীরা আর তাদের সহযোগী এনজিও। আর এখন ইসলামী আন্দালনকারীরাও দেখি মানববন্ধনের জন্য দিওয়ানা। এ স্বরোধিতা কেন? বামপন্থীদের দেশ ছেড়ে যেতে বলবেন, ইসলামবিরোধী বলবেন আবার তাদের কৃষ্টি-কালচারকে বগলতলে করে ঘুরে বেড়াবেন—এ কেন? পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
ياأيها الذين آمنوا لا تقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكافرين عذاب أليم
হে মু’মিনগণ, তোমরা ‘রায়িনা’(আরবীতে এর অর্থ: আমাদের দিকে লক্ষ করুন। আর হিব্রু ভাষায় শব্দটি বদদোয়া হিসাবে ব্যবহৃত হতো। তাই ইহুদীরা রসূলুল্লাহ সা.কে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ‘রায়িনা” বলতো। ‘উনযুরনা’ শব্দের অর্থও: আমাদের দিকে লক্ষ করুন।) বলো না—‘উনযুরনা’ বলো এবং শুনতে থাকো কাফিরদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (সূরাহ্ বাকারাহ, ১০৪)
বলাবাহুল্য, আরবীতে ‘উনযুরনা’ ও ‘রায়িনা’ সমার্থক। অথচ আল্লাহ তায়ালা শব্দ দু’টি সমার্থক হওয়া সত্ত্বেও কাফিরদের কণ্ঠে অধিকতর প্রচলিত ও দুরভিসন্ধিমূলকভাবে ব্যবহৃত হতো বিধায় ‘রায়িনা’ বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে মুসলিমদের জন্য ‘উনযুরনা’কে পছন্দ করেছেন। এখানে স্পষ্টতঃ মু’মিনদের জন্য স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও আচার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কাফিরদের সংস্কৃতিকে অগ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
আমি বলতে চাচ্ছি, মাদরাসাপড়ুয়া হিসাবে; দা-য়ী হিসাবে; মানুষকে আল্লাহর রাসূল সা. প্রদত্ত হিদায়াতের আহ্বানকারী হিসাবে আমরা সাধারণের মতো হওয়া চলবে না। আমাদের কদম-কদম আচরণ থেকে মানুষ যেনো শিক্ষা নিতে পারে—সে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ না থাকলে আমরা পাগড়ি-জুব্বা পরিধান করে আর নেতা হয়েও ব্যর্থ। নাম যখন দিচ্ছি: ইসলামী রাজনীতি, তো ইসলামসম্মত হতে হবে না? পশ্চিমারা আর দেশের উগ্র সেক্যুলার গোষ্ঠীগুলো চায় আমরা উগ্রবাদী হই, চরমপন্থী হই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি বক্তব্যে, আচরণে সংযত না হয়ে উগ্রপন্থী হই তাতে তো শত্রুপক্ষেরই লাভ। তাই না? ওরাও তো চায় আমরা রাস্তার গাছ উপড়ে ফেলি; সরকারী সম্পদে হামলা করি। এমন করলে কাদের লাভ? একটু উপলব্ধি করুন, আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন কথাবার্তায় শাপলা ও মুদিবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের কি ক্ষতি করেছি। আমরাই তো সরকারকে চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে নিজেদের অরাজনীতিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলাম। বিনিময়ে অসংখ্য আলিম-ছাত্র শহীদ হন; বেঁচে থাকাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়; অনেকের সংসার ধ্বংস হয়ে যায়। কৈ, যারা উগ্র কথা বলে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন তারা তো আড়ালে চলে গিয়েছিলেন আর অসহায় হয়ে পড়েন অসংখ্য নিরীহ আলিম। তাঁদের খোঁজ কি ভাষণওয়ালারা নিয়েছিলেন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আজও সে বলয় থেকে বের হতে পারিনি। আজ কিছু ডানপন্থী রাজনীতিক দলও ধর্মীয় উগ্রপন্থার আশঙ্কা প্রকাশ করছে। কেন? তা কি আজও আমাদের উপলব্ধিতে আসে না? জানি না আমাদের কবে বোধোদয় হবে। সংশোধিত না হলে আমাদের ভাবিষ্যৎ অন্ধকার।
27.07.2025

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন