রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ঢাকসু ও জাকসু’র ফলাফল কী বার্তা দেয়?

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭২ 

সুদূর বা অদূর অতীতে ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংসদ নির্বাচন নিয়ে এতোটা আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই কিন্তু সম্প্রতি ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র-সংসদের নির্বাচন নিয়ে যা হলো, মনে হলো জাতীয় নির্বাচন বুঝি হয়ে গেলো। আমি রাজনীতিবিদ নই, কোন সংগঠনের শীর্ষপদীও নই। তাই যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া সহজও নয়। তবুও যতোটুকু জানশোনা আছে; দুর্বল মস্তিষ্কে যা ধারণ করি সেটাকেই অবলম্বন করে দুকথা লিখছি। কেন এমন হলো? কেন ঢাবির নির্বাচন এতো মাত্রা পেলো? কেমন করে দাঁড়িয়ে গেলো এমন ফলাফল? এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন আমার মতো অনেকেই। বিশেষত জুলাই-আগস্ট বিপ্লবপরবর্তী সময়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা থেকে যে নতুন দিনের প্রত্যাশায় জাতি বুক বাঁধলোসে প্রত্যাশার নিরিখে চমকে উঠলাম ঢাবির ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেখে। অবশ্য এমন হবার নিশ্চয়তা না থাকলেও আশঙ্কা ছিলো বিশেষ কিছু কারণে।

দীর্ঘ সতের বছরব্যাপী ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির তল্পিবাহক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দখলদারিত্বের যুগটি ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় কলঙ্কিত অধ্যায়। ছাত্র-জনতা ও কওমীদের সমন্বিত বিপ্লবহেতু ফ্যাসিবাদের উৎখাত না হলে আজও আমরা ভারতীয় উপনিবেশে বন্দী হয়ে থাকতাম। তখন আর ঢাকসু, চাকসু, জাকসু ইত্যাদির টুল-বেঞ্চে বসার সুযোগও হতো না। জাতির অনেক কৃতিসন্তানদেরও ঘরে ফেরা হতো না দেশের জন্য কিছু করতে। আজ আমরা স্বাধীন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত। তাই, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবং সর্বাত্মক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে পারলো ঢাকসু-জাকসু’র মতো নির্বাচন। এ কথা মনে রেখেই তুলছি ফলাফলের প্রশ্ন। বলাবাহুল্য, সতের বছরের ফ্যাসিবাদের সময় জাতি উৎকণ্ঠিত হয় অর্জিত অনেক কিছু বিসর্জনের ভয়ে। এ বিসর্জনের ভয় যেমন ছিলো, স্বাধীনতা-অখণ্ডতার; ’৭১-এ বাংলাদেশের অর্জিত ভূমি হারাবার; ভারতীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার; ইসলামী প্রভাব হ্রাসের তেমনি সর্বোপরি জাতি হিসাবে আত্মমর্যাদাশীল ও স্বাধীন সত্ত্বা হারাবার। জাতি বারবার দেখেছে, যখন-ই এ দেশে বিপদের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন না কোন ফয়সালা নেমে আসে। ’৭৫ ও ’২৫ তার স্পষ্ট প্রমাণ। বলা দরকার, ফ্যাসিবাদে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ যখন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকে: এ ফিরাউনের কি পতন হবে না? তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের জনমানুষের স্বীকৃত আশ্রয়স্থল বলে পরিচিত শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাতীয়বাদী দল ক্ষমতামুখী হয়ে গোপনে ভারতের সহানুভুতি অর্জন করার দিকে মনোনিবেশ করে। ভারতের কট্টর সাম্প্রদায়িক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে আমীর খসরু মাহমুদের লজ্জাষ্কর ছবি পুরো জাতিকে লজ্জিত করে তোলে। ভারত সফরে গিয়ে মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শরীয়ত অস্বীকারের ঘোষণায় আমরা স্তম্ভিত হইদেশের সর্ববৃহৎ দলকে নেতৃত্ব দেয়া একজন শিক্ষিত মানুষ যখন ভারতে গিয়ে ক্ষমতার স্বার্থে নিজের ধর্মকে অস্বীকার করে বক্তব্য দেয় তখন আমাদের আদর্শিক জায়গাটা ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হবার জোগাড়এটা এমন একটা পরিস্থিতি যখন মানুষ নদীভাঙ্গনের তীব্র হানায় নতুন ভিটার সন্ধানে বের হয়।


ঢাকা ভার্সিটির সাম্প্রতিক নৈর্বাচনিক ফলাফল দেশপ্রেমী শিক্ষার্থীদের মানসে ঠিক তেমনই নতুন ভিটের সন্ধানের মতো এক অভাবনীয় বিবর্তন চলে আসে। সেখানে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের ছাত্র-সংগঠন ছাত্র লীগের অনুপস্থিতি বিএনপি’র ছাত্রদলের জন্য এক মহাসুযোগ হিসাবে দেখা দেয়। এমন কি বড়দের মধ্যেও সে স্বপ্ন গেড়ে বসে। বড়রা ভাবে, হাতের মোয়া বুঝি মুখের কাছেই। তারা ভাবেননি, আবেগের যুগ পেরিয়ে একটি বিপ্লবোত্তর মানসিকতার ধারক হিসাবে সচেতন ছাত্র-সমাজ আদর্শিক জায়গাকে অক্ষত রেখে ব্যালট-বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। এ ছিলো অনেকটা কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ের মতো ঘটনা। কচ্ছপ যে পৌঁছে গেছে সে খবর খরগোশ পেয়েছে সুখনিদ্রা ভাঙ্গার পর। তখন তো আর কিছুই করার ছিলো না। বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অসংখ্য সতর্কতার তোয়াক্কা না করে যেভাবে একগুয়েমি করে জাতি-রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তা ছিলো এক কথায় চরম আত্মঘাতী। তারা ভেবেছিলো, ছাত্ররা আর যাবে কোথায়? এর মোক্ষম জবাব শিক্ষার্থীরা মাঠেই দিয়ে দেখিয়েছে। যে শিবিরকে তারা গণনাতেই রাখেনি, ছাত্র-সমাজ তাদের নিরাপত্তার জায়গা থেকে ছাত্রদলকে এড়িয়ে শিবিরের পাল্লাতে ভোটগুলো রেখে দেয়।

তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আদর্শের কারণে বা শিবিরের রাজনীতি পছন্দ করে নয়, তারা ভোট দিয়েছে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশেষ করে, ছাত্রী ভোটাদের বিপুলভাবে শিবিরের বাক্সে রায় দেয়া তরুণ-সমাজের এক নতুন দিককে উম্মোচিত করেছে। সাথেসাথে তারা কিন্তু এও স্পষ্ট করেছে: তাদের এ রায় শিবিরের রাজনীতি ও আদর্শকে পছন্দ করে নয় বরঞ্চ নারী-নিরাপত্তার খাতিরে। এখানে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাই। তা হলো, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দখলদারিত্ব, অনৈতিকতাহেতু নিরাপত্তার অভাব, কুৎসিত দলীয় রাজনীতির দুর্গন্ধ ইত্যাদি থেকে বাঁচার আকুতি, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে যা প্রকটভাবে দেখা দেয়। পাশাপাশি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ধর্মীয় গরজের অনুভব উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা দেয়। বিশেষ করে তাঁদের হিজাব ও পর্দা বিষয়ে সচেতনতা এক ব্যতিক্রমধর্মী দিগন্তকে উম্মোচিত করে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তরুণ ছাত্র-সমাজ ছাত্রদলের মতো কথিত মধ্যপন্থী দলকেও রায় দিতে রাজি হয়নি।  


আমার উপরোক্ত বক্তব্যের প্রমাণ হলো, ঢাকসু’র অব্যবহিত পরে জাকসু’র নির্বাচনের ফলাফল। সেখানে কিন্তু অধিকাংশ পদে ছাত্র শিবির সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হলেও ভিপি পদে ছাত্র শিবির জয়ী হতে পারেনি। সেখানে রায় দেয়া হয়ে হয়েছে এক স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদকে যিনি শিবিরের প্রার্থীকে প্রায় হাজার খানিক ভোটে পরাজিত করে ভিপি হয়েছেন। অর্থাৎ, ডাকসুতে যেখানে শিবিরকে এগিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে শিবিরকে পেছনে ফেলে জাকসুতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে এগিয়ে আনা হয়েছে। এটিকে একটি Balance of activity বা সক্রিয়তার ভারসাম্য হিসাবে দেখা যেতে পারে। এখানে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে কিন্তু শিবির। কারণ, শিবির জানে ভার্সিটিগুলোতে তারা যে ভোট পেয়েছে আসলে তাদের সে ভোট বা অনুসারী নেই। এখন তারা যদি নিজেদের সর্বাংশে বিজয়ী মনে করে তাদের সনাতনী রাজনীতিতে মগ্ন হয় বা আদর্শ প্রচার করে তবে দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে এক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। তাই, তাদেরকে উভয়দিক সামলে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখী হতে হবে। হ্যা, তারা যদি কৌশলগতভাবে জামায়াতের প্রভাব এড়িয়ে তাদের আদর্শ বা সনাতনী রাজনীতি পরিহার করে ছাত্র-সমাজের চাওয়া-পাওয়ার সমস্যার সমাধানের দিকে নযর দিতে পারে তবে তারা নিরাপদ থাকতে পারবে বলে মনে হয়।

পরিশেষে বলতে হয়, এখানে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কাজ করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিক দলগুলো যদি এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পথ চলতে না পারে তা হলে তারা কখনো তাদের সনাতনী গলাবাজি করে রক্ষা পাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব সর্বোপরি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিস্কার করতে না পারলে জাতীয় পর্যায়েও তাদের হোঁচট খেতে হতে পারে। বিশেষত ভারতপন্থী মানসিকতাকে পরিহার করতেই হবে। অন্যথায়, ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কথিত ডানপন্থী বলে পরিচিত বিএনপিকে ছাত্র-সমাজের প্রত্যাখ্যানের নযীর জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। আমি বলছি না, জাতীয় পর্যায়ে জামায়াত জয়ী হবে। কিন্তু জয়ী না হলেও তাদের অর্জিত ভোটের হার তো বাড়তে পারে। এটাকে অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে বিএনপি’র মতো দলগুলোকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবার সুযোগও কিন্তু জনগণ দেবে না। জনগণ হয় তো ‘না’ ভোটে যাবে অন্যথায় ডান-বাম বাদে অন্যকে কাছে টানবে। তবুও ভারতীয় আধিপত্যবাদপ্রশ্নে কোন ছাড় দেবে না। এখন প্রমাণ হয়েছে, তারেক, ফজলু, ফখরুল, আব্বাস, সালাহুদ্দীন, খসরুদের ছাত্র-সমাজ আর চায় না। তারা চায় একদল বাংলাদেশপ্রেমিক সৈনিককে যারা অতীতের কোন দাগ ছাড়াই জাতির আকাঙ্খাকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে।

14.09.2025  

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. ও একটি সত্ত্বাগত মূল্যায়ন

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৭১ 

আমাদের দেশে জীবনী লেখা হয়, সমালোচনা লেখা হয় কিন্তু ব্যক্তির সত্ত্বাগত মূল্যায়নের চিত্র খুব কম দৃশ্যমান হয় এর মূল কারণ, সমালোচনা বা মূল্যায়নের (تقييم) ক্ষেত্রকে ফরখ করার ব্যর্থতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত যে মাপকাঠি বা সূত্র ব্যবহার করি, সেটি স্পষ্ট নয় তার চেয়ে বড় কথা, মূল্যায়নের জন্য আমাদের ধারণাও পরিস্কার নয়একটি সত্ত্বার কোন বৈশিষ্ট্যকে উপরে-নিচে রাখতে হবেসে বিচার করতে বা বিচারের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে আমাদের দুর্বলতা খালি চোখে ধরা পড়েফলে আমরা মূল্যায়ন করতে গিয়ে হয় অহেতুক প্রশংসায় গা ভাসাই অন্যথায় অপ্রাসঙ্গিক ইতিহাসের আশ্রয় নিই সঙ্গতকারণে, ব্যক্তির মূল্যায়ন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় আর গঠনমূলক মূল্যায়ন না হলে, ব্যক্তিকে তাঁর সত্ত্বার নিরিখে চেনা যায় না ধরুন, একজন মানুষের সত্যকথন স্বচ্ছ লেনদেনের গুণ আছেএখন কোন কোন ক্ষেত্রে গুণদ্বয়কে পর্যায়ক্রম দিয়ে সাজাবো এবং পর্যায়ক্রমের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করবোসেটাই মূল্যায়নের প্রাথমিক বিচার বিচার করতে গিয়ে প্রয়োজন হয়, ব্যক্তির প্রাসঙ্গিক ইতিহাস বা ঘটনা এবং তার পটভূমি পর্যালোচনাএরপর লাগবে, বিশ্লেষণ বা বিনির্মাণের পদ্ধতিএগুলো মানা হলে দেখবেন, একটি বাস্তবসম্মত উপসংহার জাতিকে উপকৃত করবে তাই উপসংহার মূল্যায়নের দৃশ্যমান আকার

হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’ মূল্যায়নের মতো সুকঠিন বিষয়ে হাত দেবার আগে একটি বাস্তব উদাহরণকে স্বীকার করে নিতে হয় আমাদের কওমী অঙ্গনে এমন অনেক মনীষী ছিলেন যাঁরা নিজনিজ অঙ্গনে ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বলতাঁদের খিদমাত, উম্মাহ জন্য তাঁদের হৃদয়কান্না আজও আমাদেরকে ঋণী করে রাখে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতি তাঁদেরকে চিনতেও পারেনিশহরের লোকাল বাসের যাত্রীর মতো তাঁরা উঠেছেন আবার নেমে গেছেনএটুকুই সার তাঁরা চলে যান; সাথে তাঁদের সীরাতও মাদফূন হয়ে যায় কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁদের কুরবানীর বিশ্লেষণকৃত একটি অধ্যায় জাতির সামনে রেখে যেতে এখানে তাঁদেরকে যদি আমি সজ্ঞানে মাযলূমবলিতবে কি অন্যায় হবে? হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. তাঁদের অন্যতম এক নক্ষত্র যিনি এসেছেন আবার চলে গেছেন পায়ের চিহ্ন ব্যতিরেকে শূণ্যতার দায় আমাদের সবার সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, জীবদ্দশায় আমাদের কারো-কারো কাছে তাঁরা ছিলেন বিতর্কিত, অসহনীয় কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাবার পর আমরাই হলাম তাঁদের অশ্রুসিক্ত ইয়াদগার কবি নজরুল মরহুম কতো কঠিন সত্যই না বলেছেন:

জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল,

মুখপানে যার তুমি চাওনি ফিরে তারি লাগি আজি কেন অশ্রু আকুল?”

হযরত বাবুনগরী রহ.কে আমি প্রথম দেখি ১৯৮৮ সালে জামিয়া বাবুনগরে তখন তিনি মিশকাত শরীফ পড়াতেন সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাঁকে আমি দেখেছি, ছাত্র গড়ে তোলার এক অদম্য কারিগর; আসলাফ-আকাবীরের নমুনা হয়ে থাকবার প্রাণান্ত প্রয়াসী; ছাত্রদের মধ্যে বাতিল-বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ জ্ঞান প্রদানে নির্ঘুম প্রহরী আর যুগের প্রয়োজনে দ্বীনের ব্যাখ্যা সৃজনে এক কিতাবমন্থনকারী হুদহুদ হিসাবে জামিয়া বাবুনগরে যতোদিন ছিলাম, দেখিনি কখনো তাঁকে রাতের নিদ্রা যেতেপ্রাকৃতিক প্রয়োজনে মধ্যরাত বা শেষরাত্রে উঠেছি, দেখেছি হযরত উপুর হয়ে কিতাবের গভীর সাগর থেকে মনিমুক্তা আহরণে মগ্ন পুরো মাদরাসা তখন ঘুমে বেঘোর। সে এক ভিন্ন জগৎ যেখানে নশ্বর পৃথিবীর তাবৎ কোলাহল নিশাচর মুসাফিরের কাছে একেবারেই নিস্তব্ধ হযরতের কামরায় তখন থাকতেন বর্তমানে জামিয়া বাবুনগরের অন্যতম মুহাদ্দিস মাওলানা হারুন আজীযী সাহেব। বয়সে তিনি আমার চেয়ে ছোট হলেও তাঁর সাথে আমার গভীর হৃদ্যতা ছিলো। একদিন তাঁর কাছে জানতে চাইলামহযরতকে তো দেখি সব সময় কিতাব নিয়ে পড়ে থাকেন। রাতে খাওয়া-দাওয়া করেন কখন? হারুন আযীযী সাহেব বললেন: রব্বানী ভাই, ওগুলোর কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনো রাত বারোটায়; কখনো তিনটায় আবার কখনো বিনা খাওয়াতেই কাটিয়ে দেন।

৮০ দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনে আন্তঃমুনাযিরার যে মোহনীয় কাল ছিলো সে-সবের প্রাণকেন্দ্র ছিলো জামিয়া বাবুনগর সাহাবায়ে কেরামের মিয়ারে হক, তাকলীদ, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেসব মুনাযিরার আয়োজন করা হতো তার প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীতাঁর তত্ত্বাবধানেই রাতব্যাপী তর্কসভাগুলো দূরদূরান্ত থেকে আসা ইলমপিপাসু উলামা তালিবে ইলমদের খোরাক মিটাতো সে-সময়কার অনেকেরই ৮৯-’৯০ সালের সাহাবায়ে কেরামের মিয়ারে হকের উপর আয়োজিত ঐতিহাসিক মুনাযিরার অবিস্মরণীয় স্মৃতি ভুলবার কথা নয় কি উৎসব-উৎসব আমেজে সপ্তাহ আগে থেকে জামিয়া মেতে ওঠেকয়েক মাস আগে ঘোষিত মুনাযিরার পক্ষ-বিপক্ষ প্রস্তুতি নিতে কিতাবের এক পহাড় গড়ে তোলে বিভিন্ন মাদরাসা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দালায়িল তৈরি সংগ্রহ করতে তাঁরা মৌমাছির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সেই মুনাযিরায় পক্ষের নেতা ছিলেন, তৎকালীন দাওরার ছাত্র মাও. নাজমুল হক এবং বিপক্ষের নেতা ছিলেন একই জামায়াতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মুফতী গোলাম মাবুদ রহ. অসাধারণ এক তেজস্বী তরুণ আলিম ছিলেন মুফতী গোলাম মাবূদ রহ.। আল্লাহ তাঁর মাগফিরাত দান করুন। যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে জামিয়া আগত আলিম-উলামা অন্য মাদরাসার ছাত্রদের আগমনে সাজসাজ হয়ে উঠলো নামাযে ইশার পর যে মুনাযিরা শুরু হয় সেটা ফযরের পূর্বেও শেষ হতে চায়নি মুনাযিরার সভাপতি ছিলেন, উস্তাযুল আসাতিযা শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা ইসহাক আল গাযী রহ. মুনাযিরায় ফরীকাইনের পরে প্রথম সারিতে ছিলেন শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’ বিশিষ্ট খলীফা তিলমীযে রশীদ হযরত মাও.ওবায়দুর রহমান সাহেব রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. আব্দুল বারী সাহেব বাশখালী রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. ইউনুস সাহেব হাটহাজারী রহ., মুহাদ্দিস হযরত মাও. হাফিয হাবীবুল্লাহ বাবুনগরী সাহেব, হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ., জামিয়া বাবুনগরের বর্তমান শাইখুল হাদীস মুফতী মাহমূদ হাসান ভুজপুরী দা.বা., মাওলানা আবুল কালাম সাহেব রহ. প্রমুখ দেশবরেণ্য আলিমে দ্বীন রাত তখন আড়াইটার মতো হবে, হযরত গাযী সাহেব রহ. সভাপতি হিসাবে মুনাযিরার সমাপণী বক্তব্য ও রায় দিতে শুরু করলেন এবার শুরু হলো, ইলমের তীরবিহীন এক মহাসাগর হযরত গাযী সাহেব হুযূরের সাথে জামিয়ার উপরোক্ত বয়োজ্যেষ্ঠ উলামায়ে কেরামের প্রশ্নোত্তর পর্ব। সে এক আজীব ও গরীব মানযার! মনে হচ্ছিলো, সবাই এ ইলমী মহাসাগর থেকে কিছু সুধা পান করতে কতোই না পাগলপারা! হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. গাযী সাহেব রহ.’র ইলমী গভীরতায় চমকে উঠলেন। অথচ হযরত বাবুনগরী রহ. আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ.’র তিলমীযে রশীদ। এক পর্যায়ে রাত তখন ফযরের কিছু আগে হবে, হযরত বাবুনগরী জরুরতের কারণে মসজিদ থেকে বের হলেন। ঘটনাক্রমে হযরতের পিছুপিছু আমিও বের হলাম প্রাকৃতিক প্রযোজনে। জায়গাটা বাবুনগরের পুরনো মসজিদের উত্তর দিকের গেট পার হয়ে ক’কদম এগিয়েছি, হযরত বাবুনগরী পায়ের আওয়ায শুনে পেছন ফিরে আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে স্বোচ্ছ্বাসে বলে উঠলেন,“গোলাম রব্বানী! মনে রেখো, এ শাখসিয়াত আর এ পৃথিবীতে জন্ম নেবে না। হযরতের কথাগুলো রেকর্ড করে রাখা দরকার। হযরতের পরে এ কথা আর শুনতে পাওয়া যাবে না।” সে দৃশ্য আমার জীবনে আজও অবিনশ্বর। বলছিলাম, এসব ইলমী অধ্যায় ও ছাত্র গড়ার কৌশলের পেছনে প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.। তাই আমি বিশ্বাস করি, হযরতের জীবনের স্বর্ণযুগ কেটেছিলো জামিয়া বাবুনগরে।

হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর এক বিস্ময়কর সত্ত্বাগত পরিচয় হলো, তিনি কেবল একজন মাদরাসায় পড়ুয়া আলিমে দ্বীন ছিলেন না; তিনি ছিলেন মুহাদ্দিসে কবীর আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.’র সুযোগ্য রুহানী ফরযন্দ আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ.’র তিলমীযে রশীদ। সম্ভবত তিনিই প্রথম বাংলাদেশে যুগ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে হাদীসে রাসূলের দারস প্রদান করতেন। এ জন্য তাঁকে রাতদিন গভীর পঠন ও গবেষণায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। মাঝেমাঝে আমার মতো গোমূর্খ হযরতের কামরায় গেলে হযরত যে অপার স্নেহের আবহে কথা বলতেন তা কখনো ভুলবার নয়। যেহেতু আমার মরহুমা মা হযরতের খালা, তাই হযরত রহ. দেখা হলেই আমার মা-বাবার হালাৎ জানতে চাইতেন। তাঁদের জন্য সালাম পেশ করতেন। কোন বিষয় নিয়ে কথা তুললে হযরতের বিস্তৃত ও বাস্তবমুখী জবাব শুনে বিমোহিত হতে হতো। তাঁর গবেষণাধর্মী চিন্তার এক বড় দিক ছিলো, বাড়িতে গড়ে তোলা পারিবারিক পাঠাগারহযরত সেখানেও আমাকে নিয়ে গেছেন কয়েকবার। সেখানেই হযরত রহ.’র পিতা বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুসান্নিফে তানযীমুল আশতাত হযরত মাওলানা আবুল হাসান রহ.’র সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। হযরত দা’ওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও যত্রতত্র বয়ান করতে যেতেন না। তিনি কিতাব আর গবেষণা নিয়েই থাকতেন। যে বছর তিনি তাঁর নিজের লেখা গ্রন্থ ‘সাইন্স আওর ইসলাম’ প্রকাশ করেন, আমাকে ডেকে নিয়ে একটি কপি হাদিয়া দেন। হযরতের যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতো তা হলো, তাঁর ব্যাখ্যা দেয়ার দক্ষতা ও বিস্তৃত ক্ষমতা। হাদীসের দারসে এটিই তাঁর ফুটে ওঠা এক বড় বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে উসূলে হাদীসে তাঁর সমকক্ষ বাংলাদেশে কেউ ছিলেন বলে জানা যায় না। এটা একবার তাঁর প্রিয় উস্তাদ হযরত মাওলানা সুলতান যওক নাদভী রহ.কে সরাসরি মঞ্চে বলতে শুনেছি। একবার সম্মিলিত আলিমদের এক সফরে তিনি আমাকে গাড়িতে সামনের আসনে তাঁর সাথে বসার নির্দেশ দেন। যথাবিহীত হুকুম পালন করে আমি সংকোচে বসে পড়লাম। গাড়ি চলতে শুরু করলে আমি সুযোগ পেয়ে হযরতের কাছে জাল হাদীস সংক্রান্ত একটি গ্রন্থের অবতারণা করলাম। হযরত তখন হাদীসের উপর সহীহ, যয়ীফ, মাওযু ইত্যাদি হুকুম প্রয়োগের ধারা ও কৌশল নিয়ে বলা শুরু করলেন। তিনি একটি হাদীসের উপর তিন দল: মুতাশাদ্দিদীন, মু’তাদিলীন ও মুতাসাহিলীনের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গী, কৌশল ইত্যাদির অভিনব সমন্বয়মূলক বয়ান তুলে ধরে বলেন, সামান্য জেনে কোন হাদীসের উপর হুকুম লাগানো অন্যায়। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম কেবল। আজও সে-সব মুক্তাঝরা কথাগুলো আমার মনে পড়ে। তাই, হঠাৎ করে আগপাচ না ভেবে কোন হাদীসের বিষয়ে হুকুম জারির বর্তমান প্রবণতাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ভয় করি। তাই আমি বিশ্বাস করি, হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্যের এক মহান দিক হলো তিনি সব কিছু ছাপিয়ে আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরী রহ,’র সুযোগ্য ছাত্র হিসাবে উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত হাদীসবিশারদের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে পূর্ণতা পায়নি ভিন্ন এক কারণে। সে কথায় পরে আসছি।

হযরত জুনায়েদ বাবুনগরীর জীবনের এক কঠিন ও আলোচিত অধ্যায় হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব ও পরবর্তীতে আমীর হওয়া।  বিষয়টিকে হযরতের শুভাকাঙ্খীরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। জানি না আমার মতো গোমূর্খের অবস্থানকে অন্যেরা সমর্থন করবেন কি না। হযরত প্রথম যখন হেফাজতের মহাসচিব হলেন আমার শঙ্কাটা জাগে তখনই। কেন জানি আমার বারবার মনে হতো, হযরত তাঁর চিরাচরিত চিন্তা ও গবেষণার পথ ছেড়ে ভিন্ন এক অপরিচিত পথে রওয়ানা হলেন। এ ধরনের কাজে অন্য কেউ আসতে পারতেন কিন্তু যিনি এ দুর্ভিক্ষের সময়ে উসূল ও ইলমে হাদীসের ঝাণ্ডা নিয়ে উপমহাদেশে দ্বিতীয় বিন্নূরী হবার কাছাকাছি যেতে পারতেন তিনি আজ হেফাজতে ইসলামের মতো একটি দলের নেতৃত্বে গিয়ে ভিন্ন এক পথে অগ্রসর হলেন। এখানে মোদ্দা কথায়, হযরত মাশহূর হলেন আবার বিতর্কিতও হলেন। যারা এক সময় এ মহান মুহাদ্দিসের জুতার পাশে বসার হিম্মাত পেতো না তারাও হযরতের পাশের চেয়ারে বসবার ধৃষ্টতা দেখাতে সক্ষম হলো। এ এক অবাক করা নিয়তি।  কিন্তু আমরা হযরতের দ্বিতীয় বিন্নূরী হবার বিষয়টিকে এড়িয়ে গেলাম আমাদের চৈন্তিক গাফলতিতে। যুগসেরা হাদীস বিশারদের চেয়ে বেশি মূল্যায়িত করলাম তাঁকে হেফাজতের মহাসচিব ও আমীর হিসাবে। যুক্তি ছিলো, তিনি উপমহাদেশের হাদীসচর্চা ও হাদীসের আন্তর্জাতিকতায় অন্যতম সিপাহসালার হবেন কিন্তু আমরা আমাদের চিন্তার দীনতা-হীনতায় তাঁকে বানালামহেফাজত মহাসচিব বা আমীর। আমি তাঁর এ গতির পরিবর্তনকে পদোন্নতি নয়, পদাবনতি বলে মূল্যায়িত করতে চাই অন্তত একজন হাদীসবিশারদের তুলনায়আমি বিশ্বাস করি, হেফাজত তাঁর অধীনে অনেক বৈপ্লবিক কাজ করেছে, সাথে এও বিশ্বাস করি: তার চেয়েও উপমহাদেশের উলূমুল হাদীসের আন্তর্জাতিকতায় তাঁর পদচারণা অব্যাহত থাকলে মুসলিমবিশ্ব অনেক উপকৃত হতো। এটাই অধীনের দুর্বল মূল্যায়ন। যাঁরা অধীনের মতো জাহিলের সাথে ভিন্নমত পোষণ করবেন তাঁদের কাছে করজোরে দুঃখ ও ক্ষমা চেয়ে এখানেই বিদায় চাইছি। তাম্মাৎ বিল খাইর।

11.09.2025

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি-মুক্ত দশক: একটি পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা

 মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

 ভাবনা-৭০

(মাইক্রোসফট কো-পাইলটের সাথে প্রশ্নোত্তরের পর উপস্থাপিত প্রবন্ধ।)

ভূমিকা:

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতির ছায়ায় পরিচালিত হয়ে আসছে। ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতি যেমন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি আজ তা অনেকাংশে সহিংসতা, দলীয় দখলদারিত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায়, আমি প্রস্তাব করছিপরবর্তী দশ বছর দেশের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখা হোক, পরীক্ষামূলকভাবে। দেখা যাক, এতে শিক্ষার পরিবেশ ও দক্ষ জনবল তৈরিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে কি না।

উদ্দেশ্য:

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো

    • শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধার
    • দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমী জনবল তৈরি
    • সহিংসতা ও দলীয় প্রভাব হ্রাস
    • নেতৃত্ব বিকাশে বিকল্প পথ উন্মোচন

প্রয়োগের কাঠামো:

পরিকল্পনাটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে দেশের ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০টি সরকারি কলেজে। সময়কাল হবে ২০২৬ থেকে ২০৩৬ পর্যন্ত। এই সময়কালে প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে একটি রাজনীতি-মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

নীতিমালা:

    • দলীয় ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে
    • অরাজনৈতিক ছাত্র-সংসদ গঠন করা হবে, যেখানে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে শিক্ষার্থীদের ভোটে
    • বিতর্ক, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, উদ্ভাবনমূলক সংগঠন সক্রিয় রাখা হবে
    • শিক্ষকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা হবে
    • ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও সহিষ্ণুতা বজায় রাখা হবে

ফলাফল ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত:

দশ বছর শেষে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। যদি দেখা যায় শিক্ষার মান, নেতৃত্ব বিকাশ, সহিংসতা হ্রাস এবং কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তাহলে এই মডেলকে স্থায়ীভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অন্যথায়, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে।

উপসংহার:

আমরা যদি সত্যিই চাই আমাদের সন্তানরা মানুষ হোক, বিশ্বে সুনাম কুড়াক, তাহলে এখনই সময় শিক্ষাকে রাজনীতির ছায়া থেকে মুক্ত করারএই পরিকল্পনা কোনো নিষেধ নয়, বরং একটি সম্ভাবনার দরজাযেখানে শিক্ষার আলোয় গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব।

10.09.2025

 

সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

হাটহাজারীর ঘটনায় দায় কার?

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী

ভাবনা-৬৯ 

গত শনিবার অর্থাৎ ৬ই সেপ্টেম্বর পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল ব্রেলভী আদর্শের অনুসারীদের জশনে জুলুসকে কেন্দ্র করে হাটহাজারীতে যা ঘটে গেলো বিষয়টি আতঙ্কিত হবার যোগ্য হলেও অপ্রত্যাশিত ছিলো না কারণ, জশনে জুলুসের ঘটনাটি নতুন নয় আমার জানামতে, ১৯৭৪ সাল থেকে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোটের পীর সাহেব তৈয়ব শাহের নির্দেশে ১২ই রবিউল আউয়াল উপলক্ষে জশনে জুলুসের আয়োজন হতে থাকেচট্টগ্রামে আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব সাহেব জুলুসের প্রবর্তন করেন যদ্দূর জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত জুলুসের একটি মিছিল থেকে হাটহাজারী মাদরাসার মসজিদকে উদ্দেশ্য করে এক যুবকের আপত্তিকর অঙ্গুলি প্রদর্শনের একটি অনলাইন পোস্ট থেকেএরপর অভিযোগ আসে, জুলুসকারীরা হাটহাজারী মাদরাসার পশ্চিমে লাগোয়া মাকবারায়ে জামিয়ায় হযরত আহমদ শফী সাহেব রহ. হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’ কবরে পাথর নিক্ষেপ করে প্রসঙ্গে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে আহুত সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য শুনলাম ঘটনার সত্যাসত্য জানতে আমি এমন দুজনের সাথে ফোনে কথা বললাম যাঁরা কাছ থেকে ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন ছাড়া বিভিন্ন পোস্টে বিভিন্ন লেখাও দেখলাম যা কেবল ব্যক্তির ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রকাশ করেসবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি নিরপেক্ষ আকার কিছু প্রশ্ন দাঁড় করানোর কোন বিকল্প খুঁজে পেলাম না আপাদমস্তক ঘটনা থেকে কিছু জিজ্ঞাস্য বিষয় আপত্তির জায়গা সচেতন পাঠকদের সামনে পেশ করতে হয়:

. আগেই বলেছি, জশনে জুলুসের মিছিল নতুন কোন ঘটনা নয় আর সেই পূর্ব থেকে হাটহাজারীর উত্তরদিকের উপজেলা ফটিকছড়ি আশপাশের এলাকা থেকে ব্রেলভী আদর্শের অনুসারীদের জুলুসের মিছিল ১২ই রবিউল আউয়ালের দিনে চট্টগ্রাম শহরে যাওয়া-আসা করে এটা অনস্বীকার্য যে, এসব মিছিল যাওয়া-আসার সময় যে কোন কওমী মাদরাসাকে অতিক্রমকালে অতিরিক্ত আওয়াযে স্রোগান, চিৎকার, ভাণ্ডারী গান ইত্যাদি চালানো হয়ে থাকেসাথে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে নাচানাচির দৃশ্যও দেখা যায় জানি না, এগুলো তাদের কোন কিতাবে সুন্নাহ বা নবীর আদর্শ বলে লেখা হয়েছেতবে এসবের পেছনে তাদের একশ্রেণীর মাওলানাদের উস্কানির প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না থেকে প্রধান সড়কের লাগোয়া বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন কওমী মাদরাসা দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর পড়াশোনা, ক্লাস, অবস্থান ইত্যাদিতে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেএমন কি কোন-কোন সময় এমন ঘটনাও ঘটে যে, নামাযের সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা গানবাদ্য বন্ধ রাখলেও ব্রেলভী অনুসারী ভাইয়েরা তা রাখেন নাএগুলো বারবার ঘটে এবং প্রমাণীত সত্য। দেখেছি, আমাদের ফটিকছড়িতে মাইজভাণ্ডারে গরু-মহিষ নেয়ার সময় বিকল্প রাস্তা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছে করেই তারা নাজিরহাট মাদরাসা বা বাবুনগর মাদরাসার পার্শ্বের রাস্তা দিয়ে বিকট শব্দে গান ঢোল-তবলা বাজাতে বাজাতে চলে দৃশ্য এক সময় প্রকট ছিলোএখন বিভিন্ন বাদ-প্রতিবাদে কিছুটা হ্রাস পেয়েছেকখনো কখনো এও দেখা যায়, ওরসের পোস্টার ইচ্ছে করেই মাদরাসার দেয়ালে বা গেইটে লাগিয়ে দেয় অথবা কোন ওরসের ব্যানার মাদরাসার ফটকের সামনে টাঙ্গিয়ে দেয়এগুলো নিঃসন্দেহে গায়ে পড়ে উস্কানি দেয়াগত শনিবারের হাটহাজারীর ঘটনা তাই অপ্রত্যাশিত ছিলো না ব্রেলভী অনুসারীদের এমন কাণ্ডে মাদরাসার শিক্ষকগণকে ছাত্রদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখানোর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে গলদঘর্ম হতে হয়একটি মাদরাসার গা ঘেঁষে এভাবে বিকট আওয়াযে গানবাদ্য বাজানোকে ছাত্ররা কোনভাবে মেনে নিতে পারেনি বা পারে নাছাত্র হিসাবে কখনো কখনো প্রতিক্রিয়া বাধার বাঁধ ভেঙ্গে ফেলেঘটে যায় গত শনিবারের মতো ঘটনা যে কোন বিবেচনায় ঘটনা একটি উস্কানিমূলক তৎপরতার প্রতিক্রিয়া বৈ কিছু নয়

. সাংবাদিক সম্মেলনে(৭ই সেপ্টেম্বর) পরিচালক মাওলানা খলীল আহমদ সাহেবের নামে বিলিকৃত বক্তব্যে হাটহাজারী মাদরাসার কর্তৃপক্ষ বলেন,

“পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল ভোর থেকেই মাদ্রাসার সকল গেট বন্ধ করে দিয়ে গেটে গেটে কড়া পাহারা বসানো হয় এবং মাদ্রাসার কোন ছাত্রকে বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। এতে আমাদের আশা ছিল, কথিত নামধারী সুন্নীরাও সংযত থেকে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা এরিয়া অতিক্রম করবে। তাছাড়া, আমরা হাটহাজারী মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনকেও অবগত করেছিলাম, যাতে অন্যান্য বছরের মতো হাটহাজারী মাদ্রাসা এরিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ অংশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করে জুলুসযাত্রীদেরকে মাইকে বাদ্য-বাজনা করতে নিষেধ করে কিন্তু ফটিকছড়িসহ উত্তর চট্টগ্রামের নামধারী সুন্নীরা চট্টগ্রাম মহানগরীতে কথিত ঈদে মিলাদুন্নবী ও জলুস উদযাপনের লক্ষে গতকাল সকাল ৭টা থেকে শত শত গাড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে হাটহাজারী মাদ্রাসার সামনে বিকট শব্দে মাইকে গান-বাজনা, উস্কানীমূলক স্লোগান, অশ্লীল নৃত্য ও কটূক্তিমূলক আচরণ এবং দৃষ্টিকটূ অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে উস্কানী দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। এই সময়ে তারা শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও কায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রাহ.)এর কবরে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, যেখানে বাধা দিতে গিয়ে কয়েকজন ছাত্র আহত হয়। এছাড়া তারা জামিয়ার শতবর্ষী বাইতুল কারীম জামে মসজিদের দিকে অশালীন ভঙ্গিমায় ইশারা করার মত ধৃষ্টতা দেখায়। এমনকি মজিদের আযান এবং জামাআত চলাকালীন সময়েও তাদের বাদ্য-বাজনা ও স্লোগান সমানতালে জারি রাখে। তাদের উস্কানীর মাত্রা বাড়তে থাকলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থেকে বারংবার অনুরোধ করা হলে দুপুরের পর ২/৩ জায়গায় কিছু পুলিশ মোতায়েন করা হলেও তারা উস্কানী বন্ধে সমর্থ হয়নি।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়,

“শত উস্কানী সত্ত্বেও পূর্ব ঘোষণামতে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মাদ্রাসার সকল গেট বন্ধ ছিল, এ সময়ে কোন ছাত্র বাইরে বের হয়নি এবং সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে। কিন্তু আমাদের সকল সংযম ও ধৈর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতের বেলায় হাটহাজারী বাজারের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় বাজার ও ওষধ ক্রয় করতে যাওয়া ছাত্রদের উপর তারা দেশিয় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে শতাধিক ছাত্রকে মারাত্মক আহত ও জখম করে। অনেক দোকানপাটে ভাংচুর চালায় এবং নগদ টাকাসহ দ্রব্যসামগ্রী লুটপাট করে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আহত বহু ছাত্র এখনো চিকিৎসাধীন। পরীক্ষার জন্য মাদ্রাসায় আসার পথে কিছু ছাত্রের উপরও তারা হামলা চালায় এবং মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগসহ আসবাবপত্র কেড়ে নেয়।”

এই হলো, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বর্ণনায় ঘটনার চুম্বকাংশ। এখানে কিছু বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। তা হলো, সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়েছে: পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল(৬ই সেপ্টেম্বর) ভোর থেকেই মাদ্রাসার সকল গেট বন্ধ করে দিয়ে গেটে-গেটে কড়া পাহারা বসানো হয় এবং মাদ্রাসার কোন ছাত্রকে বাইরে যেতে দেওয়া হয়নিবিষয়টি তাঁরা থানা-পুলিসকেও জানান বলে দাবি করেন। এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কিছু একটা ঘটতে পারে। এই যদি হয়, তবে রাত সাড়ে আটটার পরে ছাত্ররা বের হলো কি করে? গেটের চাবি তো মাদরাসা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকার কথা; ছাত্রদের হাতে নয়। তবে কি কর্তৃপক্ষ রাত সাড়ে আটটায় গেট খুলে দিয়েছিলেন? নাকি ছাত্ররা তালা ভেঙ্গে বেরিযে পড়েছিলো? ধরে নিলাম, কর্তৃপক্ষ তালা খুলে দিয়েছিলেন বা ছাত্ররা তালা ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলো। এখন প্রশ্ন হলো, তালা খুলে দেয়া বা ছাত্রদের বেরিয়ে যাবার খবর সাথেসাথে থানা-পুলিসকে কি জানানো হয়েছিলো? মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বলেছেন, হামলাকারীরা মিছিল নিয়ে আসার সময় (দিনের বেলায়) হযরত শফী সাহেব রহ. ও হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র কবরের দিকে ইট-পাথর ছুঁড়তে থাকে। সেখানে বাধা দিতে গেলে মাদরাসার কয়েকজন ছাত্র আহত হন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সকাল থেকে কোন ছাত্রকে বের হতে দেয়া হয়নি এবং প্রত্যেক পথে কড়া পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে কবরে বাধা দিতে যাওয়া ছাত্ররা রাস্তায় এলো কি করে? ওরা তো মাদরাসার ভেতরে থাকার কথা। তবে কি এ কথা বুঝতে হবে, মাদরাসার ছাত্রদের একটি অংশ বাইরেও অবস্থান করছিলো? এ অবস্থান যদি সত্য হয়, তবে কি বুঝতে হবে না কর্তৃপক্ষের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ছাত্রদের একটি অংশ বাইরে অবস্থান করছিলো? এতে কি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানো সম্ভব?

৩. বিবৃতিতে নিয়োগকৃত পুলিসের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, দুপুরের পর কিছু পুলিস রাস্তায় দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী হেফাজতে ইসলামের একজন দায়িত্বশীল আমাকে জানান, রাস্তায় মাত্র দু’তিন জন করে পুলিকে বসে থাকতে দেখেছি। বিষয়টি একজন মিডিয়া-সাংবাদিকও আমাকে জানান। বোঝা যাচ্ছে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছেন যে, জুলুসের বিষয়টি অনেক আগে থেকে ফীবছর হয়ে আসছে, তবে তাঁরা সম্ভাব্য আশঙ্কা বুঝতে পেরেও অল্পসংখ্যক পুলিসের উপস্থিতির বিষয়টি থানা বা পুলিসের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন কি? একদিকে রাস্তায় অপ্রতুল পুলিস ও ছাত্রদের একটি একটি অংশ বাইরে থাকা কি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলেনি?

৪. বলাবাহুল্য, অতীতের প্রত্যেক ১২ই রবিউল আউয়ালের মতো এবারও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সজাগ ছিলেন পরিস্থিতির পরিণতি নিয়ে। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল  সূত্র আমাকে জানিয়েছে, ঘটনার সময় মাদরাসার পরিচালক মাওলানা খলীল সাহেব নিত্যদিনের মতো মাদরাসায় অবস্থান না করে মাদরাসার বাইরে নিজস্ব বাসায় অবস্থান করছিলেন। বিষয়টি আমাদের কাছে একেবারে অনাকাঙ্খিত। বিষয়টি সত্য হলে বলতে হয়, তিনি এতো বড় একটি মাদরাসার নির্বাহী প্রধান; সবকিছুর জিম্মাদার, এমন সঙ্কটময় সময় আসতে পারে জেনেই তো তিনি সকাল থেকে গেট বন্ধ করে রেখেছিলেন, পথে পাহারা বসিয়েছিলেন। বিবৃতিতে তো সেটাই বলেছেন। তাই না? তাহলে পরিস্থিতিকে বিবেচনায় না নিয়ে তিনি কেমন করে নিত্যদিনের মতো বাসায় চলে গেলেন? তিনি কি একটি দিন ও রাত মাদরাসায় কাটাতে পারতেন না? এটা কি তাঁর মতো দায়িত্বশীল ও সম্মানী মানুষের জন্য অভাবনীয় নয়? এখানে তাঁর দায় ও দায়িত্বের প্রতি অবহেলাকে কি নির্দেশ করা যাবে না? তিনি নিঃসন্দেহে বড় মাপের মানুষ। কিন্তু যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব কাঁধে থাকে সেখানে বড় মানুষ বলেই কি তাঁকে দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া যায়? এ সম্পর্কে কি তাঁকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহী করতে হবে না? মজলিসে শূরা কি এসব বিষয় বিবেচনায় নেবেন? 

সচেতন পাঠক, পরিস্থিতির যথাসাধ্য বিবেচনায় আমি কেবল আমাদের দুর্বলতাকেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। কারণ, অতীতে আমাদের বিভিন্ন কওমী মাদরাসায় বিভিন্ন সময়ে হামলা হয়েছে কিন্তু কখনো সমস্যার গোড়ায় হাত দেয়া হয়নি বা নিজস্ব কোন তদন্ত কমিটি করে কোন রিপোর্ট রক্ষা করা হয়নি। তাই, এসব ঘটনা বারবার ঘটে। মধ্যে কিছু মধ্যম বা নিম্ন সারির শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য হয় তো বিদায় দেয়া হয় কিন্তু শীর্ষ দায়িত্বশীলরা থেকে যান পুরোদস্তুর মাসূম ও মাগফূর। আল্লাহ হাফিয।

08.09.2025     

Featured Post

১১ দল ও ৭ দলের যোগবিয়োগ

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮১  গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ১১ দলের শরীক ৭টি কওমী দলের আলাদা জোটের ভবিষ্...