মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
জোট-বিজোটের খেলা ও হেফাজত
মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৭৪
নির্বাচন যতো এগিয়ে আসছে রাজনীতির অঙ্গনে জোট-বিজোটের খেলা ততোই জমতে শুরু করেছে। কে কাকে নিয়ে জোট করবে, কাদের সাথে গোপন সমঝোতা করবে—এমন কৌশলে রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।এগুলো অবশ্য রাজনীতির মাঠের স্বাভাবিক দৃশ্য। তবে এবারের নযরকাড়া বিষয় হলো, অরাজনীতিক পরিচিতিপ্রাপ্ত হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে রাজনীতিক মাঠের সরগোল। আগেরকার নির্বাচনে হেফাজতকে নিয়ে যে কথা হয়নি তা নয়। হয়েছে, সেটা কিন্তু আড়ালে-আবডালে।শুনেছি, আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র আমলে কিছু নেতা সংসদীয় মনোনয়ন পেতে আহমদ শফী রহ.’র সুপারিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। হযরতের সমর্থন পেতে বিভিন্ন প্রচেষ্টাও চালিয়েচিলেন। হযরত জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.’র আমলে সে রকম কোন চেষ্টার সুযোগ ছিলো বলে জানা নেই। তবে বর্তমান আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দা.বা.’র কাছে এমন চেষ্টার কথা কানে না আসলেও দেশের প্রধান রাজনীতিক শক্তিগুলো সৌজন্য সাক্ষাতে আসছেন। ইতোমধ্যে জামায়াত ও বিএনপি, সম্ভবত এনসিপিও হযরত বাবুনগরীর সাথে নির্বাচনপূর্ব সাক্ষাতে মিলিত হয়েছে। একান্ত সাক্ষাতে তাঁরা হযরত বাবুনগরীকে কি বলেছেন জানা নেই। নির্বাচন নিয়ে কিছু বললেও অপ্রত্যাশিত হবার কথা নয়।
বলাবাহুল্য, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমীরে হেফাজতের সাম্প্রতিক ও অদূর অতীতের বক্তব্যগুলো এখন আলোচনার টেবিলের গুরুত্বকে প্রকাশ করছে। বিভিন্ন জায়গায়, সমাবেশে, প্লাটফরমে কথা হচ্ছে; যে যার অভিমত হিসাবে আলোচনা–সমালোচনা করছেন। সুতরাং বিষয়টিতে একটি নিরপেক্ষ ও প্রামাণ্য আলোচনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। প্রথম কথা হলো, হেফাজত-আমীর কিন্তু তাঁর অরাজনীতিক অবস্থানে ছিলেন শুরু থেকে।তিনি কোন রাজনীতিক নেতাকে ডাকেননি বা তাদের কার্যালয়ে পাও ফেলেননি। তাঁর কাছে নেতারা এসেছেন দোয়া চাওয়ার কথা বলে।সমস্যার শুরু, জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নেতা জনাব শাহজাহান চৌধুরী আমীরে হেফাজতের সাথে সাক্ষাত করতে আসার পর। সেখানে তাঁর সাথে মাও.মওদূদী সাহেবের মতবাদ নিয়ে কথা উঠে। তিনি স্বাভাবিকভাবে মওদূদী সাহেবের সমর্থনে কিছু কথা বলেন।তবে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তাঁরা মওদূদী সাহেবের ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রাখলেও তাঁর ফিকাহ বা মতাদর্শকে মানেন না।সেদিনকার বৈঠকে উস্তাযে মুহতারাম মুফতী মাহমূদ হাসান ভুজপুরী দা. বা. ও মাও.মীর হোসাইন রামগড়ীও ছিলেন। আমি হযরতদের সাথে আলাদা-আলাদা করে কথা বলেছি। হযরত মুফতী সাহেবের কথায়: জামিয়া বাবুনগরে জনাব শাহজাহান চৌধুরী মওদূদী সাহেবের মতাদর্শকে না মানার কথা বললেও সেদিন ফটিকছড়ির আজাদী বাজারে জামায়াত-আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মাও.মওদূদী সাহেবকে তাঁদের আদর্শ বলে দাবি করেন।বিষয়টি আমীরে হেফাজতের কানে আসার পর তাঁর মনস্তাত্বিক পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেন। জনাব শাহজাহান চৌধুরীর সাথে কৃত সাক্ষাতে জামিয়া বাবুগরের উর্দ্ধতন শিক্ষক মাও.মীর হোসাইন সাহেব জামায়াত নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যেহেতু বলছেন, আপনারা মওদূদী সাহেবের মতবাদকে মানে না—সে কথাটি মিডিয়ায় বলুন। সমস্যা মিটে যাবে।তখন তাঁরা বলেন: তাঁরা তর্ক করতে আসেননি, দোয়ার জন্য এসেছেন। এরপর নেতৃবৃন্দ চলে যান। বিষয়টি নিয়ে আমি যদ্দূর জানতে পেরেছি, আমীরে হেফাজত পরে উক্ত প্রসঙ্গে হাটহাজারী মাদরাসায় যান এবং এ বিষয়ে মাদরাসার পরিচালক ও অন্যান্য উর্দ্ধতন উস্তাদদের কাছে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আমীরে হেফাজত উম্মুল মাদারিস হিসাবে হাটহাজারী মাদরাসার ভূমিকাকে জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করে ফিরকায়ে বাতিলা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান। কিন্তু হাটহাজারী মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে অস্বীকার না করলেও কোন বার্তা দেয়ার ব্যাপারে নীরব থাকেন।এমতাবস্থায়, আমীরে হেফাজত একজন দায়ীয়ে ইসলাম ও আকাবীরের ফরযন্দ হিসাবে ঈমানী জিম্মাদারী মনে করে মওদূদী-মতাদর্শ বিষয়ে এককভাবে মুখ খুলতে বাধ্য হন।
কথাগুলো এজন্য বললাম, আমীরের হেফাজতের সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় না আনলে পাঠকমহল বিভ্রান্ত হবেন। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমীরে হেফাজতের সাম্প্রতিক জামায়াতবিরোধী বক্তব্যকে কোন রাজনীতিক বিবেচনায় না আনা বাঞ্ছনীয় মনে করি।তবে হ্যা, আর দশটির মতো এগুলোকে নিয়েও রাজনীতিক ব্যবহার হতে পারে।এর জন্য তো আমীরে হেফাজত দায়ী নন।বলছিলাম, রাজনীতির জোট-বিজোটের খেলা নিয়ে। উল্লেখ করা দরকার, দেশের বৃহৎ রাজনীতিক দল বিএনপি কিন্তু হেফাজতের সমর্থন চেয়েছে। তাঁদের কথায়, হেফাজতের মধ্যকার বেশ কয়েকটি দল রাজনীতির মাঠে সক্রিয়, তাই তাঁদের সাথে বিএনপি’র জোটভিত্তিক সমঝোতা প্রয়োজন।এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে তা হলো, হেফাজতকে নিয়ে রাজনীতির খেলা ও সওদাবাজি বেশ জমে উঠছে বলে মনে হয়।একটি সূত্র আমাকে জানায়, গত ২৫শে সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ঢাকায় জমিয়তের অনুষ্ঠান শেষে আমীরে হেফাজত বসুন্ধরার ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে যান। সেখানে বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দও তাঁর সাথে দেখা করেন। সেদিন বসুন্ধরায় হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। মাও. আজিজুল হক ইসলামাবাদীও ছিলেন। তিনি একজন আলিমের সাথে একান্ত এক বৈঠকে বলেন, কওমীভিত্তিক ইসলামী রাজনীতিক দলগুলো একেএকে সবাই বিএনপি’র সাথে চলে আসবে। তাঁর কথা থেকে বুঝলাম, যারা এখন জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে আছে তাঁরাও বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ হবে। কিন্তু গত ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৫ রবিবার দৈনিক মানবজমিনে মাও.আজিজুল হক ইসলামাবাদীর বরাতে একটি খবরাংশ প্রকাশিত হয়। তাতে মাও. ইসলামাবাদী বলেন, হেফাজতের সঙ্গে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে বিএনপি’র নির্বাচনী সমঝোতা হতে পারে। তাদের সঙ্গে কারও কারও যোগাযোগ আছে, আর কারও কারও যোগাযোগ হচ্ছে। উভয় সূত্রের খবর কিন্তু রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। নিজেকে নিজ প্রশ্ন করলাম, ইনি কি সেই আজিজুল হক নন যিনি গত ১৮ই আগস্ট ২০২৪ রাজধানীতে জামায়াত আহুত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমীরের প্রসংশায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমিরে জামায়াত সব মারকাজের আলেমদেরকে একত্রিত করে সবাইকে ধন্য করেছেন। আমাদের এই ঐক্য বা হাজারো ঐক্য কোনও কাজে আসবে না, যদি আমরা ব্যালটের যুদ্ধে একত্রিত হতে না পারি। আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক দেশ। তাই আমাদেরকে গণতান্ত্রিক সিস্টেমে আগাতে হবে?’(দৈনিক ইত্তেফাক ২৫শে আগস্ট, ২০২৪) তা ছাড়া, মাও. ইসলামাবাদীও তো নেজামে ইসলামের একজন নেতা। বিষয়টি কি পাঠকমহলের সবাইকে ভাবাচ্ছে না? তাহলে কি আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে যে, হেফাজতের অভ্যন্তরে একটি দল মাও. ইসলামাবাদীও যার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বিএনপি’র সাথে কওমীভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর লিয়াজোতে সম্পৃক্ত? জানি না, এটা নিশ্চিত কি না। তবে সত্য হলে বুঝতে হতে পারে, হেফাজতের রাজনীতিক ব্যবহার চলছে। আমাদের বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, যিনি একদিকে জামায়াতের নেতৃত্বে ভোটযুদ্ধের পক্ষে কথা বলবেন আবার বিএনপি’র সাথে জোট হবার বিষয়ে অগ্রগতির কথা বলবেন বা তাতে সম্পৃক্ত থাকবেন—বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আমীরে হেফাজত কি ব্যাপারটি জানেন?
হেফাজতের রাজনীতিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা কম নয়। কিন্তু যারা সওদাবাজি করছেন, রাজনীতিক ব্যবহার করছেন—তাদের তো নিবৃত করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ, হেফাজতের অভ্যন্তরে স্বচচ্ছতা ও জবাদিহীতার অভাব।এটা নতুন কোন সমস্যা নয়। ২০১৩ সালের শাপলার ঘটনা থেকে এ রোগ প্রকট আকার ধারণ করে। শাপলার ঘটনার দিন যখন একের পর এক লাশ পড়ছিলো, দিগন্ত টেলিভিশন অফিসে মাইনুদ্দীন রূহী ও তার কয়েকজন সঙ্গীসহ বস্তাভর্তি টাকা গণনা করার ঘটনা এখন কমবেশি সবার জানা। হেফাজতের ভেতর থেকে সচেতন কিছু মানুষ বিষয়গুলোকে সমাধানের চেষ্টা করলেও তা শীর্ষ নেতৃত্বের বাধা ও অনীহার কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে, সংগঠনের জন্য আসা বিপুল অর্থ তাসরূফ যেমন হয়েছে তেমনি সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি ও রাজনীতিক দলের সাথে সওদাবাজিও হয়েছে। এগুলো আল্লামা আহমদ শফী রহ.’র জমানা থেকে এখনো চলমান। কেউ লাগাম টানার সাহস পায়নি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে। এ সুযোগে কেউ লক্ষ-লক্ষ, কেউ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সিন্ডিকেটের শক্তিমত্তা এখনো সবলে বলিয়ান। বলাবাহুল্য, সিন্ডিকেটের সদস্য পরিবর্তন হয়েছে কেবল চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। এ নিয়ে হেফাজতের অভ্যন্তরে অস্থিরতাও কম হয়নি। অস্থিরতা সামাল দিতে গত ১৪ই এপ্রিল ২০২৫, সোমবার দিবাগত রাতে জামিয়া বাবুনগরে আমীরে হেফাজতের উপস্থিতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিন্ডিকেট নিয়ে কথা উঠলে খোদ সিন্ডিকেটের সদস্যরাই কোন প্রকার সিন্ডিকেট থাকার কথা অস্বীকার করেন এবং তাদের প্রভাবের কারণে সমস্যাটির কোন সমাধান হওয়া ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। উপরন্তু যারা সিন্ডিকেটের কথা উত্থাপন করেন তাদের এক প্রকার সাইডলাইনে চলে যেতে হয়। এমন কি তাদেরকে হেফাজতের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার গোপন মিশনও শুরু হয় বলে জানা যায়। আমাদের দুর্ভাগ্য, আজ পর্যন্ত হেফাজতের পক্ষ থেকে কখনো বলা হয়নি, ফীবছর কত টাকা আসলো-গেলো আর কতো টাকা থলেতে জমা রইল। অথচ এগুলো কওমের টাকা; কারও পৈতৃক সম্পত্তি ছিলো না। বিনিময়ে শাপলার শহীদ ও আহতদের পরিবার যথাযোগ্য সাহায্য-সহযোগিতা থেকে আজও বঞ্চিত রয়ে গেছে। এগুলোর দায় অবশ্যই দায়িত্বশীলদেরকে নিতে হবে, হোক তিনি সর্বজনমান্য।
২০২১ সালে হাটহাজারীর হেফাজতের মুদিবিরোধী মামলায় কারাগারে থাকাকালীন একটি সূত্র হেফাজতের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া সওদাবজি নিয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য দেন। হেফাজতের কোন কর্মসূচী ঘোষিত হলে লেনদেন ও সওদাবাজির এক বাজার কাযেম হতো। বিশেষ করে হরতাল-সমাবেশের মতো প্রোগ্রামগুলোকে কেন্দ্র করে সরকারের এজেন্সির সাথে দর কষাকষি হতো নিবৃতে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২১ সালের মার্চের হরতাল নিয়ে সরকার যে কোন বিনিময়ে হরতাল প্রত্যাহারে প্রথমত অনুরোধ পরে হুমকি-ধমকি প্রদান করে। সে সময় হেফাজতের একটি সিন্ডিকেট বিষয়টিতে সওদাবাজি করে বলে অভিযোগ ওঠে। এমন কি চব্বিশের বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদের দোসরদের মধ্যে কাকে কোন-কোন মামলা থেকে রেহাই দেয়া হবে, কাদের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হবে ইত্যাদি নিয়ে বিপুল অর্থের সওদাবাজি হয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র আমাকে জানায়। আগে সিন্ডিকেট হাটহাজারীভিত্তিক হলেও এখন ঢাকা, হাটাহাজারী ও ফটিকছড়িভিত্তিক সিন্ডিকেট হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এ যেন ব্যাংকের শাখা খোলার মতো। এদের কাজ হলো, হেফাজতের নাম ভাঙ্গিয়ে স্বার্থ হাসিল করা। আমার রিমান্ডের সময়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। রিমান্ডের এক পর্যায়ে ওসি রফিকের চেম্বারে পুলিস কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে শুনতে পেলাম, ২১-র মার্চের হরতাল প্রত্যাহার নিয়ে হেফাজতের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বৈঠক চলছিলো। বৈঠকটি নাকি হয়েছে মডেল থানার দ্বিতীয় তলায়। ওসি রফিক অন্য অফিসারদের বলছিলেন, বৈঠক চলাকালীন সময়ে ‘আবূ দারদা’ নামে এক আইডি থেকে বৈঠকে অংশ নেয়া এক হেফাজত-প্রতিনিধির কাছে ফোন এলো: এতো টাকা দিলাম আপনাদেরকে আন্দোলন করতে, আবার সমঝোতা কিসের? আমি জানি না, এ কথোপকথনের কতোটুকু সত্য বা মিথ্যা। কিন্তু যদি এসব সত্য হয়ে থাকে তবে তা কি সওদাবাজির আলামাতকে নির্দেশ করবে না? ধরে নিলাম, এ সূত্রটি বনী ইসরাঈলের রিওয়ায়েতের মতো। তবু তো শিক্ষা নেবার বা সতর্ক হবার যথেষ্ট উপাদান আছে। একটি সূত্র আমাকে জানিয়েছে, তদবীরের মাধ্যমে হেফাজতের নয় এমন মামলাও হেফাজতের মামলার সাথে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতো দেখছি, সাধারণ পাবলিকের দুষ্কর্মকেও হার মানাবে!
কথাগুলো এজন্য বললাম, আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন সওদাবাজির বাজার আবার গরম হতে চলেছে। আমীরে হেফাজতের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সূত্র ধরে যেসব খবর আসছে তা রীতিমতো আতঙ্কিত হবার মতো। সব তাই প্রকাশ করছি না। নৈর্বাচনিক রাস্তা পার হতে জোটভিত্তিক সওদাবাজি প্রকট আকার ধারণ করবে বলে মনে হয়। সরকারের তরফে চিহ্নিত সিন্ডিকেটের ব্যাংক-হিসাবের আচরণ তদন্ত করে দেখা খুবই দরকার। এগুলোকে রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে হেফাজত আর হেফাজত থাকবে বলে মনে হয় না। আশঙ্কা জাগে, আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর অবর্তমানে হেফাজতে ইসলাম এক খেলনায় পরিণত হবে। আমার সবচেয়ে বেশি অবাক লাগে হেফাজত তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত শাপলাসহ কোন ঘটনার নিরপেক্ষ ঘটনার তদন্ত করেনি; এমন কি কওমের কাছে জবাবদিহীর গরজও অনুভব করেনি। জানি না পৃথিবীতে এতো বেপরোয়া সংগঠন আর আছে কি না। আমাদের কপালের কালো মেঘ না সরলে এগুলো নিরসন হবে বলে মনে হয় না। আল্লাহই ভালো জানেন।
21.09.2025
মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
জামায়াতের নৈর্বাচনিক অতীত ও ভবিষ্যৎ
মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী
ভাবনা-৭৩
জামায়াতে ইসলামী কি একটি রাজনীতিক দল না কি ধর্মীভিত্তিক রাজনীতিক দল?—সে মীমাংসা এখনো হয়নি। পাকিস্তান আমলের জামায়াত আর বাংলাদেশ আমলের জামায়াতের রাজনীতি দেখুন, সে সংশয় জাগবে। জামায়াতও বিষয়টি সমাধান করেনি। কিন্তু তাদের তৎপরতা দেখে, অতীতের ইতিহাস দেখে নির্দ্ধারণ করা কঠিন: জামায়াতের রাজনীতির চৌহদ্দীর আকৃতি। আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তারা সাধারণত একটি বিশেষ কৌশলগত অবয়ব ও রহস্যজনক অভ্যন্তরীণ খোলসায়িত বলয়ে পদচারণা করতে অভ্যস্ত। বিষয়টিকে তারা ভেতরের পরম্মপরায় অনুশীলনে রূপ দিয়ে থাকেন। নিঃসন্দেহে তারা কঠোর নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার বেড়াজালে নিজেদের আবৃত করে রাখে। তারা যা বলে তা কতোটুকু বিশ্বাস করে—সে বিষয়ে অন্যদেরকে সংশয়ে রাখাকে তারা সাফল্য হিসাবে দেখতে চায়। এ সংশয় থেকে তাদের বলয়ের বাইরের মানুষের কাছে তাদের নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তেমনই একটি সংশয় বা সন্দেহ: জামায়াত কি নিছক একটি প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিক দল না কি ধর্মীভত্তিক রাজনীতিক দল? এ প্রশ্নের আরও কারণ আছে। এক সময় জামায়াতকে দেশের সেক্যুলারগোষ্ঠী ও তাদের আন্তর্জাতিক বন্ধুরা জঙ্গী সংগঠন হিসাবে দেখতো। জামায়াতের জন্য বিষয়টি স্বস্তির ছিলো না। তাই তা থেকে বেরুতে জামায়াত চেষ্টার কম করেনি। বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্কন্নোয়নে তারা ছিলো তৎপর। তারা যে এ কাজে সফল হয়নি তা নয়। ইতোমধ্যে জামায়াত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গীর খাতা থেকে বেরিয়ে অজঙ্গী লাইসেন্স লাভ করেছে। ভারতের সাথেও সম্পর্কন্নোয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে তারা ভারতকে বন্ধু মনে করে এবং তারা ভারতবিরোধী নয়—এমন বক্তব্যও দিয়েছে।অনেকের মনে থাকবার কথা, আওয়ামী আমলে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে তারা প্রচলিত গণতন্ত্রের স্বার্থে গঠনতান্ত্রিক মৌলিক নীতিতেও পরিবর্তন আনে। উদাহরণসরূপ বলা যায়, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত জামায়াত তাদের মেনিফেস্টোতে(সাংবিধানিক সংস্কার-১) উল্লেখ করে:১. সর্বশক্তিমান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হবে।
২. কুরআন ও সুন্নাহই হবে প্রজাতন্ত্রের সকল আইনের উৎস।
৩. কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।
কিন্তু ২০১৯ সালের ২২তম সংশোধনীযুক্ত গঠনতন্ত্রে(ধারা-৩) বলা হয়:
“বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।”
জামায়াতের মেনিফেস্টো ২০০৮ও তাদের নৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। জামায়াতের নীতিগত এ পরিবর্তন জামায়াতের দীর্ঘদিনের মিশন ও লক্ষ্য সম্পর্কে জনগণের মাঝে সংশয়ের সৃষ্টি করে। এখন জামায়াত কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দেশ গড়ার পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ ও সমাজ গড়ার পথে আগুয়ান। আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, জামায়াতের স্বীকৃত ও ঘোষিত সত্ত্বার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে। জামায়াত আসলে কি চায়? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি। তবুও আমার মতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দল না বলে ধর্মাশ্রিত গণতান্ত্রিক দল বলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে। তাহলে জামায়াতের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমালোচকদের বিশেষ কিছু বলার থাকবে না। জামায়াত এ নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে পারে। তারা দলের নামও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’র পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ রাখতে পারে। আমার মনে হয়, এখানটায় অবস্থান পরিস্কার করতে না পারলে জামায়াতের রাজনীতি সংশয়পূর্ণ ও সন্দেহের আবর্তেই থেকে যাবে। জামায়াত আসলে ইসলামী দল কি না—সে প্রশ্নেরও আক্রমণ থেকে যাবে। এমনিতেই জামায়াতের ইসলামী হবার বিষয়ে দেশের উলামায়ে কেরামের ভিন্নমত আছে। সংশয়ের বিষয়গুলোকে সমাধান করা না গেলে জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে যেমন কথা উঠবে তেমনি ভোটের বাক্সেও তাদের রায় আসার ক্ষেত্রকে কম্পমান করে রাখবে।আমার বক্ষ্যমান প্রবন্ধের মূল বিষয় হলো, জামায়াতের নির্বাচনসংক্রান্ত অতীতের আলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তাদের চাওয়া-পাওয়ার অবতারণা। চব্বিশের বিপ্লবের পর এবং সম্প্রতি ডাকসু ও জাকসু’র ফলাফলে জামায়াত, শিবির ও তাদের সমমনা মানুষজন ভাবতে শুরু করেছেন: আগামী ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে জামায়াতের ভিন্ন চেহারা দেখা যাবে। আমি বিষয়টিকে অতো সহজ ভাবি না। কারণ, এ-দেশের মানুষ, তাদের মনন, ইতিহাস-বিবেচনা ও তাদের উপর আলিম-সমাজের প্রভাবকে সামনে রাখলে জামায়াতের নৈর্বাচনিক ফলাফল নিয়ে সচ্ছন্দে হাত-পা নাড়ার সুযোগ নেই। জামায়াত সেটা কতোটুকু বোঝে, আমার জানা নেই। মনে রাখতে হবে, ডাকসু ও জাকসু’র ফলাফল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি ও শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলো নিয়ে জাতির একটি ক্ষুদ্র অংশের সচেতনতা থাকলেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জানাশোনা কম। অথচ বৃহৎ জনসংখ্যার ফয়সালাই চূড়ান্ত ফল ঠিক করবে। হ্যা, ছাত্র-সংসদের নির্বাচন হয় তো একটি সাময়িক আলোচনার জন্ম দেবে কিন্তু বিশাল সাগরের তুলনায় তা নগণ্য। তা’ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হবে আগামী সালের ফেব্রুয়ারীতে। সে বেশ দেরি। ততোদিনে ওসব নির্বাচনের কথা আলোচনার টেবিল থেকে বিদায় নেবে। ছাত্র-সমাজও নির্বাচনের সেই স্মৃতি ভুলে জাতীয় নির্বাচনের স্বপ্নে বিভোর হবে।
বলছিলাম, জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত মোট পাঁচ বার নির্বাচন থেকে দূরে থাকে। এর মধ্যে একবার দল হিসাবে নিষিদ্ধ হয় ১৯৭৩ সালে, দু’বার দলের নিবন্ধন বাতিল ২০১৪ ও ২০২৪ সালে। তারা নির্বাচন বর্জন করে দু’বার ১৯৮৮ ও ১৯৯৬(ফেব্রুয়ারী)তে। নির্বাচনে অংশ নেয় প্রথম ১৯৭৯ সালে(আইডিএল), ১৯৮৬ সালে, ১৯৯৬(জুন) সালে, ২০০১ সালে, ২০০৮ সালে এবং ২০১৮ সালে। এসব নির্বাচনে জামায়াতের আসন সংখ্যা: ১৯৭৯তে ৬, ১৯৮৬তে ১০, ১৯৯১-এ ১৮, ১৯৯৬তে ৩, ২০০১-এ ১৭, ২০০৮-এ ২ এবং ২০১৮তে ০। এর মধ্যে আবার জামায়াত ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে। প্রাপ্তভোটের শতকরা হারে তারা পায় ১৯৮৬ সালে ৪.৬%, ১৯৯১ সালে ১২.১০%, ১৯৯৬ সালে ৮.৬০%, ২০০১ সালে ৪.২৮% এবং ২০০৮ সালে ৪.৭০% ভোট। এ চিত্রের দিকে তাকালে জামায়াতের অতীতের নৈর্বাচনিক ছবি খুব একটা সুখকর নয়। মধ্যখানে ’৯১ সালেরটা বাদ দিলে বাকি পরিসংখ্যান খুবই দরিদ্র অন্তত তাদের পরিচিত সাংগঠনিক কর্মদক্ষতার প্রচারের তুলনায়। এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমানে জামায়াত কোন অবস্থানে আছে? বিশেষত বিগত ১৭ বছরের জালিম শাহীর শোষণপরবর্তী ’২৪-র বিপ্লবের উত্তরাধিকার হিসাবে জামায়াত নিজেদের সমর্থনকে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পেরেছে বলে মনে হয়? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে আমিকিছু অনলাইন-সূত্র ও তথ্যকে অবলম্বন করি। জরিপকৃত তরুণদের ভাষ্য থেকে নেয়া তথ্যমতে জামায়াতের বিভাগভিত্তিক হার: ঢাকাতে ২৪.১০%, চট্টগ্রামে ২৬.৩০%, রাজশাহীতে ১৮.৭০%, খুলনায় ১৯.৪০%, বরিশালে ১৫.২০%, সিলেটে ২২.৬০%, রংপুরে ১৭.৯০% এবং ময়মনসিংহে ২০.৩০%। নারীদেরমধ্যে জামায়াতের বিভাগভিত্তিক সমর্থন চট্টগ্রামে ১৪-১৬%, ঢাকাতে ১২-১৪%, সিলেটে ১৩-১৫%, খুলনায় ১০-১২%, রংপুরে ৮-১০%, রাজশাহীতে ৯-১১%, ময়মনসিংহে ১০-১২% এবং বরিশালে ৭-৯%। তরুণদের কাছ থেকে নেয়া এই জরিপ মাঠের আসল খেলায় কতোটুকু বাস্তাবায়িত হবে তা কেউ জানে না। যে জায়াগাটা সবচেয়ে বেশি জরিপে প্রতিভাত হয়েছে তা হলো, এখনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা ভোটারের হার যা ছিলো ২০২৪-এ ৩৭.৬০% তা ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ৪৮.৫%-এ। সুতরাং খেলাটা হবে এখানেই। জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংক হয়তো আছে কিন্তু তার বাইরে কতোটুকু সংগ্রহ করতে পারবে—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা দরকার, ডাকসু ও জাকসুতে যে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী শিবির-সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে তারা একবাক্যে বলেছে: তারা শিবিরের রাজনীতি বা তাদের আদর্শকে পছন্দ করে ভোট দেয়নি। তারা দিয়েছে ভার্সিটির অভ্যন্তরীণ বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে। সুতরাং বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কতোটুকু অংশ জামায়াতকে সংসদীয় নির্বাচনে সমর্থন দেবে—তার উত্তর মোটেও সরল নয়।বলাবাহুল্য, সরকারের কথা মতো এখনো নির্বাচনের বাকি চার মাস। এ চার মাসে রাজনীতিক পরিস্থিতির অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। তাই, যে দলই হোক না কেন এখনি স্বপ্নে বিভোর না হওয়াই ভালো। যারা স্বপ্নে মগ্ন হবে তাদেরকেই ঘুম ভেঙ্গে মাথায় হাত দিতে হতে পারে। জামায়াতের জন্য আসন্ন নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে কিছু বিপদ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন কেউকেউ জামায়াতের সাথে কিছু ইসলামী দলের জোট বাঁধার যেসব কথা বলছেন, আমার মনে হয় না তা সহজে ঘটবে। কারণ, জোটের কথা কেবল বাহ্যিক; ভেতরের নয়। প্রতিটি দলেই চাইবে নিজেদের অবস্থা সংহত করতে। জোট হলেও সেখানটায় স্বার্থপরতার ঘাটতি হবে না। আর জামায়াতের নিজস্ব কৌশলগত রাজনীতির মুখোমুখী হয়ে অন্য দলগুলো কতোটুকু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে—তা এক চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। জামায়াতকে নিয়ে আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে যে কিছু বিপদের কথা বলেছি, সেগুলো হচ্ছে:১. ’৭১-এ তাদের ভূমিকার প্রশ্ন ও তাদের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে। এখানে জামায়াত অতীতের মতো সরাসরি কথা না বলে কৌশল অবলম্বন করবে বলে মনে হয়। তেমনটি ঘটলে জামায়াতবিরোধী একটি বলয় দেখা দেবে যা পরোক্ষভাবে বিএনপি’র আশ্রয় লাভ করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঘাঁপটিমারা ফ্যাসিবাদের দোসররা, কথিত সুশীলরা, জাফর ইকবালের মতো বুদ্ধিবেপারীরা সর্বোপরি ‘র’ সুযোগ অবশ্যই নেবে। জামায়াত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সৎসাহস দেখাতে পারে তবে কিছুটা রক্ষা হতে পারে। এখনো জাতির বৃহত্তম অংশ ’৭১-র ব্যাপারে জামায়াতের কৌশলগত দুঃখ-প্রকাশ এবং ‘যদি’র আশ্রয় নেয়াকে পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিদের কৌশলের অনুরূপ মনে করছে। এটা জামায়াতের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হবে। মনে রাখতে হবে, জামায়াত সম্পর্কে প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বিরূপ। ডাকসু বা জাকসু’র মতো ফলাফলে তা প্রভাবিত হবে বলে মনে হয় না। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বলা যেতে পারে, ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে জামায়াতবিরোধী একটি শক্তির উত্থান ঘটতে পারে যা জামায়াতের কৌশলগত ভুলের কারণে শক্তি বৃদ্ধি করবে বলে মনে হয়।
২. আসন্ন নির্বাচনের আগে জামায়াতের আরেক প্রতিপক্ষ হতে পারে হেফাজতে ইসলাম। ইতোমধ্যে হেফাজত আমীরের জামায়াতের মওদূদী-মতাদর্শের বিরুদ্ধে দেয়া বক্তব্য হালে পানি পেতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেও বিষয়টি নিয়ে আলিম-সমাজের মধ্যে নীরবতা থাকলেও এখন আওয়ায বড় হচ্ছে। হেফাজতের এমন অবস্থান বিস্তৃত হলে জামায়াত বেকায়দায় পড়বে। কারণ, দেশের তৃণমূলে হেফাজতভুক্ত আলিম-সমাজের যে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক রয়েছে তা জামায়াতের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। হেফাজত আমীর মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সম্প্রতি দেয়া বক্তব্য: জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশে কওমী মাদরাসা রাখবে না, জামায়াতের জন্য রীতিমতো মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জামায়াত কোন সমস্যাকেই সমূলে সমাধান করতে চায় না। বিভিন্ন কৌশলে তারা সমস্যাকে জিইয়ে রেখে নিজেদের ষোল আনা আদায় করতে চায়। এখানেই জামায়াতের ভুল রাজনীতির মূল নিহীত।
মোদ্দাকথা, বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতিক ভবিষ্যৎ সংশয়পূর্ণ। সাংগঠনিকভাবে তারা হয়তো অন্যদের চেয়ে দশগুণ এগিয়ে কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে তারা বারবার নিজেদের ভুলে খেসারত দেয়। এটাই সম্ভবত তাদের নিয়তি। সেখান থেকে তারা যে বেরুতে পারবে, তেমন মনে হয় না। বিভিন্ন জরিপে প্রদর্শিত তাদের সমর্থন ও ভোটের পরিসংখ্যান মাঠে কতোটুকু সমর্থন করে, তাই বিবেচ্য।
16.09.2025






