মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৭১
আমাদের দেশে জীবনী লেখা হয়, সমালোচনা লেখা হয় কিন্তু ব্যক্তির সত্ত্বাগত মূল্যায়নের চিত্র খুব কম দৃশ্যমান হয়। এর মূল কারণ, সমালোচনা বা মূল্যায়নের (تقييم) ক্ষেত্রকে ফরখ করার ব্যর্থতা। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত যে মাপকাঠি বা সূত্র ব্যবহার করি, সেটি স্পষ্ট নয়। তার চেয়ে বড় কথা, মূল্যায়নের জন্য আমাদের ধারণাও পরিস্কার নয়। একটি সত্ত্বার কোন বৈশিষ্ট্যকে উপরে-নিচে রাখতে হবে—সে বিচার করতে বা বিচারের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে আমাদের দুর্বলতা খালি চোখে ধরা পড়ে। ফলে আমরা মূল্যায়ন করতে গিয়ে হয় অহেতুক প্রশংসায় গা ভাসাই অন্যথায় অপ্রাসঙ্গিক ইতিহাসের আশ্রয় নিই। সঙ্গতকারণে, ব্যক্তির মূল্যায়ন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আর গঠনমূলক মূল্যায়ন না হলে, ব্যক্তিকে তাঁর সত্ত্বার নিরিখে চেনা যায় না। ধরুন, একজন মানুষের সত্যকথন ও স্বচ্ছ লেনদেনের গুণ আছে। এখন কোন কোন ক্ষেত্রে এ গুণদ্বয়কে পর্যায়ক্রম দিয়ে সাজাবো এবং পর্যায়ক্রমের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করবো—সেটাই মূল্যায়নের প্রাথমিক বিচার। এ বিচার করতে গিয়ে প্রয়োজন হয়, ব্যক্তির প্রাসঙ্গিক ইতিহাস বা ঘটনা এবং তার পটভূমি ও পর্যালোচনা। এরপর লাগবে, বিশ্লেষণ বা বিনির্মাণের পদ্ধতি। এগুলো মানা হলে দেখবেন, একটি বাস্তবসম্মত উপসংহার জাতিকে উপকৃত করবে। তাই উপসংহার মূল্যায়নের দৃশ্যমান আকার।হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র মূল্যায়নের মতো সুকঠিন বিষয়ে হাত দেবার আগে একটি বাস্তব উদাহরণকে স্বীকার করে নিতে হয়। আমাদের কওমী অঙ্গনে এমন অনেক মনীষী ছিলেন যাঁরা নিজনিজ অঙ্গনে ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাঁদের খিদমাত, উম্মাহ’র জন্য তাঁদের হৃদয়কান্না আজও আমাদেরকে ঋণী করে রাখে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতি তাঁদেরকে চিনতেও পারেনি। শহরের লোকাল বাসের যাত্রীর মতো তাঁরা উঠেছেন আবার নেমে গেছেন। এটুকুই সার। তাঁরা চলে যান; সাথে তাঁদের সীরাতও মাদফূন হয়ে যায়। কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁদের কুরবানীর বিশ্লেষণকৃত একটি অধ্যায় জাতির সামনে রেখে যেতে। এখানে তাঁদেরকে যদি আমি সজ্ঞানে ‘মাযলূম’ বলি—তবে কি অন্যায় হবে? হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.ও তাঁদের অন্যতম এক নক্ষত্র যিনি এসেছেন আবার চলে গেছেন পায়ের চিহ্ন ব্যতিরেকে। এ শূণ্যতার দায় আমাদের সবার। সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, জীবদ্দশায় আমাদের কারো-কারো কাছে তাঁরা ছিলেন বিতর্কিত, অসহনীয় কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাবার পর আমরাই হলাম তাঁদের অশ্রুসিক্ত ইয়াদগার। কবি নজরুল মরহুম কতো কঠিন সত্যই না বলেছেন:
“জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল,
মুখপানে যার তুমি চাওনি ফিরে তারি লাগি আজি কেন অশ্রু আকুল?”
হযরত বাবুনগরী রহ.কে আমি প্রথম দেখি ১৯৮৮ সালে জামিয়া বাবুনগরে। তখন তিনি মিশকাত শরীফ পড়াতেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাঁকে আমি দেখেছি, ছাত্র গড়ে তোলার এক অদম্য কারিগর; আসলাফ-আকাবীরের নমুনা হয়ে থাকবার প্রাণান্ত প্রয়াসী; ছাত্রদের মধ্যে বাতিল-বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান প্রদানে নির্ঘুম প্রহরী আর যুগের প্রয়োজনে দ্বীনের ব্যাখ্যা সৃজনে এক কিতাবমন্থনকারী হুদহুদ হিসাবে। জামিয়া বাবুনগরে যতোদিন ছিলাম, দেখিনি কখনো তাঁকে রাতের নিদ্রা যেতে। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মধ্যরাত বা শেষরাত্রে উঠেছি, দেখেছি হযরত উপুর হয়ে কিতাবের গভীর সাগর থেকে মনিমুক্তা আহরণে মগ্ন। পুরো মাদরাসা তখন ঘুমে বেঘোর। সে এক ভিন্ন জগৎ যেখানে নশ্বর পৃথিবীর তাবৎ কোলাহল এ নিশাচর মুসাফিরের কাছে একেবারেই নিস্তব্ধ। হযরতের কামরায় তখন থাকতেন বর্তমানে জামিয়া বাবুনগরের অন্যতম মুহাদ্দিস মাওলানা হারুন আজীযী সাহেব। বয়সে তিনি আমার চেয়ে ছোট হলেও তাঁর সাথে আমার গভীর হৃদ্যতা ছিলো। একদিন তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, হযরতকে তো দেখি সব সময় কিতাব নিয়ে পড়ে থাকেন। রাতে খাওয়া-দাওয়া করেন কখন? হারুন আযীযী সাহেব বললেন: রব্বানী ভাই, ওগুলোর কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনো রাত বারোটায়; কখনো তিনটায় আবার কখনো বিনা খাওয়াতেই কাটিয়ে দেন।
৮০’র দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনে আন্তঃমুনাযিরার যে মোহনীয় কাল ছিলো সে-সবের প্রাণকেন্দ্র ছিলো জামিয়া বাবুনগর। সাহাবায়ে কেরামের মি’য়ারে হক, তাকলীদ, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেসব মুনাযিরার আয়োজন করা হতো তার প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী। তাঁর তত্ত্বাবধানেই রাতব্যাপী তর্কসভাগুলো দূরদূরান্ত থেকে আসা ইলমপিপাসু উলামা ও তালিবে ইলমদের খোরাক মিটাতো। সে-সময়কার অনেকেরই ’৮৯-’৯০ সালের সাহাবায়ে কেরামের মি’য়ারে হকের উপর আয়োজিত ঐতিহাসিক মুনাযিরার অবিস্মরণীয় স্মৃতি ভুলবার কথা নয়। কি উৎসব-উৎসব আমেজে সপ্তাহ আগে থেকে জামিয়া মেতে ওঠে। কয়েক মাস আগে ঘোষিত মুনাযিরার পক্ষ-বিপক্ষ প্রস্তুতি নিতে কিতাবের এক পহাড় গড়ে তোলে। বিভিন্ন মাদরাসা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দালায়িল তৈরি ও সংগ্রহ করতে তাঁরা মৌমাছির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সেই মুনাযিরায় পক্ষের নেতা ছিলেন, তৎকালীন দাওরার ছাত্র মাও. নাজমুল হক এবং বিপক্ষের নেতা ছিলেন একই জামায়াতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মুফতী গোলাম মা’বুদ রহ.। অসাধারণ এক তেজস্বী তরুণ আলিম ছিলেন মুফতী গোলাম মা’বূদ রহ.। আল্লাহ তাঁর মাগফিরাত দান করুন। যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে জামিয়া আগত আলিম-উলামা ও অন্য মাদরাসার ছাত্রদের আগমনে সাজসাজ হয়ে উঠলো। নামাযে ইশার পর যে মুনাযিরা শুরু হয় সেটা ফযরের পূর্বেও শেষ হতে চায়নি। মুনাযিরার সভাপতি ছিলেন, উস্তাযুল আসাতিযা শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা ইসহাক আল গাযী রহ.। মুনাযিরায় ফরীকাইনের পরে প্রথম সারিতে ছিলেন শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’র বিশিষ্ট খলীফা ও তিলমীযে রশীদ হযরত মাও.ওবায়দুর রহমান সাহেব রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. আব্দুল বারী সাহেব বাশখালী রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. ইউনুস সাহেব হাটহাজারী রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. হাফিয হাবীবুল্লাহ বাবুনগরী সাহেব, হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ., জামিয়া বাবুনগরের বর্তমান শাইখুল হাদীস মুফতী মাহমূদ হাসান ভুজপুরী দা.বা., মাওলানা আবুল কালাম সাহেব রহ. প্রমুখ দেশবরেণ্য আলিমে দ্বীন। রাত তখন আড়াইটার মতো হবে, হযরত গাযী সাহেব রহ. সভাপতি হিসাবে মুনাযিরার সমাপণী বক্তব্য ও রায় দিতে শুরু করলেন। এবার শুরু হলো, ইলমের তীরবিহীন এক মহাসাগর হযরত গাযী সাহেব হুযূরের সাথে জামিয়ার উপরোক্ত বয়োজ্যেষ্ঠ উলামায়ে কেরামের প্রশ্নোত্তর পর্ব। সে এক আজীব ও গরীব মানযার! মনে হচ্ছিলো, সবাই এ ইলমী মহাসাগর থেকে কিছু সুধা পান করতে কতোই না পাগলপারা! হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. গাযী সাহেব রহ.’র ইলমী গভীরতায় চমকে উঠলেন। অথচ হযরত বাবুনগরী রহ. আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ.’র তিলমীযে রশীদ। এক পর্যায়ে রাত তখন ফযরের কিছু আগে হবে, হযরত বাবুনগরী জরুরতের কারণে মসজিদ থেকে বের হলেন। ঘটনাক্রমে হযরতের পিছুপিছু আমিও বের হলাম প্রাকৃতিক প্রযোজনে। জায়গাটা বাবুনগরের পুরনো মসজিদের উত্তর দিকের গেট পার হয়ে ক’কদম এগিয়েছি, হযরত বাবুনগরী পায়ের আওয়ায শুনে পেছন ফিরে আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে স্বোচ্ছ্বাসে বলে উঠলেন,“গোলাম রব্বানী! মনে রেখো, এ শাখসিয়াত আর এ পৃথিবীতে জন্ম নেবে না। হযরতের কথাগুলো রেকর্ড করে রাখা দরকার। হযরতের পরে এ কথা আর শুনতে পাওয়া যাবে না।” সে দৃশ্য আমার জীবনে আজও অবিনশ্বর। বলছিলাম, এসব ইলমী অধ্যায় ও ছাত্র গড়ার কৌশলের পেছনে প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.। তাই আমি বিশ্বাস করি, হযরতের জীবনের স্বর্ণযুগ কেটেছিলো জামিয়া বাবুনগরে।
হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর এক বিস্ময়কর সত্ত্বাগত পরিচয় হলো, তিনি কেবল একজন মাদরাসায় পড়ুয়া আলিমে দ্বীন ছিলেন না; তিনি ছিলেন মুহাদ্দিসে কবীর আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.’র সুযোগ্য রুহানী ফরযন্দ আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ.’র তিলমীযে রশীদ। সম্ভবত তিনিই প্রথম বাংলাদেশে যুগ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে হাদীসে রাসূলের দারস প্রদান করতেন। এ জন্য তাঁকে রাতদিন গভীর পঠন ও গবেষণায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। মাঝেমাঝে আমার মতো গোমূর্খ হযরতের কামরায় গেলে হযরত যে অপার স্নেহের আবহে কথা বলতেন তা কখনো ভুলবার নয়। যেহেতু আমার মরহুমা মা হযরতের খালা, তাই হযরত রহ. দেখা হলেই আমার মা-বাবার হালাৎ জানতে চাইতেন। তাঁদের জন্য সালাম পেশ করতেন। কোন বিষয় নিয়ে কথা তুললে হযরতের বিস্তৃত ও বাস্তবমুখী জবাব শুনে বিমোহিত হতে হতো। তাঁর গবেষণাধর্মী চিন্তার এক বড় দিক ছিলো, বাড়িতে গড়ে তোলা পারিবারিক পাঠাগার। হযরত সেখানেও আমাকে নিয়ে গেছেন কয়েকবার। সেখানেই হযরত রহ.’র পিতা বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুসান্নিফে তানযীমুল আশতাত হযরত মাওলানা আবুল হাসান রহ.’র সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। হযরত দা’ওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও যত্রতত্র বয়ান করতে যেতেন না। তিনি কিতাব আর গবেষণা নিয়েই থাকতেন। যে বছর তিনি তাঁর নিজের লেখা গ্রন্থ ‘সাইন্স আওর ইসলাম’ প্রকাশ করেন, আমাকে ডেকে নিয়ে একটি কপি হাদিয়া দেন। হযরতের যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতো তা হলো, তাঁর ব্যাখ্যা দেয়ার দক্ষতা ও বিস্তৃত ক্ষমতা। হাদীসের দারসে এটিই তাঁর ফুটে ওঠা এক বড় বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে উসূলে হাদীসে তাঁর সমকক্ষ বাংলাদেশে কেউ ছিলেন বলে জানা যায় না। এটা একবার তাঁর প্রিয় উস্তাদ হযরত মাওলানা সুলতান যওক নাদভী রহ.