বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৩

জিনিসের দাম বেশি: বললে কি ডিজিটালে মামলা খাব?

ভাবনা-৩৬

কিছু বলতে ডর লাগে। বুঝেন-ই তো, যদি বলার অপরাধে মামলা খাই? বাজারে গেলে কারও সাথে কিছু বলতে ডর লাগে। কে আবার কোন কথাকে কোথায় নিয়ে যায়, বলা তো যায় না! পত্রিকায় দেখি, অমুক গ্রেফতার ডিজিটাল আইনে। দোষটা কি? কি যেনো লিখেছে কে জানে? ওর আর রক্ষা নেই। তাই কিছু বলতে গেলে অদৃশ্য এক জালি যেনো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। মনে হয়, কারাগারে আছি। সঙ্গতকারণে, কিছু বলতে গিয়ে মুখ হটে আসে। এই যে লিখছি, বুকে অজানা ভয়; সংকোচ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন ভাবি: আমি স্বাধীন। আমার কথা, মতামত আমি বলতে পারবো নির্দ্বিধায়। এমন কল্পনা করতে মাঝেমাঝে কণ্ঠ শুকিয়ে যেতে চায়। পরিবার মানা করে কিছু লিখতে, বলতে অজানা বিপদের আশঙ্কায়। যারা সরকারের বলে জানি ওরা আপন হলেও, সংকোচ করি। মেপে-মেপে বলতে হয়। কোনটা যে সরকারের পক্ষে আর বিপক্ষে, বোঝা দায়। আবার কোন দোষ না করেও ভুগতে হয়। ফোন করে বলবে: আমি অমুক সংস্থা থেকে বলছি। আপনি কি করেন? ইত্যাদি। ডর লাগিয়ে দেয়া আর কি। সবসময় নিরাপত্তাহীনতা লাগে। সাদাপোষাকে কেউ এলো না তো! কলিং বেল বাজলে সবাই আঁতকে উঠি। দৌড়ে গিয়ে আগে খাপ দিয়ে দেখি। এসে যদি বলে: থানায় যেতে হবে। রক্তচাপের জন্য অষুধ খাই না; খাই টেনশন না হতে। রমজান এলো, কাল থেকে। গেলো বছরের মতো এ  বছর আর হয়ে উঠছে না। বুঝতে পারছেন না! মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মেছি, সে কি কম দোষের? কথায় বলে না, অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর। আগে মানুষজন সরকারকে দু’কথা বলে মন হালকা করার মওকা পেতো। এখন তাও খোলা নেই। বেপারীরা বলে, কিনছি বেশি দামে, কম দামে বেচবো কেমন করে? আমরা তো ছোট বেপারী। বড়োদের কেউ কিছু করে না। পরিষদ আছে, জনপ্রতিনিধি আছেকারও কাছে সান্ত্বনা নেই। ওরাও বা কি করবে? আমাদের না বলার আছে, না সওয়ার আছে। মাছের বাজার, গোশতের বাজারসে তো হিমালয় দেখা। কাপড় বলে ধুয়ে দাও আর পকেট বলে সয়ে নাও। গেলো বছর যা এনেছি দশ টাকায় সে এখন প্রমোশনে ত্রিশ টাকায়। বাক আমাদের তবুও স্বাধীন। বলতেই হবে। সেটা না বললে কি অমানুষ আর অকৃতজ্ঞ হবো না? ভাবছি, বাজারে যে দাম বেশিসে কথা বললে কি ডিজিটাল আইনে মামলা খাবো? বুঝতে পারছি না। দুরুদুরু বুকে লিখলাম দু’কলম।
২৩.০৩.২৩          

বুধবার, ২২ মার্চ, ২০২৩

হাফেজ্জী হুযুর রহ. ও মূলধারার ইসলামী রাজনীতি

ভাবনা-৩৫

প্রচলিত ইসলামী রাজনীতি এবং মূলধারার ইসলামী রাজনীতি নিয়ে পার্থক্যের দর্শন আমি অনুভব করি বেশ আগে থেকেই এর মূল কারণ, ৮০র দশকের প্রারম্ভে আমীরে শরীয়াত হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.-র নেতৃত্বে গঠিতবাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন’-এর সাথে আমার সম্পৃক্ততা হযরতের জীবদ্দশায় বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়নি কারণ, দুটো ভিন্নভিন্ন বিষয়ের অস্তিত্ব প্রকাশের আগে পার্থক্যের ধারণা করা অসম্ভব  যেমন, রাত বা দিন অস্তিত্ব লাভ করার পূর্বে রাত-দিনের ভিন্নতা নির্ণয় করা সম্ভব নয় এক-ই যুক্তিতে হযরত হাফেজ্জী হযুরের রাজনীতি বা অন্দোলনপরবর্তী ইসলামী রাজনীতির আকৃতি ও চরিত্র দর্শিত না হলে প্রচলিত ইসলামী রাজনীতি ও মূলধারার ইসলামী রাজনীতির পার্থক্য নির্ণয়ের ধারণার উম্মেষ হতো না যাঁরা সে-সময়ে খেলাফত আন্দোলনের চরিত্র ও আচরণ প্রত্যক্ষ করেননি, তাঁদের পক্ষে উক্ত তর্কের মর্ম উপলব্ধি করা দুষ্কর হবে ১৯৮১ সালের ১১ই নভেম্বর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত হাফেজ্জী হুযুরের রাজনীতিক প্রক্রিয়াগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে একজন সচেতন মানুষের যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা ইসলামী রাজনীতির মূলধারা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে হাফেজ্জী হুযুরের রাজনীতিক গতি-প্রকৃতিকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়: এক. আন্দোলন, দুই. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

হুযুরেরখেলাফত আন্দোলননামেই ছিলো ঐতিহাসিক এক সম্বন্ধ ও তাৎপর্য সচেতন পাঠকমাত্রেই জানেন, ইসলামের খেলাফত-ব্যবস্থা মুসলিম শাসন-ইতিহাসের সর্বোৎকৃষ্ঠ স্বর্ণযুগ সেই আবেগবাহিত এক আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯১৯ সালে ভারতে, তুরষ্কে উসমানীয় খেলাফত বহাল রাখার দাবিতে এ আন্দোলন চলে ১৯২৪ পর্যন্ত এরপর এক-ই নামে নতুন এক আন্দোলন গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশে হাফেজ্জী হুযুরের নেতৃত্বে স্বভাবতই, হাফেজ্জী হুযুরের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও উপমহাদেশবিখ্যাত ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে এমন আন্দোলনে দেশব্যাপী কৌতুহল ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়  এ আন্দোলন যে দ্বিমতে আক্রান্ত হয়নি তা নয় সবকিছুকে অতিক্রম করে খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসাবে তার নাম লেখাতে পেরেছেসেটা যেমন সমসাময়িক কালে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির উদাহরণ হিসাবে মানুষকে আকর্ষণ করে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মধ্যপন্থায় অবস্থান করে আত্মশুদ্ধিনির্ভর ও গঠনমূলক সংস্কারের পথ দেখায় বলাবাহুল্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে আলিম-সমাজের রাজনীতিক তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে বহুদলীয় রাজনীতি অনুমোদিত হলে ইসলামী রাজনীতির দ্বার উম্মোচিত হয় সেই ধারাবাহিকতায় মঞ্চে আসে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন তবে প্রকৃত বিচারে হাফেজ্জী হুযুরের জীবদ্দশায় খেলাফত আন্দোলন কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এগুলোই মূলত বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির এক ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায় ১৯৮১-তে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও মূলত হাফেজ্জী হুযুর রাষ্ট্রসংস্কারের চিন্তা করেন আরও আগে থেকে এর প্রমাণ মেলে ১৯৭৮ সালে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে বৈঠকে তিনি সংবিধানেবিসমিল্লাহির রহমানির রহীমযুক্ত করাসহ বিভিন্ন সংস্কারের জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের কিছু কর্তব্যের কথা তুলে ধরেন ঐ বছরের ২৯শে মে তাঁর মৌখিক বক্তব্যগুলো তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বরাবরে একটি একটি খোলা চিঠি হস্তান্তর করেন বাংলাদেশের কোন ইসলামী নেতার জন্য এ ছিলো ইতিহাসের প্রথম নযীর তাছাড়া, মন্ত্রী, প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কাছে হাফেজ্জী হুযুরের দাওয়াতী চিঠি দিয়ে খেলাফত আন্দোলনের কর্মসূচীর প্রতি সমর্থন চাওয়া হতো হযরতের জীবনের শেষ পর্যন্ত এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত ছিলো সরকারী-বেসরকারী উর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছানো হতো লিখিত দাওয়াত দেশব্যাপী দলের কর্মসূচীতে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা, থানা ও মাদরাসা সফর করে আন্দোলন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা ছিলো বিরামহীন ফলে, পুরো দেশে খেলাফত আন্দোলন নিয়ে অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় তৃণমূল থেকে উপরতলা অবধি সর্বক্ষেত্রে খেলাফত আন্দোলন ছিলো আলোচনার বিষয়

হাফেজ্জী হুযুরের আন্দোলনের বিস্ময়কর এক দিক ছিলোতাওবার রাজনীতি উপমহাদেশের রাজনীতিতে: সে ধর্মীয় হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ, এ ছিলো ব্যতিক্রম এবং অভিনব আমার আজও মনে পড়ছে, তাওবার রাজনীতি প্রশাসন, পুলিশ এমন কি সমাজের সর্বস্তরে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেঢাকা স্টেডিয়ামের লাগোয়া বাইতুল মুকাররমের দক্ষিণ ফটকে দ্বিতীয় তাওবা দিবসের (আনু:১৯৮৩) ইতিহাজ্জ্বোল মহাসমাবেশের কথা বিস্মৃত হবার নয়তখন এরশাদের আমল সেদিন মঞ্চের সামনাসামনি ছিলাম আমি হাফেজ্জী হুযুর যখন তাওবার মুনাজাতে হাত তুললেন, দুনিয়া যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলো সে এক হৃদয়বিদারী দৃশ্য! আলিম-উলামা, ছাত্র-জনতা, পুলিশের গগণবিদারী রোনাজারিতে ভেঙ্গে গেলো সব শৃঙ্খল মনে হচ্ছিলো, আসমানের ফরিশতারাও বুঝি নেমে এলো জমিনেসিলেটের প্রখ্যাত আলিম মাওলানা আব্দুল গাফফার সাহেব রহ. মতভিন্নতার কারণে ক্ষমা চেয়ে হযরতের দুপা জড়িয়ে যে ক্রন্দনবিজড়িত দৃশ্যের অবতারণা করেছিলেন, তা কখনও বিস্মৃত হবার নয়সর্বত্র হযরতের আহ্বান ছিলো: আমরা গুনাহগার; সকল অরাজকতা আমাদের গুনাহ কারণতাই, আসুন সকলে তাওবা করিহযরতের স্লোগান ছিলো: এক হও নেক হও; দুনিয়ার মুমিন এক হও নেক হওআত্মশুদ্ধির সাথেসাথে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের যে রাজনীতি বা আন্দোলনের দৃষ্টান্ত হযরত হাফেজ্জী হুযুর সৃষ্টি করেন, তা এককথায় অভূতপূর্বযতোদূর মনে পড়ে, তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং এরশাদের সাথে সাক্ষাতে বলেছিলেন, আপনারা ক্ষমতায় থাকুনআমি ক্ষমতা কেড়ে নিতে আসিনিকিন্তু আল্লাহর জমীনে আল্লাহর হুকুম কায়েম করুন

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হযরতের হাফেজ্জী হুযুরের অংশগ্রহণ ছিলো আরেক ইতিহাসবাংলাদেশের কোন ইসলামী নেতার এমন পদক্ষেপ আর দেখা যায়নিপ্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮১ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনতাঁর প্রতীক ছিলো, বট গাছ নির্বাচনে তিনি তৃতীয় স্থান লাভ করেন বটে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত ভোটের সংখ্যাধিক্যে হযরত হাফেজ্জী হুযুর আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেনতিনি উক্ত নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেনএরপর আসে ১৯৮৬ সালএবারও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারী হিসাবমতে ১৫ লক্ষ ১০ হাজার ৫৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেনশতকরা হিসাবে তাঁর ভোটের হার ছিলো .৬৯ শতাংশতবে জনশ্রুতি ছিলো, আসলে হাফেজ্জী হুযুর সর্বাধিক ভোট অর্জন করেন কিন্তু কারচুপি করে তাঁকে দ্বিতীয় স্থান দেখানো হয়দু’-দুটো  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কেউকেউ এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হুযুরকে দিয়ে দেশ চালানোর সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেনএখানে বিষয়টি পরিস্কার হওয়া প্রয়োজনহযরতের রাজনীতির আগাগোড়া পর্যবেক্ষণে কখনও মনে হয়নি তিনি নিছক ক্ষমতামুখী রাজনীতি করেছেনতার রাজনীতি ছিলো মূলত ইসলামের নির্দেশিত পথে ব্যক্তি, সমাজ রাষ্ট্রসংস্কারদল গঠন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণে তিনি যা চেয়েছিলেন, তা হলো: . আলিম-সমাজকে কেবল মাদরাসাকেন্দ্রিক না রেখে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে জাতীয় উন্নয়নে শরীক করা, . জাতীয়ভাবে আলিম-উলামার প্রভাব সৃষ্টি এবং দেশের নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা এবং . দেশে নির্ভেজাল ইসলামী রাজনীতি ও নেতৃত্ব সৃষ্টিযেহেতু দেশে তৎকালীন সময়ে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনব্যবস্থা চালু ছিলো, তাই কোন প্রকার অরাজকতা সৃষ্টি না করে উক্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে যতোদূর সম্ভব সংস্কার-আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং জনসাধারণকে ইসলামের নির্দেশআমর বিল মারূফ নাহী আনিল মুনকার”(সৎকাজের আদেশ অসৎকাজের নিষেধ)- সাথে পরিচিত করে তোলা ছিলো হাফেজ্জী হুযুরের রাজনীতিক কৌশল বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করতে না পারলে হাফেজ্জী হযুরের রাজনীতির মূল্যায়ন সমূহকঠিন হবেরাজনৈতিক দল গঠন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি ঘরমুখো আলিম-সমাজকে যেভাবে সচেতন উজ্জীবিত করে গেছেন, তার প্রভাব আজও বহমান

এভাবেই দেশে কিছু সময়ের জন্য হলেও মূলধারার ইসলামী রাজনীতি দৃশ্যপটে হাজির হয় হযরত হাফেজ্জী হুযুরের নেতৃত্বেমূলত হুযুরের রাজনীতিক পদ্ধতিই মূলধারাইসলামী রাজনীতিএটা কেউ অস্বীকার করতে পারেন নাপ্রশ্ন করতে পারেন, মূলধারার রাজনীতির মাপকাঠি কি? আমাদের জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূলধারার রাজনীতির মাপকাঠি হলো, পঞ্চদশ শতকে শেখ আহমদ সিরহিন্দী মুজাদ্দিদ আলফে সানী রহ. বাদশাহ আকবরের দ্বীনে ইলাহীর মুকাবিলায় যে রাজনীতিক পদ্ধতি অনুসরণ করেনইতিহাসের অকাট্য গ্রন্থগুলো দেখুন, দেখবেন মুজাদ্দিদ আলফে সানীর গৃহীত পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.মুজাদ্দিদ সাহেব যেভাবে সরাসরি বাদশাহকে দাওয়াত দেন, তাঁর আমীর ওমারাকে চিঠি দিয়ে ইসলামের মূলধারায় ফিরে আসার আহ্বান জানান, হযরত হাফেজ্জী হুযুরও সেভাবে দাওয়াত পৌছে দেনমুজাদ্দিদ সাহেব মূলত রাসূলুল্লাহ সা.- অনুসৃত পথেই তাঁর কর্মসূচী এগিয়ে নেনআমার মনে হয়, আজও মার-মার, কাট-কাটধর্মী নেতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তে হাফেজ্জী হুযুরের অনুসৃত মূলধারার রাজনীতি আমাদেরকে পথ দেখাবেআন্দোলনের পাশাপাশি আমাদেরকে এও বুঝতে হবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাইরের শত্রুকে নিমন্ত্রণ করে এবং আমাদের শক্তিকে নেতিবাচক পথে ক্ষয় করে দুর্বল করে দেয়সঙ্গতকারণে, বলতে হয়, হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ. যে মূলধারার ইসলামী রাজনীতির উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন, সেটাকে সঠিক মূল্যয়ন করা প্রয়োজনঅন্যথায়, বিপদ আমাদের পদেপদে সঙ্গী হবে।

২২.০৩.২৩

সোমবার, ২০ মার্চ, ২০২৩

ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও আমরা

ভাবনা-৩৪

গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিশ্বে এখন বহুল পরিচিত ও প্রচলিত একটি পরিভাষা বা মতবাদ মুসলিমদের সচেতন অংশ বিলক্ষণ জানেন, কুরআনের আয়াতের অর্থ, উদ্দেশ্য ও ভাব বুঝতে প্রেক্ষাপট জানা জরুরী যাশানে নুযূলহিসাবে পরিচিত বিনা শানে নুযূলে অর্থ ও উদ্দেশ্য জানা সম্ভব নয় তেমনি প্রচলিত পরিভাষা বা মতবাদের উদ্দেশ্য বুঝতে সেগুলোরও শানে নুযূল জানা অপরিহার্য এতে করে মূল সমস্যা, সমস্যার সমাধানকল্পে প্রদর্শিত প্রতিক্রিয়া এবং প্রভাব জানা সহজ হয় আমাদের এখানে কথায়-কথায় গণতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা যারা বলেন, সম্ভবত তারা জানেন না অথবা পড়ে দেখেননি গণতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার সৃষ্টিকারণযাকে বলছি, শানে নুযূল এর ওপর একেকজনের একেক সংজ্ঞা কেউ বলেছেন, অমুক এটা বলেছেন, তমুক ওটা বলেছেন ইত্যাদি ইতিহাসূত্রে জানা যায়, মধ্যযুগে পাশ্চাত্যে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় খ্রীষ্টান চার্চের কর্তৃত্বপরায়নতার সাথে রাজার দ্বন্দ্ব এবং এর  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সরূপ গড়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা বিশেষত প্রাচীন গ্রীস এ ধারণার জন্মক্ষেত্র বলে পরিচিত সে-সময় ইতালীর দার্শনিক নিকোলো মেকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) মধ্যযুগীয় খ্রীষ্টীয় প্রভাব থেকে জাগতিক জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে ধর্মের উর্ধ্বে স্থান দিয়ে একটি জাতিরাষ্ট্রের ধারণা প্রদান করেন বিগত একশো বছর ধরে রোমান ধর্মগুরু ও পোপদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা থেকেই মূলত মার্টিন লুথারের (১৪৮৩-১৫৪৬) প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে এগুলো ছিলো তৎকালীন খ্রীষ্টান-সমাজের নিজস্ব সমস্যা এর মূলে ছিলো, চার্চের কর্তৃত্বপরায়নতা থেকে সাধারণ প্রশাসনকে রক্ষা এবং খ্রীষ্টধর্মকে সংস্কার করার আকাঙ্খা এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নির্মল কুমার সেন বলছেন, পোপ শাসিত রোমান ক্যাথলিক ধর্মপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধর্ম সংস্কার অন্দোলনের সূচনা হয় জার্মানীতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে সামন্ততন্ত্রের অবসানকল্পে এটাই ছিলো বুর্জোয়াদের প্রথম সংগ্রাম লুথার ছিলেন জার্মানীর উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপক আবাল্য খ্রীষ্টান ধর্মের প্রতি অনুরাগী লুথারের কাছে পোপের কার্যকলাপ শাস্ত্রবিরোধী বলে মনে হয়েছিল পাপ মোছনের জন্য পোপের অনুচরদের ক্ষমাপত্র বিক্রয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে পোপ এবং ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে লুথারের বিদ্রোহের সূচনা”(রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস পৃ:৬০, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮৬, পশ্চিবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলিকাতা) এভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনায় চার্চের কর্তৃত্ব নির্মূলে আন্দোলন চূড়ান্তরূপ পরিগ্রহ করে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা  হয় এ পথ ধরে আসে প্রচলিত গণতন্ত্রের ধারণা গণতন্ত্রের মূল প্রবক্তাদের মধ্যে যাকে প্রধান ভাবা হয়, ‍তিনিভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮) তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম যার-যার ব্যক্তিগত; শাসনে এর কোন অধিকার থাকতে পারে না গণতন্ত্রের আরও দুজন প্রবক্তা হলেন: মোন্টেসক্যু (Montesqiue) ও রুশো (Rousseau) এ তিন দার্শনিকই ছিলেন ফরাসী পাকিস্তান শরীয়া আদালতের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক ও প্রখ্যাত ফকীহ মুফতী তাকী উসমানী ভেলতেয়ারের দর্শন নিয়ে লিখছেন,ভলতেয়ারের মতাদর্শের আরেকটি কথা, যেটা সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তা হচ্ছে এই যে, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত একটি বিষয় এবং এমন কোন অথরিটি নেই, যা কাউকে অপরের ধর্ম সম্পর্কে সঠিক বা ভুল সাব্যস্ত করার প্রবক্তা করে তুলতে পারে। বরং এটা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার মানুষ ইচ্ছা করলে মূর্তিপুজা করতে পারে; ইচ্ছা করলে কোন ঐশী-ধর্ম গ্রহণ করতে পারে; ইচ্ছা করলে ইহুদী বা খ্রীষ্টান হতে পারে। এটা নিছক তার নিজের বিষয় এখানে চার্চেরও হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই; সরকার তথা রাষ্ট্রেরও হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই হকুমতের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই” (ইসলাম ও রাজনীতি পৃ: ১০১, ১ম প্রকাশ ২০১৫, মাকতাবাতুল হেরা ঢাকা) অপর দার্শনিক রুশো সামাজিক সন্ধির (১৭৬২) ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, স্বাধীন এবং মুক্ত মানুষের পারস্পরিক চুক্তিই রাষ্ট্রনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি তাঁর এ মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লব সংঘটিত হয় এই তত্ত্বকে সম্বল করে ১৮৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলবাণী বলে খ্যাতজনগণের সরকার, জনগণের কর্তৃক এবং জনগণের জন্যপ্রচার করেন এভাবেই আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বে কথিত গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি (এখানে Demos থেকে এসেছে জনগণ এবং Kratos থেকে এসেছে ক্ষমতা বা শাসন) প্রচলিত রয়েছে সবকিছু পর্যালোচনা করে বলা যায়, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্র এক অপরের পরিপূরকও রক্ষক  তাহলে বোঝা গেলো, যেসব সমস্যার কারণে পাশ্চাত্যে ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতন্ত্র এসেছে, সেসব একান্তই তাদের সমস্যা, অন্যদের নয়। কিন্তু আজ অষুধ খেতে হচ্ছে পৃথিবীর তাবৎ বাসিন্দার। আমরা যখন বলি, বিদেশী হস্তক্ষেপ কাম্য নয়, প্রশ্ন করি: ধর্মনিরপেক্ষতা আর কথিত গণতন্ত্র তো বাইরের সমস্যাজনিত ফল, আমরা কেন প্রয়োগ করছি? বিদেশী হস্তক্ষেপ তো এগুলোর মধ্য দিয়ে আসছে। যারা ওগুলোর জন্ম দিয়েছে, প্রচার চালাচ্ছে, তারা তো বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেয়। তখন কি সাম্প্রদায়িকতা হয় না? সেখানেও তো সংখ্যালঘু আছে। তাহলে আমরা কেন কুরআন ছুঁয়ে বা সামনে রেখে বা আল্লাহর নামে শপথ নিতে পারি না? আসলে মানসিকভাবে আমরা আজও ওদের গোলাম। স্বাধীনভাবে কথা বলার বা কাজ করার অধিকার তো আমাদের শাসক ও রাজনৈতিকেরা আগেই বিলিয়ে বসে আছেন। য়ূরোপে এখন খ্রীষ্টধর্মীয় রাজনৈতিক দল শক্তিশালী হয়েছে। ওখানে মৌলবাদী বলা হয় না কেন? ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতায়, ওদেরকে সাম্প্রদায়িক বলা হয় না কেন? দোষ কি শুধু আমাদের ইসলামী রাজনীতি নিয়ে? এখানে ইসলাম নিয়ে কথা বললে স্বাধীনতাবিরোধী হয়। তাহলে ভোটের আগে টুপি মাথায় দিয়ে মুমিন সাজার কসরত কেন? এগুলো কি ধাপ্পাবাজি নয়? আমাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে আমাদের ধর্মীয় ও জাতীয় মূল্যবোধ দিয়ে। বিদেশী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে নয়।

২০.০৩.২৩ 

শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০২৩

নজরুল: সাহিত্যকে যিনি দিয়েছেন প্রাণ

ভাবনা-৩৩

বিদ্রোহী কবি; জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কলমের দ্রোহ যেনো পৃথিবীর বুকে এক বিস্ময়। নজরুলের জন্ম না হলে, বাংলা সাহিত্য কোন দিন যৌবন খুঁজে পেতো না। বৃদ্ধের মতো ন্যুব্জ হয়ে চলা বাংলা সাহিত্যকে নজরুল যে অমৃতরস পানে যৌবনত্ব দিয়ে গেছেনসে কাজ অন্য কেউ করে যেতে পারেননি। আমি সাহিত্যিক নই, সাহিত্যের খানিক খুশবু শুঁকেছি মাত্র। তাই নজরুল নিয়ে কথা বলার অধিকার কতোটুকু আছেসে প্রশ্নবানে আমাকে জর্জরিত করার মওকা সবার থাকলো। বাল্যে নজরুলের ছড়া-কবিতা পড়েছি বাল্যশিক্ষার দিনে। তখন নজরুলের পাশাপাশি কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, কাজী কাদের নেওয়াজ, কবি বন্দে আলী মিয়া, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি জসিম উদ্দিন, বেগম সুফিয়া কামাল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমূখের কবিতা পড়েছি। এখনকার মতো মাজাভাঙ্গা কবিদের কবিতা পড়তে হয়নি কপালগুণে। কবি নজরুল ইসলাম অমূল্য যে তিন রত্ন দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ঋণী করে গেছেন সেগুলো এক. সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুই. বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের কথা, তিন. বিদেশী বিশেষত আরবী-ফারসী শব্দের উদার ব্যবহার। সত্যি কথা বলতে কি, নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক প্রবল ভূমিকম্প, যার আঘাতে অসমতল বন-জঙ্গল মাটিতে মিশে গিযে জন্ম নেয় সবুজ প্রকৃতি। নেমে আসে দমকা হাওয়া। রসহীন নিছক প্রেম-কাহিনীর বেড়াজালে আবদ্ধ বাংলা সাহিত্যকে তিনি দিলেন নতুন অভাবনীয় এক অমৃতরসযৌবনের ঝঞ্ঝা; চির উন্নত শিরের উদাত্ত আহ্বান আর বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের কথাযা আগে ভাবাও যেতো না। নজরুল শুধু যে সাহিত্যকে দিয়েছেন, তা নয়। নজরুল মানুষকে দিয়েছেন আত্মাধিকারের জন্য নিবেদিত হবার শিক্ষা; বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালানোর দীক্ষা। “তুমি রবে তেতলার ‘পরে আমি রবো নিচে, তবুও তোমারে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে।”এমন হুংকার সাহিত্যের দহলিজ থেকে কে দিয়েছে শুনি? “বল বীর বল উন্নত মম শির!” বলে যে বজ্রনিনাদ নজরুলকণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে আজও হৃদয়ের দেয়ালে-দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়, তাই তো আমাদের বাংলা-সাহিত্যের অদমনীয় অহংকার। তাঁর ছন্দমালা, শব্দচয়নসব কিছুতে নতুন অভ্যুদয় জ্বলেপুড়ে ছাই করে দিয়েছে গতানুগতিক সাহিত্যপ্রথাকে। নজরুল শিখিয়েছেন মুসলিম সাহিত্যসত্ত্বার মধ্য দিয়ে কেমন করে ইসলামের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিতে হয়। ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি তার উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। বলা চলে, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যসত্ত্বার যে অবহেলিত হাল বিরাজমান ছিলো, সেখানে নজরুল এনেছেন প্রলয়ঙ্কর ইনকিলাব। যে বাংলা সাহিত্যকে একদিন সংস্কৃতপন্থীরা অবজ্ঞা করে দূরে সরিযে রেখেছিলো, সেই বাংলা সাহিত্য নজরুলের সংস্পর্শে পেলো নতুন জীবন। এক কথায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যকে রেখে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যা কখনও এড়িয়ে যাবে না। আল্লাহ কবিকে মাগফিরাত দান করুন।

১৭.০৩.২৩            

বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৩

আমরা কেন সেক্যুলার হবো?

ভাবনা-৩২

একশ্রেণীর কথিত বুদ্ধিজীবি ক্রমাগত বলে আসছেন, বাংলাদেশ নাকি ধর্মনিরপেক্ষ। তাদের কথায় দেশ যদি ধর্মনিরপেক্ষ হয়, মানুষগুলো কি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর কি তারা দিতে পেরেছেন? ওনারা বলেন, সংবিধানে লেখা আছে। ঠিক আছে, লেখায় যদি সব হয়, তবে কেন ওনারা কথায়-কথায় তুলনা দেন: গোয়ালার গরু গোয়ালে নেই, খাতায় আছে?  প্রশ্ন করতে পারি, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কি? এর চরিত্রই বা কি? তখন ওনারা বলে উঠেন: ধর্মনিরপেক্ষতার এই মানে, সেই অর্থ ইত্যাদি। বাংলাদেশের এক স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অন্যতম উপদেষ্টা প্রয়াত আকবর আলি খান লিখেছেন, “বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ইংলিশ-বাংলা অভিধান অনুসারে ইংরেজি সেক্যুলারিজম শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘নৈতিকতা ও শিক্ষা ধর্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিৎ নয়, এই মতবাদ; ইহজাগতিকতা; ইহবাদ। ’গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বারো অনুচ্ছেদে সেক্যুলারিজমের অনুবাদ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। কোন অনুবাদ সঠিক? দুটোই ঠিক। ইংরেজি সেক্যুলারিজম শব্দটির দুটো অভিধা রয়েছে। সেক্যুলারিজম শব্দটি একটি জীবনদর্শন, আবার এটি একটি শাসনতান্ত্রিক মতবাদও বটে।”(অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি পৃ: ৮৯, দ্বিতীয় সংস্করণ: ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।)  তিনি আরও লিখছেন, “তবে শাসনতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতা ইহবাদের চেয়েও পুরোনো মতবাদ। রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে শাসকদের ক্ষমতার লড়াইয়ে এই মতবাদ বিকশিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজন এ জন্য যাতে এক ধর্ম অন্য ধর্মের ওপর প্রধান্য লাভ না করে। কিন্তু ইউরোপে সবাই ছিলো খ্রিষ্টান। ঝগড়াটা এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের ছিলো না; ঝগড়া ছিলো খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন উপদল বা সিলসিলার মধ্যে। ঝগড়া শুধু শাসনতান্ত্রিক ছিলো না; লড়াইটি ছিলো মূলত বৈষয়িক।ক্যাথলিক গির্জা ছিলো বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক। ধর্মনিরপেক্ষতার মতবাদ গড়ে ওঠে রাষ্ট্র কর্তৃক গির্জার সম্পত্তি দখল নিয়ে।”(সূত্র: ঐ) এবার বলুন, মূল সমস্যা কোথায়?  এক ঘরে ঝগড়া হলো, তাই সব ঘরে সালিস করতে হবে কোন যুক্তিতে? ঝগড়া হলো খ্রিষ্টান রাজ্যে; বিষয় হলো সম্পত্তির দখল অথচ সে ঝগড়ার বাগড়া দেয়া হচ্ছে অন্যঘরেএ আবার কোন হিসাব? ইতিহাসে দেখা যায়, চতুর্দশ শতাব্দীতে পোপ-শাসিত রোমান ক্যাথলিক ধর্ম-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জার্মান উইটেনবাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপক মার্টিন লুথারের (১৪৮৩-১৫৪৬) সংস্কার-আন্দোলন ছিলো মূলত গীর্জার আধিপত্যরোধের আন্দোলন। এখান থেকেই য়ুরোপে রাষ্ট্র এবং গীর্জার পৃথকীকরণের ধারণা আসে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধর্মহীন করার দাবি ওঠে। ফলে জন্ম নেয় নিখাদ ইহজাগতিক ধারণাধর্মনিরপেক্ষতা, যা একান্তই য়ুরোপের। আকবর আলী খানের লেখা থেকে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার মূলরস কিন্তু ইহজাগতিকতা। এখানে বিচার হবে সামগ্রিক দৃষ্টিতে অর্থাৎ ইহলৌকিক ও পারলৌকিক চিন্তায় নয়, আংশিক ইহজাগতিকতার ভিত্তিতে। জনাব খানের কথায় আরও স্পষ্ট যে, সেক্যুলারিজম একটি জীবনদর্শন। অর্থাৎ, য়ুরোপের সমস্যাহেতু যে ধর্মনিরপেক্ষতা জীবনদর্শন হিসাবে বিবেচিত হবে, সেটা অন্যস্থানেও; অন্যধর্মাঞ্চলেও  প্রযুক্ত হবে। এখানেই আমাদের মূল আপত্তি। য়ুরোপ ধর্মনিরপেক্ষতাকে জীবনদর্শন মেনে যদি রাষ্ট্রনীতি গড়তে পারে তাহলে আমরা কেন ইসলামকে জীবনদর্শন মেনে রাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করতে পারবো না? এখানে আপত্তি তাদের, যারা ইসলামকে পূর্নাঙ্গ জীবনবিধান হিসাবে মানতে নারাজ। এ-ছাড়া, সেক্যুলারিজম মানে যদি এই হয়, কোন ধর্মকে অন্য ধর্মের উপর প্রাধান্য দিতে অস্বীকার করা, তবে তাও কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশ্বাসগতভাবে মানতে পারে না। কারণ, পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে

 (سورة فتح)هو الذي أرسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا

(তিনিই তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে একে অন্য সমস্ত ধর্মের উপর জয়যুক্ত করেন। সত্য প্রতিষ্ঠাতারূপে আল্লাহ যথেষ্ট।)

সুতরাং একজন মুসলমান একান্ত বিশ্বাসগতভাবে যেমন ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দর্শনকে জীবনদর্শন হিসাবে মানতে পারেন না তেমনি অন্যান্য ধর্মের তুলনায় ইসলামকে শ্রেষ্ঠ ও সত্য বিশ্বাস করতে বাধ্য। এর অন্যথা হলে, সে ইহজাগতিকতার ‍যুক্তিতে হোক বা অন্য কোন অজুহাতে হোক তার ঈমান বহাল থাকবে না। কারণ, কুরআনের স্পষ্ট সিদ্ধান্তের বাইরে যাবার কোন সুযোগ মুসলমানের জন্য রাখা হয়নি। সেদিক থেকে রাষ্ট্রনীতি বা জীবনদর্শন হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণের সুযোগ নেই। তবে হ্যা, অমুসলিমদের অধিকার রক্ষা ও প্রদানে ইসলাম যে নির্দেশনা দিয়েছে তাও মুসলিম সমাজ মানতে বাধ্য। সঙ্গতকারণে, বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ যেখানে ৯১ শতাংশ মুসলিম বাস করে, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে আমরা সেক্যুলার হতে পারি না বা তাকে জীবনদর্শন ও রাষ্ট্রনীতি হিসাবে গ্রহণও করতে পারি না।

১৬.০৩.২৩ 

Featured Post

১১ দল ও ৭ দলের যোগবিয়োগ

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮১  গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ১১ দলের শরীক ৭টি কওমী দলের আলাদা জোটের ভবিষ্...