মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৬২
ফটিকছড়ির মাহাত্ম্য বর্ণনা আমরা সবাই করি। কিন্তু আসল জায়গায় আমাদের হাত দেয়া হয় না। আমাদের কোন উল্লেখযোগ্য নেতা নেই। ফটিকছড়ির এ দুর্ভাগ্য পিছু নিয়েছে প্রায় তিন-চার দশক ধরে। এখন সবাই বলবেন, অমুক সালে অমুক এখান থেকে সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন—তিনি কি নেতা নন? আপনি কি তাই মনে করেন? কে নেতা? কী তাঁর বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী আছে। সোজা কথায় বলতে গেলে নেতা তিনি যিনি একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীকে কল্যাণ সাধনে সচেতন করে তোলেন, আদর্শ কর্তব্য নির্দ্ধারণে যোগ্য করে তোলেন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলেন। যাঁর নেতৃত্বে সমাজ বুঝতে শিখবে কি করতে হবে বা হবে না, তাঁকেই তো মানায় নেতৃত্বে। এর বাইরে গিয়ে পদাশ্রিত চিন্তাধারার প্রভাবে মানুষের ভোট আদায়ের স্বভাবকে কখনোই নেতৃত্ব বলা যাবে না বা এমন কর্মের কর্তাকে নেতা বলা যায় না। সে হিসাবে নিছক নৈর্বাচনিক কলাকৌশল রপ্ত করে সংসদে গেলেই তিনি নেতা হবেন—এমন ধারণা ভুল।আমাদের এখানে একটি কথা প্রচলিত আছে: যা হবার ন’বছরেই হয় আর যা হয় না নব্বই বছরেও হয় না। আজকের ফটিকছড়ির অবস্থা দেখে আমার কাছে তেমনই মনে হচ্ছে। আমাদের ফটিকছড়ির মানুষের একটি স্বভাব আছে। জানি না অন্য কোথায় কেমন। স্বভাবটি হলো, তারা এক লাফে গাছে উঠতে চায়। এক রাতেই বড় হতে চায়। এই হচ্ছে আমাদের বড়ে দোষ। আমার বাবা মরহুম প্রায়ই বলতেন: ফকীর হবার আগে ঝোলা সেলাই করো না। এখানেও ব্যাপারটি তেমন। কেউই সময় দিতে চায় না; ধৈর্যের বড় অভাব। খেজুর গাছ তো সবাই দেখেছেন। তাই না! খেজুর গাছের স্বভাব হলো, তার বাড়ন্ত অতি ধীরে কিন্তু গোড়া ভীষণ মজবুত। তাই বড়বড় তুফানে অশ্বৎ-বট গাছ পড়ে গেলেও খেজুর গাছকে কেউ পড়তে দেখেনি। আমাদেরও তাই হওয়া উচিৎ। ধীরে বড়ো হোন, মজবুত হয়ে বড়ো হোন। এটাই নিয়ম। এর বাইরে গিয়ে কার্যসিদ্ধি অসম্ভব। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কথা বলেছিলেন: যে বৃক্ষ লকলক করিয়া বাড়ে তাহার ডগা অমনিতেই ভাঙ্গিয়া পড়ে। আমাদের ফটিকছড়ির মানুষও অনেকটা তেমন। ইল্লা মাশাআল্লাহ। কেউ ভেবে দেখেন না, হঠাৎ বড়ো হতে যাবার মধ্যে অনেক ঝুঁকি; অনেক বিপদ।
ফটিকছড়িতে রাজনীতিক নেতৃত্ব গড়ে না ওঠার আরেক বড়ো কারণ লেখাপড়াবিহীন রাজনীতি। পত্রিকা পড়েই এখানে রাজনীতির দীক্ষা নেয়া হয়। অনেকে তো পেপার-পত্রিকা দেখেই নিজেকে রাজনীতিক ভাষ্যকার মনে করেন। রাজনীতি এসেছে মূলত মেধাবী, শিক্ষানুরাগী ও সচ্চরিত্রের মানুষের জন্য। এক সময়কার রাজনীতিবিদদেরকে মানুষ দেখতো ভ্রমণের সময়ও বই পড়তে। যথেষ্ট শিক্ষার উপকরণ না থাকলে, বড়দের সাহচর্যে অভিজ্ঞ না হলে কেউ রাজনীতির মাঠে নেতৃত্ব দিতে সাহস করতেন না। ফটিকছড়িতে বড়োবড়ো ব্যক্তি জন্মেছেন সত্য কিন্তু নেতার জন্ম কতো? এর আরেকটি কারণ হলো, যাঁরা রাজনীতিতে বড়ো হয়েছেন তারা তরুণ-নেতৃত্ব গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দেননি। তাঁরা চেয়েছেন কেবল তরুণদের ব্যবহার করে আসন জিততে, এমপি-মন্ত্রী হতে। তরুণদের পৃষ্ঠপোষকতা কেউ দেয়নি। জেতার পর কালেভদ্রে দেখা হলে এসব তরুণদের না চেনার ভান ধরেছেন আসনজয়ীরা। দিনশেষে দেখা গেছে, সেই নিরলস তরুণ কর্মীরা শূণ্য হাতে ঘরে ফেরৎ। এটাকে একটা শোষণও বলা যায়। তাঁরা চাননি তাঁদের জায়গায় একজন যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি হোক। এ আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহ পরিণাম আজ আমরা ভোগ করছি। আমি নিজে দেখেছি, এক সময়ের তরুণ কর্মীরা হতাশ হয়ে নেতৃত্ববিমূখ হয়ে ব্যবসা-পাতি নিয়ে বসে আছে। এতে সমাজে শূণ্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর আমাদের তরুণদেরও একটি হতাশার দিক হলো, তারা অতিমাত্রায় নৈরাশ্যবাদী। একটু এদিক-ওদিক হলেই তাদের রক্তচাপ নেমে যায়। আমরা বাল্যকালে পড়েছিলাম: একবার না পারিলে দেখ শতবার, পারিব না এ কথাটি বলিও না আর। তখন দেখতাম ছোট-ছোট ছেলেদের মাঝেও জেদ আর প্রতিযোগিতার কি ভাব! এখন তেমন আর দেখা যায় না।
আজ এখানে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯১ সাল। এমপি নির্বাচন। আমাদের ফটিকছড়ি থেকে প্রার্থী হলেন মিনার মার্কায় এখানকার এক কৃতি সন্তান হাফেজ মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.। ঢাকা থেকে এসে আমিসহ আরও কয়েকজনকে ডেকে পাঠালেন বাড়ি থেকে। আমরা তখন টগবগে যুবক। তাঁর কথা শুনে যেন মাছ পানি পেলো। শতশত গুণ জোশ নিয়ে আমরা সেদিনকার ফটিকছড়ির তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম মিনার মার্কার সমর্থনে। আব্দুল্লাহপুর থেকে রামগড়—সবখানে সাড়া পড়ে গেলো। কারণ, সে-সময় আলিম প্রার্থী হওয়া ফটিকছড়িতে বিরল ঘটনা ছিলো। শুনেছি, এর আগে চল্লিশের দশকে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে হযরত হারুন বাবুনগরী রহ. নেযামে ইসলামের পক্ষ থেকে এ আসনে কিতাব মার্কায় নির্বাচন করেছিলেন। আজ মিনার মার্কা নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। সব তুচ্ছ করে শুরু হলো নির্বাচনী সংগ্রাম। আমাদের নেতা মাও. নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.। তাঁর সম্পর্কে এখানে কিছু বিষয় তুলে না ধরলে অবিচার হবে বলে মনে করি। মাও. জিহাদী সাহেব রহ. একজন ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমি হাতে গোনা যে ক’জন নেতৃত্বগুণসম্পন্ন কওমী আলিম দেখেছি তিনি তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বলতম। নেতা হবার মতো প্রায় সব গুণ তাঁর ছিলো। আমাদের মতো তরুণদের তিনি যে মূল্যায়ণ করেছিলেন তা কখনও বিস্মৃত হবার নয়। অনেকের মতো তিনি কোন বিষয়ে আমাদেরকে বাদ দিয়ে কোন সুযোগ গ্রহণ করেননি বা সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর বন্ধুসুলভ ও ত্যাগী ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ ছিলাম। তাঁর যে কোন সময় যে কোন ডাকে আমরা ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়তাম। আমার এখনও মনে আছে, তিনি পায়ে হেঁটে পথসভা করতে করতে সকালে একটি মাত্র বাটারবন খেয়ে মোহাম্মদ তকীর হাট থেকে নাজিরহাটে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। আলিমদের বিশাল অংশ তাঁর পক্ষে ছিলো। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ফটিকছড়ি আগে থেকে বিএনপি’র শক্ত ঘাঁটি। এমন জায়গায় তিনি তাঁর কঠোর নেতৃত্ব ও ত্যাগের মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হন। মধ্যখানে অপ্রত্যাশিতভাবে একজন বহুল পরিচিত আলিমের দুর্ভাগ্যজনক ভূমিকা ও হস্তক্ষেপে মাও. নুরুল ইসলাম জিহাদীর সমর্থনে ভাঙ্গন সৃষ্টি না হলে ফটিকছড়ির ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সে বছর জামিয়া বাবুনগরের সালানা জলসায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি যে মর্মস্পর্শী বয়ান করেছিলেন তা কখনোই ভোলার নয়। যা হোক, সেবারের নির্বাচনে মাও. জিহাদী রহ. এতো প্রতিকূলতার মাঝেও তৃতীয় স্থান দখল করেছিলেন। এরপর তিনি যদি তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেন, মনে হয়, তিনি অবশ্যই ফটিকছড়ি আসন থেকে এমপি হতে পারতেন। কিন্তু এখানকার উলামায়ে কেরামের বিভক্ত অবস্থা দেখে তিনি প্রবল দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মাঠ ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। আর কখনোই তিনি এখানকার রাজনীতিতে ফিরে আসেননি। সেই ঘটনাকে আমি শুধু তাঁর জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলবো না বরঞ্চ ফটিকছড়ির উলামায়ে কেরামের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক বলবো। আমি এখনো মনে করি, সেদিনকার দুর্ঘটনা বিএনপি’র জয়কে সহজ করার জন্য সংঘটিত করা হয়েছিলো। সেখানে ফটিকছড়ির বৃহত্তর আলিম-সমাজের রাজনীতিক সম্ভাবনাকে কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
ফটিকছড়ি থেকে মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.’র বিদায় আমাদের মতো তরুণদের জন্য অভিভাবকহারা হবার এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। কারণ, মাও. জিহাদী রহ. ঢাকা চলে যাবার পর এক অজানা কারণে তাঁর তরুণ কর্মীদের সাথে আর কোন সম্পর্কই রাখেননি। কোন খোঁজ-খবরও নেননি। ফলে, দিগ্বিদিকশূণ্য হয়ে কিছু সম্ভাবনাময় তরুণের নেতৃত্ব সৃষ্টি হবার ভবিষ্যৎ সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। এর রেশ আজও শেষ হয়নি বলে মনে হয়। ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে মাও. আবু তালেব সাহেবকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে সম্মিলিত উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে দাঁড় করানো হলেও মাঠে নিরঙ্কুশ একতা উপস্থিত ছিলো না। ফলে, তিনি কামিয়াব হননি। আমার আজও মনে হয়, ৯১’র সে সময়ে যদি মাও. জিহাদী রহ.কে ব্যর্থ করা না হতো এবং তিনিও যদি কর্মীদের সাথে বিচ্ছিন্ন না হতেন তবে আজ এক ঝাঁক নেতৃত্বসম্পন্ন আলিমকে মাঠে দেখা যেতো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তা আর হলো না।
বলতে দ্বিধা নেই, এখন যারা ফটিকছড়িতে নেতৃত্ব দেবার চেষ্টা করছেন তাদের নেতৃত্বগুণ নেই বললে চলে। এগুলো অনেকটা বাচ্চা ছেলের তলোয়ার নিয়ে খেলা করার মতো ব্যাপার। তারা ঠিক মতো গড়ে ওঠেননি। তাদের নেই প্রয়োজনীয় পড়াশোনা; নেই অভিজ্ঞতা। প্রশ্ন হলো, তাই বলে কি তারা হারিয়ে যাবে? আমি তা বলছি না। তারা আগে সমাজে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করুক; সমাজ তাদেরকে কতোটা চায় সেটা পরখ করে দেখা হোক। তবেই না পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন। আমার পারামর্শ হলো, তারা আগে স্থানীয় নির্বাচন করুক; কাউন্সিলর-মেম্বার হোক। সেখানে উৎরাতে পারলে জনগণ ও সমাজ তাদেরকে মেয়র-চেয়ারম্যান করবে। সেখানে সফল হলে এমপিতে আসবেন। নিজ থেকে অযথা নিজেকে নেতা জাহির করার খাহেশ কেন? আগে ফকীর হোন পরে ঝোলা সেলাই করুন। আল্লাহ হাফিয।
16.07.25

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন