ভাবনা-২৫
০৭.০৩.২৩
০৭.০৩.২৩
ভোট আসছে। এখনও কেউ জানে না ভোটের চেহারা-চরিত্র কেমন হবে। নির্বাচন দশটা হবে নাকি একটা হবে তাও জানা নেই। খবরে দেখলাম, ইসলামী দলগুলো নির্বাচন নিয়ে তাদের কৌশল ঠিক করছে। আমি রাজনীতির মানুষ নই। তবে রাজনীতির খবরাখবর রাখি। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিক দলগুলোতে বিভক্তি আছে। ক্যাডারভিত্তিক দল জামাতে ইসলামী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এবং কওমীভিত্তিক দল। আমার আজকের আলোচনা কওমীভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে। কওমীভিত্তিক ইসলামী দল মূলত কওমী মাদরাসাকেন্দ্রিক। এর নেতা-কর্মীরা নিরঙ্কুশভাবে কওমী মাদরাসার সাথে জড়িত। দেশের অন্যান্য রাজনীতিক দলের যেমন নীতি-দর্শন আছে, কওমীভিত্তিক দলগুলোরও আছে। এদের দর্শন মূলত ইসলামভিত্তিক বলে পরিচিত। অন্যান্য দল যেমন ঘোষিতভাবে ক্ষমতামুখী রাজনীতি করে, এ ঘরানার দলগুলো তেমনটা বলে না। কিন্তু তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেন এবং তাদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেন। এক সময় বামপন্থী বাদে আমাদের রাজনীতিক দলগুলো ছিলো তৃণমূলীয়, এখনকার মতো রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। রাজধানীতে সদরকাজ ছিলো কিন্তু পদচারণা ছিলো গ্রামীণ জনপদভিত্তিক। এর বড় উদাহরণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ থেকে পথচলা শুরুর পর মজলুম জননেতা মরহুম আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর হাত ধরে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ গ্রামেগঞ্জে চষে বেড়িয়েছেন দলের ভিত শক্ত করতে। তাঁরা মনে করতেন, প্রান্তিক অঞ্চলের ভিত ছাড়া রাজনীতি অসম্ভব। স্বাধীনতার পর ক্ষমতায়ন হলে আওয়ামী লীগ তৃণমূলায়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেখা দেয় রাজনৈতিক সংঘাত ও অরাজকতা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই তৃণমূলীয় ধারাকে ফিরিয়ে আনতে। তিনি প্রায়ই বলতেন, I shall make politics difficult. অর্থাৎ, রাজধানীকেন্দ্রিক আয়েশী রাজনৈতিক ধারাকে গ্রাম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে এলিটধর্মী রাজনৈতিক নেতাদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবেন। এতে তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো, রাজনীতি হবে উন্নয়নভিত্তিক এবং তৃণমূলীয়। পুরো দেশটাকেই তিনি রাজনীতির মাঠ বানাতে চেয়েছিলেন যেন সবাই সমান অংশীদার হন। তাঁর শাহাদাতে সেটা আর হয়নি। বিএনপিও রাজধানীভিত্তিক এলিট-রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়। দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আমাদের কওমীভিত্তিক ইসলামী দলগুলোও এলিট-রাজনীতির খপ্পরে পড়ে যায়। এরা মূলত রাজধানীভিত্তিক। গ্রামীণ জনপদে এদের পদচারণা শূণ্যের কাছাকাছি। অথচ এটা কওমী-দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কওমী-দর্শন ভিত্তিগতভাবেই তৃণমূলীয়। তাঁদের মূলশক্তি গ্রামীণ জনপদে। দেওবন্দ মাদরাসার মৌলনীতি বা উসূলে হাশতগানা দেখলেই তা বোঝা যাবে। তা’ছাড়া, ‘সাওয়ানেহে কাসেমী’তে (হযরত কাসেম নানতুভী রহ.-র জীবনীগ্রন্থ: মাওলানা মানাযির হাসান গিলানী রহ.) বিষয়গুলো স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে। তাহলে কেন তাঁরা আজ রাজধানীনির্ভর? ক্যাডারভিত্তিক দল জামাতে ইসলামী বিশ্বাস করে: আগে ক্ষমতা পরে ইসলাম। তাই তারা ক্যাডারভিত্তিক ও ক্ষমতামুখী। কিন্তু কওমীরা এর বিপরীত। তাঁরা মনে করে তৃণমূলীয় সমাজ-সংস্কার আগে, ক্ষমতা পরে। ক্ষমতা মূল আরাধ্য নয়, ইসলামের দা’ওয়াত ও সংস্কার মূল আরাধ্য। আর প্রচলিত রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শ অক্ষত রেখে কতোটুকু অংশগ্রহণ সম্ভব তা গবেষণার বিষয়। সন্দেহ নেই, সর্বব্যাপী সংস্কারের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে পড়ে আমীরে শরীয়ত হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.-র তাওবার রাজনীতির কথা। মূলত সেটাই ছিলো ইসলামের মূলধারার রাজনীতি বা আন্দোলন। হযরতের ইন্তিকালের পরে সে ধারা আর অব্যাহত থাকেনি। এর বিষময় ফল এখনও আমাদেরকে ভোগ করতে হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কওমীভিত্তিক ইসলামী রাজনীতিক দলগুলোকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে, তারা কোন পথে যাবেন। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, অন্য কোন দলের সাথে জোট করতে পারেন কিন্তু মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে নয়। মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যদি রাজনীতিক দল টিকিয়ে রাখতে হয়, মনে হয় সেটা অন্য কিছু হবে, ইসলামী রাজনীতি হবে না। মা বেঁচে থাকতে ‘মা’ ডাকলে অর্থবহ হয়, মা মরে গেলে সে ডাক কে শুনবে? আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে মনে হয়, ইসলামী দলগুলোর তৃণমূলীয়করণ করা দরকার যা অনুপস্থিত। মনে রাখা দরকার, কওমী মাদরাসা আর কওমীভিত্তিক রাজনীতিক দল এককথা নয়। তাঁরা রাজনীতি করুন কিন্তু রাজনীতিজীবি না হোন। এটাই কাম্য।
০৪.০৩.২৩
ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভা মূলত একটি মফস্বল এলাকা। স্বাক্ষরতা সরকারী হিসাবে ৬১.৫ শতাংশ। ৫.২৬ বর্গমাইল আয়তনের নাজিরহাট পৌর এলাকায় ৫০,০০০ মানুষের বসবাস বলে সরকারী খাতায় দেখানো হয়েছে। এখানে চলছে পৌর নির্বাচনের প্রচারণা। শুনতে পাচ্ছি, এখানে ইভিএম-এ ভোট হবে। জানি না, ইভিএম পদ্ধতি কতোটা পরিশুদ্ধ। পাশের ফটিকছড়ির পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএম-র ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ঢের। শুনেছি, সেখানে অনেক বিতর্ক উঠেছে। যাদেরকে দেয়া হয়েছে তারা ভোট পাননি। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা ভোট হয়তো দেবেন কিন্তু জানেন না মেশিনে কেমন করে ভোট দিতে হয়। বিশেষ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যাদের সংখ্যা বেশি, জানেন না ইভিএম কি বা কেমন তার ব্যবহার। এখানেই সমস্যা; প্রতারিত হবার ঝুঁকি বেশ। নির্বাচন কমিশনের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। ধরে নিলাম ইভিএম পদ্ধতি সঠিক। কিন্তু গ্রামের মানুষেরা যে প্রশিক্ষিত হয়নি বা পারদর্শী হয়নি—সেকথা বুঝেছে কেউ? অজ্ঞকে তো ধোঁকা দেয়া সহজ। আর আমাদের মতো দেশে যেখানে রাতেও ভোট হয়, আগে থেকে বাক্স ব্যালটভর্তি করে রাখার নজির আছে, সেখানে ইভিএমের কারসাজি (যদি হয়ে থাকে) রুখবে কে? বলাবাহুল্য, এখন তো স্থানীয় নির্বাচনও হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। সে হিসাবে দলীয় তোড়জোড় তো আছেই। তবে বিএনপি না থাকায় সবাই সরকারী দলের, তাই কথা আছে, জৌলুশ নেই। আগে যখন দলহীন নির্বাচন হতো, মানুষে-মানুষে কৌতুহল, আলোচনা, উৎসাহ—সব হতো। বলা চলে, এখন খালি মাঠে গোল করার মেলা। প্রার্থীরা সবাই এলাকার। নানা মতে বিভক্ত মানুষ কেউ যাবে ভোট দিতে, কেউ হয়তো যাবে না। কারণ, আগের অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ’১৪ আর ’১৮-র নির্বাচনের কথা মানুষ ভোলেনি। চোখ বন্ধ করে বলা যায়, মানুষ আজ পর্যন্ত দ্বিধায়। ভাবতে পারেন, ন্যূনতম হলেও কিছু মানুষের ভোটে কেউ জনপ্রতিনিধি হবেন; কাজ চালাবেন আগামী পাঁচ বছর। নতুন প্রার্থী-পুরনো প্রার্থী: সবাই মানুষের দ্বারে; অন্তত তাদেরকে যেন একবার সুযোগ দেয়া হয়। আমাদের কথা: বিরোধীরা যখন নেই, প্রতীক নিয়ে আমাদের কাছে আসবেন না; এমনি আসুন, আমরা বিবেচনা করবো। উন্নয়নের কথা বলে, সাহায্যের কথা বলে তারা দোয়া চায়, ভোট চায়। মানুষ যখন জানবে-বুঝবে: তাদের ভোট বিপথে যাবে না, সকালে গিয়ে শুনবে না: ভোট হয়ে গেছে, তখন-ই কেবল নির্বাচন স্বার্থক হবে-সফল হবে।
০২.০৩.২৩
ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিন অর্থাৎ, ২৮
তারিখ, পত্রিকার পাতায় খবর বেরুলো সাবেক নির্বাচন কমিশনার মরহুম মাহবুব তালুকদার তাঁর
‘নির্বাচননামা: নির্বাচন কমিশনে আমার দিনগুলো’ বইয়ে লিখেছেন: বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির
স্থপতি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি—সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। আমি তাকে অরাজনৈতিক ব্যক্তি
বললেও মূলত তিনি পর্দার অন্তরাল থেকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে দাবার চাল
দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির আসনে থেকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে
ঘটনাটি ঘটান, তার নাম সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত
রায়। এই রায়ের ফলে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক
সরকার ব্যবস্থা বাদ দেয়া হয়। তিনি আরও লিখেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিচার বিভাগ। গণতান্ত্রিক
দেশে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অনেক যৌক্তিকতা প্রদর্শন করা
যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য যে নতুন আইনি কাঠামোর
প্রয়োজন ছিল, বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে তা অনুপস্থিত।
তিনি অবশ্য বলেছেন যে, এ রায়ের পর আরও দুই টার্ম জাতীয়
নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর কোনো বাধ্যবাধকতা
ছিল না। ফলে নতুন ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রেসক্রিপশন দিয়ে
পক্ষান্তরে তিনি রাজনৈতিক বিপর্যয় টেনে আনেন। বিষয়টিতে একটি সাংবিধানিক কমিটির
সদস্য হিসাবে জনাব মাহবুব তালুকদার যেভাবে মন্তব্য করেছেন, সেভাবে অন্য কেউ বলেছেন
কিনা জানি না। তাঁর লেখাতে বিচারবিভাগ ও একজন প্রধান বিচারপতির নৈতিক অবক্ষয়জনিত অবস্থানের
যেমন চিত্র ধরা পড়েছে, তেমনি ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণও উদ্ধৃত হয়েছে। কিয়ামাতের
কঠিন দিনে সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়াদানের কথা পবিত্র হাদীস শরীফে
বলা হয়েছে। এঁদের মধ্যে প্রথমজন হলেন, হাদীসের ভাষায়, ‘আল ইমামুল আদিল’ অর্থাৎ, ন্যায়পরায়ন
বাদশা, নেতা, বিচারক প্রমুখ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন ইমামুল আদিলকে এক নম্বরে উল্লেখ
করা হলো? ভাষ্যকারেরা বলছেন: একজন ন্যায়পরায়ন বাদশা বা বিচারক কেবল ব্যক্তিত্ব বলেই
নয়, সমাজের নীতি-নৈতিকতা, স্বস্তি-শান্তি রক্ষার প্রধান নির্বাহী। তাঁদের কথা এবং কাজ
সমাজকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনি ধ্বংসও করবে। ছায়া লাভকারী বাকি ছয় শ্রেণীর মানুষ আপন-আপন
গুণাবলীতে ভাস্বর থেকে যোগ্য বিবেচিত হবেন বটে কিন্তু ইমামুল আদিলের মতো সমাজে ব্যাপকভাবে
প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। এর কারণ, ক্ষমতা ও প্রভাব। মরহুম মাহবুব তালুকদারের
কথায় হাদীসের কথাটি মনে পড়ে গেলো। নিঃসন্দেহে সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক সে দৃষ্টিকোণে
আল্লাহর কাছে তো বটেই, জাতি ও সমাজের কাছেও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করে পুরো জাতি ও দেশকে
বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, রায় ঘোষণা করে রাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ
অর্থ অনুদান হিসাবে গ্রহণ করে বিশ্বের কাছে আমাদেরকে শরমিন্দাও করে রেখেছেন।
০১.০৩.২৩
মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী ভাবনা-৮১ গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির জামিয়া বাবুনগরে ১১ দলের শরীক ৭টি কওমী দলের আলাদা জোটের ভবিষ্...