কে সরাসরি মঞ্চে বলতে শুনেছি। একবার সম্মিলিত আলিমদের এক সফরে তিনি আমাকে গাড়িতে সামনের আসনে তাঁর সাথে বসার নির্দেশ দেন। যথাবিহীত হুকুম পালন করে আমি সংকোচে বসে পড়লাম। গাড়ি চলতে শুরু করলে আমি সুযোগ পেয়ে হযরতের কাছে জাল হাদীস সংক্রান্ত একটি গ্রন্থের অবতারণা করলাম। হযরত তখন হাদীসের উপর সহীহ, যয়ীফ, মাওযু ইত্যাদি হুকুম প্রয়োগের ধারা ও কৌশল নিয়ে বলা শুরু করলেন। তিনি একটি হাদীসের উপর তিন দল: মুতাশাদ্দিদীন, মু’তাদিলীন ও মুতাসাহিলীনের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গী, কৌশল ইত্যাদির অভিনব সমন্বয়মূলক বয়ান তুলে ধরে বলেন, সামান্য জেনে কোন হাদীসের উপর হুকুম লাগানো অন্যায়। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম কেবল। আজও সে-সব মুক্তাঝরা কথাগুলো আমার মনে পড়ে। তাই, হঠাৎ করে আগপাচ না ভেবে কোন হাদীসের বিষয়ে হুকুম জারির বর্তমান প্রবণতাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ভয় করি। তাই আমি বিশ্বাস করি, হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্যের এক মহান দিক হলো তিনি সব কিছু ছাপিয়ে আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ,’র সুযোগ্য ছাত্র হিসাবে উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত হাদীসবিশারদের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে পূর্ণতা পায়নি ভিন্ন এক কারণে। সে কথায় পরে আসছি।
হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর জীবনের এক কঠিন ও আলোচিত অধ্যায় হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব ও পরবর্তীতে আমীর হওয়া। বিষয়টিকে হযরতের শুভাকাঙ্খীরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। জানি না আমার মতো গোমূর্খের অবস্থানকে অন্যেরা সমর্থন করবেন কি না। হযরত প্রথম যখন হেফাজতের মহাসচিব হলেন আমার শঙ্কাটা জাগে তখনই। কেন জানি আমার বারবার মনে হতো, হযরত তাঁর চিরাচরিত চিন্তা ও গবেষণার পথ ছেড়ে ভিন্ন এক অপরিচিত পথে রওয়ানা হলেন। এ ধরনের কাজে অন্য কেউ আসতে পারতেন কিন্তু যিনি এ দুর্ভিক্ষের সময়ে উসূল ও ইলমে হাদীসের ঝাণ্ডা নিয়ে উপমহাদেশে দ্বিতীয় বিন্নূরী হবার কাছাকাছি যেতে পারতেন তিনি আজ হেফাজতে ইসলামের মতো একটি দলের নেতৃত্বে গিয়ে ভিন্ন এক পথে অগ্রসর হলেন। এখানে মোদ্দা কথায়, হযরত মাশহূর হলেন আবার বিতর্কিতও হলেন। যারা এক সময় এ মহান মুহাদ্দিসের জুতার পাশে বসার হিম্মাত পেতো না তারাও হযরতের পাশের চেয়ারে বসবার ধৃষ্টতা দেখাতে সক্ষম হলো। এ এক অবাক করা নিয়তি। কিন্তু আমরা হযরতের দ্বিতীয় বিন্নূরী হবার বিষয়টিকে এড়িয়ে গেলাম আমাদের চৈন্তিক গাফলতিতে। যুগসেরা হাদীস বিশারদের চেয়ে বেশি মূল্যায়িত করলাম তাঁকে হেফাজতের মহাসচিব ও আমীর হিসাবে। যুক্তি ছিলো, তিনি উপমহাদেশের হাদীসচর্চা ও হাদীসের আন্তর্জাতিকতায় অন্যতম সিপাহসালার হবেন কিন্তু আমরা আমাদের চিন্তার দীনতা-হীনতায় তাঁকে বানালাম—হেফাজত মহাসচিব বা আমীর। আমি তাঁর এ গতির পরিবর্তনকে পদোন্নতি নয়, পদাবনতি বলে মূল্যায়িত করতে চাই অন্তত একজন হাদীসবিশারদের তুলনায়। আমি বিশ্বাস করি, হেফাজত তাঁর অধীনে অনেক বৈপ্লবিক কাজ করেছে, সাথে এও বিশ্বাস করি: তার চেয়েও উপমহাদেশের উলূমুল হাদীসের আন্তর্জাতিকতায় তাঁর পদচারণা অব্যাহত থাকলে মুসলিমবিশ্ব অনেক উপকৃত হতো। এটাই অধীনের দুর্বল মূল্যায়ন। যাঁরা অধীনের মতো জাহিলের সাথে ভিন্নমত পোষণ করবেন তাঁদের কাছে করজোরে দুঃখ ও ক্ষমা চেয়ে এখানেই বিদায় চাইছি। তাম্মাৎ বিল খাইর।
11.09.2025

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন